শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

“নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস
ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস”…
এ বিশ্বাসের খন্ডন হলো না আজও। বিশ্বাসকে ধারণ করেই অনুকরণের অনাবিল আনন্দে ভেসে আছি আমরা। যুগ যুগ ধরে এ চর্চাই আমাদের মজ্জায় মজ্জায় প্রোথিত হয়েছে। বর্তমান সময়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় দাঁড়িয়েও অনুসরণে বিশ্বাস নেই আমাদের, অনুকরণই অতি সহজ পথ। অতি সহজ পথে চলতে গিয়েই ভুলতে বসেছি নিজেদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে। নিজেদের অবহেলায় অজান্তেই হারিয়ে ফেলেছি আমাদের শিকড়ের সহজ থিয়েটারকে।
মঞ্চের থিয়েটার! নাকি অন্তরঙ্গ অঙ্গনের থিয়েটার!
কোনটা আমার শিকড়ের থিয়েটার?
এ প্রশ্ন করার সময় আমাদের কোথায়?

সময় নেই!
কোনো দায়ও নেই!
অথচ অজস্র নাট্যদল প্রতিদিন গড়ে উঠছে। নাট্যচর্চাও করছে, মঞ্চ এবং অন্তরঙ্গ অঙ্গনে নিজের থিয়েটার, শিকড়ের থিয়েটার সম্পর্কে আদৌ কি তারা জানে! জানতে চায় ?
একজন আটপৌরে থিয়েটার-মানুষ হওয়ার কারণে, এ প্রশ্ন আমায় কেবলই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়!
আমার অন্তরের, আমার নিজের শিকড়ের থিয়েটার কোনটা?
উত্তরের সন্ধানেই আমি হাঁটতে শুরু করি, স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে আমার শিকড়ের অন্তরের উৎসকে।
উনিশ শতকে ইংরেজ শাসনের সময় কালে তাঁদের হাত ধরেই মঞ্চের থিয়েটারের সঙ্গে আমাদের পরিচয়ের সূত্রপাত। মঞ্চের চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের দূরত্ব পূর্ব পরিকল্পিতভাবেই নির্ধারিত থাকে। মাটি থেকে মঞ্চের উচ্চতা সেও পরিকল্পিতভাবেই গড়া। নাটককে পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্যে মঞ্চকে চরম সাজ সজ্জায় সজ্জিত করে তুলতে হয় । মঞ্চের ওপর চরিত্রের চলনের জন্যে মঞ্চকে নয়টি ভাগে ভাগ করা হয়, যে ভাগকে চরিত্র কোনো মতেই অস্বীকার করতে পারে না। এবং মঞ্চের এই ভাগের ওপরেই আলোকসজ্জাও নির্ভরশীল। সুতরাং মঞ্চের নয়টি ভাগকে সঠিক অর্থে মানতে পারলে তবেই একজন চরিত্রবান অভিনয়শিল্পী হয়ে ওঠা সম্ভব।

প্রসেনিয়াম থিয়েটার


দর্শকের কথা ভেবে যে থিয়েটার তৈরি করছি আমরা দর্শককে দূরত্বে রেখে তাদের থিয়েটার থেকে ব্রাত্য করছি না তো! নাটক সমাপ্তিতে করতালি দিয়ে নিছক বাহবা প্রদানের দায় নিয়েই কি তারা তাদের অর্থ এবং সময় ব্যয় করেন? থিয়েটার উপভোগ করতে আসেন? অনুকরণীয় অভ্যেসের থিয়েটার, আজ তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। শুধু শুধুই দর্শকাসনে বসে স্থবিরের মতো দেখাই কি দর্শকের একমাত্র কাজ?

দর্শককে একটি নাটকের সাথে আন্তরিকভাবে জড়িয়ে চলার মাধ্যমে তার নিজের মনোজগতের উপলব্ধির এক দর্শনে পৌঁছে দেওয়াই একজন নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক এবং অভিনেতার মূল উপজীব্য হওয়া অবশ্য কর্তব্য। এ’রকম এক ভাবনা নিয়েই শ্রীচৈতন্য কীর্তনের প্রচলন শুরু করেন। যে কীর্তনে দর্শকের ভূমিকা কেবল স্থবির শ্রোতা নয়, সেও সমান ভাবে কীর্তনে অংশগ্রহনের দাবিদার। প্রায় অনেকটা একই ভাবধারায় সূত্রপাত হয় ‘যাত্রা’র অর্থাৎ এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গিয়ে গিয়ে ছোটো নাটিকা পরিবেশন করা হতো। এই স্থানান্তরিত হওয়ার নামই যাত্রা। যাত্রা মূলতঃ সমাজ সংস্কারমূলক হতো, আবার পৌরাণিক বিষয় নির্ভরও হতো। তবে দর্শক আর চরিত্রের অভিনেতার অবস্থান একই সমতল ভূমিতে এবং দূরত্বের ব্যবধান নেই বললেই চলে। চারদিকে গোল হয়ে বসলেই মাঝের শূন্য স্থান থাকত অভিনেতা-অভিনেত্রী বন্ধুদের জন্যে। দর্শকের সাথে সরাসরি দৃষ্টি বিনিময়ে এক গভীর বোধের জন্ম দেয় প্রতিমুহূর্তে, যা নিয়ে ফিরে যান দর্শক, আর যা পেয়ে একজন অভিনয়-শিল্পী, জীবনের সার্থকতা অনুভব করেন।

শ্রীচৈতন্য কীর্তন

ধর্ম- অর্থ-বিলাস-ব্যসন-আয়োজন-প্রয়োজন সকল দূরত্বের ব্যবধানকেই শ্রীচৈতন্য তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি এক অমোঘ চেতনায় অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন। কীর্তনের শেষে “হরি” এবং “কৃষ্ণ” বোল ধ্বনিতে তিনি এক প্রেম ভাবে ডুবে যেতেন। আসলে এই হরি অর্থাৎ পরম এবং কৃষ্ণ অর্থাৎ দর্শন। পরম দর্শনে অন্তরাত্মার চেতনাকে জাগ্রত করার কথাই তিনি বার বার বলতে চেয়েছিলেন। যাত্রার সহজ যাপনের মাধ্যমেই আমাদের সহজ থিয়েটারের প্রকাশ।

অতি সহজেই আমরা অপ্রকাশিত রাখলাম আমাদের সহজ থিয়েটারকে। দেশ বহির্ভূত এক থিয়েটারের অনুসরণে না গিয়ে অনুকরণে ভাসিয়ে দিলাম নিজেদের। একরাশ সাজসজ্জা বিলাস ব্যসন আয়োজন প্রয়োজনকে, আপন আপন বলে চিৎকার করতে শুরু করলাম। অন্য দেশের থিয়েটারকে দেশজ থিয়েটার হিসেবে প্রমান করার তাগিদে নাট্যশাস্ত্রের ওপরেও নির্ভরশীল হতে পিছপা হলাম না।

ভরতের নাট্যশাস্ত্রে যে ওঢ্রমাগধী নাট্যের উল্লেখ আছে তা আমাদের অঞ্চলেরই, কিন্তু আর্যদের দ্বারা কৃত হওয়ায় তা সংস্কৃতে লিখিত। আমাদের লোকজীবনের রিচ্যুয়াল অবলম্বন করেই নাটকের এক একটি বিষয় এবং নাট্যরীতির জন্ম হয়েছে। ভরত বলছেন বাংলায় এ’রীতির প্রচলন ছিল। পাশ্চাত্যের আকস্মিক প্রভাবে আমাদের আজকের নাট্যকলার উদ্ভব । বাংলা নাটকের কোনো পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আমাদের কাছে নেই । আমরা ভেবে নিয়েছি ঐতিহ্যবর্জিত উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক মানসিকতা নির্ভর থিয়েটারই বাংলার থিয়েটার। কিন্তু না, বাংলা নাটক উনিশ শতকে সৃষ্ট কোনো পরজীবী শিল্প নয়। বাংলা নাটকের উৎসে গিয়ে দেখা যায়, পূর্বে লিখিত কাহিনি ছাড়াই দেবদেবীর মাহাত্ম্য কীর্তন এবং পরমবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই পালিত অনুষ্ঠান থেকেই জন্ম নিয়েছিল আমাদের লোকজ থিয়েটার। ৪০০ খ্রীষ্টাব্দে চিনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েনের লেখায় পালাগানের উল্লেখ পাওয়া যায় । আসলে সময়ের দিক থেকে এবং অভিনয় রীতির দিক থেকেও লোকজ নাটকের একটা স্বতন্ত্র অবস্থান আছে।

পালাগানের আসর

বাংলার লোকজ বা সহজ নাটকের স্বাতন্ত্র্যতাকে অবলীলায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে আমরা আজও ছুটছি পাশ্চাত্যের অনুকরণে। যে সহজ থিয়েটার আমার শিকড়ের থিয়েটার, সে এক কঠিন যাত্রাপথ যাপনের মাধ্যমে অবশেষে একটু একটু করে আমাদের কাছে ফিরে এলো। বহু দেশীয় এবং বি-দেশীয় নাট্য-গবেষক, নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, নাট্যদল অবিরাম কাজ করে চলেছেন স্ব স্ব-অঙ্গনে সহজ থিয়েটারকে নিয়ে। যেমন বাদল সরকার, যিনি “থার্ড থিয়েটার” এর দর্শন নিয়ে তাঁর থিয়েটারের ভাবনাকে চর্চা করে গেছেন আজীবন। নাট্য-গবেষক গ্রটভস্কি তাঁর “পুওর থিয়েটার” নির্মাণ করেন, পিটার ব্রুকের “এম্পটি স্পেস” সহজ থিয়েটারের ভাবনায় অনুপ্রাণিত, অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটারের দর্শনে প্রবীর গুহ তাঁর গবেষণাধর্মী কাজ করে চলেছেন আজও, বাংলার থিয়েটারকে আদরে যত্নে লালন করে তিনি “সহজিয়া থিয়েটার” নামে একটি বই লেখেন এবং বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে তিনি তাঁর ভালোবাসার সহজিয়া থিয়েটারকে পৌঁছে দেওয়ার কাজ নিরন্তর করে চলেছেন। আরো অনেক নাট্যদল সহজ থিয়েটারকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করে চলেছেন নানাভাবে।

বিশ্বায়নের বিশ্বে চলমান সময়ে রাজনৈতিক ঘেরাটোপে বিপন্ন মানবিক জীবন সংকটগ্রস্ত আসন্ন প্রসবার মতোই। আগামী কয়েক প্রজন্ম মেরুদন্ডহীন অন্ধকারের গর্ভে শেষ প্রাণবায়ুটুকু নিয়ে ধুঁকছে। মানুষের মনে ধিকি ধিকি করে আগুন জ্বালাতে পারে একমাত্র শিল্পীর শিল্প মাধ্যম, নাটক তারমধ্যে অন্যতম মাধ্যম। সমসাময়িক অবস্থার থিয়েটার। যেভাবে চৈতন্য তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে জনমানসে এক আন্দোলন (movement) তৈরি করেছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সংকটকালে ব্রেশট মিথ ভেঙে এক মিথের মানুষ হয়েছিলেন। কিন্তু আজ? আন্দোলন কোথায়! সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়েও তাকে পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে চলতে চলতে প্রতিমুহূর্তে বিষয় নির্ভর নাটক তৈরি হচ্ছে ঠিকই তবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার গতানুগতিকতায়। সেখানে আন্দোলন জরাগ্রস্ত পঙ্গু অথর্ব।

একটুকরো পরিসরে চলমান সংকটের অনুষঙ্গে সমসাময়িক অবস্থার অভিঘাতে একক বা দ্বৈত অথবা তার অধিক চরিত্রের ওপর নির্ভর করে নাট্যকার এবং নির্দেশকের মিলিত শৈল্পিক প্রয়াসে বিমূর্ত ভাবনার মূর্ততায় সৃষ্টি হতে পারে চৈতন্যের চেতনার থিয়েটার। পঁচিশ জন দর্শককে সঙ্গী করে নাটক সফল ভাবে প্রদর্শিত হলে তা পরবর্তী আরো পঁচিশ জনের মধ্যে বাহিত হতে পারে। নদীর মতোই প্রবাহিত হতে পারে সংগঠিত হতে পারে সংকটগ্রস্ত সময়কালের আন্দোলন। সংকটকালে উপস্থাপিত ব্যতিক্রমী ভাবধারার নাটক দর্শক মননে নতুন আন্দোলনের দর্শনের পাথেয় হতে পারে! তবে এ সম্ভবনা আজ অলীক। রাজনৈতিক চরিত্রকেন্দ্রিক, চলচ্চিত্রের নির্দেশক কেন্দ্রিক কিংবা মহামানব ভিত্তিক অথবা বেদ পুরাণ বিষয় নির্ভর আলো ছায়ার খেলায় মত্ত, সাজসজ্জা পোষাকের শৈল্পিকগুণ নির্ভর দর্শন নির্ভার আত্মমুখী অপ্রাপ্তমনস্ক নাটকের প্রকাশ শুধুই। অপ্রকাশিত আসন্ন এবং চলমান সংকটকাল। মূল্যবোধের বৃক্ষরাজির ছায়া ক্রমশ নিশ্চিহ্ন হয়ে আসছে চুন-সুরকি-বালি-সিমেন্টে আর ব্ল্যাকবক্সের আতিশয্যে…

সময়গ্রন্থির সীমাবদ্ধতায় নিজের প্রতি নিজের বিশ্বাস হারাচ্ছি সর্বত্র, তাই চর্চার ভাষাও হারাচ্ছে তার সত্যের সহজ পথ…যে পথ ধরে চলতে চলতে আজ আমরা সগর্বে বলি, আমি মঞ্চেও আছি আবার অন্তরঙ্গ পরিসরেও আছি। আমার দর্শন আমি সর্বত্রই সুন্দরভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারি। আসলে কিসের সাথে, কেনই বা অযথা খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়াস চালাচ্ছি আমি? দায়বদ্ধতা কি আমার? জানি না!
বিভ্রান্তির এক ভানের দুনিয়া থেকে, আমরা অবুঝের মতো দর্শনশূন্য, আদর্শহীন, চেতনাশূন্য অগণিত নাট্যদল প্রতিনিয়ত নাট্যচর্চা করে চলেছি। যা আরো এক ধ্বংসের ইঙ্গিত বহন করছে।

আজ ২০২৬ এ পরিসরের সংখ্যা বেড়েছে বহুল মাত্রায়। মানুষও মঞ্চ থেকে নেমে অঙ্গন তারপর অন্তরঙ্গ পথে হাঁটছেন…যে পথ আসলেই আপনার পথ। থিয়েটার জেড প্রায় পনেরো বছর ধরে একের পর এক অন্তরঙ্গ থিয়েটার নির্মাণ করে দর্শকের অন্তরে এক অন্য মনোজগতের সন্ধান দিয়েছে। বাদল সরকারের ভাবধারায় শতাব্দী, পথসেনা, আয়না নাট্যগোষ্ঠী হেঁটে চলেছে আজও। বিভাবন প্রায় তিরিশ বছর ধরে অঙ্গন থেকে অন্তরঙ্গে হেঁটে চলেছে নিজস্ব ভাবনায়। এছাড়া লাকি গুপ্তা, মনীশ মিত্র আরো আরো বহুদল বহু নাট্যকার নির্দেশক আজ অন্তরঙ্গ পরিসরেই নিজের শৈলীর কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।

তবে যে একটুকরো পরিসর আপনার থিয়েটারের জন্যে দরকার সেই পরিসরের সার্বিক চেহারা কতটা শুদ্ধ হলে তবেই মানুষ পরিসরে এসে নাটক দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন সেদিকে লক্ষ্য রাখতে গিয়ে অর্থাৎ দর্শককে স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার আন্তরিক প্রয়াসে পরিসরগুলির পরিকাঠামো অতিমাত্রায় পরিশীলিত মার্জিত এবং সুখকর করতে হচ্ছে, যারজন্য পরিসরটি ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে নাট্যদলের নাট্যযাপনের ক্ষেত্রে। আসলে পরিসরকে গড়তে শিখেছি আমরা অথচ নাটকের স্বার্থে তা ভাঙতে শিখিনি। আর তাই প্রতিনিয়ত কঙ্কালসার অস্থি সর্বস্ব থিয়েটারের মুখোমুখি হচ্ছেন দর্শক। শূন্য হচ্ছে দর্শকাসন।

বাদল সরকারের ‘মিছিল’

বাদল সরকারের ‘মিছিল’ নাটক কার্জন পার্কে প্রদর্শিত হয়েছে যা দর্শক আজও গভীরভাবে মনে রেখেছে। থিওসফিক্যাল সোসাইটিতে বাদল সরকারের নাটক প্রদর্শন যা স্মৃতির খনিতে বন্দী আজও। আবার প্রবীর গুহর ‘অন্ধকারের ঢেউ’, ‘সমুদ্র অস্থির’ নাটক খড়দহের একটি স্কুলের বদ্ধ পরিসরে প্রদর্শিত হয়েছে, দর্শকও সেই বদ্ধ পরিসরের বদ্ধতায় আকৃষ্ট হয়েছেন একাধিকবার। বাদল সরকারের ‘সারারাত্তির’ নাটকের পটভূমি এক বদ্ধ পরিসর, যে পরিসরের বিমূর্ততায় আচ্ছন্ন হওয়াই নাটকের চরিত্র থেকে দর্শকের প্রধান কাজ।

বিশ্বায়নের বিশ্বে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জীবনে মুঠো বন্দী অন্তর্জালের দৃষ্টি ভঙ্গির অভ্যেসে অভ্যস্ত আমাদের মানবিক জীবন আজ পণ্য। দৃশ্যত পণ্যায়নে নিয়ন্ত্রিত আমাদের নিত্যকার জীবন। রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনৈতিক রাজনৈতিক ঘেরাটোপে বন্দী হতে হতে ক্রমশ অরক্ষিত জীবনকে সুরক্ষিত রাখার কৌশলে জীবন বড়োই ব্যস্ত, তাই তাকে শুধু একফোঁটা মনোরঞ্জন বা উপভোগ্য করে তোলার দায়ে আজ শিল্পের দারস্থ হচ্ছি আমরা। প্রতিটি শিল্পই হারাচ্ছে তার নিজস্ব চরিত্রের আত্মা। নাটকও আজ সকল পরিসরেই দ্বিখণ্ডিত।

জ্যঁ পল সার্ত্রে তাঁর নিজের দর্শনের আয়নায় মানুষের অস্তিত্ব সন্ধানে ছুটে গিয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নিজের জীবন বিপন্ন করে অথচ আমরা আজ গোলকায়নের বিভ্রান্তিতে বিপন্ন অস্তিত্বের মরু প্রান্তরে দাঁড়িয়েও দর্শনহীন মূক বধির। পণ্যায়নের ঘোর আগ্রাসনে সকল শিল্প হারাচ্ছে তার ভাষা নাটকও হারাচ্ছে তার আপনার নাড়ির টান।

একটি অন্তরঙ্গ নাট্যদৃশ্য

বদ্ধ ভূমিতে দাঁড়িয়েও নিজের বিশ্বাসে অনঢ় থেকে মুক্তমনে নিজের অস্তিত্বকে একবার স্পর্শ করার ছুঁয়ে দেখার খোঁজ মানুষ যেদিন নতুন করে অনুভব করবে সেদিনই সহজ থিয়েটারের সন্ধান মিলবে…
মঞ্চের মাতৃক্রোড়ে সস্নেহে লালন পালন শিক্ষা দীক্ষায় বেড়ে ওঠা একজন আটপৌরে থিয়েটার মানুষ হয়েও কোথায় যেন মঞ্চের নিবিড় সান্নিধ্য ধারক মাতৃত্বের স্বাদ আস্বাদনে আমার অন্তরকে উপেক্ষিত রেখেছে আজও। মঞ্চের উন্নাসিকতায় দূরত্বের শূন্যতায় ভারাক্রান্ত মন খুঁজে বেরিয়েছে নিজের শিকড়ের অস্তিত্বকে। অন্তরের গভীরে দূরত্বের বিচ্ছিন্নতায় জোড়াসাঁকোর তথাকথিত মূলধারার থিয়েটার নিয়ে পড়াশোনার মাঝেও বার বার কখনও ছুটে গিয়েছি আখড়ার অন্তরঙ্গে বা রবীন্দ্রসদন চত্বরে আমন্ত্রণের সামনের মুক্ত অঙ্গনে, কার্জন পার্কে, উঠোনের অঙ্গনে অথবা আটপৌরে কোনো ঘেরাটোপের অন্তরঙ্গে, নিজের অস্তিত্বকে ছোঁয়ার আশায়!

নিজের অন্তরের গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বেও অস্বীকার করিনি কখনো পালিতা মঞ্চের মাতৃত্বকে, তার অবদানকে। কখনো চরিত্র হয়ে, কখনো দর্শক হয়ে মঞ্চের গন্ধ নিতে চাইছি বুকভরে আজও। কিন্তু আবার অস্তিত্বের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছি নিজের পথে…এ এক মনোজগতের অদ্ভুত দ্বিখন্ডনের যন্ত্রনা!
তবে বিশ্বায়নের বিশ্বে বিষয়ী মনের স্পর্শ আজ মঞ্চ থেকে অন্তরঙ্গ সকল ক্ষেত্র মধ্যেই দৃশ্যমান! বিষয়ী মন সঞ্চয়ের গার্হস্থ্যে ডুব দিয়েছে। বিলাসী অনুদানের স্বতঃস্ফূর্ত অনুমোদনে নাট্যদলগুলির নাট্য প্রদর্শনী আবেগহীন এক বেনিয়াসহকলার পরিচায়ক। মঞ্চ থেকে অন্তরঙ্গ সকল নাট্যদলগুলির দলগত অন্তরেও এক ফাঁপা বায়বীয় শূন্যতা। বিষয়ী মন কেবল অবনমনের পথের সন্ধানে নিহিত আজ। শিল্পীকে শিল্পীর অজান্তেই তার শিল্পের অন্তর থেকে যোজন যোজন দূরে সরিয়ে দিচ্ছে! সকল পরিসরের আপন আপন আত্মার বিশ্বাস আজ ভূকম্পনের এক আন্দোলনে ধূলিস্যাৎ হওয়ার অপেক্ষায়…

একটি অন্তরঙ্গ নাট্য মহড়া-দৃশ্য

যন্ত্রণার মধ্যেই শিল্পের প্রকাশ, বিস্তীর্ণ যন্ত্রনার অন্তরেই সাধক মনের স্বরূপ বিস্তৃত হয়, শিল্পী মনের উদ্ভাবনী শক্তিকে চালিত করে একরাশ যন্ত্রণা। কিন্তু আজ রাষ্ট্র যন্ত্রের প্রতি অগাধ দাসত্বেই গ্রাস হছে আমাদের সকল যন্ত্রণা। সকল শিল্প মাধ্যম, নাটকের ক্ষেত্রেও মঞ্চ থেকে অন্তরঙ্গ সকল ক্ষেত্র মধ্যে সুখের আচ্ছন্নতায় যন্ত্রনার অস্তিত্ব অবলোপের পথে…সুখ সাগরের ভেলায় ভাসমান থাকতে চাই সবাই সদা সর্বদা। চলমান সময়ে স্রোত অভিমুখে যাত্রা আমাদের শবসম চরিত্রের কঙ্কাল বহন করছে প্রতিনিয়ত…

শিল্পী আজ বেনিয়াস্বরূপ, শিল্প আজ বেনিয়া-সহকলার রং বহন করছে। শিল্পীর সাধক মনের সন্ধান নেই! যন্ত্রনার উৎসের সন্ধান নেই! শিল্প হারাচ্ছে তার শিকড়ের চেতনার সন্ধান! আমাদের মনোজগতের বাস হতে, চৈতন্য আজ সত্যই অন্তর্হিত তিরোহিত!

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sanjitkumar Bhattacharya
Sanjitkumar Bhattacharya
21 days ago

Bhalo laglo

1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x