
“দেখি তো পেপার্সগুলো! এক্সামটা কেমন হল?….. এ কী! খাতায় এসব কী লেখা! ‘আই লাভ শ্রেয়সী‘……মানে? পাশে আবার দুটো হার্ট আঁকা। বলি এসব হচ্ছেটা কী?”
স্টাডি রুমে বসে সবে অফিসের ফাইলগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেছি। গিন্নীর আচমকা চিৎকারে পিলে চমকে যাওয়ার জোগাড় আর কী….!
ডাবলু স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া দাওয়া করে এখন একটু কার্টুন দেখছে, ওর প্রিয় গোপাল ভাঁড়।

গতমাসেই ছিল হ্যাপি বার্থডে। ছয় পেরিয়ে সাতে পড়ল।
স্কুলের মান্থলী ইভ্যালুয়েশন পরীক্ষা। ক্লাস ওয়ান। আজই শেষ হল। প্রত্যেক মাসে মাসে হয়। ঢিলেমির কোনো জায়গাই নেই। প্রত্যেকটা মার্কস যোগ হবে ফাইনালে। তা একদিকে ভালই। আজ ক্লাস টেস্ট তো কাল প্রজেক্ট ওয়ার্ক। সারাবছর মোটামুটি একটা অভ্যাসের মধ্যে থাকায় টার্ম এক্সামগুলোতে অতটা চাপ অনুভব হয়না। যত না ডাবলুর, তত বেশি তার মায়ের। ভাল আর এক দিকেও। সারা বছর তো দেদার মজা চলতেই থাকে। এই উইকএন্ডে মামাবাড়ি তো পরেরটায় দাদাইয়ের বাড়ি। ওখানে আবার দেদার হুল্লোড়! দাদাই, ঠাকুমা জেঠু, জেম্মা, বনি পিসি, তাতি কাকা! আবার দাদাইয়ের কাছে টিউশনে আসা কত্ত দাদা দিদিরা! এদিকে, বাবা মায়ের বন্ধুদের আর নিজের বাড়িতে আবার আজ নয়তো কাল, আড্ডা-গল্প-আসর লেগেই আছে। ছোটু দাদা, বিলু দিদি, তিন্নি দিদি, বাচ্চু, বিচ্ছু ওদের সাথে অফুরান মজা পার্টির সময়।

দেখতে দেখতে কখন যে সময়টা হুশ করে কেটে যায় ডাবলু কিছতেই বুঝতে পারেনা। তো এইসব আমোদ আহ্লাদ করতে গিয়ে দু ‘একটা পরীক্ষা কোনও ভাবে খারাপ হলেও তার খুব একটা হেরফের ফাইনাল রেজাল্টে সেভাবে পড়েনা। ভালমন্দ মিশিয়ে ঠিক একটা খাড়া হয়ে যায় অ্যানুয়াল প্রগ্রেস রিপোর্টে।
কিন্তু, তা বলে স্কুলের খাতায় আই লাভ ইউ? তাও আবার আনসার শীটে?
হ্যাঁ, তাই তো! লাল কালি দিয়ে গোল করে সার্কেল করা জায়গা টা!
“হ্যাঁ রে ডাবলু, এদিকে আয় তো…..” এই বলে গিন্নীর হাতে টিভির রিমোটে পলকের মধ্যে গোপাল ভাঁড় অন্ধকারে মিশে যায়।
“চুপচাপ বস্ এখানে। এবার চুপটি করে এই উত্তরগুলো ঝটপট লিখে ফ্যাল দেখি। ইওর টাইম স্টার্টস নাও…….।”

এদিকে ডাবলু তো আকাশ থেকে পড়েছে! একটু আগেই তো দেখলো মায়ের আজ কী ভাল মুড! স্কুল থেকে ফিরেই যখন জানালো যে আউট অফ টোয়েন্টি আজ ও নাইন্টিন পেয়েছে, মনে হল, দিনটা পুরো ওর। প্রথমে কার্টুন স্নানের আগে অবধি, তারপর লাঞ্চের আগে মার্ভেল কমিকসের পুতুলগুলো নিয়ে একটু যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। ফ্ল্যাটবাড়ির এককোণায় এক চিলতে কিচেন ব্যালকনিতে ডাবলু’র জন্য স্পেশাল করে বানিয়ে দেওয়া ‘অ্যাকুয়াটিকায়’ হৈ হৈ করে স্নান। সারাটা দুপুর আজ আর কোনও ঘুম-টুম নয়। যাক বাবা! বাঁচা গেছে! আজ তাহলে, পুরো দুপুর ধরে সবথেকে প্রিয় খেলা, মানে ইঞ্জিনিয়ারিং টুল সেট নিয়ে খুটুর-খুটুর। এটা ওর সবথেকে মনের জিনিস। আর কী নেই ওর টুল সেটে? ছোট-বড়-মাঝারি নানান ধরণের স্ক্রু-ড্রাইভার থেকে শুরু করে রকমারি রেঞ্চ, স্প্যানার, প্লায়ার্স, ইলেকট্রিক সুইচ, ছোট টর্চ, হাতুড়ি, ছেনি, বাটালি, আরো কত কী! খুঁটিনাটি অনেককিছু যেমন স্ক্রু, নাট-বোল্ট, মেজারিং টেপ, স্কেল, পেরেক ফেভিকুইক- এগুলো রাখার জন্য আলাদা একটা বক্স। ইলেকট্রিক-প্লাম্বার-কারপেন্টার কাকুরা আবার প্লায়ার্সকে ‘প্লাস’ বলে, এটাও জানে সে। ওদের সাথে আবার ডাবলুর ভারি বন্ধুত্ব। কেন যে বাড়ির জিনিসপত্তর কলকব্জাগুলো প্রতিদিন খারাপ হয়না! প্রথম থেকে শেষ অবধি এটা কী, ওটা কী, কেন, কী ভাবে – প্রশ্নবাণ চলতেই থাকে অবিরাম। কোন টুলস-এর কী নাম, কী কাজ সব ওর জানা হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই।ওদের ঝুলিতে রাখা একটাও যন্ত্রপাতি নেই যে ও চেনেনা। কাকুরাও অবিশ্যি বেশ উপভোগ করে ডাবলু’র সান্নিধ্য। ওরা তো উঠতে বসতে হামেশাই বলে, ভাগ্যিস ডাবলু’র মত একটা চটপটে স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট পেয়েছে। আর বলবেই না কেন শুনি? আগাগোড়া এটা ওটা এগিয়ে পিছিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে টুকিটাকি হেলপিং হ্যান্ড সবেতেই ও হাজির।

এদিকে প্রতিদিনের মত আজও বিকেলে পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চু বিচ্ছুর সাথে চলবে জমিয়ে খেলা। আর সন্ধ্যেবেলা মাঠে গিয়ে অনেক বন্ধুদের সাথে দৌড়াদৌড়ি আর হুটোপুটি। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই ও ঠিক করে রেখেছিল মোটামুটি আজকের কর্মসূচি।
“ফাইভ মিনিটস মোর…. ” মায়ের গম্ভীর সতর্কবার্তা।
“এই তো মা! ডান্ – দ্যাখো। এবার দাও দেখি আমার গোপাল ভাঁড়। আই মিস হিম ভেরি মাচ”
“এ কী ! এই আনসার আর স্পেলিংটা তো আমি তোকে শেখাইনি। তা হলে, এক্সাম পেপারে কী করে লিখলি? নিজে নিজেই লিখলি নাকি……”
“আরে ঐ তো। আজ আমি শ্রেয়সীর পাশে বসেছি না! ওই-ই তো আমাকে হেল্প করেছে। আমাকে ডেকে ডেকে দেখিয়েছে। বললো, তোকে আর কষ্ট করে ভাবতে হবে না। আমারটা দেখেই লেখ। এগুলো সব ঠিক। তাই আমিও আর সময় নষ্ট করলাম না, ঝটপট লিখে ফেললাম। কেমন মা, কী রকম দিলাম বলো….? আর জানো তো…………..”

আরো কী সব যেন বলতে যাচ্ছিল। চোখ কপালে, হাত তুলে থামিয়ে গিন্নী জিজ্ঞাসা করে, “আর এই লেখাটার মানে, এই আই লাভ ইউ? এটা?”
“বা…রে! শ্রেয়সী আমাকে এতো হেল্প করল! ও তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড! পরের এক্সামে আমিও ওকে হেল্প করব। বন্ধুরাই তো একে অন্যকে হেল্প করে তাই না মা? আ ফ্রেন্ড ইন নিড ইস আ ফ্রেন্ড ইন্ ডিড…. তুমিই তো শিখিয়েছো”

পাশের ঘরে বসে অফিসের হিসেব নিকেশ তখন বিশ বাঁও জলে। আপাতত পেটে খিল দেওয়া হাসি থামাতেই হিমশিম খাচ্ছি আমি।