শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

“সিগারেট ?”
“না থাক। বিড়িটাই ঠিক আছে। ওটাই কাজ করবে । “
“হুইস্কি – স্কচ ?”
“বুকের লোম উঠে যাবে।”
মুখ ফিরিয়ে পড়ন্ত বিকেলের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকা। ছলাৎছল্‌ ছলাৎছল্‌। মন দরিয়ায় নাও বাইয়া কেডা যায়! কোথা যায়!
এক ঝটকায় বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। জ্বলন্ত ছাই ছিটকে পড়ল মাটিতে। অট্টহাসি। বারুদের গন্ধ। নিজেকেই বিদ্রুপ। নিস্তব্ধতা। গোধূলির আলো মুখে পড়ে। যেন পুরনো ক্যানভাসে শুকনো রক্তের ছোপ।
“ওরা সত্যটারে বাজারে নামিয়েছে। হাতে গোমেদ, চুনি পরে ওরে গুদামে পাচার করে দিয়েছে। সেখানে ধুলোর ধ্যাষ্টামো। সারাটা জীবন ওরে দেখতে চেয়েছি ভোরের শান্ত সমাহিত শালবনে …
“আপনার যুক্তি তক্কো’র শেষ রিল।”
“ওয়েল ! আমি স্পিকটি নট। আপনারা ভাবুন। বুঝুন। অন্য কোনো বাপের ব্যাটা নয়, শেষে গুলিটা আমার পেটেই তো লাগলো। তবু আমি উঠে দাঁড়িয়ে মদন তাঁতির গপ্পোটা বলতে ছাড়িনি। আর কজন পারবে আমি জানি না, জানতেও চাই না। সব ব্যাটাকে চিনি। দেখুন, ডেসটিনি ফেসটিনি মানি না। ওটা আমার কোনো আপোষ না করার কম্পালশন। কাম হোয়াট মে ! “
“আপনি মাইকেলীও সিন্ড্রোমে ভোগেন।”
“হারামজাদা। কিছু বুজতে না পারলেই গোঁজামিল দিয়ে মিলিয়ে দেওয়া – তাই না ? যত্তোসব ফুঁকো ফিচলেমি । এইটা মাইকেল, ঐটা রবি ঠাকুর, এটা দ্বান্দ্বিক, ওটা ধ্বান্ধিক – সুবিধে মতো কোনো একজনের পিছনে গুঁজে দিয়ে বগল বাজানো – তাই না , ভাইডি?”
“তাহলে বলবো আপনার পোজ। সোজা ভাষায় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ভড়ংবাজী “
“আই উইল নট রিঅ্যাক্ট। শুধু একটু চারিদিক চাইয়া দেখো – মদতপুষ্ট সাংস্কৃতিক তলোয়ারগুলো কেমন নিপুণ হাতে শিল্পকে বেশ্যা বানিয়েছে — নাম দিয়েছে ‘বাজার’! “
“আপনার সেকেলে সব শিল্পের মানেগুলো পাল্টে গেছে , বদলে গেছে ।”
“শালা আহাম্মুক ! ওটা বদলায়নি, বিক্রি হয়ে গেছে গিয়া। “
“থামুন ! এসব ছাইপাঁশ ঢেলে কি প্রমাণ করতে চাইছেন ?”
“আমার বিষ খাবার সাহস আছে। “
নীলকণ্ঠ বাগচী ঢকঢক করে টাগরাতে মদ ঢেলে ছিপিখোলা বোতল ঝোলার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখে। হাঁটতে শুরু করে। বুর্জুয়া বঙ্গসংস্কৃতির স্টিলের তারে তৈরী মাকড়সার জাল ছিঁড়ে অবশেষে একজন পেতিবুর্জুয়া সত্যি সত্যি বেরিয়ে পড়েছে , গলি থেকে রাজপথে , ইনকুইজিটিভ জীবন সাধনার পরিক্রমায় | সৃষ্টির অন্বেষণে অক্লান্ত অনন্ত পদাতিক। প্রেরণা – উপনিষদের বাণী ‘আত্মানাং বিদ্ধি’; ‘চরণ বৈ মধুবিন্দতে চরণ ঋমধুস্বরম। সূর্যশঃ পশ্য প্রেমানাং যতন্দ্রিয়তে চরণ’। ভারতীয় জনমানসের মূলীভূত চেতনার অন্তঃশীল জীবনপ্রবাহকে ছুঁতেই হবে, বাগিয়ে ধরতেই হবে। মার্কস এই খোঁজাকেই তো বলেছিলেন – ফাইন্ডিং দ্য নিউয়েস্ট ইন হোয়াট ইজ দ্য ওল্ডেস্ট ।

নীলকণ্ঠ বাগচী – যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো

পুরো দৃশ্যটা অপর-ঋত্বিক তুললেন ‘আঠারো লেন্স’ দিয়ে। ওটা নিয়ে উনি, এবং একমাত্র উনিই ছেলেখেলা করতে পারতেন। ওঁর খুব প্রিয় ছিল এই লেন্স – যেখানে ডেপ্থ অফ ফিল্ড অনেক বেশি , কাছের সব কিছু যেমন স্বচ্ছ থাকবে তেমনি দূরত্ব থাকবে পরিষ্কার , নইলে জ্বালা-যন্ত্রণার ক্যানভাস প্রচন্ড দাপটে গ্রীষ্মের দাবদাহ হবে কি করে; অচলায়তন ভেঙে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের মুখে , আধাভৌতিক ক্ষুধিত পাষাণের বুকে দমকা ঘুষি মারা যাবে কি করে? ঋত্বিকীয় মানসিকতা, পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় যেটা ছিল –
“চাই না সহজ সুখের আস্তাবল
চাই না জাবর কাটা দিন আর ভাবলেশহীন দৃষ্টি;
এই ল্যাজের ঝাপটায় মাছি তাড়ানো , আর –
লক্ষ্যহীন অপেক্ষা – ।“
পরবর্তী লোকেশন | টপ শটে স্বরোজদার আখড়া। সময় – রবিবার , দুপুর। দেয়ালে অনিল সাহার ফ্রেস্কো। মাধব এই মাত্র চা দিয়ে গেলো। তিন নম্বর রাউন্ড চলছে। হাতে হাতে সিগারেট, বিড়ি জ্বলছে। টেবিলে রবিবাসরীয়তে ঋত্বিকের ছবি উড়ছে। আড্ডা চলছে। চায়ের ভাপে ঝাপসা চশমা পাঞ্জাবিতে মুছে নিয়ে, সুপ্রিয় বলল : “আমার মতে, ঋত্বিক ঘটক আর জঁ লুক গদার— দু’জনেই সিনেমাকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। গদারের সিনেমা ছিল তাত্ত্বিক প্রতিবাদের ভাষা — ব্রেখটীয় দূরত্ব, দর্শককে ভাবিয়ে তোলার কাঠামো। ঋত্বিকের ছবিতে প্রতিবাদটা ভেতর থেকে প্রলয়ে গতিতে বেরিয়ে আসে — ব্যক্তিগত ক্ষরণ, ইতিহাসের অভিশাপে রক্তাক্ত। “
গম্ভীর কণ্ঠে সোনা মাথার চুলকে পিছনে ঠেলে যোগ দিল, “কিন্তু গদার ছিলেন একজন নিঃসঙ্গ তাত্ত্বিক, অন্যদিকে ঋত্বিক – যন্ত্রণার দার্শনিক। মেঘে ঢাকা তারা বা সুবর্ণরেখা -তে তিনি শুধু সমাজ দেখাননি, দেখিয়েছেন সমাজের ভিতর মানুষের টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টাকে। ওখানে মার্কস আছে, আবার উপনিষদও আছে। গদারের Breathless বা Pierrot le Fou-র মতোই তো ওর ‘কোমল গান্ধার’ বা ‘সুবর্ণরেখা’ কথায় কথায় ফর্ম ভাঙছে, গল্পের বাইরে চলে যাচ্ছে। যেন প্রতিবাদের নন্দনতত্ত্ব!”
জানলার পাশে বসে সজলদা এতক্ষণ বাইরে একটা তার ছেঁড়া বেহুঁশ ট্রামের দিকে তাকিয়ে ছিল। কথাগুলো কানে আসতেই চুরুটের ছাই ঝেড়ে বললে – “একটা কথা মনে রেখো — ঋত্বিকের সিনেমা কোনো ‘ইন্টেলেকচুয়াল স্টেটমেন্ট না। ওটা আত্মার আর্তনাদ। “
মোবাইল কেটে সুপ্রিয় বললে, “কিন্তু দেখুন, অ্যান্টোনিওনির সঙ্গে ওর একটা আত্মীয়তা আছে। L’Avventura বা La Notte-এর চরিত্ররা যেমন নিজেদের নিঃসঙ্গতায় হারিয়ে যায়, তেমনি ঋত্বিকের নীতা বা ঈশ্বর — তারা নিজেদের ভেতরেই ভাঙে। পার্থক্যটা শুধু— ঋত্বিকের চরিত্ররা হারিয়ে যায় সমাজচ্যুত হয়ে, অ্যান্টোনিওনির চরিত্ররা হারায় নিজেদের বিলাসের ভেতরে।”
সজলদা মৃদু হেসে জবাব দিলে, “অ্যান্টোনিওনি নীরবতা ব্যবহার করেন অর্থহীনতার প্রতীক হিসেবে, ঋত্বিক নীরবতাকে ব্যবহার করেন আর্তচিৎকারের পরম প্রতিধ্বনি হিসেবে।”
পাশের টেবিলে থেকে ওমলেট শেষ করে এবার স্বপনের পালা। সবে ইনস্টিটিউটের ডিপ্লোমা ফিল্ম শেষ করেছে। বললে – “আপনাদের মনে আছে ‘মেঘে ঢাকা তারা’–র নীতা, পেছনে রেললাইন, সেই দীর্ঘ ট্রেনের সাউন্ড ? ওই সিনটা তো পাসোলিনির The Gospel According to St. Matthew–এর দৃশ্যের মতোই, তাই না। আলোটা, কনট্রাস্টটা, দারিদ্র্যের নান্দনিকতা — সব মিলছে।”

নীতা (মেঘে ঢাকা তারা)

সুপ্রিয় খালি দেশলাই বাক্সটা নিয়ে ক্যারামের স্ট্রাইকারের মতো টিপ্ করলো কাপের দিকে। টেবিলে জল থাকায় বাক্সটা মাঝ পথে আটকে গেলো। চোখ তুলে বললে, “আমার তো মনে হয় পাসোলিনি ছিলেন ধর্মীয় বিপ্লবী আর ঋত্বিক – সাংস্কৃতিক। পাসোলিনি দারিদ্র্যকে খ্রিস্টের প্রতীক করলেন, ঋত্বিক দারিদ্র্যকে ইতিহাসের সন্তান বানালেন। কাউন্টার ছেড়ে আঁতেল আঁচে গা গরম করতে গোলগাল টাক মাথা স্বরাজদা এসে ওদের পাশে বসলেন। মুখে মৌরি ছড়িয়ে বললেন, “কাল রাতে আগন্তুক দেখলাম। ওই সাঁওতালদের নাচ দেখে বৌ বললে পুরুলিয়া যাবে।”
বাইরে হঠাৎই বিপুল আওয়াজ শুনে ওরা কৌতূহলী চোখে তাকালো। নিশ্চল ট্রাম প্রাণ ফিরে পেয়ে আবার চলতে শুরু করেছে। আর তাই দেখে এক জনৈক অর্ধ উলঙ্গ ফুটপাথবাসী উন্মাদের এনামেলের থালা বাজিয়ে আত্মহারা নৃত্য শুরু হয়েছে।
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সোনা বললে – “জগদ্দল চললো , কি বলো সজলদা। এটার একটা সেলেব্রেশন আমাদেরও করা উচিত । “
“গড়চা নাকি বারদুয়ারী ?” মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলে সুপ্রিয়।
“না আমি একটা অন্য কথা ভাবছি। লাইটারটা দাও”, বলে হাত বাড়ালো সজলদা।
“মানে একেবারে সোজা ওলিপাব ? বিয়ার এন্ড বীফ স্টেক ?” সোনা উৎসাহে ফেটে পড়লো।

ক্যামেরার পেছনে

“না। ভাবছি করুন irony-র কথা। এতখানি কনটেম্পোরারি হয়েও, এই বিস্ময়কর তাতার চিত্রকথক ঋত্বিককে বিশ্বের বাজারে কেউ সেই সময়ে চিনল না। মোরারজি দেশাই কার বা কাদের ইন্সটিগেশনে ‘আমার লেনিন’এর মতো ডকুমেন্টারিকে চেপে দিয়েছিলেন ? কেন নেহেরু সত্যজিৎকেই বেছে নিয়েছিলেন তাঁর সুকুমার সাংস্কৃতিক তলোয়ার হিসেবে ? কেন পার্টি থেকে organised হুইসপারিং ক্যাম্পেইন চালিয়ে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে দর্শকদের ডিস্কারেজ করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ‘কোমল গান্ধার’-এর স্ক্রিনিং ? কেন প্রচার করা হলো – লোকটার প্রতিভা ছিল, কিন্তু হি ইজ মিসগাইডেড, মাল খায় আর টাকা ধার করে আর শোধ দেয় না ? “
“আমরা এমনই আহাম্মক , স্বার্থপর , আত্মঘাতী জাত । নইলে রামকিঙ্করকে খড় কেনার পয়সার অভাবে ক্যানভাস দিয়ে চাল ঢাকতে হয় ! আর ওনার নাম এলো বলে বলি – ঋত্বিকের ছবি কিঙ্করবাবুর মতোই রাফ কিন্তু ম্যাসিভ। কখনো পরিধির কেন্দ্রে আমাদের টানে, কখনো পরিধির বাইরে তা আমাদের প্রসারিত করে, যুক্ত করে।“ আবেগী কণ্ঠে বলে উঠল স্বপন।
“বাকিটা বাইরে এবার” বলে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে কিছুটা ক্লান্ত চোখে মাধব এগিয়ে এলো। হাতে মৌরির প্লেট আর বিল।
আলো নিভলো। পাখা বন্ধ হল। অন্ধকারে কাপের মধ্যে শব্দরা একে অপরের পিঠে নেতিয়ে পড়লো। কোনটা স্বপনের, কোনটা সোনার কিংবা সুপ্রিয়’র আলাদা করে চেনার অবকাশ আর রইলো না। হিসেব মিটিয়ে ওরা বাইরে বেরিয়ে এলো।
রাস্তায় এক ভ্যানে বাঁশের খাঁচায় মুরগিদের ককিয়ে ওঠা শুনে সেই পাগল তখন অচেনা কাউকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে বলছে, “এই দেশটা কারো না, কারো না…।” আর সেই শুনে মুচকি হেসে রোলের দোকানের ছেলেটি আবার গেলাস প্লেট বালতিতে ডুবিয়ে শশা গাজর মিহি করে কাটতে শুরু করে বন্ধুকে বললো, শোন্ কাউকে বলিস না, পরের মাসে কেটে পড়ব।
জীবন, জীবিকার নিরন্তর টানাটানির ছবির রোল। থামে না কিছুই, কিছুতেই । মতের দ্বন্দ্ব, স্বপ্নের ভাঙাচোরা, আদর্শের অবসাদ — সব কিছুর পরও জীবন খণ্ডিত হতে হতে চলতেই থাকে; সে খুঁড়িয়ে ‘জী হুজুর’ করে হোক কিংবা হামাগুড়ি বা পাছদুয়ারী করে হোক।
আর এই নিরন্তর বিকলাঙ্গ চলিষ্ণুতা চেতলার রাস্তায় বসে সম্পূর্ণ বিধস্ত কাল-পীড়িত ঋত্বিক দেখতো আর ভাবতো আর জনে-জনে আকুলভাবে প্রশ্ন ফেরি করে বেড়াতো – এই ভাবে ভেঙে যেতে যেতে শেষ হয়ে যাওয়াটা কি উচিত ? আমরা তো সবাই মিলে কত সুন্দরভাবে জীবনটা শুরু করেছিলাম , এই ভাবে শেষ হয়ে যাওয়াটা কি উচিত ? সেই তীব্র-আকাঙ্ক্ষী প্রহরে আকাশের কোনো এক অচিন ছিদ্র হতে হয়তো ভেসে আসতো গান – “আমের তলায় ঝামুর ঝুমুর কলার তলায় বিয়া আইলারে নয়া জামাই মটুক মাথাৎ দিয়া”
ঋত্বিক তো মিলন চেয়েছিলো — শুধু দুই বাংলার নয়, গোটা পৃথিবীর ভগ্ন নির্বাসিত ছিন্নমূল হৃদয়ের। সে চেয়েছিলো মানুষ, তার স্বপ্ন, তার যন্ত্রণা, তার সংগ্রাম — সবকিছুকে এক সুতোয় গেঁথে জীবনের জয়গান গেয়ে উঠুক ; সে চেয়েছিলো এমন এক জগৎ, যেখানে নির্বাসিতরাও ঘর খুঁজে পাবে, যেখানে শিল্প হবে মানুষের মিলনের সর্বশেষ আশ্রয়। কিন্তু অর্থ ও প্রচার যাবতীয় কূপমণ্ডূকতা, রক্ষণশীলতা , প্রতিক্রিয়াশীল বেনো জলের স্রোত পণ রেখে ঋত্বিককে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। ঢাক পিটিয়ে এই অপকর্মে মদত জুগিয়েছিল বড় মালিকের বড় কাগজ। আর তার একসময়ের কমরেডগণ।
মৃণালবাবুর বাড়ির ছাদে ঋত্বিকের স্মরণসভা ঘটেছিলো। সেখানে বিজনবাবু বলেছিলেন—“ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে।”ঋত্বিককে বুলেট দিয়ে খুন করা হয়নি, ঋত্বিক খুন হয়েছিল নোংরা, স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির কদর্য হাতে। যাঁরা সেদিন পি.জি. গেটে দাঁড়িয়ে সত্যজিৎবাবুর দিকে আঙুল তুলেছিলেন, ‘খুনি’ বলেছিলেন, তাঁরা আসলে সত্য ঢাকতে চেয়েছিলেন। ঋত্বিকের ধ্বংসের মূল কারণ আপনারা—যাঁরা তাঁকে দলে টেনে নিয়ে, পরে একা ফেলে দিয়েছিলেন। আপনাদের এই দাগিয়ে দেওয়ার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক নিষ্ঠুর আত্মপ্রবঞ্চনা।


ঋত্বিক আপনাদের সামনে এক অস্বস্তিকর আয়না ধরেছিলেন। আপনাদের আত্মগ্লানি সঠিক আলোয় দেখতে পেয়েছিলেন; প্রশ্ন করেছিলেন— আপনাদের আন্দোলনের ভিত কতটা সত্য, কতটা শুধু স্লোগান? ১৯৫৪’তে লেখা “অন দ্য কালচারাল ফ্রন্ট” থিসিসে তিনি লিখেছিলেন, “আমরা কাকে নিয়ে, কোন মানুষের কথা বলছি? আমাদের শিল্প কি সত্যিই মানুষের হয়ে কথা বলছে, নাকি পার্টির প্রচারপত্র হয়ে গেছে?” তিনি তীক্ষ্ণভাবে চিনে নিয়েছিলেন ফাটলটা— যে IPTA একদিন মানুষের মুক্তির গান গাইত, সেখানে আজ আত্মতুষ্টি, স্লোগানবাজী আর নিষ্ক্রিয় বুদ্ধিজীবীসুলভ গাম্ভীর্য রাজত্ব করছে। ঋত্বিক দেখেছিলেন, শিল্পীরা মানুষের কাছে নয়, পার্টির অনুমোদনের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
আর তাই তাঁর তীব্র, ব্যথিত কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য—
“It is curious because no Communist artist is working among them; no Communist influence by example is guiding them today. In fact, our artists in those spheres are miserable figures and are glad, for all practical purposes, to remain so. This is curious.
This is not curious, it seems monstrous when we think of our current smug complacency. We are hurrying and bustling and talking and running, and all the while we are actually sitting on the movement. We, the Communist artists.
Not a single art-work of high value has come from us in the last four years. We are reviving our past work, rehearsing and giving it a new name, or else creating Amateur, third-rate work.”
তখন বাংলার প্রায় সমস্ত প্রগতিশীল সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্র নির্মাতা কোনো না কোনোভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ছায়াতলে। তাঁদের চোখে পার্টিই ছিল মুক্তির একমাত্র দিশা। ফলে ঋত্বিক নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন। পাশে কেউ রইলো না।
‘কোমল গান্ধার’-এ তিনি পরোক্ষে এই বিভাজন, এই আত্মঘাতী প্রবণতাকেই সামনে আনলেন। আইপিটিএ-র স্বপ্ন, শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির শিল্পযাত্রা, কেমন করে গোষ্ঠীস্বার্থ, ব্যক্তিগত অহং, আর পার্টির দাপটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো — সেই বেদনাই তিনি তুলে ধরলেন প্রতীক ও সংগীতের ভেতর দিয়ে।
ব্যাগ থেকে ম্যাও বেরিয়ে পড়বার ভয়ে শুরু হলো গোপন শত্রুতা — কানাঘুষো, কুৎসা, চরিত্রহনন। কমরেডরা, যাদের একসময় তিনি বন্ধু ভাবতেন, তাঁর চারপাশে তৈরি করলো এক অদৃশ্য শ্বাসরোধী প্রাচীর। তাঁর কাজ থেমে গেল, অর্থের জোগান বন্ধ হলো, সুযোগের দরজা একে একে বন্ধ হতে লাগলো। শিল্পী আত্মহননের পথ ধরলেন। গলায় বিষ ঢাললেন- বিপ্লবের নামে পরিচালিত রাজনীতির কপটতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে | রাতে নবজীবন কলোনির হরপ্রসাদকে পাঠালেন চুপি চুপি জানলা খুলে ভগ্ন,হতদ্যম ঈশ্বর’কে কইতে, “রাত কত হইলো? উত্তর মেলে না। …. আসল কথা কি জানো ভাইডি, ও প্রতিবাদই করো আর ল্যাজ গুটাইয়া পলাইয়াই যাও, কিসুতেই কিছু যায় আসেনা। সব লোপাট। আমরা সব নিরালম্ব বায়ুভূত। আমরা মিটে গেছি।

হাঁটতে হাঁটতে নীলকণ্ঠ পৌঁছে গেলেন সাঁইথিয়া। ট্যাঁকে একফোঁটা রেস্ত নেই, বোতলে সুধার একবিন্দুও অবশিষ্ট নেই। শরীরের ভেতরটা কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। চশমাটা কপালের ওপর ঠেলে নিলেন । কিছুক্ষণ চুপচাপ চারদিক নিরীক্ষণ করলেন। সামনে পাথুরে উঁচু-নিচু রুক্ষ প্রান্তর, কাঁটা ঝোপে ঢাকা ঢিবি, ফাঁকা খোয়া-ঢাকা পথ। দূর থেকে ভেসে আসছে মাইকে গান – ‘কেন চেয়ে আছো গো মা’। চোখে পড়লো হাওয়ায় উড়ছে ছবির ব্যানার – নাগরিক, অযান্ত্রিক, মেঘে ঢাকা তারা , ইত্যাদি। আর একটা ছোট মঞ্চ, বিরাট কাঁঠাল গাছের পাশে।
নীলকণ্ঠ চোখ কুঁচকে তাকালেন। এক স্থানীয় লোককে ডাকলেন। “মিয়াঁ, সুদূরের ওই দুরন্ত ঘটনাটি কি ঘটিছে কইতে পারো ?” লোকটা গামছা দিয়ে ঘাম মুছে বলল, “ও দ্যাখেন না দাদা, আজ ঋত্বিক ঘটকের শতবর্ষ হইচে। পার্টি একদম ধুমধাম কইরা বন্দোবস্ত কইরেচে। শহর থিকি সব আর্টিসট্ আসবে বটে গো।”
নীলকণ্ঠ মাথা দুলিয়ে, মুচকি হেসে সঙ্গী দাড়িওয়ালা ছেলেটিকে ডাকলেন। বললেন – “বৎস , প্রব্লেম ইজ সল্ভড। পয়সা ওরাই খসাবে। প্রাগ্রসর হও।”
“মানে ?”
“জলবৎ তরলং। ওরা জন্মদিন উদযাপন করবে, আমরা গলায় এক টুকচা ‘সুধা’ ঢালবো।”
“দাদা, আপনি কি পাগল ?”
“বিলক্ষণ। দু,দু -বারের গারদ ফেরত আসামি।“ “
“ওরা যদি চিনে ফেলে তাহলে – । “
“তাহলে কি হে নচিকেতা ? ডোন্ট বি এ ফুল – অ্যাক্ট এন্ড অ্যাক্ট নাও। উহাতেই তব মোক্ষ লাভ। “
“দাদা সেই সিলিং ফ্যান বিক্রি থেকে সব মেনেছি, কিন্তু এটা আমি পারবো না। “
“ডর করিও না উহাদের। ওরা যুদ্ধ দেখে নাই, দেশভাগ দেখে নাই, শরণার্থী শিবিরে সদ্যজাতর কান্না শোনে নাই। সব শালা হাওয়ায় ঘুরপাক খায় । ফুঁ মারলেই পোকা মাকড়ের মতো উড়ে যায়। বুঝলে হে, বাপের বটঠাকুর ! এবার যাও দিকি – মালকড়ি লইয়া ঝটিতি আইসো।”
অগত্যা নচিকেতা চললো সম্মুখ সমরে। একটা উঁচু পাথরের ঢিবিতে নীলকণ্ঠ বিড়ি ধরিয়ে বসলো। সূর্যের আলোয় তার ছায়া মাটির উপর দীর্ঘ হয়ে হেলে পড়েছে — যেন মানুষটারই বোবা অনুবাদ। বিড়ি ধোঁয়ায় সে যেন নিজের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। শুনতে পাচ্ছে সেই মন্ত্র, “জীবন অনিত্য, পরিবর্তনই চিরন্তন।”
নীলকণ্ঠ চোখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে। সূর্য তখন প্রায় ঢলে পড়েছে। তার চোখে অনন্ত এক দীপ্তি। আলো আবার জন্ম নিচ্ছে।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.