শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

মকর পরব আসিচে ঢেউ মাইরে

ইতুর – ঘট মালসা, ভাসান দিয়ে নব অন্নে নবান্ন শেষ হয়েছে প্রায় এক মাস হলো। এখন খামারে সারি সারি শ্রী যুক্ত খড়ের পালোই, মরাই জঠরে টইটম্বুর দুধেল ধান। ক্ষেত প্রসবিত শালিনী শস্যের শেষ স্বাস্থ্যবতী আঁটি যত্নে কাঁধে নিয়ে অনিল মুর্মু বাড়ি ফিরছে। ওই তো ওর ‘দিনিমাই’। ওকে নিয়েই তো অনিলের নাবালিকা ফুলকি ‘টুসু’ পাতবে। মেঠো কুলুঙ্গির গায়ে আল্পনা দিয়ে এক তাল শুদ্ধ গোবরের ওপর ঢাকোন প্রতিষ্ঠা করবে। তাকে প্রকৃতি অনুরূপ করতে সাজিয়ে তুলবে আতপ চাল, দুব্বো, শাল গাছের বাদু ফুল দিয়ে। সপ্ত প্রদীপে, চিঁড়ে ভোগ দেবে প্রতিদিন, এক মাস, পৌষ মাস। গান গাইবে – ‘বল মা আমার মন কেমন করে/ যেমন শোল মাছে উফাল মারে.’

ফুলকির অর্চিত মা কোনো দশভুজা, চতুর্ভূজা নন। সেই প্রাগৈতিহাসিক হরপ্পার যুগ থেকে তিনি ওই যে কুয়াশা খামে খাল পাড়ের মাঠ, সর্ষে বোনা ক্ষেত, এঁটেল আলের জ্যামিতি, তিনি ওই যে সীতা প্রসবিনী – শীতলা ধরিত্রী : গ্রীষ্মকালে যাঁর ঘাড় বেয়ে শুকনো চুলের জটা নামে, বর্ষায় যিনি রজঃস্বলা হন, হৈমন্তী শীতে যিনি পোয়াতি পেটে ধারণ করেন আগামী বসন্তের ফুল্লরা উচ্ছাস।
ফুলকি তার সেই মাকে গান গেয়ে উথাল পাথাল, আকুলি-বিকুলি-কামনায় – ধূলি মনের কথা জানায়।
‘ভালোবাসার ভিতর – কানে খোল জমেছে
বুক উথাল ঢেউগুলার নাচন কমেছে।
মা রে তুই আমার বেথা বুঝিস না ক্যানে
মিন্সে আমার টোপর পড়ে আসিবে কোন খ্যানে।
বিহানে টেন সিটি মেরে টেসান ছেড়ে গেলো
চাক ভেঙে মধু খেতে মরদ না এলো।’

‘টুসু’ শব্দের ব্যাকরণগত বুৎপত্তি সম্পর্কে মতামত ভিন্নধর্মী। তবে সেই নিরিখে স্বাভাবিকক্রমে উঠে আসে অন্তজ শ্রেণীর আচার বিশ্বাসের মেঠো চিত্রপট।
১) এই শস্যোৎসবে ধানের খোসা তুষ একটা বড় উপকরণ। তাই ‘তুষ’–এর সঙ্গে আদরার্থক উ-প্রত্যয়যোগে ‘তুষু’ নামটি এসেছে।. . . ‘তুষু’ থেকে ‘টুসু’—দন্ত্যবর্ণের এই মূর্ধন্যবর্ণে পরিণত হওয়া নিয়ে প্রকৃতপক্ষে কোন বিরোধ নেই।
২) ‘টুসু’ নামকরণের পিছনে কোল (Austro Asiatic) গোষ্ঠীর ‘টুসা’ (টুসাউ) শব্দটির প্রভাব থাকতে পারে। কোল ভাষায় এর অর্থ হল—ফুলের গুচ্ছ। যৌবন ও সৌন্দর্য্যের প্রতীক। স্মর্তব্য – সাঁওতালি ভাষায়,’বাহাটুসু’ শব্দের অর্থ – ফুলের গুচ্ছ।
৩) কুর্মালি ভাষায়, ‘তুই’ অর্থে সূর্যের সর্বোচ্চ অবস্থান আর ‘সু’ অর্থে সূর্য। মকরে সূর্যদেব সর্বদক্ষিণস্থ অবস্থানে পৌঁছে শুরু করেন তাঁর উত্তর যাত্রা। দিন দীর্ঘায়িত হয়,শীত কুয়াশা কাটিয়ে পৃথিবী ফিরে হয়ে ওঠে তেজস্বী, সূর্যস্বী। হরপ্পায় নাকি এমনি দিনে ওরা সব নগরবাসি সিন্ধুস্নানে সূর্য উৎসব করতো। মকরের স্নান , টুসু উৎসব নাকি সেই দিন থেকে কালের যাত্রায় বয়ে আসা লোকাচারের, আত্মবিশ্বাসের ঢেউ।
সেই ঢেউ লাগে ফুলকির সদ্যজাগ্রত কটিতে, চোখমুখের ছটায় , ধনাকাকার খামারে বাঁশি মাদলের মহলায়ে। হীম জ্যোৎস্নায় গরম আলু পোড়ায়ে কাঁচা লঙ্কা চিপে সে গুনগুনিয়ে ওঠে –
মকর পরব আসিচে ঢেউ মাইরে
হাঁড়িয়াতে টুকচা চুমুক দুবক লাইরে
লাইচবো মোরা ঘুরাইন ঘুরাইন জ্যোৎস্না রাতে
মরদ আমার শিকল গুলান পরেচে হাতে।

বাঁশের কঞ্চি আর লাল কমলা হলদে সবুজ কাগজ আর পুঁতির মালা দিয়ে সে বানাতে শুরু করে ‘চৌড়াল’ : চৌ + উড়াল ; চতুর্দিক + উড্ডীন ; সূর্য্যযান – যাতে চড়ে টুসুলক্ষ্মী সংক্রান্তিতে বাপের বাড়ি থেকে বিদায়ে নেবে। ফুলকির সই পার্বতীও যত্ন করে জমানো পয়সা দিয়ে চৌড়াল বানিয়েছে। কার চৌড়াল কত ভালো কত আকর্ষণীয় সেই নিয়ে দুজনের মধ্যে রেষারেষিও প্রচুর। কেননা ওদের বিশ্বাস – যার চৌড়াল যত ভালো তার পুরুষ হবে ঠিক ততটাই সাহসী, পরাক্রমী, হবে পুরুষকার। যদিও যে যমুনাদিদির চৌড়াল দেখতে গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়তো তার মরদের ব্যাটা বিয়ানোর ক্ষমতা ছিল না। সারাদিন মহুয়া গিলে কাঁসাইয়ের পাড়ে পড়ে থাকতে থাকতে এক বিহানে তাকে গোখরো এসে নীল পাথর করে দিয়ে গেলো। যমুনাদিদি কেঁদেছিলো খুব। পরে আত্মহত্যাও করেছিল। অঞ্চল প্রধান সূর্য মাহাতোর ব্যাটা ওকে নাকি পোয়াতি করবে বলেছিলো।

দেউলপুরের কাঁসাই শীতকালে কঙ্কালসার ,পাথরসার হয়ে পরে। তবু মকরের দিন সে ঝলমলে স্ফটিক প্রতিমা সুন্দরী। তার ব্যাঁকা নদী আজ ঢেউয়ে ঢেউয়ে উদ্বেল। তার উজিয়ে ওঠা বালি আর কাঁকরের পাড় জুড়ে ব্রত উদযাপনের তৎপরায়ণতা। ভিড় করেছে সবাই – বামুন , কায়েৎ , বদ্দি , হাঁড়ি , মুচি , দুলে , বাগদি , সাঁওতাল। কাঁসাই যে জাত জানে না ; সে যে সবার আলেই জল ঢালে , সে যে সবার ক্ষেত্রকেই ফসলবতী করে তোলে। কেউ সায়ার দড়ি বুকে বেঁধে হাঁটু জলে ডুব দিচ্ছে ,কেউ কালচে মুখ প্লাষ্টিকের আয়নায় রেখে কাঠের চিরুনির ডগায় সিঁদুর পরে টকটকে বৌ’টি হচ্ছে , কেউ হাঁড়িয়ার বোতলে মজে বানাম (সারেঙ্গির মতো সংগীতযন্ত্র ) বাজিয়ে গাইছে –
তোকে খাওয়াবো করি যতন
মকর দিনে রইলো নিমন্ত্রণ
কলাপাতায় পিঠা দোবো , বোতলেতে হাঁড়ি
নেশা হলে নেবু দোবো এস আমার বাড়ি।

সাঁকো পেরিয়ে বন্ধুদের নিয়ে ফুলকিও নদী পাড়ে এসেছে। হাতে হাতে ধরাধরি করে এনেছে তিন তালা চৌড়াল, চেলি কাপড়ে মোড়া ঢাকোন, গেন্দার মালা পড়া টুসু। বিসজ্জন হবে। সবাই গান ধরেছে – আমার চার পয়সা আনা নাই / আমাদের টুসু জলকে যাবেক লাই।
গান আর নিয়মবিহীন হাসি শুনে কথা নেই বার্তা নেই, জীপ গাড়ি করে আসা এক শহরে গড়া বাবু, লম্বা চোঙের ঝলসানো ক্যামেরা নিয়ে হুড়পুড়তে তাদের ছবি তুলতে শুরু করে দিলো। বাবু যত তেড়ে বেঁকে ক্লিক ক্লিক তোলে ফুলকিদের হাসির আগল ততই ভাঙে। রঙ্গ দেখে একসময়ে বাবুকে ডেকে ফুলকি জিগ্গেস করে – এ বাবু , ইতো ইতো ছবি তুলছিস, কটা পয়সা দিবিক লাই। পরবের দিনে বাদাম ভাজা খাবো। আজকে আমাদের লববর্ষ বটেক। গান্দি – আসেন।

ভদ্রতার ঠুলি পড়ে ফুলকির কথা বাবু রেখেছিলো। দামি চামড়ার কালো পার্স থেকে দশটাকা ধরে দিয়েছিলো। ওতেই ওদের কি আনন্দ ! যেন পুরো আকাশটাকে পেয়ে গেছে পকেটে। সরল থাকতে সত্যি কি খরচ অনেক ! ফুলকিরা তো জন্ম থেকে অল্পতেই খুশি, যতই তাদের গেঁয়ো বলে দিন রাত্তির দুষি।

ছপছপিয়ে ওদের বিসজ্জনের নাবালিকা মিছিল পৌঁছুলো সাঁকোর নিচে, এক কোমর জলে। উলু আর শাঁক শব্দে, টুসু ভাসলো, বাহক চৌড়ালও। ভারপ্রাপ্তা সূত্রধারিনী -কাঁসাই, ওদের বুকে করে চিৎ সাঁতারে নিয়ে চললো মোহনায়, নবসৃষ্টির সাগরে : সেখানে সূর্য আর জল মিশে উর্বর করবে মাটি, অংকুরিত হবে স্বপ্নবীজ, ফলিত ফসলের দুধেল শরীর হাঁটু সামনে কটি পিছনে করে নাচবে, শরীরে শরীরের একমাত্র মোহন ছায়া মেশাবে ভালোবাসার ফসলোৎসবে।
সেদিনের সে উৎসব রাতে কুয়াশা মেখে জ্যোৎস্না-স্নান করেছিল কিছু কিছু পাহাড় , অন্যরা জ্বলে উঠেছিল দৃপ্ত মশালের আলোয়। কোনো এক চ্যাটালো পাথরের ওপর আমরা ক’জন শুনেছিলাম বাঁশি আর মাদলের ‘ধিতাং না তিন’ কথা। দেখেছিলাম দেউলপুরের মন্দিরের গায়ে পুরানের কুশীলবরাও নাচের তালে তালে দুলছে। সুঠাম দেহের নাচ। উদ্ধত বুকের কম্প , গর্বিত কটির ঝম্প , ব্যাকুল বাসনার আর্তি , সব মিলে নাচ নাচ নাচ। চারিদিকে শিরশিরে শিশিরে ছড়িয়ে পড়েছিল আগে – না – দেখা পবিত্রতার সোচ্চার অহংকার। দেখেছিলাম সৃষ্টির প্রথম মানব সন্তানের সেই অমৃতপিয়াসী মুখ। আজ সে মৃত্তিকার মতো , মৃত্তিকার মুখোমুখি , নিরাভরণ। অন্ধকারে আজ আরো একবার ফসলের আবেগে ঘন বর্ষণের ধারার মতো নেমে এলো তার গভীর চুম্বন প্রকৃতির ওষ্ঠে। সৃষ্টির কারণেই চির সনাতন এই কৃষিকাজ। মানুষের সুখের শ্রম।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x