শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

নাথ হে, প্রেম পথে সব বাধা…

জয় তব বিচিত্র আনন্দ, হে কবি জয় তোমার করুণা।

(ফোঁস, ফোঁ ……স, ফোঁস)

‘তোর কি ব্যাপার বল তো অমিত ? তখন থেকে দেখছি খালি দীর্ঘ নিশ্বাসে ফুলদানীর ফুল কাঁপিয়ে দিচ্ছিস। বলি হয়েছেটা কি?’

‘তুই বৈকুণ্ঠের খাতা পড়েছিস?’

‘কে বৈকুণ্ঠ? আমাদের অফিসে তো কেউ নেই। ও কি হেড অফিসের লোক। তাছাড়া সে তার খাতায় কি লিখেছে না লিখেছে আমি কেন পড়তে যাব?’

‘ওরে অলম্বুষ, বৈকুণ্ঠের খাতা রবীন্দ্রনাথের লেখা।‘

‘রিয়েলি ! রবীন্দ্রনাথ খাতা লিখতেন? তাও বৈকুণ্ঠ বাবুর ? বাবা যে বলেন ওনার বাবার জমিদারী ছিল শিলাইদহে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ বজরায় থাকতেন আর গান লিখতেন। ওই শিলাইদহের কাছাকাছিই কোথায় যেন বাবার মামার বাড়ি। তাই বাবার গর্বের শেষ নেই। তুই ঠিক জানিস খাতা? তাহলে গান গুলো?’

‘তিপ্পান্নটা পাঁঠা স্বর্গে গেলে একটা তোর মত মহাপ্রাণী পৃথিবীতে আসে নিখিলেশ। তোর নামটা ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস থেকে নেওয়া । অন্তত সেটার মর্যাদা দে গাধা একটা।‘

‘টু বি অর নট টু বি সেই হ্যামলেটের সময় থেকেই চলে আসছে। এই সিদ্ধান্তহীনতাতেই মরল বাঙালি’।

‘কি বকছিস কি?’

‘জন্সন স্পেন্সারের’ ইয়েস অর নো বইটা পড়লে তোর লাভ হত।‘

‘আবার বাজে কথা?’

‘না। কাজের কথা। আমি পাঁঠা না গাধা, আগে ঠিক কর। ‘ঘরে বাইরে’ জানি আমি। ওই সিনেমাটা তো? বাবা যে কতবার দেখেছিল। তাই আমার নাম নিখিলেশ । আমি অবশ্য কায়দা করে ভিক্টর করে নিয়েছি। ওই তো হিরো। তাছাড়া যখন স্টেটসে গেলাম ওরা নিখিলেশ বলতেই পারে না । ভিক্টর বললেই এক গাল হাসি।‘ 

‘ঘরে বাইরে রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি উপন্যাস। সেটা অবলম্বন করে তৈরি হয়েছে এই কালজয়ী চলচ্চিত্র। স্টেটসে গেছলি বলে বাংলা সাহিত্য জানব না, রবীন্দ্রনাথ পড়ব না, এ রকম ট্যাঁস কেন তুই?’

‘দেখ অমিত, আমার ছোটবেলা বিহারে কেটেছে। ইশকুল হিন্দি-ইংরেজি। তোদের মত বাংলায় ডুবু ডুবু জীবন নয়। তবু আমি কষ্ট করে বাংলা লেখা পড়া শিখেছি। বই পড়া আমারও সখ। হ্যাঁ, হয়ত বাংলা সাহিত্য অতটা পড়া হয়নি। তাই বলে ওই অলম্বুষ না কি ও রকম সিলেবাসের বাইরের বাংলা গাল দেওয়া তোর উচিত নয়।‘

‘সরি। সরি। তুই রেগে যাচ্ছিস। আসলে বুঝলি না একটা ব্যাপার নিয়ে একটু গেঁজে আছি। কিছু মনে করিস না ভাই।‘

‘ঠিক আছে। তাছাড়া মনে করেই বা কি করে নেব। প্রবাসী বাঙালি সম্বন্ধে খাস কলকাত্তাইয়া মানুষের একটু অ্যালার্জি থাকে। পাত্রী চাই কলামে লিখে দেয় প্রবাসীদের পত্রালাপ … কি যেন … হ্যাঁ … নিষ্প্রয়োজন। তো আমাদের অভ্যাস আছে। বাই দ্য ওয়ে, আমরা আসল ব্যাপারটা থেকে একটু ডেভিয়েট মানে দূরে সরে যাচ্ছি। তোর কি নাকে পলিপ হয়েছে।‘

‘পলিপ? না তো’।

‘তবে এই ফোঁস। ফোঁ……স। মানে কি? আর এর সঙ্গে বৈকুণ্ঠের খাতারই বা কি সম্পর্ক?’

‘একটু বিচিত্র সম্বন্ধ। তবে তার আগে বৈকুণ্ঠের খাতা। এটা রবীন্দ্রনাথের একটি ছোট্ট নাটক। তাতে বৈকুণ্ঠ বলে এক জন এক বিরাট প্রবন্ধ লিখেছেন আর জনে জনে সেই প্রবন্ধ পড়ে শোনাচ্ছেন। তাকে দেখলে পালাচ্ছে লোক।‘

‘তো? তাতে তোর কি?’

‘আরে শোন তো। তোকে বলেছিলাম না আমার একটা সম্বন্ধ এসেছে। মা বাবার পছন্দ।‘

‘তবে ? তোর পছন্দ নয়? সিম্পল। বলে দে। না পারলে আমাকে বল। সুসান নিউম্যানের হাও টু সে নো আমি পড়লাম সদ্য। পরীক্ষা করে দেখি।‘

‘তোর এই ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ জাতীয় মেজাজের জন্যেই তোকে কিছুতে জড়ানো মুস্কিল। কথা সে রকম নয়। বাড়ির সবার মেয়ে পছন্দ, আর আমার ও মানে হেঁ হেঁ …।‘

‘তোমারও হেঁ হেঁ । তবে আর বাকি কি হে?’

‘সমস্যা অন্য জায়গায়।‘

‘কি রকম?’

‘সেই পাত্রীর এক কাকা আমার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছিল। কাছেই থাকেন। আমি আবার সেই দিনই রবীন্দ্র রচনাবলী নিয়ে বসেছি। তো তিনি আমাকে বিরাট সমঝদার ভেবে নিলেন। এখন প্রতি রবিবার তিনি আমাকে নিজের লেখা প্রবন্ধ শোনাতে আসেন। আর কি সব বিষয়। আবগারি বিষয়ক পদ্য সমগ্র, তুতেনখামেনের টোটেম, সিরাজী ও কবিরাজি, সাজাহানের হামাম … বাপরে। আমার উইক এন্ডে কোথাও আসা যাওয়া মাথায় উঠেছে। তুই তো প্রতি শনিবার বাড়ি পালাস। আমি জেরবার হয়ে গেলাম।‘

‘আরে একদিন বলে দে, শুনব না। দশ বছর কি বলে মানব সংসাধনে ম্যানেজারি করছিস। মাসে দুটো করে চাকরি খাচ্ছিস হাপুস হুপুস হাপুস আম খাওয়ার মত করে। আর একজনকে নিজের কোম্পানি ছাড়াতে পারছিস না।’

‘চাকরি আমি খাই না, সেটা কর্তাদের খাঁই। চিঠি উপরে তৈরি হয়। আমি শুধু দেঁতো হাসি ডাক পিওন। তাছাড়া এটা অন্য ব্যাপার। পাত্রীর বাড়িতে এই কাকার খুব চলতি। সোজাসুজি না বলে দিলে… মানে বুঝতেই পারছিস।‘

‘হুঁ। চলতিকে বালতিতে পুরতে হবে। চিচিং বন্ধ। আচ্ছা, এই কাকার ব্যাপারটা একটু ব্যাপক কর দেখি। বয়স কত, কি করে, পয়সাকড়ি কেমন, অন্য কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য… হাঁ করিস না। কয়েকটা ভাল বাংলা আমিও জানি।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। বয়স … ধর … পঞ্চান্ন ছাপ্পান্ন । কি করে জানি না কিন্তু দেখে মনে হয় পয়সা কড়ি আছে । তবে একটু বোধহয় কঞ্জুস । হাতে করে তো কিছু আনল না কোনদিন। অথচ আমি খাবার আনালে কখনো না নেই। বলতে নেই সাঁটে ভালই।’

‘বড়িয়া ইয়ার। দোনো হাত মে লড্ডু। প্রবন্ধ শোনানো হল আবার পেট পুজো তাও হল। ভাবি একটু। প্রবন্ধ না শুনলে পাত্রী হাত ছাড়া? বেশ সিনেম্যাটিক সিচুয়েসন। টলিউড পেলে লুফে নেবে।’

‘আরে সেই জন্যেই তো বৈকুণ্ঠের খাতার কথা বলছি। সেখানেও সিচুয়েসন এরকমই। ওখানে ছিল বৈকুণ্ঠের ভাই। সে আবার …।’

‘এই বইটা আছে তোর কাছে? একবার দিবি তো। তোর মুখে ঝাল না খেয়ে একবার পড়ে দেখি। আর তোর ব্যাপারটাও একটু ভেবে দেখি। যাকে বলে ডিপ থট দেওয়া। এ শনিবার তবে বাড়ি যাব না’।


(পরের শনিবার সন্ধ্যে সাতটা। টিং টং। খটাৎ খট)

‘আ…সু…ন আ.সু.ন। আপনিই কাকা তো। ভেতরে আসুন।’

‘কে তুমি? আর আমি তোমার কাকা হলাম কি করে? অমিত নেই’?

‘শেষ থেকে শুরু করি। অমিত একটু বেরিয়েছে। আপনি হলেন অমিতের উড বি-র কাকা। সেই সূত্রে অমিতেরও আইন মাফিক কাকা হবেন। আমি ভিক্টর, না না নিখিলেশ। অমিতের প্রাণের বন্ধু। বরযাত্রী যাব বলে বসে আছি। তাই আমিও আপনাকে কাকা বলা প্র্যাকটিস করছি।’

‘অ ও ও ও। তা অমিতের ফিরতে কি দেরি হবে’?

‘একটু। কিন্তু প্রাণহরা রেস্তরাঁ-র কাটলেট এলো বলে।’

‘প্রাণহরা কাটলেট? বেড়ে বানায় ওরা’।

‘যা বলেছেন। তার গোটা দুয়েক শেষ হতে হতেই অমিত এসে পড়বে। ততক্ষণ আমরাই একটু গল্পগাছা করি। অমিত বলেছে আপনি একজন প্রখন্ড বিদোয়ান’।

‘কি বললে একটা প্রচণ্ড … কি যেন?’

‘প্রচণ্ড না … প্রখন্ড। আসলে আমি বিহারে পড়াশোনা করেছি তো। মাঝে মাঝেই রাষ্ট্র ভাষা বেরিয়ে পড়ে। মানে আপনার জ্ঞান গভীর। আর রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তো আপনি বিশেষজ্ঞ। খুব শ্রদ্ধা করে অমিত আপনাকে।’

‘হেঁ, হেঁ,হেঁ, হেঁ, ছেলেটি অতি ভাল।’

‘হেঁ, হেঁ,হেঁ, হেঁ,। ভাল বলে ভাল। সাত চড়ে রা কাড়ে না। তারপর পরোপকার করতে ওস্তাদ। তাই তো আপনার দর্শন পেলাম। আসলে আমি একটা … বলা যায় … বিপদেই পড়েছি। তো তাই তো ওকে বলতেই ও বলল আরে এই নিয়ে চিন্তা? কাকুকে বললেই ও ক্কে করে দেবে। ব্যাস আপনার দর্শনের জন্যে বসে আছি।’

‘আমি তোমাকে চিনি না, বিপদ কি তাও জানি না, ধরেই নিলে ও ক্কে করে দেব ? তোমাদের … মানে এই আজকাল কার ছেলেদের অবিমিশ্রকারিতা … মানে কি যে বলি…’ দেখো যদি টাকা পয়সার ব্যাপার হয় পরিষ্কার জানিয়ে রাখছি ……।’

‘না না না না ছি ছি ছি ছি। আপনার থেকে টাকা চাইতে পারি? টাকা মাটি মাটি টাকা। মানে এ থেকে আবার ধরে নেবেন না যে আপনার নিউ টাউনের জমিটা আমি চাইছি। আসলে আপনার জ্ঞান সাগরের এক ঘটি জল ছাড়া কিছুই চাইবার নেই।’

‘হ্যাঁ…… তা… জ্ঞান দিতে অসুবিধে কি? অমিত বাবাজীবনকে যে জীবনের এত গভীর সব তত্ত্ব জানিয়ে যাই কখনো অর্থের প্রত্যাশী হয়েছি কি? যেমন ধর আজ । আজ শোনাব তৈমুর লঙের ফুটবল প্রীতি। শুনবে তুমি?’

‘তৈমুর লঙ ফুটবল খেলতেন? বলেন কি? যত দূর জানি তিনি সাত আটশো বছর আগেকার মানুষ। আর ফুটবল উনিশ শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডে শুরু হয়েছিল।’

‘সেটাই তো গবেষণা করে বার করতে হয়েছে। তৈমুর ফুটবল খেলতেন বৈকি। তবে একালের ফুটবল দিয়ে নয়। পরাজিত শত্রুর মাথা কেটে খেলতেন। আমরা সেটাকে গেন্ডুয়া বলেও জানি।

‘একটু পায়ের ধুলো দিন। আপনাকে তৈরি করে ভগবান তো ছাঁচ ফেলে দিয়েছেন। আর হবে না?’’

‘কি বললে?’

‘বলিনি তো এই বারে বলব। আপনি নিশ্চয় ঝ্যাং ওয়াং এঁর নামের সঙ্গে পরিচিত । ইনি একজন ঝু ঝেনদান বিশেষজ্ঞ। আপনার সাহায্য চান।’

‘কি ঝন ঝন করলে কিছুই বুঝলাম না। আর আবার সাহায্য?’

‘পাণ্ডিত্যের সঙ্গে প্রবল রসবোধ আপনি যতই কর্ষিত হচ্ছেন আমি ততই হর্ষিত হচ্ছি।’

‘আমি … কি হচ্ছি বললে ? কেমন যেন ঠেকল কানে?’

‘ কর্ষিত হচ্ছেন। আপনি বোধহয় ধাঁ করে ‘ধ’-এ চলে গিয়েছিলেন। মাঝে অনেক গুলো ব্যাঞ্জন বর্ণ পিছলে গেছেন। মানে আপনাকে যত কাল্টিভেট করছি আর কি। ফুট নোট জটায়ু …ওই ফেলুদা মানে … ।’

‘দেখো হে ছোকরা, ইশকুলে আমাকে ফেলুদা বলতো সেটা তুমি কি করে জানলে – জানিনা। কিন্তু এক আধ বার ফেল সবাই করে। আমি না হয় তিন বার। তা সে ফেল করার পরেও আমার তিসি তেলের ব্যবসায় লাখ লাখ টাকা খাটে। পরে বাংলার অর্থনীতিতে তিসির প্রভাব এই বিষয়ে আমার গবেষণা পত্রের জন্যে উজবেকিস্থান ইউনিভারসিটি আমাকে পি এচ ডি দিয়েছে সেটা জানো কি ?’

‘কি বললেন ? বাংলার অর্থনীতিতে কার প্রভাব? ও তিসি! ওফ্‌! আরেকটু হলেই হয়েছিল আর কি! আসলে পশ্চিমবঙ্গে থাকতে থাকতে এমন হয়েছে … আমার ও বর্ণ বিপর্যয় ঘটে গিয়েছিল। তা আপনি… ওই ডক্টরেট ডিগ্রি আনতে উজবুক দের দেশে মানে উজবেকিস্থানে গিয়েছিলেন?’

‘যেতে হয় না। ডাক যোগে পাওয়া যায়। এখন যদি তোমার আর কিছু বলার না থাকে তবে আমি উঠি। অমিতকে বলে দিও যে আমি ……।’

‘ আরে ক্ষমা ক্ষমা। উঠছেন কি? আমার বিপদটা তো শুনলেনই না। আপনিই একমাত্র বাঁচাতে পারেন আমাকে। বসুন দয়া করে। হ্যাঁ এবার বলি । কথা হচ্ছে ঝু ঝেনদান সম্বন্ধে। নামটি ম্যান্ডারিন ভাষায়। বাংলায় যার মানে প্রাচ্য ভোরের বজ্র। আমাদের রবীন্দ্রনাথের এই নাম চীন দেশে। এখন এই ঝ্যাং ওয়াং হচ্ছেন আমার বস য়াং য়াং এঁর শ্বশুর মশাই। তিনি রবীন্দ্রনাথের ওপর প্রবন্ধ লিখছেন। হ্যাঁ তাঁর মাতৃ ভাষাতেই। এখন একজন রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ খুঁজছেন, যিনি তাঁর রচনাটি শুনে ত্রুটি-বিচ্যুতি শুধরে দেবেন। আমাকে একটি ই-মেল পাঠিয়েছেন। এই যে দেখুন সংক্ষিপ্তসার।’

‘এতো আমাকে আরো ক্ষিপ্ত করার চক্রান্ত। কি সব নকশা আঁকা কাগজ। বলি, মস্করা হচ্ছে?’

‘রাম কহো! মস্করা করব আমি? আমার বলে শিরে সংক্রান্তি। এ নকশা নয় ম্যান্ডারিন লিপি। আপনার অসুবিধে হবে না। ম্যান্ডারিন ভাষার বর্ণমালার সংখ্যাও ছাব্বিশ। না না, আপনাকে ও ভাষা শিখতে হবে না। মিস্টার ঝ্যাং ওয়াং আপনাকে পড়ে শোনাবেন। তারপর ইংরেজিতে জানাবেন কি লেখা আছে। অবশ্য ওনার ইংরেজি বোঝাও চাইনিজের থেকে সহজ নয়। তবে আমরা গোলা লোক আর আপনি জ্ঞানী মানুষ। আপনার অসুবিধে হবে না। তাহলে আমি শ্রী য়াং য়াং কে সুখবরটা জানিয়ে দি?’

‘আমি … আমি …’।

‘আপনি আর না করবেন না। আমি যদি রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ না জোগাড় করতে পারি, তবে য়াং য়াং স্যার বলেই দিয়েছেন প্রমোশনের কথা ভুলে যেতে। তাছাড়া এমনি তো নয়। ঝ্যাং ওয়াং বাবু আপনাকে ইউয়ান দেবেন মানে চীনা টাকা। এক হাজার দিলে ভারতীয় মুদ্রায় এগার হাজার আটশো। কি? কম? এই তো হাসি ফুটেছে আপনার। এতক্ষণে। হয়ত আপনাকে চীন ভ্রমণেও নিয়ে যেতে পারেন। তবে একটু মনে রাখতে হবে যে……।’

‘আবার কি মনে রাখতে হবে। প্রস্তাবটি তো বেশ ঠেকছে আমার।’

‘সে তো বটেই। তবে আমার বস জানিয়েছেন যে ঝ্যাং ওয়াং বাবু আবার একটু রগ চটা। কেউ ঠকালে রক্ষে নেই। চো মো লাং মা পাহাড়ের নিচে তার চামড়ার কারখানা আর গবেষণাগার। সারা বিশ্বে রপ্তানি, বিশেষ করে পাতলা চামড়ার ডুগডুগি। ঠগ-বাজকে না কি সেখানে নিয়ে গিয়ে …।

‘অ্যাঁ!’

‘না না কথার কথা আর কি। তাহলে কথা পাকা? জানিয়ে দি বসকে?’

‘না না এখনি জানাবার দরকার নেই। আমি একটু ভাবি। উঠলাম আজ।’

‘সে কি। দেরি কিসের ? তাছাড়া প্রাণহরা রেস্তরার কাটলেট এলো বলে। আমাকে নিরাশ করবেন না।’

‘রাখো হে প্রানহরা কাটলেট। ওসব খাইয়ে আমার প্রান হরনের চেষ্টা। আমার এখনি নামের আগে লেট লাগাবার ইচ্ছে নেই তাই তুমিই খাও কাটলেট। আমি কাটলুম।’

‘ঠিক আছে। আপনি সময় নিন। আমি তো এখানেই থাকি। আপনার পরের রবিবার আবার আসবেন তো? সে দিনই চুক্তি চূড়ান্ত করে নেব। নেহাতই যদি আসবেন আজ আসুন তাহলে। রবিবার তো দেখা হচ্ছেই।’

‘আর আসবো না। ভারি আমার চীনা চামড়া-ওয়ালা দামড়া রে। প্রবন্ধ লিখেছে। অমিতকে বোলো একেবারে ছাঁদনা তলাতেই দেখা হবে। পালাই। মানে চলি।’

‘হে হে হে হি হি হি।’

‘এই নিখিলেশ। কি হয়েছে তোর? একা একা পাগলের মত হাসছিস? ও দিকে কাকুও কেমন প্রায় আমাকে ধাক্কা মেরে দৌড় দিল।’

‘ওরে কাকুকে যা ডোজ দিয়েছি দেখ গে সরকারি হাসপাতালে কেবিন খুঁজতে গেছে। যা হোক আর বোধহয় তোকে জ্বালাবে না। চৈনিক চিকিৎসা করে দিয়েছি কি না।’

‘কি গোলমাল করলি বলতো? দেখ যদি আবার সুচেতনা জানতে পারে তবে দূরতর দ্বীপ হয়ে যাবে।’

‘তোর সর্বনাশ কি বর্ধমানের মশা না কি একটা মারলে সঙ্গে সঙ্গে আর একটা এসে পোঁ ধরে? ইনি কোন চৈতন্য দেব?’

‘সুচেতনা … মানে … ওই … হেঁ … হেঁ।’

‘ওহ। তোর হেঁ হেঁ। নাহ নিশ্চিন্ত থাক। কাকাকে কোনো কলসির কানা মারি নি। শুধু প্রেম দিয়েছি। তাতেই তিনি লম্বা দিয়েছেন।’

‘লম্বা দিয়েছেন? কি করে … মানে কি ভাবে…?’

‘ইয়ে এক লম্বি কাহানী হৈ। তোকে প্রথমে বোঝাতে হবে ঝু ঝেনদান কে। তারপর ঝ্যাং ওয়াং তারপর য়াং য়াং তারপর …।’

‘কি ঝ্যাং ঝ্যাং করছিস যেন স্টিলের থালা পড়ছে মাটিতে। ব্যাপারটা সংক্ষেপে ……’।

‘সংক্ষেপে বলতে গেলে …… বৈকুণ্ঠের খাতা। দ্যাখ, পড়েছিস তুই বহুবার। নিজেই আমাকে বললি। আমি পড়িনি বলে কি সব সাধু বাংলায় গালও দিলি। কিন্তু সেখানেই যে সমস্যা সমাধানের সূত্র লুকিয়ে আছে সেটা তোর নজর এড়িয়ে গেল। জয় ঠাকুর বাবার জয়। কত ভাবে আর তুমি বাঙালিকে সাহায্য করবে।’

‘আমার মাথাটা কেমন যেন …।’

‘আরে বোস বোস। বসে শোন। আমার বসের বস য়াং য়াং বাবু বসে আছে না চীনে? সে আবার গল্প লেখে। তো গদ গদ হয়ে তার একটা গল্প আনালাম ই-মেলে, বললাম বাংলা করে ছাপাব। ব্যাস তার প্রিন্ট দেখিয়েই কাকার কেল্লা ফতে। এ দিকে আবার বসের বসকে সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দেওয়া গেল। প্রমোশন সামনে। আপ্পা রাওটা সমানে এখানকার বসকে উথ্থাপম খাইয়ে যাচ্ছে। এবার দেখব ব্যাটাকে। এক তির দো নিশান’।

‘কি করে? কি করে?’

‘চল বোঝাই। এ দিকে প্রাণহরার কাটলেট ও হাজির। এবার একটু চা আর ছবির ক্লাইম্যাক্সের রিপ্লে। জয় ঠাকুরের জয়’!

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.