শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

অনেকদিন ধরেই মনের মধ্যে কিছু অস্বস্তি উঁকি মারছে। ষাটের দশকের শুরু থেকেই বহুবার শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব আমাকে টেনে নিয়ে গেছে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর হল মনে হচ্ছিল এমন করে আর ‘আমার যাওয়া তো নয় যাওয়া’। পরিস্থিতি বেশ মনে করিয়ে দিচ্ছিল, এমন উৎসবের সঙ্গে এই দেহ আর মনটাকে মেলানো যাচ্ছে না। কিন্তু অনেক মধুর মুহূর্তে এখনও ‘গীতবিতান’ যে-ভাবে রক্তে তুফান তোলে, মধুর স্মৃতিতে যে-ভাবে তাড়িত হই, তাতে মনের বয়সেটা কি আর মনে থাকে!

কবির কাছে কোনা রঙই তো তুচ্ছ নয়, বিশেষ করে যে কবি আবার কলম ছেড়ে তুলির টানেও কল্পনার কবিতা আঁকেন। তবু সেই বিশেষ রঙের সৌন্দর্যের মধ্যে তো আমরা অনুভব করি একটা গভীর সত্যকে, যা আমাদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয়ে হৃদয়কে আগলে রেখেছে। তাই তো রজনীগন্ধা, যুঁই, শিউলির শুভ্র স্নিগ্ধতা নয়, বসন্তোৎসবে কবির আহ্বান ‘ওরে পলাশ, ওরে পলাশ,/ রাঙা রঙের শিখায় শিখায় দিকে দিকে আগুন জ্বলাস’, যা দিয়ে ‘আমার মনের রাগ রাগিণী রাঙা হল রঙিন তানে।’ অশোক-পলাশের রাঙা হাসির মধ্যেই তো দোলের বার্তা, যখন ‘মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশ’-এর নেশাটুকুও শুধু রঙিন নয়, রাঙাই।

মনের মধ্যে কী এক আবেগের তাগিদে শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষ দোলের দিন রাস্তার বালতি-ভর্তি রঙের অত্যাচারকে উপেক্ষা করে শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে রক্তিম পরিবেশে একটু ঠাঁই খুঁজে নিতে চাইত। উড়িয়ে দেওয়া লাল ফাগে আবৃত আকাশ-বাতাস-মাটি, চারিদিক থেকে ভেসে আসা গান, তাঁদের কাছে আরও অর্থবহ হয়ে উঠত। শুধু শরীর নয়, রক্তিম শুভেচ্ছা আর ভালোবাসার স্পর্শে মথিত হয়ে উঠতো হৃদয়। খেয়াল নেই, অন্য কোনো রঙের আবির হয়তো তাদের তুচ্ছ অস্তিত্ব নিয়ে ইতিউতি উকিঁ দিত, কিন্তু রক্তিম প্লাবনে তা ছিল বড়োই নিস্প্রভ। তারপরে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং অবশ্যই রাজনৈতিক কারণে বিগত প্রায় সত্তর বছরে বিশ্বভারতী তথা শান্তিনিকেতনে পরিবেশের যে বিবর্তন ঘটে চলল তাকে যেন সবাই অনিবার্য বলেই মেনেও নিল। বটেই তো, সমগ্র ভারতবর্ষের কথা ছেড়েই দিলাম, পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে শান্তিনিকেতন কীভাবে আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো অবস্থান করবে। তাই শান্তিনিকেতন-তারাপীঠ-বক্রেশ্বরে একই দিনে একই পেন্নামের জন্য আজকের মানুষের যে প্লাবন তাকেও মান্যতা দিতেই হল।
তাহলে কীসের জন্য শান্তিনিকেতনে আসা? একদিন এমন প্রশ্নই তুলেছিলেন স্বয়ং আচার্য নেহরু। প্রবল অস্বস্তির মুখে উপাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু। কী করা যায়? প্রধান মন্ত্রীর নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিবারের মতো সেবারের সমাবর্তন অনুষ্ঠান আম্রকুঞ্জের খোলা পরিবেশে আর করা যাবে না। নিরাপত্তা রক্ষীদের এমনই নির্দেশে সমাবর্তনের ব্যবস্থা হয়েছে উত্তরায়নের ঘেরা পরিসরে। কিন্তু তাহলে প্রত্যকটি স্নাতককে সপ্তপর্ণী দিয়ে আচার্যের আশীর্বাদের মূল্য থাকে কী করে? আচার্যের এমন যুক্তি এবং জেদের কাছে হার মেনে অবশেষে তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নিয়ে সমাবর্তন হলো আম্রকুঞ্জেই। তাই শান্তিনিকেতন সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন আর উত্তর ট্যুরিস্ট গাইডে নেই, আছে ঘাসে ঘাসে পা ফেলার শিহরণে। এমন কত অভিজ্ঞতা, কত ঐতিহ্য, প্রকৃতির কত লীলা নিয়েই তো ‘আমাদের শান্তিনিকেতন আমাদের সব হতে আপন।’ বহু শিক্ষক বহু ছাত্রের কণ্ঠে প্রত্যহ ধ্বনিত হয় এমন গান। কিন্তু সত্যই কি সবার ‘দোলে হৃদয় দোলে’? যদি সত্যি এমন মধুর আবেশকে জড়িয়ে ধরেই আগামী দিনে সবার এগিয়ে চলা হয়, তাহলে আর শান্তিনিকেতনের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার দুশ্চিন্তা কেন? আসলে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিছু লিখতে বসলে সোজা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে সমস্যা হয়। পাশের অনেক গলিতে বেড়িয়ে আসাকে এড়িয়ে থাকা যায় না। ভাবি আর লিখি বটে, কিন্তু সে লেখা যে এলোমেলো হয়ে যায়। মনের মধ্যে জমে থাকা কত কথা গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে যায়। এ আমার অক্ষমতা, মানি।

যাই হোক, যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম সেখানেই ফিরে আসা যাক। আমার জ্ঞানে ১৯৫৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা লক্ষ করেছি। ডান-বাম নির্বিশেষে জয়ী প্রার্থীদের বিজয়োৎসব রঞ্জিত হতো শুধুই রক্তিম আবিরে। নানা অনুষ্ঠানে হৃদয়ের উষ্ণতা প্রকাশের আর কোনো বিকল্প রঙ ছিল না। কিন্তু ক্রমশ চিত্রটা গেল পালটে; আমাদের হৃদয়ের উচ্ছ্বাসের অভিব্যক্তি যে রং, যে রং আমাদের ধমনীতে নিরন্তর প্রবাহিত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল; সবুজের প্লাবনের হাত ধরে এখন এসে গিয়েছে আরও কত রং। আবির হারিয়েছে তার সেই রক্তিম আভিজাত্য। অবশ্যই বিভিন্ন রঙে রঞ্জিত হতেই পারে বিভিন্ন মানুষের হৃদয়, সব রঙই তো পবিত্র, প্রত্যেকেই স্বধর্মে শ্রেয়। কিন্তু বসন্তোৎসবের অনুষঙ্গে শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি ও পরিবেশের তালটা যেন কোথায় কেটে যায় যখন আমাদের মুঠোর অধিকার অনেকটাই হারায় রক্তিম আবির।

অবশ্যই আমি ইতিহাসের কথা এখানে বলতে বসিনি। বলতে বসিনি রাস্তা-ঘাটে সর্বত্র দোল-খেলার সর্বজনীন প্রথার কথা। আমার অনুভবকে আজও দোলা দিয়ে যায় আমার দেখা অনেক অনেক দিন আগের সেই শান্তিনিকেতন, সেই আম্রকুঞ্জকে ঘিরে সেই বসন্তোৎসব। আকাশে অন্য কোনো রঙ উড়িয়ে দিয়ে সাজনো হত কি সেদিনের শান্তিনিকেতনকে? মনে তো পড়ে না। ফাগুন লাগিয়ে দেওয়া প্রকৃতির মধ্যে আজও কল্পনায় ছবি আঁকি, আশ্বাস খুঁজি কবির ঈপ্সিত দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষ মানুষের সেই রক্তিম মিলনমেলা। সবই তো গেছে। লাল মাটির পথ এখন শুধু গানে আর ছবিতে, শহর থেকে তুলে এনে পৌষমেলায় ভুবনাঙার মাঠকে ক্রমশ আমরা সাজিয়ে দিচ্ছি বাজারী চাকচিক্যে। অসম্ভব ভিড় এবং কিছু বহিরাগত মানুষের উচ্ছৃঙ্খলতায় আম্রকুঞ্জের বসন্তোৎসবের বিঘ্নিত পরিবেশ আর চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে বন্দী।

শান্তিনিকেতনকে ঘিরে ধর্ষিতা প্রকৃতি প্রসব করছে কত অবাঞ্ছিত রিসর্ট, ইমারত। রবীন্দ্রনাথ ব্যর্থ হয়েছেন শান্তিনিকেতনকে ‘আধুনিক’ করে গড়ে তুলতে, যা পেরেছে আজকের চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের অধুনা কর্মকান্ড আর শহুরে বাবুদের মদির বিলাস। তার মধ্যেও একটা মানে খোঁজার চেষ্টা করা যেত যদি তাদের কোনো অসংলগ্ন মুহূর্তেও ক্ষণিক আশ্রয় হোত রবীন্দ্রনাথ। না, এমন মানুষেরা সর্বার্থেই রবীন্দ্রনাথের পরম অনাত্মীয়! আজকের শান্তিনিকেতনে রমরমিয়ে চলা জমির দালালদের তাদের বড় প্রয়োজন। খবর পেলাম – পলাশ-শিমূল-কৃষ্ণগচূড়ার শেষ অস্তিত্বটুকুকে দলিত করতে নাকি প্রান্তিকে মাথা তুলতে যাচ্ছে বিশাল মাল্টিপ্লেক্স! ভাল। তবে আমি কিন্তু বিশ্বভারতী তথা শান্তিনিকেতনের আজকের পরিবেশকে বিষাক্ত করার মূল কৃতিত্বটা দেবো রাজনীতির ছোট-বড় কারবারীদের, শান্তিনিকেতনের বহু জমি নামে-বেনামে চলে যাচ্ছে যাদের মালিকানায়। এর পরে আবার শান্তিনিকেতনের প্রায় গায়েই গজিয়ে উঠছে আরও একটি বিশ্ববিদ্যালয়! যুক্তি একটা খাড়া করা হয়েছে, বিশ্বভারতী তো অনেক দিন হল! ভাবি, আর একটা রবীন্দ্রনাথেরও খোঁজ করতে হয় তাহলে!

বিশ্বভারতী-শান্তিনিকেতন নিয়ে আজকে এত অভাববোধ, এত অতৃপ্তি, সামান্য স্খলনে এত অভিমান – তবু, তবু, তবু! তবু কেন সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের নিস্তব্ধ শান্তিনিকেতন আমাকে অবিরত ডাক দেয়, এই মুহূর্তেও! ছাতিমতলার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই শিহরণ জাগে, এই পথেই কতবার কত সূর্যোদয়ের সাক্ষী হয়েছিলেন তারই মিতা রবি – যেন সমরেশ বসুর ‘দেখি নাই ফিরে’র প্রথম পাতার অসাধারণ বর্ণনার মতো সবার অলক্ষ্যে তাঁর পদচারণা! শান্তিনিকেতন ছাড়া আর আমায় কে দেবে এমন অনুভবের ছোঁয়া?

কিন্তু এ-তো আমার ভাবনায় ছবি আঁকা, যাকে ঘিরেই আমার তৃপ্তি। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ স্মৃতিচারণা শুনেছি বেণুবাবুর মুখে একদিন সন্ধ্যায় রতনপল্লীতে। বেণুবাবু, মানে পবিত্র মুখোপাধ্যায়, যাঁর পিতা ডাঃ শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় – রবীন্দ্রনাথে নিবেদিত প্রাণ শান্তিনিকেতনের চিকিৎসক। কবির জীবনের আর আশা নেই এমন সংবাদ পেয়ে শচীনবাবুই অসুস্থ প্রতিমা দেবীকে শান্তিনিকেতন থেকে নিয়ে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়। যাই হোক, বেণুবাবুর মুখের কথাতেই বলি (সম্ভবত তাঁর মায়ের মুখ থেকে শোনা) – “গুরুদেব রোজ খুব সকালে হেঁটে বেড়াতেন। মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উঠানে পাতা একটি চৌকিতে এসে বসতেন। মা চায়ের কথা বললে খেতেন না। মাঝেমধ্যে একটু জল হয়তো খেতেন। আমাদের সবার কুশল সংবাদ নিয়ে উত্তরায়নের দিকে আবার রওনা হতেন।”

আমি কোনো অর্থেই শান্তিনিকেতনী নই। তবু এই বয়সেও, অনেক অভিযোগ অভিমান সত্ত্বেও, শান্তিনিকেতন আমাকে টানে। যাই, এই আশায়, কোনো নির্জন অবসরে যদি আমার ভাবনা উজান পথে গিয়ে ধরে আনতে পারে ফেলে আসা কিছু সময়। মনে করায় তো অনেক কিছু; যেমন শান্তিনিকেতনের ইতিহাসে সবথেকে বিপন্নতার সময় এবং বিশ্বভারতীর অনিবার্য মৃত্যুর আশংকায় গান্ধীজির কাছে নিঃসহায় রবীন্দ্রনাথের সকরুণ আর্তি, “Accept this institution under your protection, giving it an assurance of permanence if you consider it to be a national asset. Visva-Bharati is like a vessel which is carrying the cargo of my life’s best treasure, and I hope it may claim special care from my countrymen for its preservation.” রাঙিয়ে দেওয়ার কথা শুনিয়ে লেখাটা আরম্ভ করেছিলাম বটে, এমন অনেক রঙিন উৎসবের টানেই তো মানুষ আসত শান্তিনিকেতনে, গাইত আনন্দের গান। আর আজ, কোনো নিস্তব্ধ রাতে কোলাহল বারণ হলে মনটা বড় অস্থির হয়ে ওঠে। কানে কানে কবির হৃদয়ের রক্তক্ষরণের আলাপটাই শুনি শেষ পর্যন্ত – ‘কিছুই তো হল না’।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
পার্থ
পার্থ
15 days ago

খুব ভালো লাগলো একই সাথে কষ্ট।

1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x