
১৯৩৭ সালে হিন্দু-মুসলমান বিরোধের সূত্রে ‘বন্দেমাতরম’কে জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহণ করা যায় কিনা এই নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠল। মুসলমানদের বক্তব্য হচ্ছে, গানটিতে হিন্দু পৌত্তলিক দেবী দুর্গার স্তব আছে এবং ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি মুসলিম বিদ্বেষের উপর ভিত্তি করে রচিত। অপরদিকে বাঙালি হিন্দুদের মত হচ্ছে, অর্ধশতাব্দীকাল ধরে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করা গানটি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গান্ধীজি, জওহরলাল, সুভাষচন্দ্রের বিব্রত অবস্থার মধ্যে স্থির হয় এ.আই.সি.সি-র আগামী কলকাতা অধিবেশনে এ-বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সুভাষচন্দ্র কবির মতামত আহ্বান করেন। বাস্তবিকই কবি অসুবিধার মধ্যে পড়লেন। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ক্রমাগত ভাঙতে ভাঙতে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলছেন। ‘বন্দেমাতরম’ সংগীত আর রাজনৈতিক স্লোগানের সঙ্গে তাঁর উপলব্ধ আন্তর্জাতিক ভাবাদর্শের আত্মীয়তা এখন আর অনুভব করেন না। তথাপি ১৯।১০।৩৭ সালে কবি তাঁর মতামত সুভাষচন্দ্রকে জানালেন। ব্যক্তিগতভাবে জওহরলালকেও তাঁর অভিমত জানালেন। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি তাঁর পরামর্শ চাইলে রবীন্দ্রনাথের বিবৃতি আনন্দবাজার পত্রিকায় ছাপা হয় (৩০।১০।৩৭)। বিবৃতিটি বড়, শেষে কবি বললেন – “… আমি অনায়াসে স্বীকার করি যে, বঙ্কিমচন্দ্রের সমগ্র ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি যদি উহার অন্যান্য ইতিহাসের সহিত পড়া যায় তাহা হইলে উহার এমন অর্থ করা যায় যাহার ফলে মুসলমানদের মনে আঘাত লাগিতে পারে, কিন্তু এই জাতীয় সংগীত যদিও সমগ্র সংগীত হইতে গৃহীত দুইটি প্যারা মাত্র, তথাপি উহা যে সর্বদা কেন সমগ্র সংগীতের কথা স্মরণ করাইয়া দিবে কিংবা যে ইতিহাসের সহিত দৈবক্রমে ইহা জড়িত তাহার কথা স্মরণ করাইয়া দিবে, তাহার যুক্তিসঙ্গত কারণ নাই। উহার সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য আছে এবং উহা নিজস্ব এমন একটা উদ্দীপনাময় বৈশিষ্ট্য আছে যাহা, আমার মনে হয়, কোন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মনে আঘাত করে না।” রবীন্দ্রনাথের মতকে সমর্থন করেই কংগ্রেসের সভায় জওহরলাল বললেন, “…the first two stanzas are such that it is impossible for anyone to take objection to, unless he is maliciously inclined. Remember, we are thinking in terms of a national song for all India.”

সমগ্র সংগীতটিকে অখণ্ড অবস্থায় জাতীয় সংগীত হিসাবে গৃহীত না হওয়ার কারণে অধিকাংশ জাতীয়তাবাদী পত্রিকা, বিশেষ করে আনন্দবাজার পত্রিকা, কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত এবং কবির মতামতের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। আশ্চর্যের বিষয়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, দীনেশচন্দ্র সেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, যতীন্দ্রমোহন বাগচীর মতো মানুষেরাও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁদের আপত্তি গান্ধীজির কাছে পেশ করেন। তবে কংগেসের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়নি, যার সঙ্গে সুভাষচন্দ্র সম্পূর্ণ সহমত ছিলেন।
এই পর্যায় আসার পর ১৬ জানুয়ারি ১৯৪১–এ এলগিন রোডের বাড়ি থেকে সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান পর্যন্ত অনেক ঘটনার মধ্যে দিয়ে সময় খুব দ্রুত এগিয়ে যাবে। ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসে সভাপতি হয়েই সুভাষচন্দ্র The National Planning Commission গঠন করে জওহরলালকে সভাপতি এবং ডঃ মেঘনাদ সাহা সমেত নয়জন সদস্যের নাম ঘোষণা করলেন। ডঃ সাহা শান্তিনিকেতনে এসে Planning Commission সম্পর্কে বুঝিয়ে কবিকে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণের আবেদন জানালেন। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে কবি জওহরলালকে লিখলেন (১৯।১১।৩৮) – “… I have had a long and interesting discussion with Dr. Meghnad Saha about Scientific Planning for Indian Industry; I am convinced about its importance and as you have consented to act as the president of the Committee formed by Subhas for the guidance of the Congress, I would like to know your views on the matter….”

ইতিমধ্যে ধীরে ধীরে ১৯৩৯-এর ত্রিপুরি কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের দাবি উঠতে লাগলো বিভিন্ন মহল থেকে, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী মুসলিম এবং বামপন্থীদের তরফ থেকে। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং গান্ধীজি এবং জওহরলালকে সুভাষচন্দ্রকে পুনর্নির্বাচিত করার অনুরোধ রাখলেন। কিন্তু প্রথম থেকেই গান্ধীজি সুভাষচন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের বিরোধী। এমনকি সুভাষচন্দ্রের কাছে পট্টভি সীতারামাইয়ার পরাজয়কে গান্ধীজি নিজের পরাজয় হিসাবে গ্রহণ করে অহেতুক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুললেন। ফলে সুভাষ-বিরোধীদের হাত শক্ত হল। এই পর্যায়ে সুভাষচন্দ্রের সহযোগী যোদ্ধা বামপন্থী জওহরলালের ভুমিকা আশ্চর্যজনকভাবে প্রথমে নীরব এবং পরে দক্ষিণপন্থী স্রোতে গা ভাসানো ! অথচ এই জওহরলালকেই একদিন সুভাষচন্দ্র লিখেছিলেন (৪।৩।১৯৩৬) – “Among the front rank leaders of today – you are the only one to whom we can look up to for leading the Congress in a progressive direction.”

কিন্তু পন্থ-প্যাটেল-রাজেন্দ্রপ্রসাদ ইত্যাদির অসহযোগিতায় সুভাষচন্দ্র যখন সভাপতি-পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন (এপ্রিল ১৯৩৯), রবীন্দ্রনাথের পূর্ণ সমর্থনের তারবার্তা এল –“The dignity and forbearance which you have shown in the midst of a most aggravating situation has won my admiration and confidence in your leadership. The same decorum has still to be maintained by Bengal for the sake of her own self-respect and thereby to turn your apparent defeat into a permanent victory (The Statesman/4-5-1939). রবীন্দ্রনাথের শেষ বাক্যের শব্দচয়ন লক্ষ করার মতো – ‘to turn your apparent defeat into a permanent victory’। অবশ্য বাংলা তথা নিজের আত্মসম্মান বিস্মৃত না হওয়ার দ্বিধাহীন সমর্থনটা কবির কাছ থেকে আগেই পেয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র। কবি ২।৪।৩৯ তারিখে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন – “সমস্ত দেশ তোমার প্রত্যাশায় আছে – এমন অনুকূল অবসর যদি দ্বিধা করে হারাও তাহলে আর কোনোদিন ফিরে পাবে না। বাংলাদেশ থেকে তুমি যে শক্তি পেতে পার তার থেকে বঞ্চিত হবে, অন্য পক্ষও চিরদিন তোমার শক্তি হরণ করতে থাকবে। এত বড়ো ভুল কিছুতেই কোরো না। তোমার জন্য বলছি না, দেশের জন্য বলছি। মহাত্মাজী যদি শীঘ্রই তাঁর শেষ বক্তব্য তোমাকে জানান দৃঢ়ভাবে সেই দাবী করবে। যদি তিনি গড়িমশি করেন তাহলে সেই কারণ দেখিয়ে তোমরা পদত্যাগ করতে পারবে। তাঁক বোলো শীঘ্রই তোমাকে ভবিষ্যতের কর্তব্য স্থির করতে হবে, অতএব আর বিলম্ব সইবে না।”

সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি এবং বিধান রায়-প্রফুল্ল ঘোষ-সতীশ দাশগুপ্ত ইত্যাদি নেতৃবৃন্দের তীব্র বিরোধী মনোভাবকে কোনো তোয়াক্কা না করেই ঠিক এই সময়েই রবীন্দ্রনাথ ‘দেশনায়ক’ প্রবন্ধ লিখলেন, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রিক সম্বন্ধ’ নিয়ে সুভাষচন্দ্রকে অভিনন্দিত করতে চাইলেন ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ তারিখ। এর আগে জানুয়ারি মাসের ২১ তারিখে শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে কবি সম্বর্ধনা জানালেন ‘বন্ধু’ সুভাষচন্দ্রকে। উত্তরে কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সুভাষচন্দ্র ভাষণ দিলেন। অবশ্য কবির ইচ্ছা সত্ত্বেও কলকাতার সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানটি তখন করা যায়নি। সুভাষচন্দ্রের উদ্যোগে কবি ‘মহাজাতি-সদন’-এর (নামকরণ কবিকৃত) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। তখন সুভাষচন্দ্রকে ঘিরে ঘটনা ঘটেই চলেছে যেখানে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারছেন না। অন্যায় এবং অগণতান্ত্রিকভাবে সুভাষচন্দ্রকে যখন কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হল, বেদনাহত কবি গান্ধীজিকে তারবার্তায় দাবি করলেন (২০।১২।৩৯) – “Owing gravely critical situation all over India and specially in Bengal would urge Congress Working Committee immediately remove ban against Subhas and invite his cordial co-operation in supreme interest national unity.”
সেদিন গান্ধীজির কাছেও উপেক্ষিত রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্রকে সংযমী হবার পরামর্শ দিয়ে ওয়ার্ধা থেকে তাঁর কাছে তারবার্তা এল (২২।১২।৩৯) – “Your wire was considered by working committee. With knowledge they have they are unable lift ban. My personal opinion is you should advise Subhasbabu submit discipline if ban is to be removed. Hope you are well.”

এই অসময়ে সুভাষচন্দ্রের পাশে অভিভাবক হিসাবে, বন্ধু হিসাবে একমাত্র দাঁড়িয়েছেন রবীন্দ্রনাথই। কোনো কল্পনা নয়, বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ানো তাঁর ‘দেশনায়ক’কে ‘তাসের দেশ’ উৎসর্গ করার সময় অভয় তো দিয়েই রেখেছেন, “যদি মাতে মহাকাল, উদ্দাম জটাজাল ঝড়ে হয় লুণ্ঠিত, ঢেউ উঠে উত্তাল, / হয়ো নাকো কুণ্ঠিত, তালে তার দিও তাল – জয়-জয় জয়গান গাইয়ো।” সে-দিন কবি এতটাই সুভাষচন্দ্রকে অন্তরে ঠাঁই দিয়েছেন, এতটাই তাঁর পাশে দাঁড়াতে উদগ্রীব যে, সুভাষচন্দ্রকে ঘিরে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে প্রয়োজনে বিকল্প নেতৃত্বের প্রশ্নটিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা চিঠিতে (২০।৫।৩৯) কবির সাংঘাতিক মন্তব্য লক্ষ করুন –“এ কথা জানি যাঁরা শক্তিশালী তাঁরা নতুন পথে অসাধ্য সাধন করে থাকেন। মহাত্মাজীই তার প্রমাণ। তবু তাঁর স্বীকৃত অধ্যাবসায়ই চরমতা লাভ করবে এমন কথা শ্রদ্ধেয় নয়। অন্য কোনো কর্মবীরের মনে নতুন সাধনার প্রেরণা যদি জাগে তাহলে দোহাই পাড়লেও সে বীর হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না।” এই ইঙ্গিত দিয়েও এখানেই থামতে মন মানলো না কবির। তাই অন্তিম আশা আর আশীর্বাদ দিয়ে চিঠিটা শেষ করছেন – “…যে বাংলাকে আমরা বড়ো করব সেই বাংলাকেই বড়ো করে লাভ করবে সমস্ত ভারতবর্ষ। তার অন্তরের ও বাহিরের সমস্ত দীনতা দূর করবার সাধনা গ্রহণ করবেন এই আশা করে আমি সূদৃঢ়-সঙ্কল্প সুভাষকে অভ্যর্থনা করি এবং এই অধ্যাবসায়ে তিনি সহায়তা প্রত্যাশা করতে পারবেন আমার কাছ থেকে, আমার যে বিশেষ শক্তি তাই দিয়ে। বাংলা দেশের সার্থকতা বহন করে বাঙালী প্রবেশ করতে পারবে সসম্মানে ভারতবর্ষের মহাজাতীয় রাষ্ট্রসভায়। সেই সার্থকতা সম্পূর্ণ হোক সুভাষচন্দ্রের তপস্যায়।”

এখানে একটা কথা বলতেই হয়, সে-দিন সুভাষচন্দ্রের প্রতি গান্ধীজির বিচার যথার্থ হলে ভারতের ইতিহাসটা অন্যভাবে লেখা হোত। আমাদের দুর্ভাগ্য। আর এই চরম সত্যটা সুভাষ-কথিত ‘জাতির জনক’ উপলব্ধি করেছিলেন, তবে অনেক দেরিতে – ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কালিমালিপ্ত অধ্যায়ে। তখন তাঁর ‘mahatma-ship’-এ পাড়ি দেওয়ার মতো ‘yes men’-রা হয়ে গেছেন ‘no men’ ।
২ জুলাই ১৯৪০ সকাল ১১টায় কবির সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলেন সুভাষচন্দ্র। এর কিছুক্ষণ পরেই ভারতরক্ষা আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রেসিডেন্সি জেলে প্রেরণ করা হল। ১১ জানুয়ারি ১৯৪১, যখন আর পাঁচদিন পরেই গৃহবন্দী অবস্থায় তাঁর অন্তর্ধানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত, অসুস্থ কবিকে বিরক্ত না করে তাঁর সম্পর্কে উদ্বেগ আর শেষ শ্রদ্ধাটুকু জানিয়ে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি লিখলেন সুভাষচন্দ্র। অবশেষে ১৬ জানুয়ারি ঘটে গেল সেই ‘মহানিষ্ক্রমণ’। উদ্বিগ্ন কবির তারবার্তায় বিব্রত শরৎচন্দ্র বসু যতদূর সম্ভব সত্যের কাছাকছি গিয়ে উত্তর দিতে চেষ্টা করে তার করলেন, “Mother and we profoundly touched by massage. No news Subhas yet despite utmost efforts last few days. Hope he will have your blessings wherever he may be.” তবু কবির মন মানে না। অনিল চন্দকে পাঠালেন শরৎচন্দ্র বসুর কাছে, বিস্তারিত জানতে। কবির মন তখন বড়ো অস্থির, অশান্ত। দুইজনের সম্পর্কে কেন্দ্র করে কত বিভ্রান্তিকর সংবাদ বিভিন্ন মহল থেকে অতীতে প্রচারিত হয়েছ। কখনো কখনো সুভাষচন্দ্র কবির উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন; আবার কবিও বলেছেন, “মোকাবিলায় সুভাষকে কখনো ভর্ৎসনা করিনি তা নয়, করেছি তার কারণ তাঁকে স্নেহ করি।…তাঁর কোন্ অভিপ্রায় কোন্ প্রণালীর সুদূর পরিণতি লক্ষ করে চলেছে তা আমি জানিনে, কেন না পলিটিক্স আমার অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বাইরে।” কিন্ত জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কবির আশীর্বাদই বর্ষিত হয়েছে সুভাষচন্দ্রের যাত্রাপথে। আফগানিস্থান হয়ে অনেক বিপদসঙ্কুল পথ অতিক্রম করার পর সুভাষচন্দ্র নির্বিঘ্নে ইউরোপে পদার্পন করে গোপনে শরৎচন্দ্র বসুকে খবর পাঠালে শরৎবাবু শান্তিনিকেতনে গিয়ে অসুস্থ কবিকে প্রকৃত ঘটনা জানিয়ে এলেন। কবি জেনে গেলেন, এটুকুই সান্ত্বনার। এর পরের উপাখ্যানের জন্য অপেক্ষা না করে আর সাত মাস পরেই এসে গেল ২২শে শ্রাবণ।

মৃত্যুর একেবারে দোরগোড়ায় এসে রবীন্দ্রনাথের শেষ গল্পটা ‘প্রবাসী’তে (আষাঢ় ১৩৪৮) প্রকাশিত হল –‘বদনাম’। যাঁরা গল্পটা পড়েননি এখনও তাঁরা একেবারে শেষটুকু এখানে পড়তে পারেন, যেন সেই চেনা ছবিটার কোথায় একটা রেশ! বিপ্লবী অনিল মিত্র পুলিশ-কর্তা বিজয়বাবুকে যে-কথা বলছে – “…একটি কথা আপনাদের জানিয়ে রাখি, আমাকে আপনারা বাঁধতে পারবেন না। রবিঠাকুরের একটা গান আমার কণ্ঠস্থ – ‘আমারে বাঁধবি তোরা সেই বাঁধন কি / তোদের আছে!’ হঠাৎ গেয়ে উঠল বিদেশী গলায়, মন্দিরের ভিত থর্ থর্ করে কেঁপে উঠল গলার জোরে। অবাক হয়ে গেলেন ইন্সপেক্টারবাবু।
‘এই গান অনেকবার গেয়েছি, আবার গাইব, তার পরে চলব আফগানিস্থানের রাস্তা দিয়ে, যেমন করে হোক পথ করে নেব। আপনাদের সঙ্গে এই আমার কথা রইল। আর পনেরো দিন পরে খবরের কাগজে বড়ো বড়ো অক্ষরে বের হবে, অনিল বিপ্লবী পলাতক… ।’”

শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে । কবির মৃত্যুতে সুভাষচন্দ্রের কী প্রতিক্রিয়া? কেউই কখনও এই প্রশ্নটা তোলেননি। মনে অবিরত আলোড়ন তোলা এই প্রশ্নটা একদিন Netaji Research Bureau-তে সুযোগ পেয়ে করেছিলাম সুগত বসুকে। উত্তর পেলাম যে, সে-দিন সম্ভব ছিল না, যেহেতু Orlando Mazzotta ছদ্মনামে সুভাষচন্দ্র তখনও আত্মগোপনের পর্যায়ে রয়েছেন। আরও বললেন, পরে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সুভাষচন্দ্রের বক্তব্য আছে। কিন্তু সে-দিন তাঁর কাছে যা আমার জানার সুযোগ হয়নি – সেটা কোথায় আর কখন? পরে দেখলাম, সুগতবাবুই তো লিখছেন – বার্লিনে পৌঁছেই (২।৪।৪১) সুভাষচন্দ্র এমিলিয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, ইম্পিরিয়াল হোটেলে জার্মান বিদেশ মন্ত্রী রিবেনট্রপের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন (২৯।৪।৪১), রোমে যাচ্ছেন (২২।৬।৪১), বার্লিনে ফিরছেন (১৭।৭।৪১); এবং সবথেকে বড় কথা শিশির-শরৎ বোসের সঙ্গে গোপনে যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। আমার প্রশ্ন, অগাস্ট্ মাসের ৭ তারিখ তো এসেই গেছে; তখনও কি জার্মানিতে বসে সুভাষচন্দ্রের অত ব্যস্ততার মধ্যেও আত্মগোপন পর্ব চলছে? তা ছাড়া এই পর্বের পরেও কি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সুভাষচন্দ্রের সত্যি কোনো মন্তব্য/প্রতিক্রিয়া আছে, যেমন কস্তুরবা গান্ধীর মৃত্যুতে (২২।২।৪৪), যখন বার্মা থেকে শোকসন্তপ্ত সুভাষচন্দ্র একেবারে ওই দিনই তাঁর শ্রদ্ধাঞ্জলি ‘HOMAGE TO MOTHER OF THE INDIAN PEOPLE’ নিবেদন করছেন? জানি না, না-জানা পর্যন্ত অস্বস্তিটা থেকেই যাবে।
(২য় ও শেষ পর্ব সমাপ্ত)
গ্রন্থ ঋণ –
১) রবীন্দ্রজীবনী ৩-৪/প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ২) রবিজীবনী ৭-৯/প্রশান্তকুমার পাল ৩) ভারত পথিক/সুভাষচন্দ্র বসু ৪) চিঠিপত্র ১১/বিশ্বভারতী ৫) রবীন্দ্র-রচনাবলী – ২, ৯ (পঃবঃসঃ ১৯৮২, ১৯৮৮) ৬) ভারতে জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ(৬)/নেপাল মজুমদার ৭) রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র/নেপাল মজুমদার ৮)সম্পর্কের ত্রিকোণ, রবীন্দ্রনাথঃ সুভাষচন্দ্র, জওহরলাল, গান্ধী/সুরজিৎ দাশগুপ্ত ৯) সাহিত্য সংখ্যা দেশ–১৩৮৩ ১০) Indian Struggle/Subhas Ch. Bose ১১) Selected Speeches of Subhas Ch. Bose/ Pulication Division. ১২) His Majesty’s Opponent/ Sugata Bose ১৩) Essential Writings of Subhas Ch. Bose/ Ed: Sisir K Bose & Sugata Bose ১৪) Letters to Emilie Schenkl/ Ed: Sisir K Bose & Sugata Bose ১৫) A Bunch of Old Letters/ Ed: Jawharlal Nehru. ১৬) The Visva-Bharati Quarterly/ Nehru Number ১৭) The visva-Bharati Quarterly/ Gandhi Number ১৮) The Mahatma and the Poet/ Sabyasachi Bhattacharya.
অনবদ্য! ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথ ও দেশনায়ক সুভাষচন্দ্রের সম্পর্কের ক্রমবিবর্তনের ইতিবৃত্তের একটি সুসংহত বীক্ষণ। তৎকালীন রাজনীতির জটিল আবর্তে সুভাষচন্দ্রের প্রতিপক্ষের স্পষ্ট বিরোধিতায় একা রবীন্দ্রনাথ নির্ভীকচিত্তে তাঁর তরুণ বন্ধুটিিকে স্নেহদানে সম্মানে অভ্যর্থনা করেছিলেন। তাই কবির তিরোধানে সুভাষচন্দ্রের প্রতিক্রিয়াটি কেমন হয়েছিল সেই অনুত্তরিত প্রশ্ন বড় বেদনার মতো বেজে চলবে বাঙালীর মনে। এমন একটি নিবন্ধ উপহার দেওয়ার জন্য হিমাদ্রিবাবুকে শ্রদ্ধা জানাই।
আপনার মতামত আমাকে প্রাণিত করে।