শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

তাঁর জীবনের প্রায় সবটাই কেটেছে বাংলার বাইরে – বিহারের পূর্ণিয়ায় । সাহিত্যে খ্যাতিলাভের তেমন কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল বলে মনে হয় না। বরং রাজনীতিতে অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন, তরুণ বয়স থেকেই জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজনৈতিক আন্দোলনে। তবু সতীনাথ ভাদুড়ীর প্রথম উপন্যাস “জাগরী” তাঁকে লেখক হিসেবে সফলতার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল। লেখক, সমালোচকদের অকুণ্ঠ অভিনন্দন এবং প্রথম রবীন্দ্র-পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিল এই গ্রন্থ, যা যে-কোনও সাহিত্যিকের পক্ষেই এক দুর্লভ স্বীকৃতি।

“জাগরী” উপন্যাস গত শতাব্দীর বিয়াল্লিশের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বন্দীদের কারাবাসের এক বেদনাময় ছবি। সেই কারাগারের অন্ধকারে নানা পথে প্রবেশ করে বৃহত্তর জীবনের রশ্মিরেখা । একদিকে যেমন এই রচনা গভীর রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ, তেমনই রাজনীতির মতবিরোধ একটি পরিবারের ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়তার সম্পর্কে কী নিদারুণ ফাটল ধরাতে পারে, তারই করুণ কাহিনী- যা লেখক শুনিয়েছেন চারজন মূল চরিত্রের আত্মকথনের ভঙ্গিতে। এই দ্বৈত ভাব উপন্যাসটিকে সাহিত্যকীর্তি হিসেবে অমরত্ব দিয়েছে।

আমি প্রথমবার “জাগরী” পড়েছিলাম স্কুল জীবন শেষ হওয়ার অল্প কিছুদিন পরে। বলাই বাহুল্য, এমন লেখার সম্পূর্ণ রসগ্রহণ করার বয়স সেটা নয়। তবুও এই উপন্যাস আমার শেষ কৈশোরের বেশ কয়েকটি নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নকে বেদনাবিধুর করে রেখেছিল। বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক দু’ দিক থেকেই এই লেখাটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কীর্তি; এর লেখক মানসিকভাবে এক ভিন্ন জগতের অধিবাসী। বাংলার ক্ষণজন্মা অন্যান্য সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ না থাকলেও মিল নেই।

ইতিহাস বইতে পড়া বিয়াল্লিশের আগস্ট আন্দোলন তার নৈর্ব্যক্তিক আবরণ সরিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে “জাগরী”র পৃষ্ঠায়। ….১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে যখন সমগ্র ভারতবর্ষ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল, বহু মানুষ কারারুদ্ধ, পূর্ণিয়া জেলার এক শ্রদ্ধেয় গান্ধীবাদী নেতা ও তাঁর স্ত্রীও সেসময় পূর্ণিয়া সেন্ট্রাল জেলে বন্দী। সেই জেলেরই condemned cell এ আসন্ন ফাঁসির সাজার জন্য অপেক্ষারত তাঁদের বড় ছেলে বিলু। তার ছোটো ভাই নীলু কারাগারের বাইরে, সে কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়া ব্রিটেনের পক্ষ অবলম্বন করার ফলে ভারতবর্ষে কম্যুনিস্ট পার্টি “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনে যোগদান করে নি, এই তথ্য ” জাগরী ” উপন্যাসে একান্ত প্রাসঙ্গিক। আন্দোলনে তথাকথিত নাশকতামূলক কাজকর্মে জড়িত থাকায় বিলু ও অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে যে সরকারি মামলা হয়, তাতে নীলু – হয়তো নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণেই- তার দাদার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় । মামলার রায়ে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয় বিলু ।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য ফাঁসি হয়নি বিলুর । অনির্দিষ্ট কালের জন্য তা স্থগিত হয়ে যায়। সংবাদটি আমরা জানতে পারি গল্পের একেবারে শেষে, ছোটো ভাই নীলুর জবানিতে । তার অকৃত্রিম আনন্দের উচ্ছ্বাস দিয়ে সমাপ্ত হয় এই কাহিনী।

কিন্তু ফাঁসির আগের আশংকায় ভরা রাতটি চারজনের কেমন কেটেছিল তা সহজেই অনুমেয়। অন্তরঙ্গ আত্মীয়তায় আবদ্ধ কিন্তু নিঃসঙ্গ চারজন মানুষ সেই রাত্রির দুঃসহ অন্ধকার থেকে ফিরে তাকায় তাদের অতীতের দিকে। যে অতীত ক্ষমাহীন বর্তমানের কাছে কত স্নিগ্ধ ও সান্ত্বনাময়। একটি রাতের কালো কষ্টিপাথরে তাদের সমগ্র জীবনকে বিচার করে তারা ।

উপন্যাসটি সতীনাথ ভাদুড়ী লিখেছিলেন ১৯৪২ সালে রাজবন্দী হিসেবে ভাগলপুর সেন্ট্রাল জেলে থাকার সময়ে, জানিয়েছেন তাঁর দীর্ঘকালের সহযোগী ও স্নেহধন্য, ওই জেলে তাঁর সহ-আবাসিক ফণীশ্বরনাথ রেণু। একথা সত্য যে “জাগরী” বহুলাংশে আত্মজৈবনিক রচনা, বিলু ও তার বাবা – এই দুজনের চরিত্রেই আমরা সতীনাথ ভাদুড়ীর অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধের ছায়া দেখি। ছাত্রাবস্থা থেকেই রাজনীতি তাঁর জীবনের অনেকখানি জুড়ে ছিল। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম. এ পাশ করেন মেধাবী সতীনাথ । পিতা ইন্দুভূষণ ছিলেন বিখ্যাত ব্যবহারজীবী, তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে কিছুদিন ওকালতি করেন; মেধা, সততা ও অসাধারণ ভাষাজ্ঞানের জন্য সমাদৃত হয়েছিলেন পূর্ণিয়ার আইনজীবী মহলে। কিন্তু জনসংযোগের তীব্র আগ্রহে ও দেশের প্রতি ভালোবাসায় তিনি যুক্ত হন স্বাধীনতা সংগ্রামে। বহুদিন পর্যন্ত গান্ধীজীর অনুগামী ছিলেন, সকল বিলাসিতা পরিহার করে চলতেন। বিহারের গ্রামে গঞ্জে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ প্রচারের জন্য নিয়মিত যাতায়াতের সূত্রে যে সব দীনহীন শোষিত মানুষ, অসহায় স্নেহশীলা গ্রাম্য নারীদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় চেনাশোনা হয়, সতীনাথের কাছে তারাই ছিল স্বদেশের প্রতিমূর্তি। “জাগরী”র বিলুও তো এমন সহজ সরল গ্রামবাসীদের কাছের মানুষ বলে জেনেছিল।

দরদী ও ঋজুস্বভাবের কারণে সতীনাথ ভাদুড়ী জননেতা হিসেবেও যথেষ্ট সফল। কংগ্রেসের পূর্ণিয়া জেলার সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৪২ সালে আগস্ট আন্দোলনে কারাবাসের সময়ে তাঁর সঙ্গী ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ ও শ্রীকৃষ্ণ সিংহের মতো বিখ্যাত নেতারা।

ভারতে কম্যুনিস্ট পার্টির আগস্ট আন্দোলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্ভবতঃ মেনে নিতে পারেন নি সতীনাথ। “জাগরী”তে নীলুর একরোখা, কিছুটা নির্মম চরিত্রে এই সিদ্ধান্তের তির্যক সমালোচনা রয়েছে বলে মনে হয়। তবে এই সমালোচনা সমগ্রভাবে বামপন্থার বিরুদ্ধে নয়, কারণ বরাবর সাম্যবাদী ভাবনার প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল।

আসলে সেযুগেও সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো নির্মল মনের মানুষ রাজনীতির অঙ্গনে কিছুটা বেমানান ছিলেন। তাঁর সূক্ষ্ম রুচি ও প্রখর ন্যায় অন্যায় বোধ নিয়ে এ পথে তিনি খুব বেশি অগ্রসর হতে চান নি। ১৯৪৮ সালে, দেশ স্বাধীন হবার অল্প কিছুকাল পরেই তিনি কংগ্রেসের সংস্রব ত্যাগ করেন। তাঁর মনে হয়েছিল, স্বাধীনতা লাভের পরে এদেশে কংগ্রেস দলের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি তাঁর সহানুভূতির ফলে অল্প সময়ের জন্য সতীনাথ Congress Socialist Party র সদস্য হয়েছিলেন।

“জাগরী” উপন্যাস তাঁর স্বাধীনতা-পূর্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ফসল; তবে তার সঙ্গে এই লেখায় মিশে আছে এক প্রায়-অবিচ্ছিন্ন স্মৃতি ও ভাবনার প্রবাহ (stream of consciousness) এবং লেখকের মনোবিশ্লেষণের অসাধারণ ক্ষমতা। তাই চরম সংকটের প্রাক্-মুহূর্তে সামান্য অসামান্য বহু স্মৃতি ও অনুশোচনা নিয়ে বিলু , তার বাবা মা ও ভাই ভুলে থাকতে চায় সেই সংকট, দীর্ঘকালের লালিত কিছু ধারণাকে তত অভ্রান্ত বলে মনে হয় না আর। কোনো আদর্শের জন্য নিজের ব্যক্তিগত সুখ ও আকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলি দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে বিলুর মনে- ” কেবল ফুটবল ম্যাচের টিকিট- ক্রয়ার্থীদের ন্যায় দেশসেবকদের অন্তহীন বিসর্পিল লাইনে নিজের স্থান করিয়া লইবার সুযোগ পাইয়াছিলাম মাত্র।…আমি তেত্রিশ বৎসর বয়সে কুকুর বিড়ালের মতো মরিব । কেহ জানিবে না, কেহ শুনিবে না, কেহ দু-ফোঁটা তপ্ত অশ্রু ফেলিবে না। ” ভাইয়ের প্রতি অপরিসীম স্নেহ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে নীলুর সাক্ষ্য দেওয়াকে সে অন্তর থেকে ক্ষমা করে না – ” সেই নীলু, সেই একরত্তি হাফপ্যান্ট পরা ক্যাপ্টেন নীলু, … সেই দাদা বলিতে অজ্ঞান নীলু- সে কিনা আমার সঙ্গে এই ব্যবহার করিল! …এত ঘৃণ্য পরিবর্তন হইয়াছে তাহার মনের! ” মানবিক সম্পর্কের উপরে রাজনীতি জয়ী হবে, সেকথা সতীনাথের মতো তাঁর নায়ক বিলুও মেনে নিতে পারে না । গভীর দুঃখের মধ্যে ১৯৩৪ সালের বিহার ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত গান্ধী আশ্রমের ছবি, প্রতিবেশিনী জ্যাঠাইমার অগাধ স্নেহের স্মৃতি তাকে আনমনা করে দেয়। অনেক বছর আগে বিলু সেই জ্যাঠাইমার সঙ্গে গিয়েছিল তাঁর গ্রামের বাড়িতে , পাবনায়। স্নেহময়ী সেই নারী বিলুকে দেখিয়েছিলেন তাঁর ছোটোবেলার স্মৃতিজড়ানো গ্রামের ঘরবাড়ি , তারপরে বহুকাল আগে যেখানে এক ডাক্তার সাইকেল নিয়ে পড়ে গিয়েছিল দীঘির জলে, সেখানে এসে অনুযোগ করে বলেছিলেন বিলু কেন তাঁকে মা বলে ডাকে না।” নবদ্বীপ ডাক্তারের সাইকেল হইতে পড়িয়া যাইবার স্থান দেখাইবার সময় জ্যাঠাইমার হঠাৎ আমার মা হইবার ইচ্ছা কেন হইল, তাহা আজও ঠিক করিতে পারি নাই।” নির্লিপ্ত কৌতুকের এই অননুকরণীয় ভঙ্গিটি সতীনাথ ভাদুড়ীর নিজস্ব, তাঁর “শুভ্র সমুজ্জ্বল” পরিহাসে চরম ব্যথাও মধুর হয়ে ওঠে।

জেলের আর এক প্রান্তে চরকা কাটার ফাঁকে অন্যমনস্ক হয়ে যান বিলুর বাবা। চিরকাল নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসে অবিচল থেকেছেন, কিন্তু তাঁর দুই পুত্র সেই আদর্শে বিশ্বাস রাখেনি; তাদের প্রতি পিতার দায়িত্ব পালন করেন নি বলে অবশেষে তাঁর আক্ষেপ হয়। পরিচিত একজনের হাত দিয়ে জেলে বড় ছেলে বিলুকে একটি ‘গীতা’ পাঠিয়েছিলেন, বিলু সেই বই অপ্রয়োজনীয় মনে করে ফিরিয়ে দিয়েছে। গর্বিত পিতা ভাবেন “যে নাস্তিক বিলু গীতা ফেরত দিয়াছিল, সেই কিন্তু কর্মযোগের মূলমন্ত্র বুঝিয়াছে, কাজের মধ্যে নিজেকে লীন করিয়া দিয়াছে।” একমাত্র তিনিই মনে মনে নীলুকে কিছুটা প্রশংসা করেন, তার রাজনৈতিক কর্তব্যবোধের জন্য। নীলুর কথা সতীনাথ জানিয়েছেন সবার শেষে, তাঁর দরদী লেখনীতে। তার প্রতি পাঠকের সহানুভূতি নেই, বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশীরও নয় । কিন্তু তার মনের টানাপোড়েন, স্থিতধী আদর্শবাদী স্নেহপ্রবণ দাদার প্রতি তার অকপট ভালোবাসার প্রকাশের সঙ্গে পাঠক একাত্ম না হয়ে পারে না।

“আওরৎ কিতা” পরিচ্ছেদে বিলুর মায়ের স্বগতকথন “জাগরী”র আশ্চর্য সম্পদ। সমাজ ও সংসারে উপেক্ষিত নারীদের অবদমিত মতামতকে এই পর্বে সতীনাথ ভাষা দিয়েছেন। এবং খুব সচেতনভাবেই তিনি এই অধ্যায়টি লিখেছিলেন চলিত ভাষায়। বিলুর মা সারাজীবন ধরে স্বামীর অনুগত ছিলেন, তাঁর গান্ধী আশ্রম পরিচালনার কাজে যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন। স্ত্রী হিসেবে খুব সম্মান পেয়েছেন এমন নয়, আর্থিক স্বাধীনতার তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু জ্যেষ্ঠ পুত্রের জীবন যখন বিপন্ন, তখন স্বামীর অন্ধ গান্ধীভক্তি ও অযৌক্তিক আচরণকে তীব্র বিদ্রূপ করতে দ্বিধা করেন নি – ” দিনের মধ্যে ভাত ছাড়া আর পাঁচটি জিনিস খাব, গোনা পাঁচটা। ছটা খেলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। …তুমি দেশের স্বাধীনতার জন্য সব ছেড়েছ সত্যি – কিন্তু আমাকে তো একটুও স্বাধীনতা দাও নি।” একজন সাধারণ নারীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কত অনায়াসে ও সকৌতুকে পুরুষশাসিত সমাজের মূল দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেন সতীনাথ।

বাংলা সাহিত্যে খুব কম উপন্যাসই “জাগরী”র মতো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সত্যকে বিবৃত করতে পেরেছে। এই গ্রন্থটি ” The Vigil ” নাম দিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন অন্নদাশঙ্কর রায়ের পত্নী লীলা রায়। এর পরেও সতীনাথ লিখেছেন বেশ কয়েকটি উপন্যাস ও অসংখ্য ছোটো গল্প, যার মধ্যে লোকায়ত চেতনায় সমৃদ্ধ “ঢোঁড়াই চরিত মানস ” ছাড়া আর কোনটিই “জাগরী”র তুল্য প্রসিদ্ধি লাভ করেনি। তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসে রাজনীতির প্রসঙ্গ এসেছে। মনে হয় সহজাত প্রতিভা ও অসামান্য পর্যবেক্ষণশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেবল সাহিত্যে কুশলতা অর্জন তাঁর লক্ষ্য ছিল না, সতীনাথ ভাদুড়ীর সাহিত্য তাঁর ইতিহাসবোধ ও রাজনৈতিক দর্শনেরই প্রসারিত রূপ। সাজসজ্জাহীন যে ভাষায় তিনি লিখতেন, তার উজ্জ্বল লাবণ্য সব পাঠকের চোখে সমান ভাবে ধরা দেবে না।

১৯৪৯ সালে সতীনাথ ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য কিছু দেশ ভ্রমণে যান। তারই অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন “সত্যি ভ্রমণ কাহিনী।” স্বল্পপরিচিত এই লেখায় তাঁর রসবোধ ও মনীষার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায়। এই বিবরণের শেষের দিকে সতীনাথ লেখেন, “সে ভাবে যে বেড়াতে তার ভাল লাগে, অথচ সত্যি কথা বলতে কী তার ঘরকুনো মন ভালবাসে বেরুনোর আগেকার নূতন দেশের স্বপ্নগুলো, আর ফিরবার পর বেড়ানোর সময়ের স্মৃতিগুলো। এইগুলোই আসল, বেড়ানোটা অবান্তর। ” …বহু ভ্রমণার্থীর মনের কথা যে নিজের স্বভাবকে নিয়ে ঠাট্টার ছলে তিনি বলে দিয়েছেন, তাতে সন্দেহ নেই।

সদালাপী, বন্ধুবৎসল কিন্তু অন্তর্মুখী সতীনাথ সাহিত্য ছাড়াও আরো বহু বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। তার মধ্যে প্রথম সারিতে অবশ্যই ছিল প্রকৃতি-পর্যবেক্ষণ ও উদ্যান চর্চা। জেলে থাকার সময়ে ফণীশ্বরনাথ রেণুকে সযত্নে দেখিয়েছেন একটি কীটের ক্রমশঃ প্রজাপতিতে রূপান্তর। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের উপহার দিয়েছেন তাঁর প্রিয় অর্কিড ফুল।

আকাশে বাতাসে জনজীবনের অশান্ত স্পন্দন যেখানে মিশে গেছে মনোজগতের নিঃসঙ্গতায়, বাংলা সাহিত্যের সেই সীমারেখায় সতীনাথ আজও রয়ে গেছেন তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে। ছায়াময়, সজীব এক মহীরুহের মতো।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.