
‘বীরবল’ ছদ্মনামের আড়ালে প্রমথ চৌধুরীই বলেছিলেন “সাহিত্য নিয়ে কারবার করে শুধু লক্ষ্মীছাড়ার দল।” কারবার বলতে তিনি অবশ্য বইয়ের ব্যবসার প্রসঙ্গে কথাটি বলেছিলেন। কিন্তু এই প্রতিবেদনে কারবার কথাটি আমরা অন্য অর্থেও ব্যবহার করব। আমরা বইয়ের কথা বলব এবং বইয়ের সঙ্গে যাঁদের ‘লেনা-দেনা’- সেই লেখক, পাঠক, প্রকাশক, সমালোচক এঁদের কথাও বলব।
সরস্বতীর সেবা যাঁরা করেন, লক্ষ্মী তাঁদের উপর বিরূপ, এ কথা আমরা শুনেও এসেছি, দেখেওছি; যদিও এর ব্যতিক্রম আছে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সরস্বতীর সাধনা করতে গিয়ে তাঁদের বেশিরভাগকেই অলক্ষ্মীকে অর্ধাঙ্গিনী করে জীবন কাটাতে হয়েছে। আমরা নজরুলের কথা জানি। প্রকাশকের কাছ থেকে তিনি কী পেয়েছেন, তার সাক্ষী ইতিহাস। সে সময়ের আর এক প্রতিভা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বুকের রক্ত ফ্যাকাশে করে দিয়েছে আর্থিক দুরবস্থাই। এমন উদাহরণ অনেক…

আজকের বাঙালি সাহিত্যিকদের জীবনে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেবীর ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব মিটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে বটে, কিন্তু কোথাও যেন একটা গোপন গ্লানি থেকে যাচ্ছে। সে কথায় পরে আসছি। সত্যি কথা বলতে গেলে, আমাদের দেশে সাহিত্যের সমাদর কম,পড়ুয়া জোটে না। যে বিদ্যা বাজারে ভাঙানো যায় না, তার যে মূল্য থাকতে পারে এ বিশ্বাস সকলের নেই। সাহিত্য সাক্ষাৎ উদরপূর্তির কাজে লাগে না। স্বেচ্ছায় যাঁরা বই পড়েন, তাঁদের আমরা নিষ্কর্মা, লক্ষ্মীছাড়ার দলে ফেলে দিই। আমাদের চারপাশে তাকালে দেখতে পাব, সমাজের বৃহৎ অংশের এই সারস্বত সাধনায় যোগ নেই, ঝোঁকও নেই। এ যেন আমরা ক’জন সাহিত্যসেবী একঘরে হয়ে সমাজের বাইরে জটলা করছি। হাটে হট্টগোল করছি। এঁদের লক্ষ্মীছাড়া ভিন্ন আর কীই বা বলি?
সাহিত্যের অমৃতরস আস্বাদনে আমাদের যে অরুচি ধরেছে, সে আমাদের দোষ নয়; আমাদের শিক্ষার দোষ। এর একটা কারণ হল আধুনিক শিক্ষার গতি সাহিত্য সাধনার অনুকূল নয়। জ্ঞানের ভাণ্ডার তো আর ধনের ভাণ্ডার নয়। তাই এদেশের শিক্ষিত লোকেদের বই পড়ার বড় একটা অভ্যাস নেই। আমাদের শিক্ষিত সমাজের লোলুপ দৃষ্টি আজ অর্থের উপরেই পড়ে রয়েছে।
রসবস্তু কেউ গিলে খান, কিন্তু রসজ্ঞ ব্যক্তিরা চেখে খান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ্ধতিটাই গিলে খাবার পদ্ধতি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের মধ্যে কোনো সাহিত্যবোধ জন্মাবার ব্যাপারে সাহায্য করে না। ছাত্র জীবনে বহু পড়তে হয়। পনেরো-ষোল বছর ধরে বই ঘেঁটেও ছাত্ররা পড়ার স্বাদ পায় না। মূলত নোট মুখস্থ করে করে তারা বদহজমে ভোগে। তখন তাদের বই দেখলেই অরুচি। ‘মোক্ষ’ লাভের পরে তাই পড়া ভোলার শান্তি। বই পড়ার আর সময়ও হয় না , প্রয়োজনও পড়ে না। একেবারেই যে পড়ে না, তা নয়। এ যুগে সভ্য সমাজে সকালে উঠে দুটি কাজ। এক, চা পান আর দুই, সংবাদপত্র পাঠ। চা বেশি খেলে আহারে অরুচি হয় আর অতিরিক্ত সংবাদপত্র পাঠে সাহিত্যে অরুচি হয়। কিন্তু মানুষের মন বলে একটা জিনিস আছে। মনের দাবি রক্ষা না করলে মানুষের আত্মা বাঁচে না। তাই বইয়ের পাতা যাঁকে টেনেছে, নীড়ের সীমাবদ্ধতার শান্তি তার চলে গিয়েছে। তাঁর সামনে উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছে বিশ্বের বিরাট রূপ। এ পিপাসা যাঁর জেগেছে, সে রসের আনন্দে আত্মহারা, আবার অরসিকদের চোখে লক্ষ্মীছাড়া। অরসিক একপক্ষে নিশ্চিন্ত, কারণ তার ছোট্ট জগতের মধ্যে কোনো অপরিচয়ের ধাঁধা নেই।

বই মানেই সাহিত্য, এ কথা সকলে মানবেন না। আবার লেখক মানেই সাহিত্যিক, একথাও বলা চলে না। প্রশ্ন উঠতে পারে, সাহিত্য তাহলে কী? এটা যে কত যুগের জিজ্ঞাসা কে জানে? আর কত কালে এর মীমাংসা হবে, তাই বা কে বলতে পারে? সাহিত্য যে কী, সে বিষয়ে নানা মুনির নানা মত। তাই স্বল্প পরিসরে বড় কথা নিয়ে নাড়াচাড়া করার সাহস আমার নেই। কারণ এক কথা বললে হাজার কথা শুনতে হয়। তবে সাহিত্যবোদ্ধারা বলেন, লেখকের হৃদয়ে যে আবেগ, যে অনুভূতি জাগে তারই বাঙ্ময় প্রকাশ ঘটে সাহিত্যে। তবে সে প্রকাশ নিশ্চয়ই রসাশ্রিত হতে হবে। কারণ শ্লোকেই বলা আছে, ‘বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম’। রসেই সাহিত্যের সার্থক পরিচয়। সাহিত্যের সনাতন লক্ষ্য ও চিরন্তন দাবি হল মানবসমাজের কল্যাণ এবং মানবচিত্তের বিনোদন। চিত্তবিনোদনের আনন্দ তাঁরাই উপভোগ করতে জানেন, যাঁরা রসিক পাঠক, সহৃদয় পাঠক। অক্ষরে চোখ বুলানো পাঠক সাহিত্যরস থেকে বঞ্চিত।
আবার প্রশ্ন হতে পারে, সাহিত্যের আবার রস কী? সত্যি সাহিত্যরস (রসের সাহিত্য নয় কিন্তু) কথাটা আবার ভীষণ গোলমেলে। আলোচনা দু’-এক কথায় শেষ করার জো নেই। রস বলতে কোনো এক রকমের আস্বাদনকে বোঝায়।সাহিত্যের রস আস্বাদন করে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তা অলৌকিক। তবে খাওয়ার রসাস্বাদ আর সাহিত্যের রসাস্বাদ এক নয় কিন্তু। বস্তুর আস্বাদ গ্রহণ ইন্দ্রিয়নির্ভর, কিন্তু সাহিত্যের রস আস্বাদন মানুষের চিত্তনির্ভর। রাঁধুনি ঠাকুরের কাছে যেমন চাখনদার, লেখকের কাছে তেমনি যাচনদারের গুরুত্ব অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনের বৈশিষ্ট্য ছিল নূতন কিছু সৃষ্টি হলেই অন্তরঙ্গ জনকে পড়ে শোনানো। লেখাটি রসোত্তীর্ণ হল কিনা বোঝবার জন্য। তাঁর কাছের পরিকররা তো ছিলেনই, তবুও সজনীকান্তকে তিনি সাহিত্যরসের উৎকৃষ্ট যাচনদার বলে মনে করতেন। শেষ বয়সে লেখা ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পটি কবির সজনীকান্তকে পড়ে শোনাবার ইচ্ছে হল। সজনীকান্ত তখন ভাগলপুরে সাহিত্যসভার পৌরোহিত্যের কাজে ব্যস্ত। তাঁর কাছে জরুরি তারবার্তা গেল। হন্তদন্ত হয়ে সজনীকান্ত কলকাতা ফিরে এলেন।
সাহিত্য বুঝতে হলে জীবনের প্রস্তুতি দরকার। সাহিত্যের যা কিছু মহৎ সৃষ্টি, তাকে জীবন দিয়ে বুঝতে হয়। কথাগুলো লেখক-পাঠক উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। জীবন সম্পর্কে যার জিজ্ঞাসা জাগেনি, জীবনের ব্যথা-বেদনার অনন্ত প্রহেলিকা যে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেনি, বই পড়ে সে কি পাবে? আর লিখবেই বা কী করে? লেখকের হৃদয় ও পাঠকের হৃদয়- এই দুয়ের সংযোগ হলে তবেই সাহিত্যরস বিশিষ্টতা পায়।

কোন অবস্থায় থাকলে একজন মানুষ লেখক হয়ে যায়, তা কেউ জানে না। কেউ কেউ বলেন, লেখক নিজের জন্য লেখেন, মনের আনন্দে লেখেন। কিন্তু লেখক শুধু নিজের জন্যই লেখেন না। বহুকে আনন্দ দেবার মহতী ইচ্ছাও তাঁর মধ্যে বর্তমান থাকে। পাবার এবং দেবার আনন্দে তিনি শিল্পসৃষ্টি করেন। রসিক পাঠককে আনন্দরসের জোগান দেন। লেখার প্রবৃত্তি না থাকলে লেখক হওয়া যায় না। বঙ্কিমচন্দ্র লেখকদের ‘তেঁতুল’ বলেছিলেন। কেন বলেছিলেন, সে কমলাকান্তই জানেন। আমার মনে হয়, লেখক হওয়া বড় শক্ত। কিন্তু এখন লেখকদের সংখ্যাধিক্য দেখে আবার মনে হয় লেখক হওয়া হয়তো এমন কিছুও কঠিন ব্যাপার নয়, বরং পাঠক হওয়াটাই মুশকিল! অনেকেই মনে করেন অন্যান্য শিল্পকর্মের তুলনায় লেখার কাজটাই বুঝি সবচেয়ে সহজ। যেহেতু তাঁরা বাংলাভাষাটা খুব ভালোভাবে জানেন, সুতরাং বাংলায় সাহিত্য রচনা করবার অধিকার তাঁর রয়েছে। কিন্তু এঁরা ভুলে যান যে ভাষাজ্ঞান আর সাহিত্যজ্ঞান এক বস্তু নয়। এখন অনেক অনেক লেখক, লেখার পরিমাণও অনেক বেশি। কিন্ত লেখকের দায়িত্ব নিয়ে লিখছেন কতজন? সারস্বত সাধনাকে শিকেয় তুলে এখন শুধু অক্ষর সাজানো ও পাতা ভরানোর খেলা। আগের চেয়ে এখন সাহিত্যিকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু যে অনুপাতে তাঁর আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, সেই অনুপাতে সামাজিক মান এবং লেখার মানও গিয়েছে নেমে। আবার খ্যাতনামা লেখকদের সব লেখাই যে ভাল, এমন কথাও বলা যায় না।
লেখক হতে হলে যথেষ্ট পরিমাণে পড়াশোনা করতে হয়। অধ্যয়ন-চিন্তন-মনন-অনুভাবনের মধ্য দিয়ে কোনো ভাব যখন মনের মধ্যে দানা বেঁধে ওঠে, তখনি তাকে লেখার প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু ‘কলাপাতে না এগোতেই গ্রন্থ লেখার সাধ’ হয় আমাদের। বক্তব্য আধাখেঁচড়া হোক, অপরিপক্ব হোক, দানা নাই বাঁধুক, তাকে ভাষা দিতে আমরা তৎপর হয়ে উঠি। ফলে যা হবার তাই হয়। না ঘরকা, না ঘাটকা। সাহিত্যের ছদ্মবেশে বহু সংখ্যক স্বল্পক্ষম এবং অক্ষম লেখকের রচনায় বাজার ছেয়ে যায়। লেখকের দায়িত্বহীনতা ও তার ফল সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- “লেখার সহিত কোনো যথার্থ দায়িত্ব না থাকাতে কেহ কিছুতেই তেমন আপত্তি করে না। ভুল লিখিলে কেহ সংশোধন করে না, মিথ্যা লিখিলে কেহ প্রতিবাদ করে না, নিতান্ত ‘ছেলে খেলা’ করিয়া গেলেও তাহা ‘প্রথম শ্রেণীর’ ছাপার কাগজে প্রকাশিত হয়। বন্ধুরা বন্ধুকে অম্লান মুখে উৎসাহিত করিয়া যায়…পাঠকরা কেবল ততটুকু আমোদ বোধ করে ততটুকু চোখ বুলাইয়া যায়, যতটুকু নিজের সংস্কারের সহিত মেলে ততটুকু গ্রহণ করে, বাকিটুকু চোখ চাহিয়া দেখেও না। সেইজন্য যে-সে লোক যেমন-তেমন লেখা লিখিলেও চলিয়া যায়।” সে চলুক ,ক্ষতি নেই। গাইতে গাইতে যেমন গায়েন, তেমনি লিখতে লিখতে একদিন এঁরা লেখক হয়ে উঠবেন- আশা করাই যায়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের পথচলা তো সেভাবেই।

লেখকরা চান তাঁদের বই বেশি বিক্রি হোক, বেশি লোক পড়ুক। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমান লেখকরা হাড়ে হাড়ে টের পান যে নিজে বই লেখার চাইতে অপরকে পড়ানো ঢের বেশি শক্ত। সাধারণ লেখকদের কথা ছেড়ে দিলেও নামজাদা লেখকদের বই বাজারে কাটে কম, কাটে বেশি পোকায়। দিন যেদিকে এগোচ্ছে, একদিন হয়তো দেখা দেবে লেখা ও পড়ার দুটি কাজ একই লোকে করবেন। অর্থাৎ লেখকের পক্ষে নিজের লেখা নিজে পড়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
বই পড়া হল জীবনের রোম্যান্টিক অ্যাডভেঞ্চার। ঠিক যেমন প্রেমে পড়া। বই পড়তে হলে বইকে ভালবাসতে হয়। বই-প্রেমিক মানুষের কাছে বই না পড়ে থাকাটা বিরহ-যন্ত্রণার মতো অসহ্য মনে হয়। বই পড়ার অভ্যাস সব সময়ের জন্য বজায় রাখার অর্থ হল জীবনকে সজীব রাখা, সতেজ রাখা, স্বাস্থ্যবান রাখা। কিন্তু লক্ষ লক্ষ বই লেখা হয়েছে, লক্ষ লক্ষ বই লেখা হচ্ছে, পড়ব কখন? জীবন তো ছোট, কতটুকুই বা পড়া যায়? প্রশ্ন আসে বাছাবাছির। কোন্ বই পড়ব আর কোন্ বই বাদ দেব। How to read what to read. পড়ার মধ্যে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কোনো তাগিদ নেই। একমাত্র তাগিদ হল ভেতরের তাগিদ। যতক্ষণ না এই বোধ বা তাগিদ জন্মায়, ততক্ষণ পড়ার আনন্দরস পাওয়া যায় না। সাহিত্যিকের মনের সঙ্গে যখন পাঠকের মনের সংযোগ হয়, তখনি শুরু হয় সত্যিকারের পড়া। পণ্ডিত হওয়ার চেয়েও বড় কথা হল রসিক হওয়া আর সেখানেই পড়ার চরম সার্থকতা। অনেক বই আছে, যা না পড়লে কিছু যায় আসে না। অনেক বই আছে, যা একবার পড়লেই চলে যায়। অতি অল্পসংখ্যক বই-ই এমন আছে, যা জীবনে বারবার পড়তে হয়। বই ঘুমন্ত মনকে জাগ্রত করে, জাগ্রত মনকে চাঙ্গা করে, অবলম্বন-শূন্য মনক অবলম্বন করার মতো একটা বস্তু জোগায়। বই পড়া হল একটি বিশেষ বইয়ের অন্বেষণ। শত উপদেশে যা সম্ভব হয়নি, সত্যকার স্রষ্টার একটা লাইনে ঘটে যায় রূপান্তরের বিস্ময়। কার লেখায় কোন পাঠকের মনে সেই পরম বিস্ময় ঘটবে, তা কেউ জানে না।
সেই একখানি বই বাইবেল হতে পারে, গীতা হতে পারে, কোরান হতে পারে, কালিদাসের মেঘদূত হতে পারে কিংবা কারো কাছে কপালকুণ্ডলা, ঘরে বাইরে বা অন্য কোনো বই-ও হতে পারে।
সাহিত্যের সৌন্দর্য ও রসের অনুভূতি সকল পাঠকের সমান নয়। এ অনুভূতি কারও সূক্ষ, কারও বা মোটা, কারও ব্যাপক, আবার কারও বা সঙ্কীর্ণ। সাধারণ পাঠকসমাজ দু’ ধরনের বই পছন্দ করে না, এক হচ্ছে ভাল আর এক হচ্ছে মন্দ। প্রতি যুগে প্রতি জাতির একটি সামাজিক বুদ্ধি থাকে। সে বুদ্ধির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সংসারযাত্রা নির্বাহ করা। সচরাচর লোকে সেই সামাজিক বুদ্ধির মাপকাঠিতেই সব কিছুকে মেপে নেয়। সেই মাপে যে পদার্থটি ছোট মনে হয়, সেটিও যেমন গ্রাহ্য হয় না, তেমনি যেটি বড় সাব্যস্ত হয় সেটিও গ্রাহ্য হয় না। এই কারণেই উঁচু দরের লেখক আর নীচু দরের লেখক সমান অনাদর পায়।
মানুষ গল্প ভালোবাসে। নিজের জীবন ঘটনাশূন্য হলেও অপর লোকের ঘটনাবহুল জীবনের ইতিহাস চর্চা করে সুখ পায়। নিজের জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে নিজেকে সেই ঘটনাপূর্ণ জীবনের অংশীদার মনে করে আনন্দ লাভ করে। পাঠক গল্প উপন্যাসের সঙ্গে নিজের জীবনকে মেলাতে ভালোবাসে। যে লেখকের লেখায় পাঠকের অনেক চিন্তা হুবহু মিলে যায়, সেই বই পাঠক পছন্দ করে। গল্প যত পুরোনো হয়, সমাজে ততই জনপ্রিয় হয়। সেই কারণে রূপকথা, রামায়ণ, মহাভারতের কদর আজও কমেনি।
বই শয্যাসঙ্গী হয়, আবার সফরসঙ্গীও হয়। একদল পাঠক আছেন, ট্রেনে চড়লেই যাঁদের বইয়ের কথা মনে পড়ে। আবার এই ট্রেনেই আর এক ধরণের পাঠকের দেখা মেলে, যাঁরা নিজেরা বই কিনে পড়েন না, কিন্তু সহযাত্রীর হাতে নতুন বই বা পত্র-পত্রিকা দেখলেই তাঁদের পাঠস্পৃহা প্রবল হয়ে ওঠে। তাঁরা সমানে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকেন, শেষপর্যন্ত মালিকের হাত থেকে বই বা কাগজটি বাগিয়ে নিয়ে পড়তে শুরু করেন।
বই হল কেনা-বেচার জিনিস, আবার পড়ারও জিনিস। তাই বই যিনি বিক্রি করেন, তিনি একজন সাহিত্য-ব্যবসায়ী। তিনি সবচয়ে ভাল জানেন কী কী উপায় অবলম্বন করলে বই কাটানো যেতে পারে। বিজ্ঞাপন দেওয়া, দাম কমানো, ছাড় দেওয়া, উপহার দেওয়া, ফাউ দেওয়া- নানা উপায় অবলম্বন করা হয়ে থাকে। কিন্তু কিনবেই বা কে আর পড়বেই বা কে? প্রকাশকের খদ্দের জোটানো মুশকিল, লেখকের পাঠক জোটানো আরো মুশকিল।
যদিও বই কিনে কেউ কোনো দিন দেউলিয়া হন না, তবু নিজের পয়সায় বই কিনতে পাঠক উৎসাহী নন। পাঠকের দল, যাতে বস্তু আছে, সেই বইও বিনামূল্যে অথবা সিকিমূল্যে না পেলে গ্রহণ করতে নারাজ। আমাদের কাছে শুধু পি.ডি.এফ.-এর আদর, বিনা পয়সায় পাই বলে। আমরা মনে রাখি না যে শুকনো ধন্যবাদে লেখকের পেট ভরে না। বিক্রি বাড়াতে হলে, এক কথায় ব্যবসা চালাতে গেলে, যাতে বইয়ের খদ্দের বাড়ে তার উপায় করতেই হয়। বাজারে কী ধরনের বইয়ের সবচেয়ে বেশি কাটতি, সেও আজ আর অজানা নয়। তাই তো দেখি পণ্যসাহিত্য, অপসাহিত্যে আজ বাজার ভর্তি।
বই গৃহসজ্জার একটি প্রধান উপকরণ। গৃহের কোনো আসবাবপত্র বইয়ের মত সুন্দর নয়।আলমারি ভরা বইয়ের দিকে তাকালে বিস্ময়ে মন ভরে যায়। রাশি রাশি বই সারি সারি সাজিয়ে রাখা প্রমাণ করে যে গৃহকর্তা ধনী, গুণী ও সুরুচিসম্পন্ন মানুষ। সমাজের পক্ষে এটা কম লাভ নয়। বইয়ের সংস্পর্শ মানুষকে নীতিবান না করলেও রুচিবান করে। আর কে না জানে মার্জিত রুচি, পরিষ্কৃত বুদ্ধি, সংযত ভাষা, বিনীত ব্যবহার মানুষকে চিরকাল মুগ্ধ করে এসেছে এবং সম্ভবত চিরকাল করে যাবে।
সৃষ্টির ক্ষমতা যাঁর আছে, তিনি সৃষ্টি করেন। যাঁর রসবোধের শক্তি আছে, তিনি আস্বাদন করেন। তবে এর মধ্যে আরো একজনও আছেন, যিনি লেখকও নন, আবার পাঠকও নন; অথচ একাধারে পাঠক ও লেখক। ইনি হলেন সমালোচক। ইনি গুরুগিরি করেন। সুরেশ সমাজপতি, সজনীকান্তরা প্রত্যেক যুগে ফিরে ফিরে আসেন। সাহিত্যের এই হাকিম সমালোচকেরা সচরাচর নবীন সাহিত্য ও নূতন লেখকদের সমালোচনা করেন। তাঁরা ভাবেন যে তাঁদের নিন্দা-প্রশংসায় সুসাহিত্য উৎসাহ পাবে আর অসাহিত্য ও কুসাহিত্য লজ্জায় মুখ ঢেকে সাহিত্যসমাজ থেকে বিদায় নেবে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটাই হয় না। বেরসিক পাঠকদের কৃপায় অসাহিত্যও টিঁকে থাকে। তাই বলা যায়, সাহিত্যৈর সৃষ্টি, পালন বা সংহারে ইন্সপেক্টর সমালোচকের কোনো হাত নেই।
ভক্ত না থাকলে যেমন দেবতার দেবত্ব বজায় থাকে না, ঠিক তেমনই সুপাঠক না থাকলে সুলেখকের পূজাও সম্ভব নয়। পাঠকের কাছে তিনি বিশেষ, তিনি স্রষ্টা, তিনি ঈশ্বরের সমান। লেখকের কাছে পাঠকের অনেক প্রত্যাশা। তাঁরা ভাবেন বই পড়ার সময় লেখককে যত আপন, যত কাছের মানুষ মনে হয়, ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ঠিক একই রকম হবেন। পাঠকের মনে একবারও প্রশ্ন জাগে না সাহিত্যর সত্য আর জীবনের সত্য এক নয়। বাস্তবের সত্য কথাটার অর্থ অনেক বেশি ব্যাপক।

খেলা হবে নয়, হয়। সাহিত্যেও খেলা হয় এবং হচ্ছেও। যিনি শিব গড়েন, তিনি বাঁদর গড়তেও জানেন। লেখকরা সাধারণ পাঠকসমাজের মনোরঞ্জনের জন্য নানা রকম খেলনা গড়েন। “কাব্যের ঝুমঝুমি, বিজ্ঞানের চুষিকাঠি, দর্শনের বেলুন, রাজনীতির রাঙা লাঠি, ইতিহাসের ন্যাকড়ার পুতুল, নীতির টিনের ভেঁপু এবং ধর্মের জয়ঢাক”- এইসব সাহিত্য বাজারে তো আছেই। এছাড়াও আসছে নিত্যনতুন অর্ডার।
সেই অর্ডারের দাতা এবং গ্রহীতা কেউই আর লক্ষ্মীছাড়ার দলে পড়েন না। এঁরা লক্ষ্মী-ধরার দল। সাহিত্যবাজারের নিয়ন্ত্রক এখন বৃহৎ পুঁজির একচেটিয়া কারবারিরা- যাকে বলে এস্টাব্লিশমেন্ট। এঁরাই লেখককে তৈরি করেন, পুরস্কৃত করেন, খ্যাতনামাদের কিনতে পারেন, সময়ে সময়ে দাদন দেন। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সাহিত্যের মাল-মশলা ( বিশেষত যৌন বিষয়ক, রহস্য-রোমাঞ্চ ) জোগানও দেন। হাঁকে-ডাকে সেই সব বইকে বেস্টসেলার বানিয়ে এডিশনের পরে এডিশন করে বাজারে ছেড়ে লাভের মুনাফা ঘরে তোলেন।
অনেক কথা হল। এবারে একটা আশঙ্কার কথা বলি। বাংলা সাহিত্যের হাল-হকিকত দেখে মনে হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ পেরিয়ে এসে পড়েছি এক অবক্ষয়ের যুগে যেখানে বাংলা ভাষাটাই আজ সংকটের মুখে। শিক্ষিত বাঙালির কথা শুনলে টের পাই যেটা, তা হল বাংলা ভাষার মর্যাদাহানি। ‘অ্যান্ড’, ‘বাট’ আর ‘কেন কি’-র মিশেলে শিক্ষিত বাঙালির মুখে আজ বাংলা ভাষা উচ্চারিত হয়। বাগদেবী শ্রী মধুসূদনকে স্বপ্নে বলেছিলেন, “ওরে বাছা! মাতৃকোষ রতনের রাজি /এ ভিখারী দশা তবে কেন তোর আজি? “আমরাও কি আজ ভিখারীর পর্যায়ে? শিক্ষিত বাঙালী বাংলা মাধ্যমে ছেলে-মেয়ে ভর্তি করতে চায় না। ব্যঙের ছাতার মত ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল গ্রামে গঞ্জেও গজিয়ে উঠেছে। আজকাল ক্ষেতমজুরের ছেলেও সরকারি স্কুলে ভর্তি না হয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তে যায়। পরিযায়ী বাঙালি যাঁরা কর্মসূত্রে ভিনরাজ্যে থাকেন, তাঁদের ছেলে মেয়েরাও বাংলা বলে না। আছে অন্যান্য ভাষার প্রবল চাপ। মনে সংশয় জাগে, এই চাপে তাপে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলা ভাষাটাই ভুলে যাবে না তো?
সংশয় থাকলেও আশাবাদী আমাদের হতেই হয়। কারণ বাংলাপ্রেমী এমনি কিছু লক্ষ্মীছাড়াদের দেখা মিলছে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন গ্রুপে। বইপাগল মানুষেরা সেখানে জড়ো হয়েছেন। গড়ে তুলেছেন এক মিলনমন্দির। দানসত্রের মত চলছে সেখানে বই দেওয়া-নেওয়ার কাজ। বইপ্রেমীদের একজোট করে চলছে সাহিত্যের আলোচনা। সাহিত্য প্রচার সহজ ব্যাপার নয়। তবুও তাঁরা অনেক প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে লড়াই করে, প্রীতি, ত্যাগ, তিতিক্ষা ও ভালবাসার আদর্শ নিয়ে পলাতকদের পাকড়াও করে তাঁদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষা এবং বাংলা সাহিত্য আবারও স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে – এই আশাটা করা তাই অন্যায় নয়, অসঙ্গতও নয়। বেঁচে থাকুক এমন লক্ষ্মীছাড়ার দল- এখন শুধু এটুকুই কামনা।
ঋণ-
প্রবন্ধ সমগ্র – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্যিক যৎকিঞ্চিত – প্রমথ চৌধুরী।
বইয়ের ব্যবসা – বীরবল।
সমালোচক – অতুলচন্দ্র গুপ্ত।
নানা কথা – নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়।
সমাজে সাহিত্য – হীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সনাতন পাঠকের চিন্তা – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
সাহিত্য পাঠকের ডায়রী – হরপ্রসাদ মিত্র।
সাহিত্য শিল্প – ভোলানাথ ঘোষ।
চিত্র ঋণ – ফেসবুক।