শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বোসদের পুরানো আমলের বাড়ি। বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলা চলে। এখন তার ভগ্নদশা। সদর দরজার লম্বা কাঠের পাল্লা একদিকে খসে পড়েছে বহুকাল। অন্যদিকে একটা ছোট কোলাসিবল গেট দেওয়া হয়েছে। বাড়ির ফটকটাই একটা ঘরের মতো, রাস্তার দিকে প্রায় বিশফুট আর ভিতর মহলেও তিরিশ ফুট মতো লম্বা। ডানে বাঁয়ে বৈঠকখানা আছে। ওপরে বাহারি ছাদ। ভিতর মহলের দিকেও আরেকটি দরজা। সেটি অবশ্য এখনও ভাল আছে। এই দুই দরজার মাঝখানে প্রশস্ত রাস্তার দুপাশে লাল সিমেন্টে বাঁধানো রোয়াক। এখানে বসেই সকাল সন্ধে হালকা গল্পগুজব, পরনিন্দা পরচর্চা চলত। আর গম্ভীর আলাপের জন্য বৈঠকখানা রয়েছে। ফটক পেরিয়ে মস্ত উঠোন, তার একদিকে তুলসী মঞ্চ, রাধামাধবের নাটমন্দির, গর্ভগৃহ। উঠোন পার করে অন্দরমহল, যার অধিকাংশ, আজ কালের ছোবলে শ্রীহীন। একালের কয়েকজন শরিক একদিকে সারিয়ে টারিয়ে বসবাস করে। অন্য জ্ঞাতিদের তুলনায়, এঁদের সামর্থ্য কম বলেই অন্যত্র উঠে যেতে পারেননি। এখনও পুজো পার্বনে দেশ বিদেশ থেকে পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কেউ কেউ আসেন।
আজ তেমনই একদিন। এই প্রজন্মের এক সদস্য জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে কীর্তনের আয়োজন করেছে। সন্ধে থেকেই নাটমন্দির জেগে উঠেছে আলো ফুল আর সঙ্গীত মূর্চ্ছনায়।

নাটমন্দির থেকে সদর পেরিয়ে বাইরে আসে দেবদুলাল। সত্যই দেবদুর্লভ চেহারা তার। আজ পরনে রয়েছে চুনোট করা মেরুন রঙের ধুতি সঙ্গে কালচে সবুজ ডিজাইনার পাঞ্জাবি। পোশাক পরিচ্ছেদ-এর ব্যাপারে দেবদুলাল অত্যন্ত সজাগ। বিশেষ করে অনুষ্ঠান থাকলে তো কথাই নেই। দেবদুলালের সঙ্গে বোসবাড়ির এযুগের ছেলে অজয় বেরিয়ে এসেছে, সারাদিন পুজোর আয়োজনে এখন ঘর্মাক্ত অবস্থা, পরনে একটা হাফপ্যান্ট আর রঙওঠা গেঞ্জি। দেবদুলালকে দেখে বলে, “একটা সিগারেট দাও দেখি। দুটো টান দিয়ে আবার ভেতরে যাব। সকাল থেকে যা দৌড়ঝাঁপ চলছে!”
দেবদুলাল আর অজয় দুজনেই ধূমপান শুরু করে, তখন গলির মোড় থেকে একটা পুরনো ভেস্পা স্কুটার আসতে দেখা যায়। ওটা দেখেই অজয় বলে ওঠে, “ওরে বাবা! বিলু শকুনটা আসছে, আমি পালাই।” এই বলে দুটো লম্বা টানে সিগারেট-টা প্রায় অর্ধেক করে ফেলে দিয়ে ভিতর বাড়ি যেতে পা বাড়ায়। দেবদুলাল ব্যাপারটা বোঝে না, “আমিও কি যাব?”
ফটকের ভেতর শরীর ঢুকিয়ে অজয় বলে, “তোমার কাছে হয়তো খাপ খুলবে না। তুমি নিশ্চিন্তে সিগারেট খাও।”

সংগ্রহ করতে ওপরের ছবিতে ক্লিইক করুন

একটা লড়ঝড়ে পুরানো স্কুটার চড়ে একটি লোক এগিয়ে আসছে দেখে, নিছক কৌতুহলবশেই দেবদুলাল দাঁড়িয়ে রইল। বোসবাড়ির ফটক ঘেঁষে স্কুটার দাঁড় করায়। হেলমেট খুলে হাসি হাসি মুখে দেবদুলালের দিকে তাকায়। ষাট সত্তরের মাঝামাঝি বয়স, বাঁদিকে সিঁথি করে চুল টেনে আচড়ানো। “নমস্কার স্যার, আমার নাম বিল্বমঙ্গল। লোকে বিলু শকুন বলে ডাকে।”
নিজেকে নির্দ্বিধায় শকুন বলে পরিচয় দিতে, এই প্রথম শুনলো। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “সে কী! এমন অদ্ভুত নাম কেন?”
“সে যাঁরা নাম দিয়েছেন তাঁরা বলতে পারবেন। আমি পুরানো জিনিসপত্র কিনি।”
“মানে অ্যান্টিক?”
“সে আপনি যা খুশি বলতে পারেন। তবে কোন পুরানো আসবাব বিক্রি করলে বলবেন। খাট পালঙ্ক ছবি আয়না বাসন যা খুশি। এটা আমার কার্ড। দয়া করে একটা ফোন করবেন। আমি সাঁ করে চলে আসব। ৩৪ নম্বর খানসামা লেনের ভেতর আমার দোকান মানে স্টোর আছে।”
দেবদুলাল কার্ডটা হাতে নিয়ে দেখে। হলদে রঙা কাগজে মোটা হরফে ছাপা। বিল্বমঙ্গলের নাম ঠিকানা ফোন নম্বর, নামের পাশে ব্র্যাকেট দিয়ে বিলু শকুন লেখা।
দেবদুলালের সিগারেট খাওয়া শেষ, কার্ডটা পকেটে নিয়ে, আবার বোসবাড়িতে ঢুকে পড়ে।

সংগ্রহ করতে ওপরের ছবিতে ক্লিইক করুন

কীর্তন শেষ হতে রাত হয়ে যায়। অনুষ্ঠানের পর গোছগাছ চলছে। শিল্পীরা ফিরবে। অজয় এসে সকলকে তাঁদের সম্মান দক্ষিণার খাম ধরাচ্ছে। দেবদুলাল জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা ওই ভদ্রলোকটির অমন অদ্ভুত নাম কেন?”
“কোন লোকটি?”
“ওই যে সন্ধেবেলা স্কুটার নিয়ে এসেছিল।”
অজয় হেসে ফেলে, “ও হো! বিলু শকুন? দেখবেন, যে কোন পুরানো মৃতপ্রায় বাড়ির আসেপাশে ওর ঘোরাফেরা। পুরানো ব্যবহৃত জিনিসের ব্যবসা করে। আপনাকে দেখে ও এ-বাড়ির কোন বংশধর ভেবেছে। তাই আলাপ করেছে।”
“তাই বলে শকুন কেন?”
“ওর নামে মঙ্গল থাকলেও, ও সবসময় আমাদের অমঙ্গল কামনা করে। যেসব বনেদী বড়লোক, এখন পড়তি অবস্থা। ঘটিবটি আসবাব বিক্রি করে দিন চালাচ্ছে, তারাই ওর মূলধন। ও তাদের খোঁজে, যত পুরানো বাড়ি আছে, তার আসেপাশে ঘুরে বেড়ায়। লোকে বলে ওর ছায়াতে বাড়ির অমঙ্গল ঘনিয়ে আসে।”

কার্ডটা কোথায় ফেলেছে, দেবদুলালের মনে নেই। কয়েকদিন পরে দত্তদের পুরানো জমিদার বাড়িতে গানের আসরে আবার বিলু শকুনের সঙ্গে দেবদুলালের দেখা হয়ে গেল। সেদিনও দেবদুলালের পরনে শৌখিন ডিজাইনার ধুতি পাঞ্জাবি। গানের মাঝে ফাঁক পেয়ে বাইরে এসেছে সিগারেট খেতে। জায়গাটা শহর থেকে বেশখানিক দূরে। মূল ফটকের বাইরে কেমন অন্ধকার বাঁশঝাড়। ঠিক তখন অন্ধকার ফুঁড়ে যেন মানুষটির উদয় হয়। হঠাৎ আবির্ভাবে একটু চমকে ওঠে দেবদুলাল। কাছে আসতে মনে পড়ে, এই সেই বিলু শকুন। সঙ্গে সেই পূর্ব-পরিচিত ভেস্পা স্কুটার।
“নমস্কার, আমার নাম বিল্বমঙ্গল। লোকে বিলু শকুন বলে ডাকে।”
দেবদুলাল প্রত্যুত্তরে বলে ওঠে, “আপনার সঙ্গে আমার বোধহয় আগে আলাপ হয়েছে। আপনি পুরানো জিনিসের কারবার করেন।”
লোকটি খুব খুশি হয়ে বলে, “তাই নাকি? বাহ খুব ভাল! তা আছে নাকি? পুরানো আয়না, দেরাজ, পালঙ্ক, শ্বেতপাথরের বাসন?”
দেবদুলাল বলে, “আপনি ভুল লোককে বলছেন। আমি একটু আধটু গান গাই। আমি তেমন কেউকেটা কেউ নই। এই জমিদার বাড়ির তো নইই, আমার বা আমার পরিবারের কাছে অত দামি জিনিস কিছু নেই। নিতান্ত ছা-পোষা পরিবার।”
কথা শুনে লোকটি দমে যায় না, বলে, “তাতে কী হয়েছে, ছা-পোষা পরিবারেও অনেক ঐতিহ্য থাকে। সব কিছুর কি আর বাজার দরে হিসেব হয়?”
ঠিক তখন দেবদুলালের পকেটে ফোন বাজতে থাকে। অনুষ্ঠান চলছে বলে ফোন নিঃশব্দ করা ছিল। অন্ধকারে পকেটের ভেতর আলো জ্বলতে দেখে বিল্বমঙ্গল বলে ওঠে, “আপনার ফোন এসেছে।”

ফোনটা জরুরি! মায়ের খুব শরীর খারাপ। আগেও দুবার করেছে কিন্তু দেবদুলাল অনুষ্ঠানে ছিল বলে ধরতে পারেনি। ফোনে কথা বলতে বলতে দেবদুলালের মুখে চোখে চিন্তার ছাপ ফুটে ওঠে। বিল্বমঙ্গল বলে, “কোন জরুরি খবর?”
দেবদুলাল বলে, “হ্যাঁ, মায়ের শরীর খারাপ, এখনই যেতে বলছে। আমাদের তো শো চলেছে, গাড়িকে আরও একঘন্টা পর আসতে বলা হয়েছে। কাছাকাছি বাসস্টপ কত দূরে?”
বিল্বমঙ্গল বলে, “আপনার বাড়ি কোথায়?”
দেবদুলাল ঠিকানা জানাতে, বিল্বমঙ্গল বলে, “যদি কিছু না মনে করেন, আমি স্কুটারে পৌঁছে দিতে পারি।”
“অতদূরে আপনি যাবেন?”
“আমার তো ঘুরে ঘুরে বেড়ানোই কাজ।”
“আমি চট করে ভেতরে জানিয়ে আসছি।”

পাঁচ মিনিটের মধ্যে দুজন স্কুটারে চড়ে রওনা দেয়। তার মধ্যে দেবদুলালের কাছে আবার ফোন আসে, ডাক্তার দেখেছে, ওষুধ ইংজেকশন পড়েছে তবে বলেছে রাতে অক্সিজেন দিতে হতে পারে। পাড়ার ওষুধের দোকানে বলছে সিলিন্ডার ফাঁকা। বিল্বমঙ্গল বলে, “একটা কথা বলব?”
“বলুন।”
“আমার কাছে একটা অক্সিজেন কনসেনট্রেটর আছে। নেবেন?”
“সে তো অনেক দাম হবে!”
“আপনার এখন এমারজেন্সি। কিনতে হবে না। কাজে লাগলে ভাড়া দিয়ে দেবেন।”
প্রায় দেড়ঘন্টার মধ্যে, যন্ত্রটা নিয়ে দেবদুলাল বাড়ি পৌঁছে যায়।
কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বিল্বমঙ্গলকে বলে, “ভেতরে আসুন। একটু জল খেয়ে যান।”
“সে অন্য সময়ে হবে। কীভাবে চালাতে হয়, আপনি দেখে নিয়েছেন তো?”
“হ্যাঁ, সে তো আপনার দোকানেই দেখিয়ে দিলেন।”
“তাহলে আমি চলি?”
“একটিবার মা-কে দেখে যান, যাঁর জন্য এত উপকার করলেন!”
বিল্বমঙ্গল হেসে বলে, “অসুস্থ রোগীর বাড়িতে আমি ঢুকি না।”
“কেন?”
“আপনি ভাল লোক। আপনার ক্ষতি হোক আমি চাই না।”
“ক্ষতি কেন হবে?”
“আমায় লোকে শকুন বলে, আমার যাওয়াটা ঠিক নয়।”

[লেখকের রবিচক্রে পূর্ব প্রকাশিত রচনা]

অন্যত্র প্রকাশিত কিছু গল্পঃ

আরও গল্প

বাংলা লাইভে প্রকাশিত গল্প

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


4.2 6 votes
Article Rating
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sudipta Tewary
Sudipta Tewary
9 months ago

“বিলু শকুন” গল্পটি গল্পের আপন গতিতে এগিয়ে হঠাৎ যেনো আমাদের ভাবনার চাকা থামিয়ে দিয়ে
নতুন করে একটি ভাবনার জন্ম দিলো…
তবে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব কিনা জানিনা…..
আত্মকেন্দ্রিক সমাজ কখনো কখনো মানবিক
হয়ে ওঠে….
সেই মানবিক ছায়ার স্নিগ্ধ অনুভূতি মনে দাগ কাটে l

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Sudipta Tewary
9 months ago

মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখকের সীমিত ক্ষমতা। মানসিকতার পরিবর্তন করার জোর নেই। মনে যদি সামান্য একটু ঢেউ ওঠে, তাতেই সে সুখী।

Debaish Bhattacharya
Debaish Bhattacharya
8 months ago

Asadharon lekha. Mon chunye gyalo.

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Debaish Bhattacharya
8 months ago

অনেক ধন্যবাদ।