শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

নিখিলেশ – তাঁর হৃদয়ের প্রতিবেশী

“আমিও দেশকে ভালোবাসি, তা যদি না হত তা হলে দেশের লোকের কাছে লোকপ্রিয় হওয়া আমার পক্ষে কঠিন হত না। সত্য প্রেমের পথ আরামের নয়, সে পথ দুর্গম। সিদ্ধিলাভ সকলের শক্তিতে নেই এবং সকলের ভাগ্যেও ফলে না, কিন্তু দেশের প্রেমে যদি দুঃখ ও অপমান সহ্য করি তা হলে মনে এই সান্ত্বনা থাকবে যে কাঁটা বাঁচিয়ে চলার ভয়ে সাধনায় মিথ্যাচারণ করিনি।”
[‘ঘরে-বাইরে’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ‘কৈফিয়ত’ ]

“মা গো, আজ মনে পড়ছে তোমার সেই সিঁথির সিঁদুর, চওড়া সেই লাল-পেড়ে শাড়ি, সেই তোমার দুটি চোখ – শান্ত, স্নিগ্ধ, গভীর। সে যে দেখেছি তোমার চিত্তাকাশে ভোরবেলাকার অরুণরাগরেখার মতো। আমার জীবনের দিন যে সেই সোনার পাথেয় নিয়ে যাত্রা করে বেরিয়েছিল। তার পরে ? … রাজার ঘরে আমার বিয়ে হল । তাঁদের কোন্ কালের বাদশাহের আমলের সম্মান। ছেলেবেলায় রূপকথার রাজপুত্রের কথা শুনেছি, তখন মনে একটা ছবি আঁকা ছিল। রাজার ঘরের ছেলে, দেহখানি যেন চামেলি ফুলের পাপড়ি দিয়ে গড়া, যুগযুগান্তর যে-সব কুমারী শিবপূজা করে এসেছে তাদেরই একাগ্র মনের কামনা দিয়ে সেই মুখ যেন তিলে তিলে তৈরি। সে কী চোখ, কী নাক! তরুণ গোঁফের রেখা ভ্রমরের দুটি ডানার মতো, যেমন কালো, তেমনি কোমল।
“স্বামীকে দেখলুম, তার সঙ্গে ঠিক মেলে না। এমন-কি তাঁর রঙ দেখলুম আমারই মতো। নিজের রূপের অভাব নিয়ে মনে যে সঙ্কোচ ছিল সেটা কিছু ঘুচল বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে একটা দীর্ঘনিশ্বাসও পড়ল। নিজের জন্যে লজ্জায় না হয় মরেই যেতুম, তবু মনে মনে যে রাজপুত্রটি ছিল তাকে একবার চোখে চোখে দেখতে পেলুম না কেন ?
“কিন্তু রূপ যখন চোখের পাহারা এড়িয়ে লুকিয়ে অন্তরে দেখা দেয় সেই বুঝি ভালো। তখন সে যে ভক্তির অমরাবতীতে এসে দাঁড়ায়, সেখানে তাকে কোনো সাজ করে আসতে হয় না। ভক্তির আপন সৌন্দর্যে সমস্তই কেমন সুন্দর হয়ে ওঠে …।”

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, এ তো ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের শুরুতে ‘বিমলার আত্মকথা’র একটু অংশ। যাঁরা উপন্যাসটি আদৌ পড়েননি, অথবা পড়লেও শেষ কবে পড়েছেন মনে করতে পারছেন না, তাঁদের ভাবনাকে একটু উসকে দিলাম আর কি! সাম্প্রতিক অতীতে একটা অনিশ্চয়তার বাতাবরণে মহামারির সঙ্গে ঘর করতে হয়েছিল। তখন আমার সেই রুদ্ধ কারার অন্তরালের অস্থিরতা-মোচনে মনের মধ্যে একটা ভিন্ন আলোড়নের প্রয়োজন ছিল। তাই ‘চার অধ্যায়’ আর ‘ঘরে-বাইরে’কে আবার সঙ্গী করা। পড়া-ভাবনা-আবার পড়া, এই দুটো বই যেন আমার অনিঃশেষ পথ চলার সঙ্গী। ‘চার অধ্যায়’-এর ভাষাতে আছে যাদু – নিজেরই কথা রবীন্দ্রনাথের। কিন্তু সে যাদুর স্পর্শ তাঁর কোন গল্প-উপন্যাসেই বা কম-বেশি নেই? বিশেষ করে ‘ঘরে-বাইরে’, যেটাকে কেন্দ্র করে আমার এই মুহূর্তের ভাবনা !

১৩২২ সালে ‘সবুজপত্র’তে প্রকাশের পর ‘ঘরে-বাইরে’ গ্রন্থাকারে প্রথম ১৯১৬ এবং পরিবর্ধিত সংস্করণ ১৯২০ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় । চলিত ভাষায় লেখা এইটাই রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস। ‘চার অধ্যায়ের কথা আপাতত থাক। সে তো অনেক পরে সেই ১৯৩৪-এ, তাঁর শেষ উপন্যাস। কিন্তু তীব্র সমালোচনা শুরু হল ‘ঘরে-বাইরে’ দিয়েই। যে-ভাবে হল, তাতে কবিকে বলতেই হল, “আমি যা লিখে থাকি তা অনেকের ভাল লাগে না। এই কথাটা সাধারণত যে ভাষায় বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা হয় নানা স্বাভাবিক কারণ সে ভাষায় আমার দখল নেই। এইজন্য যথারীতি তার জবাব দেওয়া আমার পক্ষে অসাধ্য।” কিন্তু জবাব যে তিনি একেবারে দেননি তা নয়, তাঁর মতো করেই তিনি দিয়েছিলেন কখনও কখনও।

নিখিলেশ – বিমলা – সন্দীপ, এই তিনটি চরিত্রের আত্মকথার মাধ্যমে উপন্যাসটির বিস্তার। সত্যি করে বলতে হয়, পড়তে পড়তে কেবলই খুঁজে পাই নিখিলেশের মধ্যে রবীন্দ্রনাথেরই জীবনচর্যা এবং ভাবনার ছবি। কাহিনীতে নিখিলেশ যেন রবীন্দ্রনাথেরই আর একটা নাম। নিখিলেশ যেভাবে নিজের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক সম্পর্কের ভাবনাকে শুধু প্রকাশ করে নয়, যাবতীয় উদ্যোগ দিয়ে তার জীবনে এবং জমিদারিতে ফলপ্রসূ করতে চেয়েছে তা যেন রবীন্দ্রনাথের জীবন থেকে নেওয়া এক অবিকল ছবি। নিখিলেশ চেয়েছিল ঘর থেকে বাইরে বার করে এনে বিমলাকে আলোর নীচে দাঁড় করাতে – জীবনের সত্যটাকে উপলব্ধি করাতে। এই উপলব্ধ সত্যটা নিয়ে ঘরের বাইরে নিখিলেশের হাত ধরতে বিমলার অনেক দেরি হয়ে গেল। অথচ ঘর নিয়ে কারও মনেই কোনো প্রশ্ন ওঠেনি, অন্তত সন্দীপের আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত । দেহ-মন দিয়ে নিখিলেশের নিবেদনে কোনো অভাববোধ বিমলার ছিল না। তাই তো বিমলা বলতে পারে – “প্রেমের থালায় ভক্তির পূজা আরতির আলোর মতো – পূজা যে করে এবং যাকে পূজা করা হয় দুয়ের উপরেই সে আলো সমান হয়ে পড়ে ।… প্রিয়তম, তুমি আমার পূজা চাওনি সে তোমারই যোগ্য, কিন্তু পূজা নিলে ভালো করতে। তুমি আমাকে সাজিয়ে ভালোবেসেছ, যা চেয়েছি তা দিয়ে ভালোবেসেছ, যা চাই নি তা দিয়ে ভালোবেসেছ। আমার ভালোবাসায় তোমার চোখে পাতা পড়ে নি তা দেখেছি, আমার ভলোবাসায় তোমার লুকিয়ে নিশ্বাস পড়েছে তা দেখেছি, আমার দেহকে তুমি এমন করে ভালোবেসেছ যেন সে স্বর্গের পারিজাত, আমার স্বভাবকে তুমি এমনি করে ভালোবেসেছ যেন সে তোমার সৌভাগ্য !”

যশোহরের ভবতারিণীর সঙ্গে মাত্র উনিশ বছরের দাম্পত্য-জীবন রবীন্দ্রনাথের । প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে ‘মৃণালিনী’ নামটি কবিরই দেওয়া। তা ছাড়া ‘নলিনী’ নামটি কবির বড় প্রিয়। তবে জগদীশ ভট্টাচার্যের মতে নববধূর ‘মৃণালিনী’ নামকরণটি করেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। মৃণালিনী ঠাকুর-এস্টেটের একজন সাধারণ কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা। সে আনা তরখড়, লুসি স্কট, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, ইন্দিরা, সরলা, এমনকী স্বর্ণকুমারী দেবী বা জ্ঞানদানন্দিনী দেবীরও আদৌ সমগোত্রীয় নয়, হতেও পারবে না। তথাপি বাড়ির ছোটবউ বা তাঁর ছুটিকে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তুলতে আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না কবির। একটা কথা স্ত্রীকে বুঝিয়েছেন – “কিছু আমি করিনি গোপন ।/ যাহা আছে সব আছে তোমার আঁখির কাছে / প্রসারিত অবারিত মন।” এই ঠাকুরবাড়ির যতই ব্যাপ্তি, মর্যাদা বা বৈভব থাক, স্ত্রীর সঙ্কোচের বিহ্বলতাকে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন – “এ রাজ্যের আদি অন্ত নাহি জান রানী, / এ তবু তোমার রাজধানী।” তবু, তা সত্ত্বেও, জোড়াসাঁকোর বৈভব ছেড়ে স্বামীর হাত ধরে বোলপুরের রুক্ষ জমিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে তিনি বাসা তো বাঁধলেন। কবির সেই সময়কার প্রচণ্ড আর্থিক অনটনের মধ্যে নিজের যাবতীয় গয়না একটি একটি করে তুলে তো দিলেন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে। কলকাতার লরেটোর মতো স্কুল নয়, সেই প্রথম গুটিকয়েক ছাত্রের সঙ্গে রথীন্দ্রনাথকেও ঠাঁই তো করে দিলেন শান্তিনিকেতনের বিদ্যাশ্রমে। সংসারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের যাবতীয় দায়িত্ব তুলে তো নিলেন নিজের কাঁধে। এমন করেই তো ঘরের বাইরে বিমলাকে পেতে চেয়েছিল নিখিলেশ। মৃণালিনী যা পারলেন, বিমলা তা পারেনি। কারণ সাময়িক মতিভ্রমে বিমলা তার গয়না তুলে দিয়েছিল নিখিলেশ নয়, লুব্ধ এবং কামনায় তাড়িত সন্দীপের হাতে! এখানেই ‘ঘরে-বাইরে’র ট্র্যাজেডি।

“জানি আমাকে প্রশ্ন করা হইবে, সন্দীপ যত বড়ো মন্দ লোকই হউক তাহাকে দিয়া সীতাকে অপমান কেন? আমি কৈফিয়ত-স্বরূপে বাল্মীকিরই দোহাই মানিব, তিনি কেন রাবণকে দিয়া সীতার অপমান ঘটাইলেন।… তেমনি আমার মতে সন্দীপ সীতা সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছে তাহা সন্দীপেরই যোগ্য, অতএব সে কথা অন্যায় কথা বলিয়াই তাহা সংগত হইয়াছে। এবং সেই সংগতি সাহিত্যে নিন্দার বিষয় নহে।” সেদিন অভিযোগ উঠেছিল, সন্দীপকে সামনে রেখে রবীন্দ্রনাথ সমগ্র বিপ্লবী-সমাজকেই অপমান করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এমন নানা বিরোধী মন্তব্যের অভাব কোনো কালেই হয়নি। বস্তুত রবীন্দ্রনাথ সন্দীপকে বিপ্লবী-সমাজের প্রতিনিধি বলে মনেই করেননি। পরবর্তী কালের ইতিহাস প্রমাণ করেছে কীভাবে সন্দীপের মতো অজস্র ছদ্মবেশী বিপ্লবী বাংলার বিপ্লব প্রচেষ্টাকে কলুষিত করেছিল। সাংঘাতিক ছিল বিপ্লবীদের গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব। এমন-কি এমন অভিযোগও উঠেছিল যে, অনুশীলন দলের ডাকাতির দ্বারা লব্ধ অর্থ – ‘এ পাপের ধন গেছে বেশ্যালয়ে’ (দ্রঃ- নিবেদিতা লোকমাতা – ৩ / শঙ্করীপ্রসাদ বসু) । এই ডাকাতির হাত থেকে দরিদ্র বিধবার ঘটি-বাটিরও রেহাই ছিল না। এমন ঘটনাগুলোই ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসে বিপ্লবী দলে নাম লেখানো অতীন্দ্রের হৃদয়ের রক্ত-ক্ষরণের কারণ হয়েছিল। সন্দীপ এমনই চরিত্রগুলিরই একজন, যাদের বিপ্লব-বিরোধী এবং অনৈতিক আচরণ সম্পর্কে স্পষ্ট স্বীকারোক্তির ইতিহাস লিখে গেছেন হেমচন্দ্র কানুনগো এবং পুলিনবিহারী দাসের মতো বিপ্লবীরা । তাই সন্দীপ মুক্তি আন্দোলনের বিপ্লবী নয়, সে বিনয়-বাদল-দীনেশ বা সূর্য সেন নয়, সে বিপ্লবীর ছদ্মবেশে উপন্যাসের একটি নেগেটিভ চরিত্র মাত্র ।

নিখিলেশের স্বপ্ন ছিল তার জমিদারিতে পল্লী-উন্নয়ন, কৃষকদের আর্থিক সমস্যার সুরাহা এবং অবশ্যই হিন্দু-মুসলমান প্রজাদের আত্মিক মিলন । ঠিক এমনই তো রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন যেখানে তাঁর চেষ্টার অন্ত ছিল না । মহাজনদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করার জন্য পতিসরে সমবায় পদ্ধতিতে চাষ এবং নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত টাকা গচ্ছিত রেখে একটি কৃষিব্যাঙ্ক স্থাপন, কূপ-খনন, সড়ক-নির্মাণ এবং অবশ্যই বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণের চেষ্টাতে তাঁর ছিল অনলস প্রয়াস। আজ পর্যন্ত কোন্‌ জমিদার, কোন্‌ কবি, কোন্‌ লেখক, কোন্‌ রাজনৈতিক নেতার জীবনচর্যার ইতিহাসে আছে এমন দৃষ্টান্ত?

সন্দীপের সংস্পর্শে আসা মোহাচ্ছন্ন বিমলা বিদেশী-দ্রব্য বয়কট করতে প্রয়োজনে শক্তির প্রয়োগকে সমর্থন করে নিখিলেশকে বলে –
“দেখো, সমস্ত বাংলাদেশের মধ্যে কেবল আমাদের এই হাটটার মধ্যেই বিলিতি কাপড় আসছে, এটা কি ভালো হচ্ছে ?
“আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কী করলে ভালো হয়?”
“ঐ জিনিসগুলো বের করে দিতে বলো-না।”
“জিনিসগুলো তো আমার নয়।”
“কিন্তু, হাট তো তোমার।”
“হাট আমার চেয়ে তাদের অনেক বেশি যারা ঐ হাটে জিনিস কিনতে আসে।”
“তারা দিশি জিনিস কিনুক-না।”
“যদি কেনে তো আমি খুশি হব, কিন্তু যদি না কেনে?”
“সে কী কথা । ওদের এত বড়ো আস্পর্ধা হবে ? তুমি হলে –”
“আমার সময় অল্প, এ নিয়ে তর্ক করে কী হবে ? আমি অত্যাচার করতে পারব না।”
“অত্যাচার তো তোমার নিজের জন্যে নয়, দেশের জন্যে –”
“দেশের জন্যে অত্যাচার করা দেশের উপরেই অত্যাচার করা, সে কথা তুমি বুঝতে পারবে না ।”
কিন্তু এমন অত্যাচারের পরিণাম সন্দীপের মতো বিপ্লবীরা হাড়েহাড়ে বুঝতে পেরেছিল। প্রকৃত অবস্থাটা সন্দীপ বুঝেছে এমন করে – “এখন কথা হচ্ছে, যার কাপড় পোড়াব তার জন্যে যদি দিশি কাপড় কিনে দিতে হয়, তার পরে আবার মামলা চলে, তা হলে তার টাকা পাই কোথায়! আর ঐ কাপড় পুড়তে পুড়তে বিলিতি কাপড়ের ব্যাবসা যে গরম হয়ে উঠবে। নবাব যখন বেলোয়ারি ঝাড় ভাঙার শব্দে মুগ্ধ হয়ে ঘরে ঘরে ঝাড় ভেঙে বেড়াত তখন ঝাড়ওয়ালার ব্যাবসার খুব উন্নতি হয়েছিল।” অতএব ডাকাতি করে অর্থ সংগ্রহ করা ছাড়া সন্দীপের মতো বিপ্লবীদের আর রাস্তাই বা কী?

আমরা তো জানি, বিদেশী দ্রব্যের বয়কট প্রসঙ্গে সারা দেশ যখন আবেগে থরথর করে কাঁপছে তখন সেই স্রোতের মুখে দাঁড়িয়ে একা রবীন্দ্রনাথ তাঁর যাবতীয় বিচার-বুদ্ধির সপক্ষে প্রশ্ন তুলেছিলেন, বারবার দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেছিলেন – এই পথ ভুল, এই পথ আত্মঘাতী। এই প্রসঙ্গে গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ বিতর্ক তো ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের এই বিচারের সমালোচনা হতেই পারে, কিন্তু সেই পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়েও, সবার অসন্তোষের কারণ হয়েও, নিজের যুক্তি ও বিশ্বাসের প্রতি ছিলেন অটল। ইতিউতি তাকিয়ে কথা বলা আজকের অতি-সাবধানী ‘বিদ্বৎসমাজ’ কিছুই শিখল না তাঁর কাছ থেকে।

সন্দীপের অবিমৃশ্যকারিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল নিখিলেশের এলাকার দরিদ্র গ্রামবাসী যাদের অধিকাংশই মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। উত্তেজিত এই মানুষগুলির আক্রমণের লক্ষ্য হওয়াতে সন্দীপের কাছে পলায়নই শ্রেয় বলে মনে হল। আর সেই উত্তেজনার আগুনে বিপন্ন হল নিখিলেশের জীবন। না, রবীন্দ্রনাথ নিখিলেশের জীবনের সেই অন্তিম পরিণতির কথা বলেননি মোটেই, ভয়ঙ্কর সেই সম্ভাবনাটা ইঙ্গিতেই জিইয়ে রেখেছেন। ‘ঘরে-বাইরে’ চলচ্চিত্রটির শেষ দৃশ্যে দেওয়ালে টাঙানো বিমলার বৈধব্যের ছবি শুধু শিল্পের দিক দিয়ে অতিসরলীকরণ নয়, কাহিনীর মান্যতার প্রেক্ষিতেও এনেছে সত্যজিৎ রায়ের কল্পনার আধিক্য।

এক ফ্রেমে ‘ঘরে বাইরে’র স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিত রায় ও ভিক্টর ব্যানার্জী (চিত্রশিল্পী – বিকাশ ভট্টাচার্য্য)

‘ঘরে-বাইরে’ একটি অসাধারণ উপন্যাস। মনস্তত্ত্বের টানাপোড়েনে তিনজনের এই আত্মকথাকে কাহিনীর সুষম গঠন আর আঙ্গিকের অভিনবত্ব করেছে সমৃদ্ধ। এই উপন্যাসের ভাষাতেও রয়েছে সেই অনবদ্য স্টাইল যা প্রয়োজনে কখনও পেলব আবার কখনও ঋজু। ঘরে-বাইরে উপন্যাসটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার বিষয়, দেশ-কাল-সমাজকে ঘিরে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, যা ফলবতী হয়েছে রবীন্দ্রনাথেরই আইডিয়ার ভ্রুণে। যে সভ্যতার সঙ্কট নিয়ে তাঁর এত ভাবনা তার উদ্ভব তো মনুষ্যত্বের আপন গরিমার অবমাননায়, তা কী ঘরে কী বাইরে। এমন ভাবনাই রয়েছে নিখিলেশের আন্তরিক উচ্চারণে, যা বারবার পড়ি আর পৌঁছে যাই রবীন্দ্রনাথেরই কাছে।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ashish Sen
Ashish Sen
1 month ago

ঘরে বাইরে আমার অত্যন্ত প্রিয় একটি উপন্যাস। এই উপন্যাসের আঙ্গিক এবং ভাষা নিয়ে কিছু বলা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা। আর পড়তে পড়তে নিখিলেশকে রবীন্দ্রনাথের থেকে আলাদা করতে পারি নি। আমাকে অবাক করেছে তাঁর দূরদর্শিতা। আবেগসর্বস্ব হঠকারিতা দিয়ে যে কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধন হয়না, উল্টে উদ্দেশ্য বিচ্যুত হয়, সেই সত্যটা তখনকার কোন রাজনৈতিক নেতা বুঝতে পারেন নি, যা রবীন্দ্রনাথের মত অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শুধু উপলব্ধি করেছেন তা নয়, উল্টে চরম সমালোচনা সহ্য করেও বারবার সতর্ক করেছেন।

Himadri Kumar Das Gupta
Himadri Kumar Das Gupta
Reply to  Ashish Sen
1 month ago

একেবারে ঠিক।

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x