
তালপাতার এক বিশাল ছাতি তাঁর মাথায়। মাঝখানের লাঠিটাই ৭/৮ ফুট লম্বা। রোজ টুকটুক করে তিনি হেঁটে আসেন নারকেলডাঙ্গা থেকে গোলদিঘির এই কলেজে। ছাতিটা ধরে থাকেন এক ভৃত্য। চালচলনে, কথার ধরণে, পরিচ্ছদে এক্কেবারে দেশীয় গ্রাম্য পণ্ডিত!
তিনি জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন!
সময়টা ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝির দিকে। নবন্যায়ের অভিঘাতে চিরন্তন ন্যায় তখন কোনঠাসা। ন্যায়শাস্ত্রে সত্যিকারের সুগভীর পণ্ডিত কোলকাতার আশেপাশে মেলা ভার। যা আছে তা সস্তা চালাকির পল্লবগ্রাহী পাণ্ডিত্য। তার মধ্যেই তিনি এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
সংস্কৃত কলেজের থেকে তাঁর টোলের পাঠক্রম অনেক বেশি কঠিন। মুক্তাবলী সমেত ভাষা পরিচ্ছেদ, গৌতমসূত্র ও নৈষধ পূর্বভাগ ছাত্রদের ১ম বছরেই শেষ করতে হত। বীরসিংহের ঐ খর্বকায় জেদি একগুঁয়ে ছাত্রটাও তাঁর কাছেই ন্যায়শাস্ত্র শিখেছিলেন।
গোলদিঘির এই কলেজ আর ঐ হিন্দু কলেজ —বাংলার শিক্ষায় তখন দুই সমান্তরাল বহতা। পরিচালনা, সিলেবাস, শিক্ষকদের যোগ্যতা, ছাত্রদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, সবেতেই হিন্দু কলেজ পাশ্চাত্যের আলো গায়ে মেখে আধুনিক ও বিত্তবানদের প্রতিনিধি। সেখানে পড়ার অধিকার জাতিধর্মনির্বিশেষে সবার। আর গোলদিঘির সংস্কৃত কলেজ তখনো জাপটে রয়েছে প্রাচ্যের আলো ও অন্ধকার! ভারতীয় দর্শন, ন্যায় ও সংস্কৃত ব্যাকরণ পড়তে ভর্তি হতে পারেন শুধু ব্রাহ্মণ ও বৈদ্যরা।
ওদিকে গোলদিঘি আর দুই কলেজের আবহ ছুঁয়ে জয়নারায়ণের এক কিশোর ছাত্রের চোখে তখন এক মায়াঘোর। তাঁর কৈশোরের বোধগম্যতায় একটু একটু করে প্রকট হচ্ছে ঔপনিবেশিকতার হাত ধরে উঠে আসা এক নতুন শ্রেণিবৈষম্য। যা বীরসিংহের মতো অজ পাড়াগাঁয়ের জাতপাতের বৈষম্য থেকে অনেকটাই আলাদা!
গোঁড়ামো কোথায় থাকে? মনের কোণের অন্ধকারে? না বাইরের চালচলন, পোশাক আর পাঠ্যবিষয়ের নির্বাচনে? সংস্কৃত ভাষা, প্রাচ্য দর্শন , ভারতীয় সংস্কৃতির লগ্নতা মানেই কি রক্ষণশীলতা ?
চালচলন, পোষাকপরিচ্ছেদ, ন্যায়শাস্ত্রের গভীরলগ্নতায় জয়নারায়ণ চূড়ান্তভাবেই তো ভারতীয় ছিলেন!

এহেন জয়নারায়ণ একদিন ন্যায় পড়াতে পড়াতে দীর্ঘদিনের আহরিত জ্ঞান থেকে বলে বসলেন “বায়ুর ওজন নাই”। একটা ছাত্র বলে বসল “পণ্ডিতমশাই, বায়ুরতো ওজন আছে।” জয়নারায়ণ তথাকথিত ব্যক্তিত্বের ভড়ং , শিক্ষকের মহিমান্বিত অবস্থানের সুযোগ আর গাম্ভীর্যের আড়ালে নিজের অজ্ঞতা ঢাকার চেষ্টা না করে সত্যের মুখোমুখি হলেন।
—“ তা বাবা, তুমি জানলে কী করে যে বায়ুর ওজন আছে?”
ছেলেটি বিজ্ঞানের পরীক্ষার অনুপুঙ্খ বর্ণনা করল। জয়নারায়ন কয়েক মিনিট চুপ। তারপর মাথায় তালু ঘষতে ঘষতে বললেন“ তা দেখ দেখি বাবা, এই কৃৎকৌশলটা না জানার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের এত বড় সত্যিটা জানাই হয়নি!”
মাঝে মাঝে কবিতা লেখার ঝোঁক ছিল। লিখে কোন কাব্যরসিক ছাত্রকে ডেকে বলতেন “বাবা, একটু দেখতো। দরকারে কেটেকুটে একটু ঠিক করে দাও। কাব্য বিষয়টা তোমরা আমার থেকে ভাল বোঝো যে!”
জয়নারায়ণ একবার কেশব সেন সম্পর্কে বললেন “কেশব অত ঈশ্বর ঈশ্বর করে বেড়ায় কেন? ওসব এদেশে ঢের হয়ে গেছে। যদি বিলিতি কলকব্জা এনে কিছু করবার চেষ্টা করে তাতে বরং দেশের উপকার হয়। ”
কেশব সেন পর্যন্ত তাঁর কথা পৌঁছেছিল কিনা বা পৌঁছলেও তাতে তাঁর ভাবান্তর বা মননান্তর হয়েছিল কিনা জানা নেই। তবে বহিরঙ্গের এই দেশীয় ঐতিহ্যের অন্তরালে যে বহমান এক অন্তর্লীন আধুনিক মনন ছিল, তার উত্তরাধিকার চেতনায়-মননে-বোধে গ্রহণ করেছিলেন ঐ খর্বকায় ছাত্র, ঈশ্বরচন্দ্র।

গুরুরই মতো পোষাক পরিচ্ছদ, দৈনন্দিন জীবনশৈলী, স্বাচ্ছন্দ্যের সহজসরল উপকরণে আর সত্যিকারের দেশপ্রেমে ছিলেন আদ্যন্ত ভারতীয়। অথচ চিন্তাচেতনায় একেবারেই পশ্চিমি এক আধুনিক মানুষ। তার মানব প্রেম আর মননের ভিত্তিভূমি ছিল যুক্তিবাদী পাশ্চাত্য দর্শন। তিনি সচেতনে বা অচেতনে তার প্রয়োজনীয় ভারতীয়করণ করেছিলেন শুধু।
ঈশ্বরচন্দ্র সাংখ্য আর বেদান্তকে ভ্রান্ত দর্শন মনে করতেন। এ বিষয়ে তাঁর মত ছিল-“ ভ্রান্ত হলেও এই দুই দর্শনের প্রতি হিন্দুদের গভীর শ্রদ্ধা আছে। তাই আমাদের উচিত সংস্কৃত পাঠক্রমে এগুলো পড়ানো। একই সঙ্গে পাঠক্রমের ভেতরেই পশ্চিমি খাঁটি দর্শন দিয়ে সেগুলোর বিরোধিতা করা। যাতে সাংখ্য ও বেদান্তের মতো ভ্রান্ত দর্শনের প্রভাব কমে আসে।”
“….That the Vedanta and Sankhya are false system of philosophy is no more a matter of dispute” — ১৮৫৪ য় দূরের কথা ১৫০ বছর পরেও ক’ জন পণ্ডিত বস্তুবাদ ছুঁয়ে নির্দ্বিধায় এ-কথা বলার সাহস রাখেন ধুতি- চাদর- চটি পরে? একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে? তাঁর রক্তে ভারতীয় লোকায়ত দর্শন বা চার্বাকের পরম্পরা ছিল,, না কি তিনি ইউরোপীয় রেনেসাঁর ” হিউম্যানিজম” – এর কাছে মাননিক দীক্ষা নিয়েছিলেন সে-প্রশ্ন পরে।
আসল কথাটা হ’ল, বিশুদ্ধ যুক্তিবাদেরও একটা শেকড় ও পরম্পরা থাকে। ইতিহাসের গর্ভেই তার পূর্বাঙ্কুর নিহিত। ভবিষ্যতের বিবর্তন তার অনিবার্য পরিণতি! পরম্পরার নিবিড় বয়ন তাকে ধরে রাখে, নিরবচ্ছিন্ন সংহতিতে।

জড়বাদী বা যুক্তিবাদী ধারা ভারতীয় পরম্পরায় একেবারে বিরল নয়। এটুকুই বলার। আমাদের আক্ষেপ সেই ধারাটা খুবই দুর্বল রয়ে গেছে। শিক্ষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্রের যন্ত্রণাটা আরও বেশি ছিল। এদেশে প্রথাগত শিক্ষা যতটা বিজ্ঞানবিষয়ক ধারণা ও তাত্ত্বিক জ্ঞান এনে দিয়েছে, পেশায় পরিচয় আর জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে, ততটা বিজ্ঞানমনস্কতা আনতে পারেনি শিক্ষার্থীর চেতনায়।
আচার্যের অন্তর্ভেদী পর্য্যবেক্ষণ ও আশঙ্কা আজও সমান প্রাসঙ্গিক! জয়নারায়ণদের মনে পড়ে কোনো কোনো সময়! একটু বেশি করেই। ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে একপেশে বীক্ষণ, শ্লেষ, ব্যঙ্গকে উপেক্ষা করতেই কুসংস্কারের রাষ্ট্রীয় লালনের বিপরীতে জয়নারায়ণ, বিদ্যাসাগর, প্রফুল্লচন্দ্রদের সেই সমান্তরাল ভারতের উজ্জীবন হোক।
[লেখকের অন্য রচনা]
- ‘রাজা’ ও ‘রক্তকরবী’ – আলোকাভিসারী মানুষের মুক্তির অভিন্ন তপস্যা
- বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাঃ এক অনিকেত মানবতাবোধের স্বপ্নকথন