
অ্যালার্ম ক্লকটা কি আজ বড্ড তাড়াতাড়ি বাজল? তা-ই বা কী করে হয়? কাল রাতে শুতে শুতে সত্যিই তো কত দেরি হয়ে গেল। প্রায় দুটো। প্যান্ডেলের কাজ আর বাকি ডেকোরেশনগুলো যে এত সময় খেয়ে নেবে কেউ ভাবতেই পারিনি।
বাইরে তখনও অন্ধকার। স্ট্রিট ল্যাম্পগুলো দিব্যি জ্বলছে। পাড়ার অলিগলির অতন্দ্র প্রহরী সারাবছরের বিশ্বস্ত সাথী লালু-ভুলু কালুর দল সারারাত ডিউটি দিয়ে শেষরাতে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। না, না। বেশি দেরি করলে হবেনা। চোখ দুটো ব্যাপক কটকট করে জ্বালা করছে। সারাদিন ঠা-ঠা রোদে ঘুড়ি ওড়ানো। তার ওপর রাত জাগার ফল, আর কী! সকাল থেকে দুপুর হয়ে বিকেল অবধি পুরোটাই তো কেটে গেল সুতোর মাঞ্জা দিতে গিয়ে। বাবলু-বিশু-ভজা-পাপাই-ভোম্বলদের বারবার বলেছিলাম ভাই, চল দুদিন আগেই এসব ঘুড়ি-সুতোর কাজগুলো সেরে রাখি। তাড়াহুড়োর মাথায় শেষমেশ বাল্ব গুঁড়ো করতে গিয়ে বেচারা বাবলুর হাতটাই গেল কেটে বিচ্ছিরিভাবে। আমারও তো ভাত খেতে গিয়ে নুন ঝোলে আর জলে হাতটা চিড়বিড়িয়ে উঠছে থেকে থেকে। ব্যান্ডেড দিয়ে ম্যানেজ করেও নেব বটে, ও নিয়ে অবিশ্যি চাপ নেই। চোদ্দ-নম্বর রেল গেটের সামনে গৌতমদার দোকানে কি ভিড় গেল কালকে! ভাগ্যিস আমরা পুরনো খদ্দের ওর। আগে থেকেই আলাদা করে রাখা ছিল সিঙ্গল-ডাবল লেজের ঘুড়ির বান্ডিলগুলো। চাঁদিয়াল-পেটকাটি-মোমবাতি-মুখপোড়া-ময়ূরপঙ্খী-গলাকাটা-চাপরাশ-বলমার-ভেরিয়ালগুলো গুনে গুনে রাখা ছিল এক কোণায়।আর আমরা ছয় বন্ধু নিলাম দুটো করে “একতে” আর “দুইতে” ঘুড়ি। বড্ড দাম ওগুলো। বেশি নিলে বাজেটে বসবে না।

না। দাঁত মাজব ফুল তুলে ফিরে এসে। ফুল তোলা তো না, চুরি করা। কী যে বলি, চুরি করা থুড়ি! বাণীবন্দনার প্রয়াস আর কি। ছিঃ ছিঃ! ভাল কাজে ঐভাবে মন ছোট করতে নেই কক্ষনো। যাই হোক, আশু দাদুর বাগানের স্থলপদ্ম আর গন্ধরাজ আজ যেকরেই হোক বাগাতেই হবে এবার। যেকোনও মূল্যেই। আশু দাদু ঘুম থেকে ওঠার আগেই। কিন্তু কী করে যে পাশের পাড়ার বিল্টুদা আর ওর দলের কু-নজর পড়ে গেল ওই বাগানটায়! গতবছর ওরা এসে আগেভাগেই সব সাফ করে দিল আর পুরো বকুনির ঝাড়টা খেলাম আমরা ছোটরা। এ-বছর সেটা উশুল করে নিতে হবে কড়ায়গণ্ডায়।
বাড়ি থেকে এই কয়েকদিন অবাধ ছাড়। এমনকী, বাড়ি-বাড়ি গিয়ে চাঁদা তোলাতেও ‘নো আপত্তি’।

পুজোর আগের দিন সন্ধ্যে হতে না হতেই প্রতিমা আনার প্রস্তুতি। সাথে কাঁচা বাজার, ফল-মূল-দশকর্মা। পেলু আর বিশ্বনাথ আবার বাপ্পাদা-বান্টিদাকে নিয়ে ছুটল লাস্ট মিনিট সাজেশনের মত পাড়ার পেন্ডিং চাঁদাগুলো কালেকশন করতে। হায় রে! আমাদের কপালে সাঁটানো ‘পুঁচকে’ ‘ছোঁড়া’ তকমাগুলো যে কবে মুছবে! তবে, পাঁচ টাকার কমে চাঁদার রিসিট মিলবেনা – বাপ্পাদার এই কায়দাটা চাঁদা তোলায় বেশ কাজে দিয়েছে এবার। বিল বইয়ে এবছর দশ-বিশের ছড়াছড়ি। পঞ্চাশ-একশোও মুখ ফেরায়নি। “লক্ষী” যেন বোনের সাথে সাথে হাতে হাত ধরে এই মাঘে বিচরণ করছেন আমাদের পাড়ায়। ”টাচ উড”।
এদিকে কাজ যেন শেষই হয়না। পিল্টু কাকু ওর লাইটিংয়ের রসদ নিয়ে হাজির বিকেলের গোড়ায়। এবছর মোড়ের এ-মাথা থেকে ও-মাথা অবধি পুরো টুনি আর বাল্ব এ মুড়ে থাকবে পাড়া। আর একটু পরপর টিউবের মালা। ওর একমাত্র ভাইপো আমাদের অভিদা ইউপিএসসি ফাইনালে লাগিয়েছে এবার।
তাই পুরোটাই পিলটুকাকু নিজে স্পনসর করছে। আমাদের জন্য ‘বাসন্তী গিফট’ ওঁর তরফ থেকে। ওদিকে আবার সজলদা-কে ফিল্ডিং করছি গত একমাস ধরে। মণ্ডপের সামনে মেগা আলপনাটা ওকে ছাড়া ভাবাই যায়না। আর্ট কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে উঠল এবছর। সারাদিন কলেজ করার পর এদিক সেদিক এই অনুষ্ঠান ওই উৎসব এসবের মধ্যেই পড়ে আছে দিনরাত। শিল্পী মানুষ বলে কথা! আজ ভোরেই নামিয়ে দেবে পেল্লাই আলপনাখানা। স্রেফ ঘন্টাখানেকের ব্যাপার নাকি। আজকের বিশেষ দিনে ওকে আবার অ্যাসিস্ট করতে আসে ঝুমাদি-টিনিদি-মিঠুদিদের গুলাবী গ্যাং। যদিও সজলদা একাই একশো, কিন্তু সেদিন দেখি দিব্যি কোনও কিছুতেই ‘না’ কিংবা বিরক্তি নেই ওর। চিরকাল দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা চরম আলসে শঙ্কুদা-বিশ্বদা-দেবাশিসদারাও সেদিন কোন এক না দেখা হ্যামলিনের বাঁশির টানে ঠিক জড়ো হয়ে যায় মণ্ডপের সামনে। স্রেফ এক ঘণ্টার ‘মামুলি শিল্প’ যে কখন দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ কঠিন মহান শিল্পে মোড় নেয়, সে আর কেউ না হোক আমরা ‘সিঙ্গল রেডি টু মিঙ্গলরা’ হাড়ে হাড়ে টের পাই বইকি।
যাক ফুল তোলা শেষ। এবার বাড়ির পুজোটা সময়মত নামিয়ে দিলেই ব্যাস। আমাদেরই সমবয়সী ভোম্বল আবার খোকাপুরুতমশাইয়ের ভাইপো। গতবছরই যজমানিতে হাতেখড়ি হয়েছে। একদিনের চটজলদি ইনকামে ঘুড়ি সুতোর খরচাটা আরামসে উঠে আসে একবেলার ডিউটিতে। সাথে বিপুল ফলাহার দই মিষ্টি প্রাপ্তি। এবারেও বাড়ির পুজোটা ওকে দিয়েই সারব। যাই, ওর বাড়ি গিয়ে হাইজ্যাক করে নিয়ে আসি। উফ্। তার আগেই এই কনকনে শীতে স্নান করতে হবে। ভাবলেই হাড় কাঁপুনিটা আরো বেড়ে যায়। গ্যাসের উনুনের জলটা যেন গরমই হয়না- এই শীতের সকালে।
এবার আমরা জুনিয়র টিম ঠিক করেছি সকাল বেলায় সবাই মিলে ধুতি-পাঞ্জাবি পরবো।
বাড়ির পুজো শেষ। এবার ক্লাবের পালা। বাঃ মোটামুটি সবই প্রায় ফিনিশিং-এর পথে। আরে! বাগদেবীর হাতে স্পেশাল চাঁদিয়ালটা কোথায় গেল? আরে ও ভজা কোথায় রাখলি…..?
আলপনা ততক্ষণে শেষের পথে। তবে, শেষ নেই আলাপচারিতার। সিনিয়র দাদা দিদিরা তখন যতটাই ‘ব্যস্ত’ তার থেকেও বেশি সিরিয়াস জমাটিয়া বৈঠকে।
অঞ্জলিটা সেরে পুজোর শেষে প্রসাদ বিতরণ হয়ে গেলে এবার আর দেরি নয়। চাটুজ্জে দাদুদের প্রকান্ড তিনতলার ছাদটা ঐদিন আমাদের হেফাজতে। কোনও ঝুঁকি নেই অবিশ্যি। চারিদিকে লম্বা উঁচু দেওয়াল। তবে আকাশে ‘যত পারো কেরামতি’ বিকেল তিনটের মধ্যেই সেরে ফেলতে হবে। দুটো বাড়ি পরে ননী কাকু আকাশের মাঠে নামার আগেই। উফফ কি সাংঘাতিক ঘুড়ির প্যাঁচ খেলেন উনি। আশপাশ পুরো সাফ হয়ে যায় ঘন্টাখানেকের দাপটে।

নিচে শেষবারের মত হাঁক মেরে যায় বিশু-ভজা-বুড়োরা। নেমন্তন্ন রক্ষা করতে যাওয়ার গুরুদায় ওদের আজ। আর বেছে বেছে গার্লস স্কুলগুলোতেই। গতবছর শাড়ির সাথে এক ললনার মালার খোঁপার ম্যাচিংটা দেখে মনটা আমার যেন কীভাবে একটু আনমনা হয়ে গেছিল। ব্যস! আর যায় কোথা। গোটা বছর ধরেই শুনতে হল সেই গঞ্জনা। কিন্তু মোল্লার দৌড় মসজিদ অবধি। ওই চোখাচুখিতেই শুরু আর ওখানেই শেষ। নামটাও জানা হয়নি। ন্যাড়া বেলতলাতে একবারই যায়।
আরে আরে…..! পেট কাটিটা কোত্থেকে গোত্তা মেরে ঢুকে গেল রে? আর কোনও রাস্তা নেই। মার মার মার ঘাড়ে চাপ মার উল্টে। ছেড়ে খেল, ছেড়ে খেল……..ঢিলে আরো ঢিলে …..ভো…. ও…. ও…. ও….. কাট্টা আ-আ-আ–আ
অনতিদূরেই ভোরবেলার আজানে ঘুমটা ভেঙে যায়। স্বপ্ন নয়। সত্যিকারের যেন মনে হয় এক্ষুণি কি না ভাঙলেই নয়? ঘুমটা যেন বড্ড কাঁচাই ছিল আজ।
চমৎকার গল্প এরকম আরো লেখা পড়তে চাই।
ধন্যবাদ।
অবশ্যই। আরো ভাল অনুভূতি ভালোলাগা ভাগাভাগি করে নেওয়ার ইচ্ছে রইল।