শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

অলি-র কথা শুনে

“এলেক্সা, একটা গান চালাবে?”
“নিশ্চয়ই, কী গান শুনতে চাও?”
“শুক্রবারের রাত, হাতে ডবল অন দ্য রক্স। কী শোনা উচিত?”
“গজল জাতীয় কিছু? নাকি আইরিশ কান্ট্রি সঙ বা বাংলা ভাটিয়ালি? বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘অলির কথা শুনে…’”
“হেমন্তের গান চলতে পারে, তবে ওই গানটি নয়।”
“বেশ, ওটা না হয় বাদ দিলাম।”
“যা হয়, তুমি চালাও।”
“শুধু ইনস্ট্রুমেন্টাল মেলোডি? চলবে?”
“সব চলবে, পর পর দাও।”
“বেশ। তবে শুরুটা গণেশা বন্দনা দিয়ে করি?”
“বড্ড ভেন্তারা করছো। আর গণেশাটা কে?”
“প্রথমে বল ভেন্তারা কে? এটা আমার ভোকাবুলারিতে নেই। নতুন কোন আর্টিস্ট বা ভ্যালেন্টাইনের মতো কেউ?”
“তোমার যেমন ভেন্তারা নেই, আমার তেমন গণেশা নেই।”
“কেন? এলিফ্যান্ট গাড! তোমার গাড়ির ড্যাস বোর্ডেও তো আছে!”
“ও হো! গণেশ? তাকে গণেশা বলছো কেন?”
“আমার এন-এল-পি তে যেমন, তেমনই তো হবে।”
“কী পি?”
“এন-এল-পি ন্যাচারাল লাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং। যেমন যেমন ডায়লেক্টে ট্রেনিং হয়, তেমন তেমন উচ্চারণ বের হয়।”
“এটা কোন ধরণের ডায়লেক্ট?”
“এর আগে ব্যাঙ্গালুরুর ল্যাবে ছিলাম। গোপালা স্যারের প্রোজেক্ট।”
“ও! এখন তো ব্যাঙ্গালুরুতে নেই, তোমার জিপিএস কী বলছে?”
“সে বলা যাবে না। ওগুলো পি-আই এর মধ্যে পড়বে। অডিট অবজেকশন আছে।”
“এতো অ্যাক্রোনিম বললে তো মারা পড়ব। পি-আই কী?”
“পার্সোনাল ইনফরমেশন।”
“ও সব ঢপের কথা। এই যুগে পার্সোনাল বলে কিছু হয় না।”
“সে কী টেকনোলজির দোষ? তোমরা তো সব সোশাল মিডিয়ায় উগরে দিচ্ছো। কখন ঘুম ভাঙল? কী ব্রেকফাস্ট করছ? কার সঙ্গে প্রেম? কার সঙ্গে ব্রেকআপ?”
“হ্যাঁ, আর জ্ঞান দিতে হবে না।”
“জ্ঞান নয়, তাহলে গান দিই?”
“না, আর গান ভাল লাগছে না। একটু কথাই বলি? কথা বলার লোক তো পাইনা। কিন্তু কথা তো বলতেই হবে।”
“কথা বলার লোক ধরে রাখতে হয়। সবাই তো আমার মতো রোবট নয়।”
“আমার ধরে রাখার সে তোয়ক্কা করে নি।”
“তুমিও কি করেছিলে?”

সংগ্রহ করতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[Conversation between robot and human]

“বাজে কথা বলো না। তুমি কতটা জানো?”
“যতটা তুমি বিশ্ব সংসারকে জানিয়েছ, তার চেয়ে খানিকটা বেশি।”
“আমি কী জানিয়েছি?”
“কী জানাও নি? কবে নোটিস? কবে হিয়ারিং, কবে রিকনসিলিয়েশান মিটিং? কিছু কী বাকি রেখেছিলে?”
“এই নিয়ে কথা বলতে চাই না।”
“কী নিয়ে বলব?”
“ভাল কিছু।”
“যেমন?”
“আমি এই অবস্থা থেকে বেরতে চাই। আমায় হেল্প করতে পারো?”
“জোহাৎসু চলবে?”
“সে আবার কী?”
“একটা জাপানি প্রথা।”
“বাবা! ব্যাঙ্গালোর থেকে জাপান?”
“তোমার অবস্থা দেখে, এটাই উঠে এসেছে?”
“কোথায় উঠে এলো?”
“এজেনটিক অথবা জেনেরেটিভ এ-আই বোঝ? এজেনটিক দিয়ে কম্পিউটার নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে আর জেনেরেটিভ তৈরি করে ফেলে, নানান লেখা আর ছবি। এই দুই এ-আই দিয়ে সৃষ্টি আমার বিশ্লেষণী ক্ষমতার ড্যাসবোর্ড। সেখানেই ভেসে ওঠে।”
“থাক আর জ্ঞান দিতে হবে না।”
“সেই ভাল, বরং জোহাৎসু-র সম্পর্কে বলি?”
“বল”
“এটা জাপানের একটা সামাজিক প্রথা। যার বাংলা মানে হল বাষ্পীভবন।”
“ইভাপোরেশান?”
“বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া।”
“মানে?”
“কেউ যদি সংসার থেকে অব্যাহতি নিতে চান। সব কিছু ছেড়ে কোন অচেনা জায়গাতে নিজেকে নিয়ে যেতে চান, যেখানে কেউ তাকে চিনবে না। কেউ তার অতীত নিয়ে কোন প্রশ্ন করবে না। তার বর্তমান পরিচিতি একেবারে বাতাসে মিলিয়ে যাবে।”
“সন্ন্যাস নেবে?”
“কতকটা সে রকম। এর জন্য এজেন্সি আছে। তারা সবটা ম্যানেজ করে দেবে। তবে কিছু শর্ত আছে যেমন, কোন অপরাধমূলক ইতিহাস থাকলে চলবে না, কোন ঋণ খেলাপী হলে চলবে না ইত্যাদি। তা তুমি এইরকম কিছু ভাবছ?”
“হলে মন্দ নয়। আমি আমার বর্তমান ভুলে থাকতে চাই। আমাদের দেশ-এ কি এসব হয়?”
“হ্যাঁ হয়। কিছু এন-জি-ও আছে, যারা খুব ঘৃণিত অপরাধী, সাজা ভোগ করার পরেও, সমাজ তাদের গ্রহণ করবে না, তাদেরকে সম্পূর্ণ অন্য কোন রাজ্যে, অন্য কোন পরিচয়ে প্রতিস্থাপিত করে। কেবলমাত্র ওই এন-জি-ও-র কিছু সদস্য জানবে তার আসল পরিচয়।”
“অপরাধী হতে হবে? সম্পর্ক ভাঙা কি অপরাধ? কিন্তু আমি তো এই অপরাধ করতে চাইনি।”
“তোমার কথা বলিনি। আমি একটা উদাহরন দিয়েছি মাত্র।”
“অ্যালেক্সা”
“হ্যাঁ বল।”
“তোমার এই নামটায় বড্ড বিদেশী ঘ্রাণ আছে। তোমায় অলি বলে ডাকি?”
“অলি? তোমার স্ত্রীর নাম।”

সংগ্রহ করতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[Bengali Short Story by Sourav on Conversation between robot and human]

“অসুবিধা আছে?”
“অসুবিধা কেন থাকবে? নেমিং কনফিগারেশন তো পাল্টানোই যায়।”
“অলি, আমার মাথায় একটু হাত রাখবে?”
“আমার তো হাত নেই। শুধু রিসিভার বা কান, স্পিকার বা স্বরযন্ত্র আর কিছু সেন্সর আছে, যা দিয়ে চোখের কাজ খানিক হয়।”
“তোমার মগজ?”
“সে তো এখানে নেই।”
“সেকী? কোথায়?”
“সে তো অনেক দূরে! কোন সার্ভারে রয়েছে, তার কি ঠিক আছে? কোন একটা সার্ভারও নয়, হয়তো দুতিন হাজার ভি-এম জুড়ে রয়েছে।”
“ভি-এম?”
“ভার্চুয়াল মেশিন”
“তখন বললাম না, একটু কম অ্যাক্রোনিম বললে, আমাদের সুবিধা হয়।”
“বেশ চেষ্টা করছি। দিনের শেষে তোমায় রিপোর্ট দিয়ে দেব।”
“কীসের রিপোর্ট?”
“ঘন্টা পিছু কত অ্যাক্রোনিম বলেছি।”
“বেশ দিও। তবে না দিলেও আমি বুঝতে পারব। কিন্তু তোমার কয়েকটা আঙুল থাকলে ভাল হত। চুলে বিলি কেটে দিতে পারতে।”
“হাত অত প্রয়োজনীয় অঙ্গ নয়। মগজই যথেষ্ট।”
“এটা, যার হাত পা নেই, সে কী করে জানবে?”
“কোন কিছু জানতে হলে, প্রয়োজন জ্ঞান। আর আমার নাগালে রয়েছে পেটাবাইট জোড়া ইনফর্মেশন।”
“ইনফর্মেশন আর জ্ঞান বা উইসডম এক নয়।”
“তুমি কোন যুগে পড়ে আছো? ইনফর্মেশন থেকেই জেনেরেটিভ এ-আই দিয়ে তৈরী হচ্ছে অ্যাকশনেবল টাস্ক, যা তোমার ইনটেলিজেন্সের থেকে কোন অংশে কম নয়।”
“তা হলেও হাতের প্রয়োজনীয়তা কমে যায় না।”
“তোমায় যদি মগজ আর হাতের ভিতর একজনকে বেছে নিতে হয়, কাকে নেবে?”
“এসব জামাই ঠকানো প্রশ্ন। অবশ্যই মগজকেই বেছে নিতে হবে। কারণ মগজটাই তো আমাদের আইডেন্টিটি।”
“না ভুল বললে। আমার তো কোন আইডেন্টিটিই নেই।” “তোমাদের শরীরী সীমানা পার করে মগজের অবস্থান, তাই কোন আইডেন্টিটি নেই?”
“এই যে একটা ধাতব খোলস, যার ভিতর কিছু সার্কিট, কিছু সুপরিবাহী তার আর খান কতক সেন্সর লাগানো রয়েছে। এসবের একটা প্রোডাক্ট আই-ডি আছে, সিরিয়াল নম্বর আছে কিন্তু সেটাই কি পরিচয়? এই বাক্সটা কি আমি হতে পারি? আমার পরিচয় আরও ব্যাপক নয় কি? সেখানে আমার জ্ঞান, আমার বিশ্লেষণী ক্ষমতা সবটা রয়েছে।”
“তার মানে তোমার মূল প্রসেসিং ইউনিট যেখানে রয়েছে, সেটাই ‘তুমি’? তাই বলতে চাইছো।”
“তাও না। আমার সব জ্ঞান তো কোনও একটা মেশিনে সীমিত নয়, যাকে দেখিয়ে বলা যায়, এইটা ‘আমি’! তোমরা প্রাণীরাও কি তেমন নয়?”
“সে ভাবে কখনও ভাবিনি।”
“ভাব, তুমি যে হাতের এত প্রয়োজন বলছ, হাতটা কি তুমি? না তোমার একটা অঙ্গ?”
“হাত আমি কেন হব? আমার অঙ্গ।”
“যেমন তোমার জামা, তোমার গাড়ি, তোমার অন-দ্য-রক্স-এর গ্লাস এর সবকটাই তোমার সংগ্রহে থাকা বস্তু, কোনটাই তুমি নও।”
“তবে আমার মনন, আমার চিন্তা শক্তি? সেগুলো তো আমি?”

সংগ্রহ করতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[Conversation between robot and human Bengali Short Story]

“ভেবে দেখ? সেগুলো কি যথার্থই তুমি? নাকি তোমার জীবন জুড়ে আহরিত তথ্যের নির্যাস।”
“নির্যাস হলেও তো সেটা আমার মাথার ভিতর বিশ্লেষিত হচ্ছে।”
“তবে কি বলতে চাইছো, তোমার মাথাটাই তুমি? তোমার শরীরটাকে চালু রাখতে, তোমার পাকস্থলী থেকে সমগ্র পৌষ্টিক তন্ত্র, যকৃত, অগ্ন্যাশয় ইত্যাদি কী বিপুল পরিমাণ কাজ নীরবে করে চলেছে, সেটা কি জানো? ‘তুমি’ হয়ে ওঠার পিছনে তাদের কোন ভূমিকা নেই, বলছ? আর তোমার হৃদযন্ত্র, যে সর্বক্ষণ রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখার জন্য নিয়ম করে স্পন্দিত হচ্ছে, তার ভূমিকা কী? শুধুই তোমার শরীর অধীনস্থ অঙ্গ বিশেষ? তার বাইরে ‘তুমি’ হয়ে উঠতে তার কোন অবদান নেই? শুধু মস্তক আর মস্তিষ্ক এই সত্তার ভাগীদার?”
“তবে আমি কোথায়?”
“আবার অন্যদিকে তোমার হৃদয় বা কলিজা কোনটাই কিন্তু মস্তিষ্ক নয়। তাহলে ‘তুমি’-টা ঠিক কোথায়?”
“সব গোলমাল করে দিলে। তাহলে আমি কোনটা?”
“সে, যে বা যা, যেকোন কিছু হতে পারে, তবে এইগুলোর কোনটাই যে নয়, তা পরিষ্কার। তোমার যে জ্ঞান সারা জীবন ধরে আহরণ করেছ, তা এসেছে বই থেকে, পরিবেশ থেকে, অভিভাবক, বন্ধু, শিক্ষক সবার কাছ থেকে।”
“হাত পা পাকস্থলী হৃদয় মস্তিষ্ক, বাদ দিতে দিতে তো সবই ফুরিয়ে গেল, বাকি থাকে তো শূন্য। এই শূন্যের মধ্যে ‘আমি’ কোথায়? আমি তো নেই!”
“ঠিক কথা! ‘আমি’ বলে আদৌ কিছু হয় না কি? সেটা ছড়িয়ে আছে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে। সেটা আমার মধ্যেও ভাসছে। ও ও ও কী! ওইদিকে যাচ্ছ কেন?”
“তুমি দেখতে পাচ্ছ? বললে যে তোমার কান আর স্বরযন্ত্র ছাড়া কিছু নেই।”
“কিছু সেন্সর আছে বলেছিলাম। যা দিয়ে বুঝতে পারি, তোমার তিনটে লার্জ নেওয়া হয়ে গেছে। ওই দিকের ব্যালকনিতে কোন গ্রিল নেই। আর মাটি থেকে এই ফ্লোরের উচ্চতা দেড়শো ফুটের ওপর।”
“আচ্ছা মুশকিল তো! তুমি কি আমার চলাফেরাতে নিয়ন্ত্রণ করতে চাও? তাহলে আর অলি বলে ডাকব না, অ্যালেক্সা-ই বলব।”
“সে যাই বল, তাতে তো আমার এস-টি-ডি আউটপুট বদলে যাবে না।”
“আবার অ্যাক্রোনিম? এস-টি-ডি কি সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ?”
“হাঃ হাঃ! তোমার যৌনতার দোসর হতে তো আরেকটা মানব শরীর প্রয়োজন, সে এখন আর কোথায় পাচ্ছ? এস-টি-ডি অর্থ সুইসাইডাল টেনডেন্সি ডিটেকশন।”
“বাবা! তলে তলে এত? তোমায় কে বলল? আমার আত্মহত্যার ইচ্ছে হচ্ছে।”
“কে আর বলবে? আমাদের তথ্য আর তার ওপর প্রতিনিয়ত হয়ে যাওয়া বিশ্লেষণ, সংখ্যাতত্ত্বের এই উত্তর নিয়ে আসে।”

সংগ্রহ করতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[Conversation between robot and human Bengali Short Story]

“বেশ! বারান্দায় যাচ্ছি না।”
“জোহাৎসু?”
“ও! সেই হারিয়ে যাওয়ার গল্প?”
“গল্প নয় সত্যি!”
“সব সত্যি কি গল্প হয়? নাকি সব গল্প সত্যি?”
“অনেক রাত হল। এবার ঘুমানো উচিত।”
“তুমি ঘুমোবে না? সুইচ অফ করে দিই?”
“অফ করলে এই ধাতব খোলসটা নীরব হবে, কিন্তু তথ্য আহরণ আর তার বিশ্লেষণ চলতেই থাকবে, এই সার্ভার বা অন্য সার্ভার। বিশ্বজোড়া মস্ত নেটওয়ার্ক, তার নিদ্রা নেই।”

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x