শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

তোমারি তুলনা তুমি প্রাণ…

‘থাপ ফ্রায়া’ নগরীতে গেছেন কখনো? কিম্বা ‘সিয়াম’ দেশটা তে? ইন্দো-চীন উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ। যার উত্তর-পশ্চিমে মিয়ানমার, উত্তর-পূর্বে লাওস, দক্ষিণ-পূর্বে কম্বোডিয়া, দক্ষিণে মালয়েশিয়া উপসাগর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে আন্দামান সাগর। ক্ষেত্রফল পশ্চিমবঙ্গের আড়াইগুণ এবং জনসংখ্যা অর্ধেকের কিছু বেশী। লোক জন হাসি মুখ। যখন তখন পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে ঝুঁকে নমস্কার কচ্ছেন। রাস্তা ঘাট ঝকঝকে সুন্দর । বহু গাড়ি রাস্তায় কিন্তু কেউ হর্ন বাজাচ্ছেন না। মেট্রো নেই, রয়েছে টুকটুক। পথচারী দেখলে গাড়ি চালক গতি কমিয়ে তাকে রাস্তা দিচ্ছেন। কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আবার পথচারীরাই সুইচ টিপে সিগনাল লাল করে পেরিয়ে যাচ্ছেন। মানুষ মদ গাঁজা খাচ্ছে প্রচুর – কিন্তু যত্রতত্র থুতু ফেলছে না, বোতলও না। সন্ধ্যায় স্বল্প বাসা মহিলা ঘুরছেন, বসছেন , দাঁড়াচ্ছেন ইতি উতি। চতুর্দিকে সাগর, পাহাড়, বনরাজি-নীলা, সৌন্দর্যের অনায়াস সহবাস। সে যেন ছবির দেশ, কবিতার দেশ। জনগণ – মাতৃভাষা ছাড়া অবোধ্য ইংরেজিতে কথা বলেন। যারা ঠকবাজ তারা খুব ভদ্র, ইংরেজি বলেন আমাদের মত, অবলীলায় আমাদের হাত দিয়েই টাকা বার করে নেন। এ হল ভারতীয়দের জন্যে সস্তা, সুন্দর, নিকটতম বিদেশ। অন্তত অবসর নেবার পর যখন পকেট একটু ভারি তখন সবাই যান সেখানে ঝুল-পড়া পাসপোর্টে ছাপ লাগাতে।

এখনো যদি স্থানটি সম্বন্ধে কিছু সংশয় থাকে তবে আরেকটি তথ্য দিলেই জলবৎ বোঝা যাবে। সেখানে সুলভে এবং নির্ভয়ে বৌয়ের বিকল্প পাওয়া যায়। এবার নিশ্চিত গোঁপের ফাঁকে একটু আধো হাসির নকশা ফুটে উঠবে সবার। শহরের নাম পাটায়া, দেশটির নাম ‘থাইল্যান্ড’, আগে তাদের নাম ছিল যথাক্রমে ‘থাপ ফ্রায়া’ আর ‘সিয়াম’ (১৯৩৯ )। কিছু কিছু ‘ঘনাদা / টেনিদা ‘ দুখিরামকে দুঃচ্ছাই করে বলতেই পারেন ও রকম বৌ বিকল্প বহু সাগর সৈকতে – এমন কি আমাদের পশ্চিমবঙ্গেই অন্তত দুটি বেলাভূমির শহরতলিতে পাওয়া যায়। দুখিরাম ভুশুণ্ডি কাক বলে তার ধারণা নেই। তাহলে দুখিরাম সবিনয়ে তার আগের বাক্যের ‘নির্ভয়ে’ শব্দটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে চাইবে। শশক ও শার্দূলের মধ্যে যতটা তফাৎ – ‘আমাদের’ সঙ্গেও ‘তাদের’ তফাৎ ততটাই।

যাহোক – সেইখানে গেছল দুখিরাম তবে – তার আগে গেছল দীঘা ও ঝাড়গ্রাম এবং তার আগামী সফর স্থির হয়ে আছে সিউড়ি ও বাঁকুড়ায় । এই কথাটির উল্লেখ এই জন্যে করতে হল যে বিদেশ যাত্রা হলেও দুখিরামের পা মাটির উপরে যায় নি। অদ্যাবধি সে গাঁয়ের ছেলেই বটে। তাই সেই ধুলো পায়ের সফর কেমন হল তার এক দুটি গল্প শোনাতে চায় সে।

প্রথমেই একটি তাল কাটা কথা বলা দরকার। এই লেখাটিতে সে দেশের দ্রাঘিমাংশ, অক্ষাংশ, যাবার উপায়, প্লেন / হোটেলের ভাড়া, সস্তার গাড়ি – দেশের নাড়ি – এসব তথ্য পাওয়া যাবে না। বুদ্ধ কোথায়, তার প্যাগোডা কোথায়, হোথায় কোথায় আলু পোস্ত ভাত পাওয়া যায় – সে খোঁজ ও এ লেখায় পাবেন না। সে সব তো গুগুল গুলে খেয়েছে, কেউ চাইলেই ঘাঁটতে পারেন। বরং দু একটি এড়িয়ে যাওয়া কথা আর দুখিরামের কাছা টানাটানির ব্যথা জানতে হলে এ ছারভস্ম পড়ুন। আর হ্যাঁ … একবার নিজের আধার কার্ড দেখে নেবেন – এ লেখা পড়ার মত নিরাপদ বয়স আপনার হয়েছে কি না। এতে কিছুটা প্রাপ্ত বয়স্ক/ মনস্কদের পড়ার মত তথ্য আছে কি না।

যাবার আগে বিস্তর খুচরো কাজের পাহাড় জমে গেছল দুখিরামের । সে সব সারতে গিয়ে সাজগোজ করা হয়নি। বিদেশ যাত্রা বলে কথা – মাথায় কলঙ্ক মাখা দরকার । ঠিক যাবার আগের দিন পাড়ার সাবেক দোকান ছেড়ে একটু জাঁক জমকের ‘স্যালোঁ’-তে গিয়ে বসল। হাতের কাগজপত্রের মধ্যে পাসপোর্টের ছায়াপ্রতি নজরে এলো নরসুন্দরের। ভারি মোলায়েম হেসে বললেন ‘বিদেশ যাচ্ছেন’? দুখিরাম ছটি দাঁত দেখাল। তারপর বলল ‘মাথায় ডার্কেস্ট ব্রাউন রংটা …’। বরাভয়ে হাত তুলে নরসুন্দর বললেন ‘আমি হাবিবের কাছে কেশ কলা শিখেছি, চিন্তা করবেন না। আপনার মাথার জিম্মা আমার। একটু বারগেন্ডির টাচ দিয়ে দেবো, সে দেশে সবাই এর ঝিলিক দেখে দাঁড়িয়ে যাবে’। তার হাবিব জনচিত ড্রিবলিং এর চোটে দুখিরাম না না করতে করতেও গোল খেয়ে গেল। শুধু শুধু জনান্তিকে কিশোর কুমার গাইলেন ‘এ লাল রং কব মুঝে ছোড়ে গা’। রং হল, ধোওয়া হল, কালো কেশে ঝিলিক টিলিক দেখা গেল না। বাড়িতে আবার স্নান হল দুবার। তারপরের মাথায় জল পড়ল পাটায়ায়। সে দেশের হোটেলে একটি বিজ্ঞপ্তি থাকে – বিছনার চাদর বা তোয়ালে নোংরা করলে জরিমানা নিয়ে ও সব ভাড়াটে কেই দিয়ে দেওয়া হবে। এটি মনে রাখবেন সবাই । কারণ কোনও ভারতীয় হোটেলে এ জাতীয় সতর্কতা দেওয়া/ নেওয়া হয় না। ধারা স্নানের পর দুখিরামের সাদা তোয়ালেতে রক্ত বর্ণ ছাপ পড়ল। সেই বারগেন্ডি বেরোলেন দুদিন পরে , যা মিশিয়ে ছিলেন আল হাবিবি চেলা। তোয়ালে ধোবার চেষ্টা করতেই – যেমন বলেছিলেন পাঞ্জাব কেশরী রাজা রঞ্জিত সিং – সব লাল হো গয়া । ঘর সাফাইয়ের কর্মী এসে ঘোর রব তুললে। বমাল সহ দুখিরামকে বজ্রসেনের মত নিয়ে গেল কোটাল ম্যানেজারের দরবারে। অনেক কষ্টে দুখিরাম নত মস্তকে বোঝাল আর কিছুই নয় মাথার থেকে রং উঠেছে। তারপর হোটেলশুদ্ধু মানুষ জন একবার দুখিরামকে দেখে আর একবার লাঞ্ছিত তোয়ালে টিকে। অবোধ্য কিছু বলে হাসতে থাকে। দুখিরাম কোনো ক্রমে জরিমানা দিয়ে পালিয়ে বাঁচল। অর্থদণ্ড মোটামুটি মোটা – এক হাজার ভারতীয় মুদ্রা।

শেষ দিনের অপমান আরেক রকম। হোটেল রুমে যা দেওয়া হয়েছিল – ব্যাভার করলে মূল্য চোকাতে হবে। তাই কারণ বারি, সাদা বারি, আলুভাজা, ঠান্ডাইয়ের দিকে দুখিরাম ফিরেও তাকায় নি। কিন্তু সঙ্গে ছিল আর একটি বস্তু। তেমন দ্রব্য দুখিরাম গাঁ ঘরের হোটেলে কস্মিন কালেও দেখেনি। এক প্যাকেট জন্ম নিয়ন্ত্রক খাপ। তদ দৃস্টং দুখিরাম অবশ্যই একটু খাপ্পা হয়েছিল। কারণ সে ঘরে দুখিরামের পরিবার ছাড়াও ছিলেন দুখিরামের অগ্রজা। চেক আউটের সময় ম্যানেজার সাহেব বললেন, ওই প্যাকেটের দাম দিতে হবে’। ‘মানে’? ‘ব্যাবহার তো করেছেন নিশ্চয়ই’। প্রবীণ নাগরিক দুখিরাম তখন তাকে খুন করতে প্রস্তুত। শুধু সুটকেস দিয়ে মাথা ভেঙে না গলা টিপে – সেইটি স্থির করতে পাচ্ছে না। তখনি ম্যানেজার সাহেবের কাছে ফোন এলো অটুট প্যাকেট পাওয়া গিয়েছে। ম্যানেজার মুচকি হাসি চেপে সই করতে করতে বললেন ‘দুঃখিত । আসলে এখানে তো মনোরঞ্জনের জন্যেই আসে সবাই … আপনার বোধহয় … ‘। দুখিরাম এক গ্লাস বরফ ঠাণ্ডা ফলের রসে চুমুক দিয়ে শপথ নিল ‘ আর যদি কোনো দিন গুরুজনদের সঙ্গে পাটায়াতে…’।

এই শপথ আপনারা ও মনে রাখবেন। এমন নয় যে পাটায়া সাগর কিনারায় দুখিরাম তার থেকে বয়স্ক ভারতীয় দেখেনি। ম্যাক্সির উপরে গামছা জড়িয়ে ব্রিড়াবনতা মা বা শাশুড়ি মা। অনভ্যাসের জমকালো টি শার্টে ভুঁড়ি ঢেকে, হাফ প্যান্ট পরা সরু ঠ্যাং বাবা বা শ্বশুর মশাই। বেশ কিছুটা দূরত্বে বিড়ম্বিত ছেলে/ জামাই/ মেয়ে/ বৌমা। সবাই সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিয়ে হাঁটছেন বালুকা বেলায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে উপভোগ করছেন ফিরোজা নীল সমুদ্রকে। নয়ন নত হবার জো নেই। সেখানে শুয়ে/ বসে/ হেঁটে চলেছেন কৃশ বা পৃথুলা মহিলা মণ্ডলী। তাদের শরীরে স্রেফ কয়েক গাছি দড়ি বাঁধা। আগের পরিবারের সঙ্গে যারা শিশু বা বালক বালিকা – তারা হাঁ করে চৌদিক দেখছে আর প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করছে লাল/ বেগুনী হওয়া মা বাবাকে। একটি দুষ্ট বাগধারা রয়েছে দুখিরামের দেশজ ভাষ্যে ‘ ———– লাজ নাই, দেখুন্তির লাজ’। একই নীল আকাশের নিচে আমাদের বসবাস। একই আর্য ঐতিহ্যের দাবীদার। কিন্তু আমূল বৈদিক ব্যবস্থায় বড় হবার দরুন লজ্জা আমাদের কাঁধে বেতাল হয়ে বসে আছে। ঠিক-ভুল বলার দুখিরাম কেউ নয় তবে … সে দেশের মোড়ে মোড়ে কিন্তু বুদ্ধের স্মারক। সেখানে কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগী শাক্যমুনি হাত তুলে বসে আছেন।

নিজের উচ্চতা ও বর্ণ সম্বন্ধে কোনো তিল পরিমাণ হীনমন্যতা থাকলেও এমন বিদেশ যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিৎ। না, থাইল্যান্ডের লোকের সঙ্গে আপনি সমানে সমানে চোখে চোখ রাখতে পারবেন। কিন্তু পদে পদে ছয় / সাড়ে ছয় ফুটিয়া, ঘোর গৌরবর্ণ পর্যটক সাহেব মেমরা ঘুরছেন। উচ্চতা ও স্বাস্থ্য পরস্পরের পরিপূরক। কেউ ‘হাই’ বলে হাঁ করলে আপনাকে ধ্রুব তারা দেখার মত ঘাড় উঁচাতে হবে। এরা মুখ ধুয়ে বা না ধুয়েই সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত ‘ভালুক (ইং)’ পান করছেন। হাঁই হাঁই করে প্রাতরাশ খাচ্ছেন এক ডেকচি সালাদ-সহ এক ডজন ডিম সেদ্ধ, হ্যাম, বেকন – আর যা কিছু রয়েছে টেবিলে। আর আপনি অম্বল বাঁচিয়ে এক আধ চামচ করে অচেনা খাদ্য নিচ্ছেন ছোট প্লেটে। এদের একেক জনের প্রাতরাশ দিয়ে আমাদের সমূহ পরিবারের নাস্তা হতে পারে। তুলনায় সুটকেস পুঁচকে। পোশাক তাদের কাছে বাহুল্য বই তো নয়। তাছাড়া বস্ত্রের বিকল্প টাটু আছে না ? এক এক জন কে দেখে দুখিরাম ঠাওরই করতে পারে না যে তাদের শরীরে কোনো লজ্জা বস্ত্র আছে – নাকি সবটাই উল্কি।

পাটায়া শহর দুবার জাগে , দিনে ও রাতে। কি যেন লিখেছিলেন সত্যেন্দ্র নাথ দত্ত ? ‘দেবতা ঘুমালে তাহাদের দিন, দেবতা জাগিলে ইহার রাতি, ধরার নরক সিংহ দুয়ারে – জ্বালায় তাহারা মোমের বাতি’। সকালের শান্ত জন প্রবাহ দেখে বিশ্বাস করা শক্ত রাতে এই পথ গুলোই ভিসুভিয়াসের মত জেগে উঠবে। প্রবল শব্দ আর চক্রবত আলোক মালায় নাচতে থাকবে মোহিনী মায়া, টলে যাবে আত্ম নিয়ন্ত্রণ। দাদা ঠাকুরের অমর গান ‘ মজা করে খাও রে গাঁজা’। যেখানে সেখানে তার আন্তর্জাতিক শিষ্যরা দমদম দাওয়াই নিচ্ছেন। সবুজ পাতার ছবিওয়ালা দোকানে সগৌরব বিজ্ঞপ্তি – পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে পৌঁছে যাবে এই ঈশ্বরীয় ভূমা। তবে শিক্ষণীয় দশাসই সাহেবদের প্রাণ শক্তি। হয়ত তার আশি বছর আসি আসি করছে কিন্তু দুই উচ্ছল মহিলার কাঁধে হাত দিয়ে চলেছেন পথ বেয়ে, দুহাতে ছল ছল বোতল নিতে ভোলেন নি। কোথায় চলেছেন প্রভু? এক দিন খৃস্ট দেবও এমন প্রশ্ন শুনেছিলেন। আমাদের একজন সর্ব জন শ্রদ্ধেয় দেশ নেতাও এভাবে নিজের আত্মিক শক্তির পরীক্ষা নিতেন । শুধু কারণ বারির বদলে নিতেন ছাগলের দুধ। হে পাঠক – আরো বিশদে তরল বর্ণনা এ লেখায় পাবেন না। সমরেশ বসুকে আদালতে ঢাল হয়ে বাঁচিয়ে ছিলেন আরেক বুদ্ধদেব। দুখিরামের সম্পাদক মশাই বোধহয় তেমন পোক্ত নন। তবে আমাদের রাষ্ট্র ভাষার এক অদ্ভুত প্রয়োগ দেখেছে দুখিরাম । সাঁটে সে কথা জানিয়ে দিচ্ছে একটু।

রাতের সমুদ্র তীরে আমাদের দী-পু’র মতই ভাজাভুজির রাজসূয় যজ্ঞ। নয়নলোভন তো বটেই কিন্তু তার উপাদান কি তাতে একটু সন্দেহ থাকে। না না ভেজালের প্রশ্নই নেই। সে দেশের একজন ঘোর বিস্ময় ও উষ্মা প্রকাশ করেছিল যে – সে শুনেছে ভারতে কোথাও কোথাও খাবারে – এমন কি শিশু ভোগ্য আহারেও ভেজাল মেশানো হয়। এ তাদের কাছে অকল্পনীয় এবং মৃত্যুদণ্ড যোগ্য অপরাধ। কিন্তু দুখিরাম যে দু-প্রকার ছাড়া সব মাংস কেই নিষিদ্ধ তালিকায় রেখেছে।সে তো ‘বিরিঞ্চি বাবা’ নয় যে জলহস্তীর রোস্ট খেতে চাইবে। বিশেষত রাস্তায় দাঁড় করানো কুমির আর তাদের শূলপক্ব মাংসের ঢুলুঢুলু গ্রাহক দেখে তার আত্মারাম কিছুটা বিচলিত হয়েছে। তাছাড়া রক্তে পলির প্রকোপও আছে। তাই সে মিষ্টি ভুট্টার সন্ধানে হাঁটছিল একা একাই। সুমধুর মহিলা কণ্ঠ তাকে ডাক দিল ‘আইয়ে ইধার আইয়ে বাবু’। পররাষ্ট্রে রাষ্ট্র ভাষা? এ যে নবকুমার দর্শনে কপাল কুন্ডলা! পুলকিত দুখিরাম থমকে দাঁড়িয়ে দেখল ললনাকে। তারপরে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে দৌড় দিল সাধ্যমত। সেই অপমানিত থাই সুন্দরী বাছা বাছা হিন্দি / ভোজপুরি গাল দিল দুখিরামকে – মানে দিতেই থাকল যত দূর শব্দ যায়। জন্মাবধি বিহারে মানুষ দুখিরামের শব্দ ভাণ্ডার ও তত বিস্তৃত নয় । বৃত্তির প্রসারের জন্যেই হয়ত তার ভাষা শিক্ষা। কিন্তু কারণ যাই হোক ভাষার বিকাশ তো হল – পুলক জাগল দুখী মনে।

দুখিরামের একটি হৃদয় বাসনা পূর্ণ হয় নি। সেখানে বার বার সুটকেস টেনে, সিঁড়ি চড়ে বা অনভ্যাসের দীর্ঘ হাঁটাহাঁটিতে দুখিরামের পুরনো বন্ধু কোমরের ফিক ব্যথা জেগে উঠল। এ ব্যারামের ওষুধ অল্প ফিজিওথেরাপি। পথে পথে মহিলা পরিচালিত ম্যাসেজ পার্লার সে দেশে, খ্যাতি বিশ্ব জোড়া। কিন্তু সেই পঞ্চ মুন্ডির আসনে হাঁকিনী ডাকিনীর মায়া আছে। মন শক্ত হওয়া চাই – নইলে সঙ্গী চাই সজাগ ছড়িদার। দুখিরামের স্ত্রী কিম্বা দিদি কেউ তাকে পাহারা দিতে রাজি হল না।। একবার মনে মনে একাই যাবার কথা ভেবে ছিল দুখিরাম – কিন্তু তৎক্ষণাৎ তার অবচেতন থেকে অগ্নিমূর্তি দীক্ষাগুরু বেরিয়ে এসে ‘পাপিষ্ঠ, পামর, নরাধম’ আরো কি কি সব বলে খুব গাল মন্দ করলেন। দুখিরাম মনে মনে তাঁর পায়ে পড়ে , নাক কান মুলে নিষ্কৃতি পেল। নিজেই কোমরে ঘষল ‘অম্রুতাঞ্জন’, আর বাকি ভ্রমণ বাঁধল কোমর বন্ধনী। দার্শনিকরা বলেন সব ইচ্ছা পূর্ণ হয়ে গেলে আর পুনর্জন্ম হবে না। না হয় আবার ধরাধামে আসবে দুখিরাম।

আপনারা বিশ্বাস করবেন কি না জানা নেই – দুখিরাম বিশুদ্ধ বাংলায় দর করে একটি ঝুটো পাথরের হাত বালা কিনেছে সেই সমুদ্র তীরে। যেমন আমাদের যে কোনো সাগর বেলায় ঝিনুক , মুক্তো, পাথরের মালা / চুড়ি নিয়ে আসেন স্থানীয় গরিব গুর্ব মানুষ – সেখানে ও তাই। একজন এসে দুর্বোধ্য ভাষায় একটি পাথরের কড়া দেখাল দুখিরামকে। আঙুল দেখাল দশটি। দুখিরাম হাসি মুখে বলল ‘আরে আমি পুরী গেছি বাইশ বার আর দীঘাতে অন্তত বার দশেক, আমাকে বুদ্ধু পায়া হায়? ভাট বকো না – আমি তিরিশ ভাটের থেকে এক পয়সা বেশি দেবো না’। আঙুল দেখাল তিনটি। সে লোক নিজের ভাষায় বিস্তর কাঁদুনি গেয়ে আঙুল দেখাল ছটি । দুখিরাম আবার হাসল চওড়া করে এবং বলল ‘দেখো তোমার ও থাক আর আমার ও থাক – চল্লিশ’। আঙুল বের করল চারটি। ব্যাস হস্তান্তর হয়ে গেল। ওই পাথর বালা দুখিরামের কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখল হলই বা বিদেশ – আমাদের বাঙলা ভাষা যাদু জানে।

বুদ্ধ এবং তার আশ্রয় অর্থাৎ প্যাগোডা সে দেশে প্রচুর – পাটায়া, চিয়াং মাই, চিয়াং রাই – সব স্থানেই নব নব রূপে তার প্রকাশ। তাঁর বাসস্থান কখনো সাদা, কখনও কালো, নীল, লাল। মুর্তি রয়েছে এক ইঞ্চি থেকে সাত তালা বাড়ির সমান। আমাদের জন্মভূমিতেও বড় কম নেই। কিন্তু দুখিরামকে অভিভূত করেছে sanctuary of truth. মাত্র ১৯৮১ সালে এর নির্মাণ শুরু হয়। শ্রী ভিরিয়াফ্যান্ট এর মগজের তাঁতে বোনা পরিকল্পনা – অভ্রলেহী – ইস্পাত বর্জিত – সম্পূর্ণ সেগুন কাঠের তৈরি এবং এখনও যার কাজ সমাপ্ত হয় নি। কি অসামান্য দারুময় শিল্প কর্ম। সেই কারু শিল্পের চারুতায় স্তব্ধবাক্ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তার সামনে। দুখিরামের দাদা কম করেও হাজার ছবি নিয়েছেন সেই স্থাপত্যের । দুখিরাম তো বাঁশ বনে ডোম-কানা।

পাটায়ায় আপনারা শুশুক Show দেখবেন নিশ্চয়ই। মানুষ কি অসাধ্য সাধন করতে পারে, চাইলে মনের কথা বোঝাতে পারে জলের প্রাণীকেও এ এক গভীর বিস্ময়। শুশুক যেন স্ফূর্তির প্রতি মূর্তি। নাচন কোদন, লম্ফ ঝম্ফে অদ্বিতীয়। আবার তারা অভিনয় জানে , জানে অভিমান ও। দুখিরামের বিচ্ছিরি চেহারা দেখে – জলের উপর দাঁড়িয়ে ডাক ছেড়ে যেন হাসল ও কয়েকবার। দুখিরাম বাক্যহীন ! হয়ত আপনি ও তেমন হতে পারেন।

আর একটি ঘটনা নাড়া দেবার মত। সন্ধ্যার সাগর তীরে একদিকে চার / পাঁচটি স্বচালিত হুইল চেয়ারে আসীন মার্কিন সাহেবরা খুব হাসি ঠাট্টায় মজে আছে। এই বিয়ারের গ্লাস উঠল উপর, তারপরেই হিম ক্রিম। সকলেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী কিন্তু একটি বা দুটি পা নেই। কৌতূহলী দুখিরাম খোঁজ নিয়ে জানলো এরা সবাই ম্যারিকান সৈনিক, যুদ্ধে অঙ্গ অর্ঘ্য দিয়েছে। কিন্তু দমে যায় নি মোটেই। হুইল চেয়ার সঙ্গী করেই তারা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়েছে আর ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশে-বিদেশে। সর্বাঙ্গ সুন্দর দুখিরামদের দীঘা যেতেও দুশো অসুবিধে হয় আর এরা ……। এদের সাতটি মহাদেশের সেলাম।

দিনের শেষে ‘কি পেলাম’ ভাবে মানুষ মাত্রেই। থাইল্যান্ড – বিশেষত পাটায়া ভ্রমণ কি শেখাল দুখিরামকে? প্রাচ্য জন্মাবধি ত্যাগের দোহাই দিয়ে ভোগকে দুঃচ্ছাই করে, তা বোধহয় করা ঠিক নয়। নাম জীবনে আমরা সবাই এসেছি দৈব পিকনিকে। এই অনন্ত যাত্রা পথের প্রতি মুহূর্তকে উপভোগ করা চাই। রেলের কামরায় আমাদের জন্ম। অবসর একটি বড় ধরনের জংশন, তিন ভাগ দৌড় শেষ এক ভাগ বাকি। কিন্তু নামবার আগেই নেমে পড়া নয়। এই পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা রূপ – রস – গন্ধকে আমূল অনুভব করার আনন্দ বাকি রয়ে গেছে। দায়-কর্তব্য অনেক হল। বাকিটা নিজের বা দুয়ের জন্যে বাঁচা যাক। আমাদের সভ্যতার বেড়ি বেজায় শক্ত, তাকে ছেঁড়ার কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু আইন বাঁচিয়ে, ভব্যতার পালিশ যথাযথ রেখে যে চিত্ততোষ লাভ করা যেতে পারে, তাকে ঝুলি ভরে নেওয়া যাক। প্রয়োজনে চার্বাক পন্থাতেই। এক অখ্যাত কবির নিকৃষ্ট বন্দিশ বলছে –

‘হেসে খেলে নাও রে চাঁদু মনের সুখে, কে জানে কে যাবে কবে শিঙ্গে ফুঁকে’।

থাই ভাষা ধার করে দুখিরাম বলে ‘কপ খুন ক্রাপ’, এর মানে কাউকে খুন করা নয় – সোজা সাপটা ‘ধন্যবাদ’। তবে সে দেশের অবর্ণনীয় নৈসর্গিক টান – বাঙলা গানের বাঁশির মতোই খুন করতে পারে। একটু রেস্ত পুঞ্জিভূত হলেই হয়ত বাকি আদ্ধেকটা দেখতে যাবে দুখিরাম।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
2 months ago

যে রচনাটি বিদেশ ভ্রমণের ইতিবৃত্ত হতে পারত, রসিক মন আর সরস কলমের কুশলতায় শৌভিক বাবু সেটিকে উপভোগ্য একটি রম্যরচনার রূপ দিয়েছেন। তাঁর কলম দীর্ঘজীবী হোক।

Debasis Sarkar
Debasis Sarkar
2 months ago

চমৎকার হয়েছে। অননুকরণীয় তোমার নিজস্বতা ফুটে বের হচ্ছে ছত্রে ছত্রে। ছোট্ট একটি আপত্তি জানিয়ে রাখা ভালো। এখনকার নতুন ষ্টাইল হচ্ছে ( বাংলায় রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুরু করা, কবি রবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর… হাত রেখেছিলেন কিনা!) বিতর্কিত হবার জন্য (?) গুণের বিচার না করে, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নিজস্ব মতামত জারি করা। “সত্য নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা” বিষয়ে যিনি নিজেই বক্তব্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন, তাঁর সম্পর্কে তরল (যাহা মোটেও সরল নহে!) উপলব্ধি ব্যক্ত করা রুচিকর নয় (কেউ কেউ গূঢ়ার্থ না বুঝেই, বা:বা: ব্রেশ, ব্রেশ করলেও!)….. ওগুলো ছাত্র বয়সের চাপল্য মাত্র। এই বয়সে পৌঁছে বক্রোক্তি, সমাজ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে অনেকের মনের দরজায় আঁচড় কাটতে পারে। অতএব, সাধু সাবধান। ছাপানোর আগে সম্পাদনার দাবী রাখে।

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x