শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বাঙালির বায়োস্কোপ (নির্বাক পর্ব)

উনিশ শতকের শুরুর দিকেই বাঙালি হাতে পেয়েছে ছাপা বই । বাঙালির সামনে খুলে গেছে একটা নতুন দিগন্ত । এতদিন যা পুঁথিতে লেখা হত সেই লেখা পৌঁছোত হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের কাছে । এবার ছাপা বই শ’য়ে শ’য়ে পৌঁছে যেতে লাগলো বাংলার দিকে দিকে বসবাস করা পাঠকের কাছে । প্রথম দিকে ধর্মীয় বই, পাঠ্য বই, আইনের বই এই সব বই ছাপা হত বিশেষ উদ্দেশ্য মাথায় রেখে। তারপর একসময়ে শুরু হল গল্প উপন্যাস লেখার পালা । একদিকে পাঠকের গল্প পড়ার খিদে, অন্য দিকে লেখকের গল্প বলার খিদে। মাধ্যম হয়ে উঠল বই। বই শিক্ষার বাহন তো হলই । সেই সঙ্গে একজন মানুষের সৃজনশীলতার ফসল অনেকের কাছে পৌঁছে দেবার একটা উপায়ও হয়ে উঠলো । মঙ্গলকাব্যের কাহিনি পুঁথির থেকে, বা শ্রুতির মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছোতে পৌঁছোতে হয়ত হারিয়ে ফেলত লেখকের অনেক মৌলিকতা, অনেক নিজস্বতা। ঢুকে পড়তো বেনোজল । এবার প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরে দুলাল’ বা ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘অঙ্গুরীয় বিনিময়’ বইতে লেখকের বলা কাহিনি সরাসরি পাঠক পড়ে ফেললো বই থেকে ।
লেখকের কল্পনা থেকে সৃষ্ট গল্প পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নতুন অধ্যায় শুরু হল, ছাপা অক্ষরের মাধ্যমে ।

গোটা উনিশ শতক জুড়ে এলেন নানান লেখক কথাশিল্পীরা তাঁদের অনন্য সাহিত্যের সম্ভার নিয়ে । ওদিকে বাংলা নাট্য জগতেও মঞ্চস্থ হতে লাগল নতুন নতুন নাটক। নাটক লেখা হতে থাকলো, ছাপা হতে থাকলো এবং সেই ছাপা নাটক অভিনীত হতে থাকলো নানান মঞ্চে।

উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে যখন দেখা গেল বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিম যুগের অবসান হয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে রবীন্দ্র-যুগ, এবং বাংলার নাট্যজগতে গিরীশ যুগ শেষ হয়ে উত্থান হচ্ছে শিশির ভাদুড়ির, সেই রকম একটা সময়ে বাঙালি প্রযুক্তির দৌলতে পেয়ে গেল আর একটি গল্প বলার মাধ্যম। তার নাম বায়োস্কোপ। অবশ্য প্রথম দিকে সেই মাধ্যমের মধ্যে কতখানি সৃষ্টিশীলতার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে আছে তা বোঝা যায় নি।
১৮৯৬ সালের ৭ই জুলাই বোম্বাই শহরের ওয়াটসন হোটেলে এবং তারপরে নভেল্টি হোটেলে সিনেমার আবিষ্কারক লুমিয়র ভাতৃদ্বয়ের এজেন্ট এ দেশে চলমান ছবির কিছু উদাহরণ দেখালেন। জীবন্ত মানুষের মতো ছবির নড়াচড়া দেখতে দর্শকদের যে প্রচুর আগ্রহ দেখা দিল, তা বোঝা যায় 27শে জুলাই, ১৮৯৬ সালের টাইমস অফ ইন্ডিয়া খবরের কাগজের একটি রিপোর্ট থেকে। সেখানে লেখা হল – “ At the desire of large number of Bombay residents who have flocked recently in spite of bad weather to see kinematograph , of Novelty Theatre for a few more nights. ”

এর কিছুদিন পরেই মিঃ স্টিফেন্স নামের এক বিদেশী ভদ্রলোক কলকাতার স্টার থিয়েটারে , ছোটো ছোটো কিছু চলমান ছবি দেখাতে লাগলেন । তাতে কোনো গল্প থাকত না । কিছু টুকরো টুকরো দৃশ্যাবলী থাকত – যেমন – ট্রেন চলে যাচ্ছে , ঘোড়া ছুটছে , একজন লোক রাস্তায় জল দিচ্ছে, এই সব । দর্শকরা এই চলমান ছবি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত । খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হতে লাগলো – “পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য । বায়োস্কোপ । আসুন। দেখুন। যাহা কেহ কল্পনাই করেন নাই তাহা সম্ভব হইয়াছে । ছবির জীবজন্তু জীবন্ত প্রাণীর ন্যায় হাঁটিয়া ছুটিয়া বেড়াইতেছে ।”
মিঃ স্টিফেন্স যে যন্ত্র দিয়ে সিনেমা দেখাতেন, সেটির নাম ছিল বায়োস্কোপ। সেখান থেকেই সিনেমার আদি নাম হয়ে গেল বায়োস্কোপ ।

কিছুদিন পরে ফ্লেমিং নামের আর এক বিদেশী অমর দত্তর ক্লাসিক থিয়েটারে বায়োস্কোপ দেখানো শুরু করেন। এবং ফাদার লাফোঁ নামের এক পাদরি এই সময়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ছাত্রদের সিনেমা দেখানো পদ্ধতি শেখানোর ব্যবস্থা করেন । এই সময়ে হীরালাল সেন, যাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের জনক বলা হয়, তিনিও এই ফাদার ফাঁলোর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন।

হীরালাল প্রবলভাবে এই নতুন প্রযুক্তিটির প্রতি আগ্রহান্বিত হয়ে উঠলেন। তিনি নানা বিদেশী কোম্পানি, যারা তখন সিনেমাটোগ্রাফির যন্ত্রপাতি তৈরি করতে শুরু করেছে , তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলেন । শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে জনরেঞ্জ অ্যান্ড কোম্পানিকে সিনেমাটোগ্রাফি যন্ত্র অর্ডার রডার দিয়ে বসলেন। ১৮৯৮ সালে রয়েল বায়োস্কোপ নামের একটি সংস্থা খুলে সারা দেশে সিনেমা দেখাতে শুরু করেন । প্রথম দিকে তিনি যা দেখাতেন সবই বিদেশী ছবি । পরে আবদাল্লা ও মর্জিনার কিছু দৃশ্য তুলে দেখাতে শুরু করেন । আসলে এই সময়ে ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের আলিবাবা নাটকটি ক্লাসিক থিয়েটারে দেখানো হত । নাটকটি সকল শ্রেণির দর্শকদের কাছে প্রবল জনপ্রিয় হয় । বিশেষ করে এই নাটকের গান । হীরালালবাবু নিজের ক্যামেরা দিয়ে এই আলিবাবা নাটকের কিছু গান চিত্রায়িত করেন। এই সব গান তিনি নাটকের ফাঁকে ফাঁকে দেখাতে লাগলেন । এই ছবি দেখবার জন্য লোক ভেঙ্গে পড়ত।

হীরালাল সেন

রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি অমরেন্দ্র দত্তর থিয়েটারে সিনেমা দেখানো শুরু করেন। অমরেন্দ্র দত্ত নিজেও এই নতুন আসা শিল্পটি নিয়ে প্রবল আগ্রহান্বিত হয়ে উঠলেন । হীরালাল সেন এবং অমরেন্দ্র দত্ত একসঙ্গে বাংলায় প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত লাগান ।
১৯০১ থেকে ১৯০৩ সালের মধ্যে এঁরা দুজনে মিলে কিছু ছোটো ছোটো সিনেমা নির্মাণ করেন – সেগুলির নাম ভ্রমর, আলিবাবা, হরিরাজ, সীতারাম, বুদ্ধদেব চরিত, দোললীলা, সরলা ইত্যাদি ।
১৯০৩ সালের ২১ শে আগস্ট তারিখের বঙ্গবাসী পত্রিকায় লেখা হয় – “প্রকৃতই রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানী প্রশংসার যোগ্য। ইহারা বায়োস্কোপ অর্থাৎ অদ্ভুত ও প্রসিদ্ধ ঘটনাবলী জীবন্ত ও চলন্তভাবে চিত্র প্রদর্শন করিয়া ভারতবাসীকে মুগ্ধ করিয়াছেন । ইহারা যে কেবল বিলাতী ছবি দেখাইয়া থাকেন তাহা নহে, ইহারা বহু অর্থ ব্যয় করিয়া এখনকারও অনেক চলন্ত ফটো তুলিয়াছেন।”

হীরালাল সেনের ব্যবহৃত মুভি ক্যামেরা

প্রথম দিকে কিছু খন্ড খন্ড নির্বাক চলমান ছবি তুলে, নাট্যালয়গুলিতে নাট্যাভিনয়ের ফাঁকে ফাঁকে দেখানো হতে লাগল । তবে হীরালাল সেন বুঝতে পারেন, সিনেমা শুধু নাট্যালয়ে নাটকের ফাঁকে ফাঁকে দেখানতে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না, ভবিষ্যতে সিনেমা দেখাবার জন্য আলাদা প্রেক্ষাগৃহের প্রয়োজন হবে।
এই ভাবনা থেকে গণেশ টকিজের কাছে তিনি একটি স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করেন । পরে এসিয়াটিক সিনেমাটোগ্রাফি কোম্পানি নামের একটি কোম্পানী খুলে করপোরেশন স্ট্রিট এবং চিৎপুর রোডে দুটি স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ তৈরী করে ফেলেন । এই কাজে তাঁকে সাহায্য করেন কালীপ্রসন্ন সিংহের পোষ্যপুত্র বিজয় সিংহ ।
এই সময়ে পার্শীদের তৈরি ম্যাডান কোম্পানী নামের একটি কোম্পানী, এতদিন যারা ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে সিনেমা দেখাত, তারা এবার কলকাতা করপোরেশন হাউসের কাছে এলফিনস্টোন নামের একটি স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করল ।

এলফিনস্টোন সিনেমা

এই ম্যাডান কোম্পানী মূলত আমেরিকা, ইংল্যান্ড থেকে ফিল্ম আনিয়ে তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করত । তাতে প্রচুর আর্থিক লাভ হতে থাকল। ম্যাডান কোম্পানীর মালিক জে এফ ম্যাডান এই সিনেমা ব্যবসাতেই লেগে রইলেন । ১৯১৭-১৮ সালে এঁরা গোটা ভারতে এবং ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কার নানা জায়গায় সিনেমা প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করলেন । ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র ব্যবসায় তাঁরা একছত্র অধিপতি হয়ে উঠলেন । সব মিলিয়ে প্রায় ১৭২ টি চিত্রগৃহের মালিক হয়ে উঠেছিল ঐ কোম্পানী । সেই সময় এতগুলি হলে দেখানোর মতো বিদেশী সিনেমা পাওয়া যাচ্ছেনা দেখে জে এফ ম্যাডেনের সাহেবের মনে হল ব্যবসার স্বার্থে এ দেশেই সিনেমা বানানো প্রয়োজন । টালিগঞ্জের ট্রামডিপোর পূর্বদিকের জমিতে একটি ফিল্ম স্টুডিও বানিয়ে ফেললেন ম্যাডেন সাহেব । সঙ্গে পেয়ে গেলেন জ্যোতিষ চন্দ্র গুহ নামের এক বাঙালি আলোকচিত্র শিল্পীকে ।

জে এফ ম্যাডান

১৯১৯ সালে প্রথমে হরিশচন্দ্র, পরে ধ্রুব, মহাভারত, বিষ্ণু অবতার এই সব ছবি তোলা হল। তবে এই সব ছবিতে অভিনয় করানো হল পার্শি থিয়েটারের অভিনেতা, অভিনেতৃদের । যেহেতু নির্বাক ছবি তাই হিন্দি ও বাংলা দুই রকমের দর্শকদের জন্যই এক ছবিতেই কাজ চলে যেত । ১৯২৬ সালে প্রথম বাংলা সাবটাইটেল সহ যে ছবি তৈরি হল তার নাম হল ‘শিবরাত্রি’ ।

এর পর এক এক করে এই রকমের ছবি তৈরি হতে শুরু হয় ম্যাডান কোম্পানী এবং অন্যান্য দুই একটি কোম্পানীর ব্যানারে । ১৯২৬ থেকে ১৯৩২ সালের সময়টুকুর মাঝের সময়ে প্রায় ৬২ খানি চলচ্চিত্র তৈরি হয়। এই সব চলচ্চিত্র নির্মানে যারা প্রধান কারিগর ছিলেন তাঁরা হলেন – প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় , জ্যোতিশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় , শিশির কুমার ভাদুড়ি, মধু বসু , নরেশ চন্দ্র মিত্র, চিত্তরঞ্জন গোস্বামী প্রমুখ। যে নির্বাক সিনেমাগুলি জনপ্রিয় হয়েছিল, সেগুলি হচ্ছে -বিল্বমঙ্গল, শিবরাত্রি, মা দুর্গা, জয়দেব, কৃষ্ণকান্তের উইল, কপালকুন্ডলা, সরলা, গিরিবালা, কালপরিণয়, দালিয়া, দুর্গেশনন্দিনী, নৌকাডুবি ইত্যাদি।

অনাদি বোস

হীরালাল সেন ছাড়া আর এক বাঙালি এই সময়ে সিনেমা ব্যবসাতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন । তাঁর নাম অনাদি বসু । ১৯১১ সালে তিনি অরোরা স্টুডিয়ো নামের একটি কোম্পানী খোলেন । রাজা রাজবল্লভ স্ট্রিটে একটি ল্যাবোরাটরি এবং স্টুডিয়ো খোলেন । প্রথম দিকে হীরালাল সেনের মতই ঘুরে ঘুরে চলন্ত ছবি দেখাতেন এঁরা । হীরালাল সেন যখন অর্থাভাবে তাঁর দুটি ক্যামেরা বন্ধক রাখেন জনৈক আংটি মল্লিকের কাছে, অনাদিবাবু সেই ক্যামেরা কিনে নেন এবং নিজে ছবি তোলা শুরু করে দেন ।

ম্যাডান কোম্পানীর প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি ‘বিল্বমঙ্গল’ মুক্তি পাবার (৮ই নভেম্বর ১৯১৯) কয়েকদিন পরেই অরোরা কোম্পানীর তৈরি করা রত্নাকর সিনেমাটি মুক্তি পায় । সিনেমা ছাড়া এই অরোরা কোম্পানী নিউজ রিল জাতীয় সংবাদচিত্র তুলতে থাকেন । রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর এরাই শেষ যাত্রার ছবি তুলে রেখেছিলেন ।

এই সময়ে আরও একটি বাঙালি ফিল্ম কোপানীর উদয় হয় । এই কোম্পানীটির নাম ইন্দো-বৃটিশ ফিল্ম কোম্পানী । এর কর্ণধার ছিলেন নীতীশচন্দ্র লাহিড়ী । এই কোম্পানীর প্রথম সিনেমা England Returned (বিলেত ফেরত) পরিচালনা করেন ধীরেন্দ্র নাথ গঙ্গোপাধ্যায় । ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে England Returned ছবিটি মুক্তি পায় ভবানীপুরের রসা থিয়েটারে, যেটি পরে নাম হয় পূর্ণ সিনেমা ।
১৯২২ সালে ফোটো প্লে সিন্ডিকেট নামের আর একটি সিনেমা কোম্পানীর জন্ম হয় । এই কোম্পানীর প্রথম ছবি The soul of a slave । এই ছবির পরিচালক ছিলেন প্রফুল্ল ঘোষ । এই ছবিতে প্রথম বাংলা নাটকের বিখ্যাত অভিনেতা অহীন্দ্র চৌধুরী অভিনয় করেন ।

শিশির কুমার ভাদুড়ি ও নরেশ মিত্র

এর পরে শিশির কুমার ভাদুড়ি, নরেশ মিত্র এবং আরও কয়েকজন মিলে তাজমহল ফিল্ম কোম্পানী নামের একটি সংস্থা গড়ে তোলেন । এদের প্রথম ছবি – শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আঁধারে আলো’। শিশিরকুমার ভাদুড়ি স্বয়ং এই ছবিতে নায়কের ভুমিকায় অভিনয় করেন । এর পরে এই কোম্পানী রবীন্দ্রনাথের ‘মানভঞ্জন’ গল্প নিয়ে ছবি করেন । যাতে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন নরেশ মিত্র ।
এরপরে তারা খোকাবাবু নামের একটি হাসির ছবি এবং তারপর আবার শরৎচন্দ্রের চন্দ্রনাথ গল্প নিয়ে ছবি করে। চন্দ্রনাথ ছবিতে দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জীবনের প্রথম সিনেমায় অভিনয় শুরু করেন ।
এ ছাড়া ইন্ডিয়ান সিনেমা আর্টস, বৃটিশ ডোমিনিয়ান ফিল্ম করপোরেশন, গ্রাফিক্স আর্ট, ইনটারন্যাশানাল ফিল্ম ক্র্যাফট, বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিট – এই সব কোম্পানীই তিনটি-চারটি করে ছবি তৈরি করে । তার মধ্যে বেশ কিছু ছবি ব্যবসায়িক সাফল্য পায় ।

আগেই বলা হয়েছে নির্বাক যুগের ছবির জগতে একছত্র অধিপতি ছিল ম্যাডান কোম্পানী । ১৯১২ থেকে ১৯৩২ এর সময়টাকে বলা হত ম্যাডান যুগ ।

সারা ভারতে এদের প্রচুর নিজস্ব সিনেমা হল ছিল বলে এরা যে ছবিই বানাত, তার টাকা উঠে আসবার মতো বাজার পেয়ে যেত । ফলত একদিকে এদের যেমন প্রচুর অর্থাগম হত , অন্য দিকে এদের ছবি তৈরির উৎকর্ষ নিয়ে তারা বিশেষ মাথা ঘামাত না । অনেক সময় ইংরেজি ছবি থেকে কিছু সিন কেটে নিয়ে ভারতীয় পুরাণের গল্পে জুড়ে দিত । যে সব অভিনেতা অভিনেত্রী এবং পরিচালকেরা এদের ছবিতে কাজ করত তাদের ভারতীয় পুরাণ, বা বাংলা সাহিত্য বিষয়ে কোনো জ্ঞান ছিল না । তাতে ছবিগুলি বেশ নিচু মানের হত । শিক্ষিত বাঙালিরা ম্যাডান কোম্পানীর ছবির প্রতি কিছুটা অনীহা ছিল। তারা ঠাট্টা করে বলতো মদন কোম্পানি । বাঙালিরা চাইত বাঙালিরাই ছবি বানাক, বাঙালিরাই অভিনয় করুক । তাই বাঙালিরা বাঙালি প্রতিষ্ঠানগুলির তৈরি করা ছবির জন্যও মুখিয়ে থাকত ।
যে সব অভিনেতা অভিনেত্রী রা নির্বাক যুগের ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম ছিল – দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চরন বন্দ্যোপাধ্যায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য্য, রাজীব রায়, জীবন গাঙ্গুলি, প্রমথেশ বড়ুয়া, নরেশ চন্দ্র মিত্র, অহীন্দ্র চৌধুরী, সীতা দেবী, পেসেন্স কুপার, উমাশশী, শান্তি গুপ্তা, রেণুবালা ইত্যাদি ।

ধীরাজ ভট্টাচার্য ও দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

সেই সময়ের ছবির নায়িকারা বেশীরভাগই ছিল অবাঙালি । মূলত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান । তার কারণ বাঙালি মেয়েরা তখনও অন্তঃপুর থেকে বাইরে বেরোবার মতো সাহসী হয়ে ওঠেনি, আর সিনেমায় পুরুষ মানুষদের সঙ্গে অভিনয় তো দূর অস্ত।
নির্বাক যুগে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে নানা রকমের অসুবিধা ছিল । সূর্যের আলো ছাড়া শুটিং করা যেত না । আলো কম থাকলে কাঠের উপরে রাংতা লাগিয়ে রিফ্লেকটার বানানো হত । মেক আপ করা হত রঙ্গমঞ্চের মেক আপ করার নিয়ম মেনে। এ ছাড়া পাত্র পাত্রীদের শুধু মুখ নাড়া দেখা যেত, সংলাপ শোনা যেত না, তাতে করে গল্পের রস দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক দুরূহ ব্যাপার ছিল ।
তবে কিছু সুবিধেও ছিল। সেকালের নায়ক ধীরাজ ভট্টাচার্য মশাই তাঁর ‘যখন নায়ক ছিলাম’ বইতে তার একটি সরস বিবরণ দিয়েছেন –

“নির্বাক যুগের আরও কিছু সুবিধ ছিল । প্রথমত, সিনারিও বা স্ক্রিপ্টের কোনো বালাই ছিল না । ছাপানো একখানা বই বা নাটক যা তোলবার জন্যও মনোনীত হত, তাতে শুধু সংলাপ অংশ লাল পেন্সিল দিয়ে দাগ দিয়ে নিলেই সিনারিও হয়ে গেল। পরিচালক শুধু সিনটা বুঝিয়ে দিয়ে অভিনয় শিল্পীদের ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে ঐ লাল পেন্সিলের দাগ কাটা লাইনগুলো আউড়ে যেতে বলতেন । কোনও অভিনেতার যদি কোনো লাইন আটকে যেত , অমনি স্টেজের মতো প্রম্পট করে বলে দেওয়া হোত। সব চাইতে বড় কথা অপচয় বলে নির্বাক যুগে কিছু ছিল না । অভিনয় করতে করতে কোনো অভিনেতা যদি হাঁদারামের মতো সংলাপ ভুলে পরিচালকের দিকে চেয়ে থাকতেন , তাতে তার লজ্জিত হবার কিছু ছিল না। পরিচালক মশাই রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ‘কাট’ বলে চিৎকার করে ক্যামেরা থামিয়ে দিতেন না । বরং উৎসাহ দিয়ে বলতেন ‘ঠিক আছে চালিয়ে যাও’ । ফিল্ম এডিট বা জোড়া লাগাবার সময় ক্যামেরা বা পরিচালকের দিকে হঠাৎ চেয়ে ফেলার ছবিটা কাঁচি দিয়ে বাদ দিয়ে সেখানে একটা জুৎসই টাইটেল জুড়ে দেওয়া হত । ব্যস, সব দিক রক্ষে । ‘

বিল্বমঙ্গল ছবির পোস্টার

নির্বাক সিনেমা যবে থেকে সফল ভাবে দর্শকদের কাছে দেখানো শুরু হয়েছিল, তখন থেকেই ইয়োরোপ আমেরিকার প্রযুক্তিবিদরা চেষ্টা করছিলেন নির্বাক ছবিকে কি ভাবে সবাক বানানো যায়। অবশেষে ১৯২৭ সালে হলিউডে ‘দা জাজ সিঙ্গার’ নামের ছবিকে বলা first part-takie । পরের বছর ওয়ার্নার ব্রাদার্স বানালো পুরোপুরি টকি ছবি । নাম লাইটস অফ নিউ ইয়রক ।
সেই বছরেই সলসবেরী কোম্পানী কলকাতার গ্লোব থিয়েটারে দেখালো কিছু সবাক ছবির নমুনা। দর্শকদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা দেখা দিল। ম্যাডান কোম্পানী আঁচ করলেন আবার একটা নুতন যুগ আসতে চলেছে, তার সুযোগ নিতে হবে। তারা তাদের তৈরি এলফিনস্টোন প্রেক্ষাগ্রহটিকে সবাক সিনেমা দেখানোর উপযোগী করে তুলল। প্রথমে তারা ‘বিহাইন্ড দা কারটেন’ নামের একটি ইংরেজী ছবিতে একটি বাংলা গান জুড়ে দিয়ে তার প্রদর্শন করতে লাগলেন । সেই গানটি ছিল – কুঞ্জে কুঞ্জে পুঞ্জে পুঞ্জে । লোকেরা প্রচন্ড ভিড় করে সেই ছবি দেখতে আসতে লাগলো । এর পরে স্বামী গল্প নিয়ে একটি ছবি হয়েছিল ফিল্ম অফ দা ইস্ট নামের একটি সংস্থার প্রযোজনায় । ম্যাডান কোম্পানী চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো সবাক চলচ্চিত্রের প্রযুক্তি রপ্ত করে কিছু দেশী ছবি তৈরি করার । তবে পুরোপুরি কাহিনী চিত্র তোলার আগে , তারা তুলে ফেললো, শব্দ ও দৃশ্য সমেত একটি গানের দৃশ্য । সেই গানটি গেয়েছিলেন সেই সময়ে সব চেয়ে নামকরা এবং সব চেয়ে দামী গায়িকা মুন্নিবাই । ১৯৩১ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে ক্রাউন সিনেমায় সেই সবাক ছবিটি দেখান হল। টিকিট কেটে মুন্নিবাঈয়ের গান শোনা সাধারণ লোকেদের সাধ্যের বাইরে ছিল । তারা ভিড় করল এই ছবি দেখতে।
সেই গানটি ছিল – জয় জয় ভবানিপতি ।

এর মাসখানেক পরে ম্যাডান কোম্পানী আবার একবার নিজেদের তোলা সবাক ছবি দেখালেন । এবারে ছিল গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলের ছাত্রীদের গান এবং সেই সময়ের প্রবাদপ্রতীম গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে’র গান । এ ছাড়া তাঁরা তুলেছিলেন কিছু জনপ্রিয় নাটকের খন্ডিত দৃশ্য । যেমন অহীন্দ্র চৌধুরী অভিনীত আলমগীর নাটকের একটি দৃশ্য, দানীবাবু অভিনীত প্রফুল্ল নাটকের একটি দৃশ্য, নির্মলেন্দু লাহিড়ী অভিনীত সীতা নাটকের একটি দৃশ্য, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত কৃষ্ণকান্তের উইলের একটি দৃশ্য, ওই নাটকেরই সরযুবালা অভিনীত একটি দৃশ্য ইত্যাদি।

জামাই ষষ্ঠী ছবির বিজ্ঞাপন

এই ম্যাডান কোম্পানীই কয়েকমাসের মধ্যে বানিয়ে ফেললেন বাংলা ভাষার প্রথম সবাক কাহিনীচিত্র – জামাইষষ্ঠী । সেই ক্রাউন থিয়েটারেই ১৯৩১ সালের ১১ই এপ্রিল মুক্তি পেল সেই ছবি । সে ছবির কাহিনী রচনা এবং পরিচালনা করেছিলেন অমর চৌধুরী । অভিনয় করেছিলেন অমর চৌধুরী, ক্ষীরোদ গোপাল মুখোপাধ্যায়, রাণী সুন্দরী, যতীন সিংহ, শ্রীমতি গোলেলা, কার্তিক রায়।
খুব আশ্চর্য ভাবে যে ম্যাডান কোম্পানী নির্বাক যুগে একচেটিয়া ব্যবসা করেছিল , সবাক চলচ্চিত্র শুরু হবার কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ব্যবসায়ে লাভে অধোগতি দেখা দিল । জামাইষষ্ঠী সিনেমার পরে পাঁচ-ছটি ছবি বানাবার পরে তারা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলল ।

বাঙালির ব্যাবসায়িক বুদ্ধি এবং পেশাদারিত্বের অভাব সেই সময়েও ছিল । তাতে প্রায় সব বাঙালি কোম্পানীই প্রথমে কিছু সফলতা পেলেও ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেনি । যদিও মানের দিক থেকে বাঙালিদের তৈরি ছবিগুলি ভারতের অন্য জায়গায় ছবি থেকে অনেক উন্নত ছিল ।
ওদিকে বোম্বাই শহরে ধীরে ধীরে সিনেমা তৈরির প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে লাগল । ওখানে ফোটোগ্রাফি এবং প্রযুক্তির দিক দিয়ে এগিয়ে থাকলেও ছবির বিষয় বস্তুর দিক দিয়ে যথেষ্ট পিছিয়ে ছিল । এমন কি নির্বাক যুগেও তাদের ছবিতে অকারন মারপিট এবং নাচ গানের দৃশ্য প্রক্ষিপ্ত ভাবে জুড়ে দিত । সাহিত্যের সঙ্গে বোম্বাইয়ের ছবি সম্পর্ক প্রায় ছিলই না ।

কিন্তু বাংলায় প্রায় প্রথম থেকেই সিনেমা সাহিত্যের হাত ধরেছে । দেখা যাচ্ছে নির্বাক ছবির যুগে সব চাইতে বেশি ছবি হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা গল্প থেকে । বঙ্কিমচন্দ্রের গল্প থেকে যখনই নাটক অভিনীত হয়েছে তখনই তা জনপ্রিয়তা পেয়েছে , এটা একটি কারণ তো বটেই । তবে আর একটি কারণ ছিল, সেই সময়ের দুঁদে সিনেমা ব্যবসায়ী জে এফ ম্যাডান কোম্পানী বঙ্কিমচন্দ্রের পরিবারের কাছ থেকে মাত্র ২২০০০ টাকায় তাঁর সমস্ত উপন্যাসের স্বত্ব কিনে নেয় । তারপরে ম্যাডান কোম্পানী দুই বাঙালি পরিচালক জ্যোতিষ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে দিয়ে একে একে অনেক গুলি গল্পের চিত্রায়ন করে ফেলে । এর মধ্যে জ্যোতিষচন্দ্র পরিচালনা করেছিলেন বিষবৃক্ষ ( ১৯২৯), যুগলাঙ্গুরীয় ( ১৯২৯), রজনী (১৯২৯), ইন্দিরা (১৯২৯), রাধারাণী (১৯৩০ ), মৃণালিনী ( ১৯৩০ ), রাজসিংহ (১৯৩০ ) ।

প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালনা করেন কৃষ্ণকান্তের উইল ( ১৯২৭) , দুর্গেশনন্দিনী ( ১৯২৭) , কপালকুন্ডলা ( ১৯২৯) , দেবী চৌধুরানী ( ১৯৩১)।
বঙ্কিমচন্দ্রের গল্প নিয়ে করা সব ছবিই যে বাণিজ্যিক সফলতা পেয়েছিল এমনটা নয় ।

শুধু বাংলা সিনেমায় নয়, সারা ভারতেই শরৎচন্দ্রের কাহিনি নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ছবি হয়েছে । কিছু গল্প নিয়ে একাধিকবার একাধিক ভাষায় ছবি হয়েছে । অধিকাংশ সময়েই তা বাণিজ্যিক সফলতা পেয়েছে । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় , ম্যাডান কোম্পানী একটিও শরৎচন্দ্রের গল্প নিয়ে ছবি করে নি। তার কারণ বোধহয় এইটাই যে বাংলা দেশে চলচ্চিত্রের উত্থান এবং লেখক হিসেবে শরৎ চন্দ্রের খ্যাতি প্রাপ্তি প্রায় একই সময়ে ঘটেছে। অর্থাৎ ম্যাডান কোম্পানির কাছে শরচন্দ্র তুলনামূলক ভাবে নূতন বা অপরীক্ষিত লেখক ছিলেন । পার্শি ব্যবসায়ী তাই ঝুঁকি নিতে চায় নি ।
তবে শরৎচন্দ্রের গল্প নিয়ে ছবি করতে এগিয়ে আসে তাজমহল ফিল্ম কোম্পানী । আগেই বলা হয়েছে, যার মালিক ছিলেন শিশির কুমার ভাদুড়ি এবং নরেশ মিত্র । এঁরা শিশির কুমার ভাদুড়ির পরিচালনায় করেন ‘আঁধারে আলো’।
এর পরেই আর এক বাঙালি প্রতিষ্ঠান অরোরা ফিল্মের প্রযোজনায় নরেশ মিত্রের পরিচালনায় তৈরি হয় ‘দেবদাস’। দুটি ছবিই জনপ্রিয় হয়েছিল । ১৯২৪ সালে অরোরা কোম্পানীর প্রযোজনায় নরেশ মিত্রের পরিচালনায় তৈরি হয় ‘চন্দ্রনাথ’, ১৯৩০ সালে রাধা ফিল্ম কোম্পানির প্রযোজনায় তারা কুমার ভাদুড়ির পরিচালনায় তৈরি হয় ‘শ্রীকান্ত’ ।
১৯৩১ সালে বৃটিশ ডোমিনিয়ান ফিল্মস নামের সংস্থার প্রযোজনায় ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনায় তৈ্রি হয় ‘চরিত্রহীন’ ছবিটি । শোনা যায় শরৎচন্দ্র নিজে এই ছবির নির্মান পর্বে স্টুডিওতে আসা যাওয়া করতেন ।

বাংলা সংস্কৃতির সব কটি ধারাই রবীন্দ্রনাথ দ্বারা কোনো না কোনো ভাবে উন্মেষিত হয়েছে, উৎসাহিত হয়েছে, বিকশিত হয়েছে, নবজন্ম লাভ করেছে, অথবা নূতন গতিপ্রাপ্ত হয়েছে । সিনেমাকে একটি সংস্কৃতির নবলব্ধ ধারা বলে স্বীকার করে নিতে প্রথম দিকে অনেকেই অস্বীকার করেছিলেন। কারণ জন্মসূত্রে এটি নেহাত অর্বাচীন, এর জন্ম ইয়োরোপে এবং এই শিল্প প্রবলভাবে যন্ত্রনির্ভর ।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রথম থেকেই বুঝে ছিলেন চলচ্চিত্র ভবিষ্যতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হয়ে উঠবে।
তাই সেই ১৯২৩ সালে যখন এ দেশে চলচ্চিত্র ভালো করে হাঁটতেই শেখেনি, তখনই যখন তাঁর গল্প মানভঞ্জন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মানের প্রস্তাব আসে তখন তিনি সম্মতি দিতে দ্বিধা করেননি । নরেশ মিত্র ছিলেন এই ছবির পরিচালক । অভিনয় করেছিলেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় , নরেশ মিত্র , ইন্দু মুখোপাধ্যায় , নিলীমাদেবী প্রমুখ ।এই ছবিটি সমালোচক এবং দর্শকদের কাছে মোটেই প্রশংসা পায় নি ।

এরপর শিশিরকুমার ভাদুড়ি রবীন্দ্রনাথের ‘বিচারক’ গল্পের চিত্ররূপ দেন । ছবিটি মুক্তি ১৯২৮ সালে ক্রাউন সিনেমায়। শিশির ভাদুড়ি, যোগেশ চৌধুরি, কঙ্কাবতী এই ছবিতে অভিনয় করেন। সেই সময় কিন্তু চলচ্চিত্রে সেন্সর বোর্ড গঠন করা হয়ে গেছে । এবং খুব আশ্চর্যের ব্যপার এই ছবিটিকে সেন্সর বোর্ড আটকে দেয় । কারণ দেখানো হয় – low moral tone । কিন্তু যারা ছবিটি দেখছিলেন তারা অনেক চেষ্টা করেও এই ছবিতে আপত্তিকর কিছু খুঁজে পায় নি । তাই চারিদিক থেকে প্রতিবাদ ওঠে এবং ছবিটি বোর্ড আবার পুনর্বিবেচনা করে দেখাবার অনুমতি দেয় ।
১৯৩০ সালে ম্যাডান ফিল্মসের ব্যানারে মধু বসুর পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথ রচিত গল্প থেকে ‘দালিয়া’ এবং ‘গিরিবালা’ ছবি মুক্তি পায় ।

পরিচালক মধু বসু, শান্তিনিকেতনের ছাত্র এবং রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন ছিলেন । তাই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই দুই ছবির চিত্রনাট্যের কিছু সংশোধন করে দেন। ছবিটি দেখতেও আসেন । মধু বসু তাঁর “আমার জীবন’ বইতে লেখেন – “এর কিছুদিন পরে গুরুদেব বিদেশ থেকে ফিরে এলেন । এদিকে গিরিবালার মুক্তি ঘোষিত হল ক্রাউন সিনেমায়( বর্তমান উত্তরা) । গুরুদেবকে আমি প্রথম দিনেই আমি নিয়ে এলাম ছবি দেখাতে । দোতলার একটি বক্সে গুরুদেব ছবি দেখতে লাগলেন । আমি খুব অস্থির এবং উত্তেজিত ভাবে কাছা কাছি ঘুরঘুর করতে লাগলাম ।
ছবি শেষ হলে তিনি আমাকে আশীর্বাদ করে বললেন, যে তাঁর ভালোই লেগেছে । নরেশ মিত্র একটি দুষ্টু লোকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন- নরেশবাবুর অভিনয়ই গুরুদেবের সব থেকে ভালো লেগেছিল । পরিচালক রূপে আসরে নেমে যে সকলকে খুশী করতে পেরেছিলেম, সবার উপরে গুরুদেবের আশীর্বাদ পেয়েছিলাম, তাতেই মনে জোর পেলাম।”

মধু বসু


এর পরে ম্যাডান কোম্পানীর প্রযোজনায় নৌকাডুবি গল্পটি চিত্রায়িত হয়, নরেশ মিত্রের প্রযোজনায় । নির্বাক যুগে রবীন্দ্রনাথের এই কটি গল্প থেকেই ছবি হয় ।

রবীন্দ্রনাথ নির্বাক যুগে তাঁর গল্প থেকে চিত্রায়িত হওয়া প্রতিটি ছবি দেখেছিলেন কিনা তা জানা যায় না । তবে সিনেমা শিল্প নিয়ে যে প্রথম থেকেই তিনি যে বেশ গভীর ভাবে ভেবেছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় । শিশির কুমার ভাদুড়ির ভাই মুরারি কুমার ভাদুড়ি রবীন্দ্রনাথের কাছে চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর মত জানতে চাওয়াতে জানিয়েছিলেন –

“ছায়াচিত্র এখনো পর্যন্ত সাহিত্যের চাটুবৃত্তি করে চলেছে – তার কারণ কোনো রূপকার আপন প্রতিভার বলে তাকে এই দাসত্ব থেকে উদ্ধার করতে পারেনি । করা কঠিন । কারণ কাব্যে বা চিত্রে বা সঙ্গীতে উপকরণ দুর্মুল্য নয় । ছায়াচিত্রের আয়োজন আর্থিক মূলধনের অপেক্ষা রাখে । শুধু সৃষ্টিশক্তির নয় ।
ছায়া চিত্রের প্রধান জিনিষটা হচ্ছে দৃশ্যের গতিপ্রবাহ । এই চলমান রূপের সৌন্দর্য্য বা মহিমা এমন করে পরিস্ফূট করা উচিত যা কোনো কাব্যের সাহায্য ব্যতীত আপনাকে সম্পূর্ণ সার্থক করতে পারে । তার নিজের ভাষার মাথার উপরে আর একটা ভাষা কেবলি চোখে আঙ্গুল দিয়ে মানে বুঝিয়ে যদি দেয় তবে সেটাতে তার পঙ্গুতা প্রকাশ পায়।”

১৯১৯ সালের ১লা নভেম্বর বিল্বমঙ্গল ছবি দিয়ে যে বাংলা নির্বাক ছবির যাত্রা শুরু হয়, তা ১৯৩১ সালে সবাক ছবি শুরু হওয়া অবধি চলে । এর মধ্যে বাঙালি পরিচালক, চিত্রগ্রাহক, কলাকুশলীরা খুব সীমিত সুযোগে নিজেদের উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনী শক্তি দেখান । সাহিত্যধর্মী ছবি করার পথপ্রদর্শক কলকাতাই।

খুব আকস্মিক ভাবে ১৯১৭ সালে বাংলা চলচ্চিত্রের পুরোধা হীরালাল সেন মশাইয়ের মৃত্যুর কয়েকদিন পরেই তাঁর তৈরি করা ছবিগুলির নেগেটিভ যদি পুড়ে না যেত ,তাহলে ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে দাদা সাহেব ফালকের বদলে বাঙালি হীরালাল সেনের নামই থাকত। দুর্ভাগ্যবশত সেটা না হলেও শুধু বাংলা চলচ্চিত্রেই নয়, সর্বভারতীয় চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও বাঙালিদের প্রচুর অবদান , সেই নির্বাক যুগ থেকে শুরু করে আজও আছে ।

এই রচনাটি বাংলা চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলাম । পাঠকদের আগ্রহ থাকলে সবাক যুগের জন্য একটি আলাদা নিবন্ধ লেখার ইচ্ছে রইল।

সংগ্রহ করতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x