
রাজনীতির কল্যাণে ইদানিং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামটা প্রায়শই উচ্চারিত হয়। ইতিহাস থেকে মুখ ফিরিয়ে রাজনীতির চর্চায় বাঙালির চিরকালীন উৎসাহ বলে শুধু রাজনীতির তকমা লাগানো শ্যামাপ্রসাদের মূল্যায়নে অনেক ফাঁকও থেকে যায়। গান্ধী-নেহরু-সুভাষ-বামপন্থা-ডানপন্থা-দেশভাগ-বঙ্গভঙ্গ-সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক এমন হাজারটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে যথার্থ ভাবনা বর্জিত বল্গাহীন বিতর্কে বাঙালি তো অক্লান্ত। আর এত সব বিষয়ের মধ্যে অনেক দিন ধরে ঘুমিয়ে থাকা শ্যামাপ্রসাদ ইদানিং জেগে উঠেছেন অথবা তাঁকে জাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভাবতে অবাক লাগে ভারতীয় রাজনীতির বিচিত্র গতি আজ এক ভুঁইফোড় নেতার মতো শ্যামাপ্রসাদকে হাজির করেছে আমাদের সামনে। কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। ইতিহাসে এতটা আবর্জনার সামগ্রী নন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। চিত্তরঞ্জন এবং সুভাষচন্দ্র ছাড়া শ্যামাপ্রসাদের মতো আর একজন ব্যক্তিত্বের নাম আমার মনে পড়ে না ভারতীয় রাজনীতিতে যাঁর বাংলা এবং বাঙালির প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসটা এমন উজ্জ্বল ছিল। কপালে তিলক কাটা, গায়ে গেরুয়া উত্তরীয় জড়ানো আর মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনির উচ্চারণ আদৌ শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল না। তাত্ত্বিক দিক দিয়েও সাভারকার ঘরানার সঙ্গে তাঁর বিস্তর দূরত্ব ছিল। তবে চরম সঙ্কটে হিন্দুদের পরিচয় এবং অস্তিত্ব রক্ষাকে শ্যামাপ্রসাদ যে সুনিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন এটা তো অবশ্যই স্বীকার্য। এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠীর বক্তব্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ – “দুর্ভাগ্য আমাদের, জাতীয়তাবাদী মুসলিমরা যেমন জিন্নার ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে লড়াই করতে পারেননি, তেমনি উদারপন্থী শ্যামাপ্রসাদ ও নির্মল চ্যাটার্জীরাও পারেননি সাভারকার-গোলওয়ালকরদের সঙ্গে লড়তে।”

আমার ভাবনাটি পক্ষপাতিত্বের দোষে দুষ্ট হলে আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। কারণ, শুধু একজন উদার রাজনীতিবিদ তো নন, অসাধারণ বাগ্মী এবং শিক্ষাচিন্তার অন্যতম পথিকৃত এই মানুষটির ব্যক্তিত্ব নানা মানবিক গুণের সমন্বয়ে গঠিত হলেও গায়ে যে তাঁর হিন্দুত্বের আঁশটে গন্ধ !! আমি অনেকেরই অস্বস্তির কারণটা বুঝি। তীব্র মতপার্থক্য সত্ত্বেও গান্ধীজি-সুভাষচন্দ্র এমনকি কম্যুনিস্ট নেতা মুজফ্ফর আহ্মেদে ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ও যাঁকে ব্রাত্য করে রাখতে পারেননি, এই বিচিত্র political compulsion-এর যুগে আজকের প্রগতিশীলরা তাঁকে এড়িয়ে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করলে মুক্তমনে ইতিহাস চর্চার দিন কি তা হলে শেষ? শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে যাঁদের ভাঁড়ারটা শুধু অতৃপ্তিতেই পূর্ণ তাঁদের সঙ্গে বিবাদে না গিয়ে তাঁদের কাছে আগাম মার্জনা চেয়ে নিলাম। আমি এখানে তিনটি, মাত্র তিনটি বিষয়ে অতি সংক্ষেপে আমার ভাবনার কথাই শুধু বলি। শ্যামাপ্রসাদকে ঘিরে প্রথমটির বিষয় অবশ্যই বঙ্গভঙ্গ, দ্বিতীয়টি ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং শেষে তৎকালীন আইনসভায় পেশ হওয়া বিশ্বভারতী-বিল (১৯৫০)।

১) ভাবুন তো একবার, আপনি বাজারে গেছেন অথবা গ্যাসের বিল মেটাচ্ছেন – আপনার পকেটে থাকা গুচ্ছের টাকার নোটের সবগুলোতেই যাঁর ছবি – তিনি মহম্মদ আলি জিন্না। আপনি টি-ভি খুললেন, উর্দুতে ভাষণ দিচ্ছেন আপনার প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। আশ্চর্য হচ্ছেন ? এমনটাই তো ঘটতে যাচ্ছিল ! সেদিন ভারত ভাগ হল আর বাঁকা পথে আপনি হলেন পাকিস্থানের নাগরিক! কিন্তু কীভাবে ঘটতে যাচ্ছিল ব্যাপারটা? প্রয়োজনে লিগের মন্ত্রীসভায় জিন্না হোক অভিভক্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী, এমন শর্তে গান্ধীজি এবং সুভাষচন্দ্র দুজনেরই আপত্তি না থাকলেও কংগ্রেসের তো আপত্তি ছিলই। তাই ঐকবদ্ধ ভারতের স্বপ্ন যখন অধরাই থেকে গেল তখন এ-বঙ্গের বাঙালি, বিশেষ করে হিন্দু বাঙালিদের কাছে এল আরও বড় সমস্যা। শরৎচন্দ্র বসু এবং সুরাবর্দি ভারত এবং পাকিস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন, সমাজবাদী সাধারণতন্ত্র এবং সার্বভৌম অখণ্ড বঙ্গের ডাক দিলেন। ভাবতে অবাক লাগে, সুরাবর্দির মতো তীব্র সাম্প্রদায়িক মানুষের উপর নির্ভর করে লিগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শরৎবাবু যুক্তবঙ্গের স্বপ্ন কী করে দেখলেন! পাকিস্তানে বসে জিন্না বোধহয় এরই অপেক্ষায় ছিলেন – সায় দিলেন এমন প্রস্তাবে। জিন্না ভালই বুঝেছিলেন ভারত থেকে এবং আপাতত পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অভিভক্ত বঙ্গ গঠিত হলে আখেরে বড় লাভটা পাকিস্তানেরই। কারণ, অবিভক্ত বঙ্গে হিন্দুরা হল সংখ্যালঘু এবং অদূর ভবিষ্যতেই সংখ্যাগুরু মুসলমানদের সমর্থনে গণভোট করে যুক্তবঙ্গকে গ্রাস করার রাস্তাটা তো পাকিস্তানের কাছে একেবারেই মসৃণ কাজ। ১১।৪।১৯৪৭ তারিখে মাউন্টব্যাটেনকে ছোটলাট বারোজ এক রিপোর্টে জানালেন “শরৎচন্দ্র বসুর ফরোয়ার্ড ব্লক ও কম্যুনিস্টরা দেশভাগের (বঙ্গভাগ) বিরোধী কিন্তু সংখ্যাগুরু হিন্দু জনমত তাদের কথা শুনতে রাজি নয়।” যাইহোক, অনমনীয় শ্যামাপ্রসাদের একটাই সিদ্ধান্ত – “I can conceive of no other solution of the communal probem in Bengal than to divide the province…”।

এখানে ও-পার বাংলার তফসিলী নেতা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্তে কথাও বলতে হয়। উচ্চবর্ণের হাতে নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের নিগৃহীত হওয়ার কারণে মুসলমানদের কাছ থেকে পূর্ণ সহানুভূতি ও সহযোগিতার প্রত্যাশায় যোগেনবাবু পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থন করেন। লিগের সক্রিয় সমর্থক যোগেনবাবুকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে জিন্না তাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিও করলেন। কিন্তু সংখ্যালঘুদের প্রতি নির্যাতন ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় অচিরেই তাঁর মোহভঙ্গ হয়। যাই হোক, অবিভক্ত বাংলার পরিণাম সম্পর্কে শুরু থেকেই শ্যামাপ্রসাদ সতর্ক ছিলেন, জিন্নার অভিসন্ধিও তাঁর অগোচরে ছিল না। স্বাধীন যুক্তবঙ্গের বিরুদ্ধে শ্যামাপ্রসাদের আন্দোলন ফলপ্রসু হয়। বিধানচন্দ্র রায় এবং কিরণশঙ্কর রায়ের সমর্থন আসে। এই আন্দোলনের পিছনে সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, রমেশ মজুমদার, যদুনাথ সরকার, শিশিরকুমার মিত্র আর মেঘনাদ সাহার মতো বিদ্বজ্জনেদেরও অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল; আর ছিল অধিকাংশ হিন্দু বাঙালির নৈতিক সমর্থন। শেষ পর্যন্ত আর ঝুঁকি না নিয়ে সরকার বঙ্গ বিভাজনে সায় দিল যার ফলে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হিসাবে আজ পশ্চিমবঙ্গের মর্যাদা।

২) এবারে আসি সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের বিরুদ্ধে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকার কথায়। কাশ্মীর সার্বভৌম রাজ্যের একটি অঙ্গরাজ্য – এই সত্যটা যাঁরা স্বীকার করেন তাঁরা তো এই সত্যকেও মান্যতা দেবেন যে, অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের মতো কাশ্মীরেও ভারতের একই আইন একই পতাকা প্রযোজ্য। একটি বিশেষ আইনের দ্বারা অন্যান্য রাজ্যগুলোর থেকে পৃথক করে কাশ্মীরকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং তার স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করে নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার বিরুদ্ধে শ্যামাপ্রসাদ তীব্র প্রতিবাদ করেন। এই আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনার জন্য কাশ্মীরের উদ্দেশে রওনা হলে শ্যামাপ্রসাদকে জম্মু সীমান্তে গ্রেফ্তার করা হয়। ২৩ জুন ১৯৫৩ সালে জেলেই তাঁর মৃত্যু। দীর্ঘ সত্তর বছর ধরে চলে আসা এই আইনটি বর্তমান আইনসভায় বাতিল করা হল। আসল কথা এই, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির কাছে জোরালো যুক্তিসাপেক্ষে এই বাতিলের পক্ষে-বিপক্ষে কিছু বলার অসুবিধা ছিল, যেমন ছিল ‘তিন-তালাক’ নামক মধ্যযুগীয় আইনটির বাতিল সম্পর্কে কিছু বলার। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে, বিশেষ করে ইদানিং সরকার এবং বিরোধী দলগুলির কাজ-কর্ম পুরোটাই দলীয় রাজনীতির লাভ-ক্ষতির উপর নির্ভরশীল। সেই অঙ্ক কষেই এই বিলটির ভোটাভুটিতে অনেক বিরোধীদল অংশগ্রহণ করল না।
একটি সরকারের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ থাকলেও সেই সরকার কর্তৃক আনিত কোনো কোনো মানবিক এবং যুক্তিযুক্ত উদ্যোগের আদর্শহীন বিরোধিতা আজ ভারতের রাজনীতিতেই সম্ভব। মনে করে দেখুন, এমন পরিস্থিতির কি উদ্ভব হত যদি সেদিন শাহাবানু মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ক্ষমতার জোরে অস্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সংবিধান সংশোধন না করতেন? তাই ৩৭০ ধারা বিলোপের জন্য যে আন্দোলন সেদিন শ্যামাপ্রসাদ আরম্ভ করেছিলেন তাকে মান্যতা দিতে দলীয় লাভ-ক্ষতির হিসেব-নিকেশ করা রাজনৈতিক দলগুলি এবং তাদের সাঙ্গোপাঙ্গদের আজ প্রধান কাজ হতে পারে; কিন্তু তা চিন্তাশীল, গণতান্ত্রিক মানুষের ভাবনার বিষয় নয়। ভোট এখন সবার কাছেই বড় বালাই!

৩) গান্ধীজির শেষবার শান্তিনিকেতনে আসা এবং ১৯।২।১৯৪০-এ বিদায়-মুহূর্তে তাঁর হাতে বিশ্বভারতী সম্পর্কে আবেদনটি কবির ধরিয়ে দেওয়ার ইতিহাস তো সবারই জানা। সেদিন জেনেছিলাম বিশ্বভারতী সম্পর্কে কবির ভাবনার সারাৎসার – “Visva-Bharati is like a vessel which is carrying the cargo of my life’s best treasure.” দীর্ঘ সাত বছর ধরে সযত্নে রাখা কবির এই আবেদনটি সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতের শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে গান্ধীজি তাঁকে তাঁর দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করিয়ে দিলেন। আজাদের নিজের উক্তিতে – “… he told me that it was precious thing kept with him and that it was his desire to hand it over to the Government of India. I feel a pleasure in having this opportunity, although somewhat delayed, to set the Government of India’s seal on the preservation of this institution.” যাই হোক অবশেষে Visva-Bharati Bill (1950) আইনসভার কক্ষে পেশ করা হল (28-4-1951) ।

বিলটি নিয়ে বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন অনেকে, বিশেষ করে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তথা ইউ জি সি-র চেয়ারম্যান সিডি দেশমুখ, হরেবিষ্ণু কামাথ, পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য এবং অবশ্যই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংসদ এবং মন্ত্রীরা। বিতর্কে বিশ্বভারতীর প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, অ্যাকাডেমিক বিষয়, রবীন্দ্রনাথের আদর্শ, ধর্ম সম্পর্কে ভাবনা এবং বিশ্বভারতীতে এ-যাবৎ লালিত আন্তর্জাতিক ও অসাম্প্রদায়িক পরিবেশের সুরক্ষা ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং বিলটির উপর নানা সংশোধনী পেশ করা হয়। বিতর্কে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ভাষণে বিলটিতে প্রস্তাবিত বিশ্বভারতীর অ্যাকাডেমিক অধিকার নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। শ্যামাপ্রসাদ প্রশ্ন তোলেন বিলটিতে কী করে শুধুমাত্র কলেজ এবং উচ্চতর শিক্ষাকে বিশ্বভারতীর পঠনপাঠনের এক্তিয়ারভুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে বিশ্বভারতীর শিক্ষার একেবারে নীচু স্তর থেকে বিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষার বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই চলে যাবে পশ্চিম বঙ্গীয় বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে। এমন সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে সেখানে ঘটে যাবে শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মূল আশা-আদর্শ-ভাবনার চরমতম বিচ্যুতি।

একটু বড় হয়ে যাবে, তবু আইনসভায় বিশ্বভারতীর অ্যাকাডেমিক পর্যায়ের উপর বিতর্কে শ্যামাপ্রসাদের ভাষণের কিছু গুরত্বপূর্ণ অংশের উল্লেখ এখানে না করে পারছি না। রবীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বভারতীর প্রতি যাঁদের বিশেষ দুর্বলতা আছে শ্যামাপ্রসাদের এই বক্তব্যের তাৎপর্য তাঁদের পক্ষে মন দিয়ে উপলব্ধি করার – “ … the University is given power to maintain colleges and Bhavanas or halls or recognize colleges and Bhavanas, but what exactly will be the position of the schools at Santiniketan? This Bill obviously covers the cases of colleges which means the institutions after the Matriculation stage. According the Secondary Education Bill, which has been passed in West Bengal recently all high schools in West Bengal will come under the control of the Board. Then what happens to the schools situated in Santiniketan? I am definitely of the view that this Bill will never succeed and Visva-Bharati will never succeed unless you never allow Visva-Bharati to maintain its own school right from the kindergarten stage. There is a new type of secondary education which has been imparted at santiniketan, which in fact, was the special gift of Rabindranath Tagore. That is how Santiniketan’s activities started. Unless the child is taken up at the very initial stage it will be impossible to maintain Visva-Bharati with the proper standard. We cannot do that if we allow the University control only over the colleges. I know the Education Minister’s intention is all right. He wants Visva-Bharati to prosper according the ideals of its founder. If that is his intention and the intention of Parliament and of the whole country, I suggest Government might have small amendment and add ‘schools’ also so that the position may be clear beyond any doubt whatsoever.”
এ ছাড়াও বিশ্বভারতী সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের প্রসঙ্গও শ্যামাপ্রসাদের ভাষণে উঠে আসে, বিশেষ করে এই প্রতিষ্ঠানের আদর্শ সম্পর্কে যা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক নির্ধারিত। এর কোনোরকম পরিবর্তনে আপত্তি জানিয়ে শ্যমাপ্রসাদের সতর্কবাণী – “… it is not for us to edit the objectives of the founder. We have no right to do that. If you say that you do not accept the objectives, do not pass the Bill and say Government is not prepared to pass the Visva-Bharati Bill on the model that Rabindranath Tagore thought should be its objective or ideals….”

মৌলানা আজাদ শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্যের যৌক্তিকতাকে মান্যতা দিয়ে বিলে ‘স্কুল’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তিতে স্বীকৃত হলেন; কিন্তু যা বললেন তা অবাক করার মতো কথা, শুনুন – “This Bill has been prepared in consultation with the Visva-Bharati authorities and they did not lay any emphasis on schools…. I have no objection if the word ‘school’ is added to it.” অর্থাৎ মৌলানা আজাদ জানাচ্ছেন, বিলটি প্রস্তুত হয়েছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এবং সেখানে ‘স্কুল’ শব্দটির উল্লেখ ছিল না। অর্থাৎ পেশ করা বিলে শুধু কলেজ এবং উচ্চতর শিক্ষার প্রসঙ্গই আসছে!

আমাদের অবাক লাগে, ভাগ্যিস শ্যামাপ্রসাদ আপত্তি তুললেন, তা না হলে তো নিঃশব্দে ঘটে যাচ্ছিল এক সর্বনাশা কাণ্ড! আমরা তো জানি বিলের খসড়া তৈরির মূল দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত অ্যাটর্নি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের সলিসিটর তথা বিশ্বভারতীর অর্থ সচিব নৃপেন্দ্রচন্দ্র মিত্র। তা ছাড়াও বিলটির প্রস্তুতির পিছনে শরৎচন্দ্র বসুর মতো আইনজ্ঞ এবং নলিনাক্ষ সান্যাল, প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যের মতো বিদ্বজ্জনদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতাও ছিল। এর পর নানা আইনগত কারণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা-মন্ত্রক, আইন-মন্ত্রক এবং অর্থ মন্ত্রকের ছাড়পত্র নিয়ে বিলটি লোকসভায় পেশ হল। কোনো ভুলের তো প্রশ্নই আসে না। তা ছাড়াও সব শেষে বলতে হয়, সেখানে তখন স্বয়ং রথীন্দ্রনাথের উজ্জ্বল উপস্থিতি – যিনি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে সদ্য স্বীকৃতি পাওয়া বিশ্বভারতীর প্রথম উপাচার্য হিসাবে কার্যভার গ্রহণ করতে চলেছেন ১৪ মে ১৯৫১তে !! তাহলে? বুঝি না, সত্যি বুঝি না। শুধু বুঝি, বিশ্বভারতী-বিল থেকে স্কুল শব্দটির বর্জন – অর্থাৎ বিশ্বভারতীতে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার কোনো সুযোগ না থাকা আর রবীন্দ্রনাথের ‘life’s best treasure’কে নর্দমায় নিক্ষেপ করার ব্যাপারটা একই।

আমি লেখাটা শেষ করব বেঙ্গলি পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদ্মিনীমোহন নিয়োগীকে রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি চিঠির শেষ অংশটুকু দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন –“পিতা আমাকে সঙ্গে করিয়া অমৃতসর হইয়া ডালহৌসী পর্বতে ভ্রমণ করিতে যান – সেই আমার বাহিরের জগতের সহিত প্রথম পরিচয় । … এই যে স্কুলের বন্ধন ছিন্ন করিয়া মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে তিনমাস স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়াছিলাম ইহাতেই ফিরিয়া আসিয়া বিদ্যালয়ের সহিত আমার সংস্রব বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। এই শেষ বয়সে বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া তাহার শোধ দিতেছি – এখন আমার আর পালাইবার পথ নাই – ছাত্ররাও যাহাতে সর্ব্বদা পালাইবার পথ না খোঁজে সেই দিকেই আমার দৃষ্টি।”
সেদিন যে তৃপ্তির অন্বেষণে রবীন্দ্রনাথ বোলপুরের রুক্ষ জমিতে অনেক ত্যাগ অনেক অভাবের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ের সৌধটি গড়ে তুলেছিলেন, যার জন্য স্ত্রীর গয়না পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়ছিল, আইন করে কলমের এক খোঁচায় স্বাধীন ভারতের জাতীয় সম্পত্তি হিসাবে তার চূড়াটা ভেঙে দেওয়ার মতো অবিবেচক ও অপরিণামদর্শী প্রয়াসের বিরুদ্ধে শ্যামাপ্রসাদের সময়োচিত এবং যথোচিত উদ্যোগকে শুধুমাত্র হিন্দুত্বের তকমা দিয়ে অস্বীকার বা অমর্যাদা করাটা কি ইতিহাসের দাবি হতে পারে? আজকের আলোচ্য বিষয়ের প্রেক্ষিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কিন্তু আমাকে তৃপ্ত করেছেন।
ঋণ –
১) স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস / অমলেশ ত্রিপাঠী
২) রবীন্দ্র-রচনাবলী – ১১ / পঃবঃ সরকার ১৯৮৯
৩) সাপ্তাহিক ‘দেশ’, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শতবর্ষ সংখ্যা / ৪।৭।২০০১
৪) ‘দেশ’ / সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৯০
৫) The Indian Struggle / Subhas Ch. Bose
৬) Freedom at Midnight / Larry Collins and Dominique Lapierre
৭) An Odyssey in Parliament Mode / Dilipkumar Sinha
৮) The Visvabharati Quarterly / Gandhi Number
শিক্ষাবিদ্ তেজস্বী নীতিজ্ঞএবং নির্ভীক
শ্যামাপ্রসাদের চরিত্রের এমন বলিষ্ঠ উন্মোচন সচরাচর চোখে পড়ে না। শ্রদ্ধেয় হিমাদ্রিবাবুর লেখার মধ্য দিয়ে বঙ্গবাসীর চির আরাধনীয় সারথি শ্যামাপ্রসাদের
জাগরণ পাঠককুলকে জাগিয়ে দিল।
অনেক শ্রদ্ধাসহ।
. ……….
ধন্যবাদ