শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

“ঐ আলোকমাতাল স্বর্গসভার পুষ্পাঞ্জলি”

Maria Sklodowaska তখন নিতান্তই ছোট, খেলার সঙ্গিনীদের সঙ্গে চলেছেন পোল্যান্ডের ওয়ার্সর পথে। এমন সময় এক বৃদ্ধা তাঁর কাছটিতে এসে বললেন, “খুকু তোমার হাতখানি দেখি তো।”
বালিকা তাঁর ছোট্ট নরম হাতখানি বৃদ্ধার দৃষ্টির সামনে মেলে ধরতে বৃদ্ধা সবিস্ময়ে তাকে বললেন, “কি অদ্ভুত তোমার হাতখানি! পরে আশীর্বাদ করে বলেন, “ভবিষ্যতে তুমি জগদ্বরেণ্য হবে।”

মাদাম কুরির জীবনে এটাই প্রথম সম্মানলাভ।
যদিও এই ঘটনার বিজ্ঞানসম্মত কোন ব্যাখ্যা নেই, তবুও তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের এটিও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
আমরা জানি মাদাম কুরি ও পিয়ের কুরি ১৮৯৮ সালে একত্র কাজ করে Radium আবিষ্কার করেন, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
প্রত্যেক বিজ্ঞানীর জীবনের লক্ষ্য প্রমাণসিদ্ধ সত্যানুসন্ধান। কুরি দম্পতিও আজীবন সত্যানুসন্ধানে ব্যাপৃত থেকেছেন। নানা প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে কি বিপুল নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে এই দুই মানুষ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তা ভেবে বিস্মিত হতে হয়।

পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তরিক সহযোগিতায় দুজনে মিলে সন্তানপালনের সঙ্গে করেছেন বিজ্ঞার লক্ষ্মীর সাধনা। বিশ্ববরেণ্য এই দম্পতি পরস্পর এমন নিবিড়ভাবে সংপৃক্ত ছিলেন যে তাঁদের সাফল্যের সম্মান একজনকে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। Radium আবিষ্কারের নোবেল পুরস্কারের সম্মান মাদাম কুরি লাভ করলেও একথা অনস্বীকার্য যে অধ্যাপক কুরির নিরলস সহযোগিতা ব্যতীত এই দুরূহ কার্য তাঁর একার পক্ষে সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
১৮৫৯ সালে প্যারিসে পিয়ের কুরির জন্ম। তাঁর শিক্ষালাভ Sorborne University থেকে। পরবর্তীকালে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মানদানে সম্মানিত করে। বস্তুত তাঁর বিরলতম বিজ্ঞান সাধনার স্বীকৃতি তিনি তাঁর জীবৎকালেই লাভ করেছিলেন। কিন্তু মাদাম কুরির জীবনেতিহাসে জানা যায় নিজের স্থানটিতে পৌঁছতে তাঁকে বহু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
১৮৬৭ সালে পোল্যান্ডে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা Sklodowaska ছিলেন রসায়নের অধ্যাপক।
তাঁর সন্তানগণ বিজ্ঞানমনস্ক হবেন এটা খুব স্বাভাবিক। এছাড়া তাঁর মধ্যে ছিল গভীর স্বাজাত্যবোধ ও স্বদেশপ্রেম। বিবাহের পর তিনি পিয়েরের পত্নীরূপে সমধিক পরিচিতি লাভ করলেও তিনি যে জাতিতে পোলিস এ’সত্য তিনি বিস্মৃত হতে চাননি। কারণ তাঁর জন্ম ও বেড়ে.ওঠার কালটা ছিল পোল্যান্ডের ইতিহাসে এক চরমতম বিপর্যয়ের অধ্যায়। রাশিয়ার নির্যাতনে ও নিপীড়নে তখন পোল্যান্ডবাসীগণ বিধ্বস্ত। সেই নির্যাতিত পরপীড়িত জাতির প্রতিভূ ছিলেন ম্যারিয়া। ওয়ার্সর পথে কসাক সৈন্যদলের স্বেচ্ছাচারের ছবি তাঁর অন্তরে রক্ত-আখরে আঁকা হয়ে গেছিল।
এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে শব্দমাত্র উচ্চারণের ফল ছিল সুদূর সাইবেরিয়ায় নির্বাসন। জাতীয় ভাষাশিক্ষা সমস্ত বিদ্যালয় থেকে নিষিদ্ধ করে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে রাশিয়ান ভাষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
পোল্যান্ডের রমণীরা প্রায়শঃই সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী হন।

জন্মসূত্রে মারিয়াও ছিলেন রূপ ও মেধার এক অসামান্য প্রতিমূর্তি। ব্যক্তিত্বে ও কর্তব্যে অবিচল এই নারী ছিলেন যেন নিবাত নিষ্কম্প চৈতন্যময়ী এক দীপশিখা। সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর দৃষ্টিতে ধরা দিয়েছিল নির্যাতিত জাতির এক অব্যক্ত বেদনা। সে সময়ে পোল্যান্ডে বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষালাভের কোন প্রতিষ্ঠানের অভাবে মারিয়া অষ্ট্রিয়া সরকার পরিচালিত এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানবিভাগে একটি আবেদনপত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু নারী হয়ে তাঁর বিজ্ঞান চর্চার ইচ্ছাকে কর্তৃপক্ষ স্পর্ধা হিসাবে মনে করেন এবং রন্ধনবিভাগে নাম নথিভুক্ত করার উপদেশ দিয়ে মারিয়াকে বাধিত করেন।
কিন্তু মারিয়ার অদম্য ইচ্ছা শেষ অবধি পূর্ণতা লাভ করে। তিনি চলে আসেন প্যারিসে। সেই সময় ফরাসি সরকার পোল্যান্ডবাসীদের জন্য এক অনন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। মারিয়া ইতিমধ্যে ফরাসী ভাষাটা ভাল করে রপ্ত করে নিয়েছিলেন। আর সবচয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল এই যে এই সময় সে দেশ নারীদের বিজ্ঞানসাধনাকে সম্মান জানাতে নানা সুযোগ সুবিধাদানের পদক্ষেপ নিয়েছিল। সে যুগে ইংল্যান্ডও যে খুব প্রগতিশীল হয়ে উঠেছিল এমনটা মনে করার কোন কারণ নেই। আর সে কালে মেয়েদের চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নকে অপরাধ বলেই গণ্য করা হত। তাই প্যারিস হয়ে উঠেছিল সারস্বত সাধনার তীর্থভূমি।

এই সময় থেকেই মারিয়ার আনন্দঘন দিনগুলোর সূচনা। অর্থপ্রাচুর্য না থাকলেও আনন্দের খামতি ছিলনা। শহরের একটি apartment এর চারতলার একটি ছোট ফ্ল্যাট-এ থাকতেন এবং নিজেই নিজের কাজ করতেন। কয়লা নিয়ে চার তলায় উঠছেন এমন দৃশ্য প্রায়শঃই দেখা যেত। খুব সাধারণ জীবন যাপন, তবু কতই না স্পৃহনীয়!
বহু আকাঙ্ক্ষিত কর্মের সূত্রপাত এখান থেকেই। একদিকে চলছে বিজ্ঞানচর্চা অন্যদিকে Laboratoryতে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষায় সোৎসুক আত্মনিবেদন। এইখানেই পরিচয় হয় প্রখ্যাত অধ্যাপক পিয়ের কুরির সঙ্গে। পরিচয়থেকে প্রণয় এবং পরিণয়। আদর্শগতভাবে এ ছিল যথার্থ অর্থে পরিণয়। উভয়ের জীবনজিজ্ঞাসা ছিল একই কেন্দ্রাভিগ। দুই জীবনের গ্রন্থিবন্ধন এই কারণেই সম্ভব হয়েছিল।
বিজ্ঞান সাধনা দুজনের মুখ্য লক্ষ্য হলেও পারিবারিক দায়িত্ব ও কর্তব্য তাঁরা পালন করেছেন আনন্দের সঙ্গে। জ্ঞানব্রতী এই দম্পতী দুই কন্যাসন্তান আইরিন ও ইভকে কি অপরিসীম যত্ন ও স্নেহ দিয়েই না বড় করেছিলেন।

অনেকসময় গৃহকার্য তাঁরা নিজেরাই করতেন। মাদাম রন্ধনে ব্যাপৃত থাকলে অধ্যাপক সন্তানদের দেখাশোনা ঘরদোর ধোয়ামোছার দায়িত্বে থাকতেন।
ইতিমধ্যে বিজ্ঞানজগতের বাইরে রঞ্জনরশ্মি আবিষ্কারের কথা রাষ্ট্র হয়ে গেছে। এই আবিষ্কারের ফলে তেজস্ক্রিয়তা বিশ্বময় বিচ্ছুরিত হচ্ছে এ সত্য প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিশেষ বিশেষ ধাতুতে সূর্যরশ্মিতে ও পানীয় জলে এর প্রমাণ মিলেছে। উপরোক্ত পদার্থগুলি থেকে তেজস্ক্রিয়তাকে পৃথক করে মানবকল্যাণের কাজে নিয়োজিত করতে পারলে ভবিষ্যতে অশেষ সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে বলেই বিজ্ঞানীগণ মনে করতেন।
এই অসাধ্য সাধনে ব্রতী হয়ে যিনি বিজ্ঞানে যুগান্তর আনলেন তিনি মাদাম কুরি। এই ব্রতপালনে তাঁকে ছায়ার মতো সঙ্গদান করে অনুপ্রাণিত করেন অধ্যাপক পিয়ের কুরি।

পিচ্ ব্লেন্ড নামক এক কৃষ্ণবর্ণ কঠিন পদার্থকে নিষ্কাশিত করে পাওযা যায় এই রেডিয়াম। আলোকবিচ্ছূরণক্ষম পদার্থগুলির মধ্যে এটি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী হওয়ায় স্বচ্ছ কাঁচের মধ্যে এর অনুপ্রবেশ সহজেই ঘটে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিকালে cancer চিকিৎসায় এবং ব্যথা উপশম ছাড়াও নানা রোগে এর ব্যবহার ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
এই Radium আবিষ্কারের পিছনে কতখানি নিরলস প্রচেষ্টা কত বিনিদ্র রজনীর ইতিহাস জড়িত আজকে তা কল্পনাকরা আমাদের পক্ষে দুঃসাধ্য। মাঝে মাঝেই অতি পরিশ্রমে মাদাম অসুস্থ হয়ে পড়লে অধ্যাপক কুরি তাঁকে বিশ্রাম নিতে অনুরোধ করতেন। কিন্তু তাঁকে নিরস্ত করা ছিল অসম্ভব। পরিকল্পিত সিদ্ধান্তে না আসা পর্যন্ত অসুস্থ শরীরে অবিচলিত চিত্তে তাঁর সাধনা অব্যাহত রেখেছেন । এ ছাড়া অর্থাভাব তো ছিলই। পিচ ব্লেন্ড নামক বস্তুটিওছিল মহার্ঘ্য। এ সকল বাইরের নানা বাধাকে বিঘ্নকে অতিক্রম করে মানুষের হিত সাধনায় অন্তরের আলোকে পথ চলেছেন তিনি।

সে কালের অষ্ট্রিয়ার রাজা ছিলেন মাদামের গুণমুগ্ধ। তিনি স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে তাঁর কাজকে.সম্মানিত করতে তাঁকে পাঠালন এক টন পিচব্লেন্ড। এই উপহার মাদামের কাছে যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদরূপে নেমে এল। এ গৌরব তিনি সসম্মানে গ্রহণ করলেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে মাদাম তাঁর বহু যত্নে লালিত স্বপ্নকে সফল করতে সক্ষম হন। তিনি তখন একটি কন্যাসন্তানের জননী।
কিছু দিন পরে ইংল্যান্ডে Radiam সংক্রান্ত একটি পরীক্ষা Demonstrate কালে পিয়ের কুরি গুরুতরভাবে অগ্নিদগ্ধ হন। পরে সুস্থ হয়ে উঠলেও দৈনন্দিন কাজে তাঁকে বহু অসুবিধার সম্মুখীন হতে হ’ত। আহারের সময় কাঁটা চামচ ধরার ক্ষমতাও তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন।
১৯০৩ সালে কুরি দম্পতী যুগ্মভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান। একই বছর Royal Society Davy পুরস্কার দানে তাঁদের সম্মানিত করেন।

Sorbourne University একটি নতুন বিভাপ খুলে অধ্যাপক কুরিকে সেখানকার প্রধানের পদে বৃত করেন। মাদাম কুরি হন সহপ্রধান।
তাঁদের এই যৌথ সাধনার ধারা.অকস্মাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। প্যারিসের একটি পথ দুর্ঘটনায় পিয়ের কুরির মর্মান্তিক মৃত্যুর আঘাতে মর্মাহত মাদাম স্বামীর আরব্ধ কাজে নিজেকে আরও বেশি করে উৎসর্গ করেন। কাজের মধ্যেই তাঁর শোকাহত আত্মা শান্তিলাভ করে।
এই দুই মানুষ জীবনে বহুবার সম্মানিত হয়েছেন, কিন্তু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন সৌজন্যপরায়ণ বিনম্র, প্রচারবিমুখ দুটি মহৎ প্রাণ।
অবশেষে মর্ত্যের বন্ধন ছিন্ন করে তিনিও চলে গেলেন। মৃত্যুর দু-তিন দিন আগে পর্যন্ত জগৎবাসী তাঁর নিদারুন রোগযন্ত্রণার কথা জানতে পারে নি।

সহিষ্ণুতা ছিল তাঁর স্বভাবধর্ম। ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসের ৪ তারিখে হয়তো কোন বর্ষণস্নাত দিনে তিনি চির বিদায় নিলেন। রেখে গেলেন তাঁর অক্ষয় কীর্তি, তাঁর অপ্রমেয় মানবপ্রেম। ১৯৩৫ সালে তাঁর কন্যা আইরিন ও জামাতা ফ্রেডরিক রসায়ণে যুগ্মভাবে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন। আত্মজার এই গৌরবলাভ তিনি দেখে যেতে পারেননি সত্য, কিন্তু মানুষের সামনে রেখে গেছেন মানবকল্যাণে আত্মনিবেদনের এক পরম্পরাগত গৌরবময় ঐতিহ্য।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
সুলতা ভট্টাচার্য
সুলতা ভট্টাচার্য
2 months ago

সুধীবরেষু, এবারের রবিচক্রের আন্তর্জালিক পত্রিকায় মেরি ক্যুরির ওপর আমার রচনাটি প্রকাশিত হওয়ায় আনন্দের সঙ্গে মিশল এক মুগ্ধতা। কারণ আপনার প্রদত্ত নামটি যে অনির্বচনীতায় বিলীন তার বিশ্লেষণ করি কি ভাবে? অনেক শুভেচ্ছা সহ।
সঙ্গের ছবিগুলিও অনবদ্য।
যানি অনবদ্যানি তানি সেবিতব্যানি নো ইতরাণি।
যে সকল কাজ অনবদ্য, অনিন্দ্য, সেই গুলি সম্পন্ন করিবে। অন্যগুলি নহে। – উপনিষদ্।”

1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x