
সেবার লাদাক থেকে ফেরার পথে ফিরছিলাম। মাঝে দু’দিনের বিরতি শ্রীনগরে। এর আগেও দু’বার কাশ্মীর ভ্রমণ করেছি, কিন্তু ‘ডাউন টাউন’ কাশ্মীরে কখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্যে বলি, ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল শ্রীনগর শহরের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা শহর-ই-খাস নামে পরিচিত ডাউন টাউন। এলাকার বেশিরভাগটাই শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিমি (৩.১ মাইল) দূরে ঝিলম নদীর তীরে অবস্থিত।
সৌভাগ্যক্রমে সেদিন সকালে শ্রীনগরে আমার হোটেলের সামনে এক অটোচালক আরমান গুলের সঙ্গে স্বল্প আলাপচারিতায় বেশ অন্তরঙ্গতা হয়ে গেল। তাকে আমার ইচ্ছের কথা প্রকাশ করার প্রথমে সে একটু দ্বিধান্বিত হল। তারিখটা ছিল ১৩ই জুলাই, যেটা কাশ্মীরের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। কিছুক্ষণ ভেবে ইমরান বলল, যদি রাস্তায় ভারতীয় সামরিক বাহিনীর লোকেরা জিজ্ঞাসা করে, বলবেন – আমি এই আরমান গুল-এর পরিচিত, যাচ্ছি তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে। কাশ্মীরের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিস্মৃত মিডিয়া রিপোর্টের কারণে দ্বিধান্বিত মনটাকে কিছুটা দমন করেই চড়ে বসলাম তার অটোতে এবং অর্জন করলাম এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। সেই কাহিনিই আজ শোনাব আপনাদের ।
ডাউন টাউনে এসে পৌঁছতে বেশীক্ষণ সময় লাগল না। অটোচালক আরমান এ-গলি সে-গলি দিয়ে আমাকে নিয়ে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর নজর এড়িয়ে সহজেই নিয়ে গেল তার শহরে। এই শহরটিকে সমগ্র কাশ্মীরের কেন্দ্রীয় আধাত্মিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং নৈতিক কেন্দ্র বলা চলে।
এই এলাকার কিছু ঐতিহসিক ভবন, মসজিদ এবং স্মৃতিস্তম্ভ — যেখানে কান পাতলে শুনতে পাওয়া যাবে কাশ্মীরের ইতিহাস, যা ধারাবাহিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বিপ্রতীপ এক চিত্র উপস্থাপিত করে। তার অন্তরে যেন যুগ যুগ ধরে আগত বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে কাশ্মীর উপত্যকার আদিবাসী মুসলমানদের আশা-আকাঙ্খা চরিতার্থ না হওয়ার যন্ত্রণা।


প্রত্যেক বছর ১৩ই জুলাই তারিখটি কাশ্মীরে শহীদ দিবস হিসাবে পালিত হয়। যদিও ডাল লেক এবং তার নিকটবর্তী অঞ্চলে জনজীবন স্বাভাবিক, পর্যকদের ভিড় চোখে পড়ার মতো, কিন্তু ডাউন টাউন-এ ওই দিনটায় যেন অঘোষিত বন্ধ। শান্তিরক্ষার তাগিদে জারি ১৪৪ ধারা। রাস্তার মোড়ে বালির বস্তা দিয়ে বাঙ্কার করে ভারতীয় জওয়ানদের অতন্দ্র প্রহরা, কাঁটাতার বিছিয়ে চৌরাস্তায় যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা। সে যেন এক শীতল মৃত্যুপুরী।
বর্তমান ঘটনাকে পাশে রেখে এবার আমরা বরং একটু চোখ রাখি কাশ্মীরের পুরোনো ইতিহাসের পাতায় এবং পরিচিত হয়ে নিই তদানীন্তন কাশ্মীরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমির সঙ্গে। এবং আরমানের সঙ্গে যাত্রাপথে আমার দেখা কাশ্মীরের কিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যের সঙ্গে।

১৯৩১ সাল। শিখরা তখন কাশ্মীরে কর্তৃত্ব করছে মহারাজ হরি সিংয়ের নেতৃত্বে। তারিখ ১৩ই জুলাই, তৎকালীন একজন ইংরেজ সেনা কর্মকর্তার কর্মচারী, আবদুল কাদির খানের নেতৃত্বে শ্রীনগরে এক বিশাল সমাবেশ ঘটল স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে । হরি সিংয়ের ডোগরা বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাল সেই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে। নিহত হল ২২ জন কাশ্মীরী, আহত বহু কাশ্মীরী। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর এই দিনটিতে কাশ্মীরীরা পালন করে ইউম-ই-সুধা-ই-কাশ্মীর বা শহীদ দিবস হিসেবে।

এই সময়কাল থেকে কয়েক শ’ বছর পিছিয়ে আমরা দেখতে পাই, ইসলাম ধর্ম কাশ্মীর প্রবেশ করতে শুরু করে দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। কাশ্মীরে প্রথম মুসলিম ধর্মপ্রচারক ছিলেন সৈয়দ-শরফউদ-দিন-আবদুর রহমান সোহারওয়ার্দী, যিনি বুলবুল শাহ নামে পরিচিত। তিনি কাশ্মীর উপত্যকায় ব্যাপকভাবে মুসলিম ধর্ম প্রচার করেছিলেন সোহরা রাজবংশের রাজা সুহাদেবের সময়ে (১৩০১-২৯) । সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মপ্রচারক— যাঁর ব্যক্তিত্ব কাশ্মীরে ইসলাম প্রচারে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি মীর সাইয়্যেদ আলী হামাদানী, যিনি শাহ-ই-হামাদান নাম পরিচিত। তাঁর স্মরণে ১৩৫৯ সালে মুসলিম শাসক সিকান্দার বুশিকান ডাউন টাউনে ঝিলম নদীর ডান তীরে ফতেয়া কাদালে নির্মাণ করেছিলেন শ্রীনগরের প্রথম মসজিদ।



কথিত আছে মীর সৈয়দ হামদানি সুদূর পারস্য থেকে কাশ্মীরে এসেছিলেন মুসলিম ধর্ম প্রচারের জন্য। তার মুসলিম ধর্ম প্রচারের ফলে বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের পুরোহিত এবং তাদের অনুসারীরা ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়। মীর সৈয়দ হামদানির প্রভাব শুধুমাত্র ধর্মপ্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, কাশ্মীরের সংস্কৃতি, শিল্প ও অর্থনীতিতেও তার প্রভাব ছিল অপরিসীম। তার প্রচেষ্টায় শাল তৈরী, কার্পেট তৈরী ও কাপড় বুনন ইত্যাদি শিল্পের প্রসার ঘটে।
পরবর্তী সময়ে কাশ্মীরে জনকল্যানমূলক কাজের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন সুলতান জয়নুল আবেদীন, যাঁকে কাশ্মীরের শ্রেষ্ঠ বাদশাহ বলা হয়। তাঁর শাসনকাল ৫০ বছরের (১৪২১ – ১৪৭৪)। তিনি জনগনের দ্বারা প্রদত্ত কর হ্রাস করেছিলেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও অনেক উপাসনালয় তৈরী করেছিলেন। তিনি একটি উদার ধর্মীয় নীতি অনুসরণ করতেন ও শিল্প সাহিত্য এবং স্থাপত্যের প্রসার ঘটিয়েছিলেন— যার কারণে তাঁকে কাশ্মীরের আকবর বলা হয়। তাঁর নির্মিত বাদশাহ টুম্ব একটি দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে তাঁর মাকে তিনি সমাহিত করেন।


আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে কাশ্মীরের, যখন মোগল সম্রাট আকবর কাশ্মীর দখল করে নেন ১৫৮৯ সালে। পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর (সেলিম) বালচিস্তানের রাজকন্যাকে বিবাহ করেন। এবং বালচিস্তান এবং লাদাখ তাঁর রাজ্যের অর্ন্তভুক্ত করে নেন। ১৬২৩ সালে জাহাঙ্গীরের অপর এক পত্নী নূরজাহান ঝিলম নদীর বাঁদিকে, পবিত্র “খানকাহ-এ-মৌল” এর বিপরীতে একটি মসজিদ স্থাপন করেন। এটি মোগল যুগের স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। পাথরের তৈরী বলে সম্ভবত এটির নাম ‘পাত্থর মসজিদ’ । ১৬৩৪ সালে পঞ্চম মোগল সম্রাট শাহজাহানের শাসনকালে বালচিস্তান এবং লাদাখ জম্মু-কাশ্মীরের অর্ন্তভুক্ত হয়।



সম্রাট শাহজাহানের শাসনকালেই ১৬৩৪ সালে স্থাপিত হয় হজরতবাল মসজিদ। মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র ধর্মস্থান এবং তাঁদের ধারণা এখানে হজরত মহম্মদের ‘বাল’ অর্থাৎ চুল সংরক্ষিত আছে। সেই সময় সম্রাট শাহজাহানের শাসনকালে গিলগিট এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ জম্মু এবং কাশ্মীরের সাথে যুক্ত হয়। এরপর মোঘল সাম্রাজ্য ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে ১৭০৮ সালে নাদির শাহের আক্রমণে ক্রমশ তা ভেঙে পড়ে।
আর একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য দস্তগীর সাহেব । কানিয়ারে অবস্থিত শেখ সৈয়দ আবদুল কাদির জেলানীর এই সুফি মাজারটি স্থাপিত হয় ১৮০৬ খৃস্টাব্দে। দস্তগীর সাহেব প্রায় ২০০ বছরের পুরানো মাজার। কাশ্মীরীরা মনে করেন তাঁর চুল রক্ষিত আছে এই মাজারে যাকে বলা হয় ‘মোই-ই-পাক্”।



মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ১৭৫২ সালে আহমেদ-শাহ-দুরানী কাশ্মীর দখল করে এবং আফগান শাসনের সূত্রপাত হয়। এরা পাসতুন উপজাতির অন্তর্গত। এরা কখনোই কাশ্মীরকে আফগানিস্থানের অন্তর্ভুক্ত করেনি। কেবল একটা আফগান উপনিবেশ হিসাবে ব্যবহার করেছিল। এদের শাসনকালে (১৭৫৩ – ১৮১৯) কাশ্মীরের ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। অর্থনৈতিক শোষন, সম্পদের অপচয়, অস্বাভাবিকহারে খাজনা আদায় এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের মাধ্যমে কাশ্মিরী মুসলমানদের যারা জাতিগতভাবে কাশ্মীর উপত্যকার আদিবাসী – তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছিল।
১৮০৮ সালে দুরানি সাম্রাজ্যের কাশ্মীর প্রদেশের গভর্নর আত্তা মহম্মদ খানের শাসনকাল। এই সময়ে যে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যটি নির্মিত হয়েছিল, সেটি হল হরিপর্বত কেল্লা। শহরের দুপাশ দিয়ে এই দুর্গে পৌঁছানো যায়। রায়না ওয়ারি হয়ে, কাঠি দরওয়াজা গেট হয়ে এবং আওয়াল হয়ে সাঙ্গিন দরওয়াজা গেট হয়ে। যদিও সম্রাট আকবরের শাসনকালে এই দুর্গ নির্মানের কাজ শুরু হয় কিন্তু তিনি তা সমাপ্ত করে যেতে পারেননি।





১৮১৯ সালে কাশ্মীর মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর শিখ সাম্রাজ্যের অধীনে আসে এবং কাশ্মীরের উপর শিখ শাসন ১৮৪৬ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। আফগান শাসকদের অধীনে কাশ্মীরীদের কষ্টের কারণে তারা প্রাথমিকভাবে শিখ শাসনকে স্বাগত জানায়, যদিও শিখরাও কালক্রমে কঠোর প্রশাসকেই পরিণত হয় এবং তাদের শাসনকে সাধারণ মানুষ নিপীড়নের শাসন বলেই চিহ্নিত করে। এরপর ১৮৪৬ সালে প্রথম বৃটিশ-শিখ যুদ্ধে শিখদের পরাজয়ের পর এবং অমৃতসর চুক্তির মাধ্যমে – চুক্তির শর্তাবলী অনুসারে ব্রিটিশ সরকার ৭.৫ মিলিয়ন নানক শাহী রুপিতে মহারাজা গুলাব সিংকে কাশ্মীর বিক্রি করে দেন। এই গুলাব সিং জামওয়াল (১৭৯২-১৮৫৭) ছিলেন ডোগরা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের প্রথম মহারাজা।
ব্রিটিশ রাজত্বের অধীনে মহারাজা গুলাব সিং-এর বংশধরদের শাসনে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে অল জম্মু কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স দ্বিধাবিভক্ত হয়ে অধিকাংশ কাশ্মীরই শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে জম্মু কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স গঠিত হয়। ১৯৪৬ সালে শেখ আবদুল্লাহ নেতৃত্বে শিখরাজতন্ত্র বিলোপ, স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্বশাসনের জন্য ন্যাশনাল কনফারেন্স ‘কুইট কাশ্মীর’ আন্দোলন শুরু করেন। হরি সিং-এর নেতৃত্বে শিখ ডোগরা বাহিনী চূড়ান্ত দমন নীতি প্রয়োগ করে এবং শেখ আবদুল্লাহ এবং চৌধুরী গোলাম আব্বাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৪৭ সালে অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রিন্সলি স্টেট হিসাবে জম্মু এবং কাশ্মীর হিন্দু রাষ্ট্র নায়ক হরি সিং-এর শাসনে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসাবে ছিল। ১৯৪৭ সালে ১৫ই আগস্ট জাতির ভিত্তিতে ভারত খণ্ডিত হল। জন্ম হল পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের । কাশ্মীর কিন্তু তখনও মহারাজা হরি সিং-এর নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে চেয়েছিল।
রাজতন্ত্রের বিলোপ, স্বায়ত্ব শাসন এবং ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে শুরু হয় সংঘাত।
২২শে অক্টোবর ১৯৪৭ তারিখে পাকিস্তান নিয়োজিত পাসতুন পুঞ্চ বিদ্রোহীরা একযোগে কাশ্মীর আক্রমণ করে। রাজা হরি সিং শ্রীনগর ছেড়ে জম্মুতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করেন। হরি সিং-এর সঙ্গে ভারতের (Instrument of Accession) চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলশ্রুতিতে ২৬শে অক্টোবর ১৯৪৭শে ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে প্রবেশ করে এবং স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র দু’মাস কাটতে না কাটতেই ভারত এবং পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই চুক্তির ফলে কাশ্মীরের ভারতভুক্তি সম্পন্ন হল, কাশ্মীর তার স্বাধীন সত্তা হারিয়ে পরিণত হল বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে। রাজনীতির ঘাত-প্রতিঘাতে বিলুপ্ত হল দুই বৃহৎ রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী একটি ক্ষুদ্র ভূখন্ডের স্বাধীন অস্তিত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।
ইতিহাসের কাহিনি শেষ করে এবার আমার সেদিনের সঙ্গী আরমানের পরিবারের সঙ্গে আমার পরিচয় ও তাদের আন্তরিক আতিথেয়তার কথা বলি।
সেদিন এইভাবে ঘুরে ঘুরে সব দেখতে দেখতে কখন যে বেলা গড়িয়ে গেছে তা টের পাইনি। আরমান তার বাড়িতে দ্বিপ্রাহরিক আহারের জন্য নিমন্ত্রণ করল আমাকে । একটা কাশ্মিরী পরিবারকে এত কাছ থেকে দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না, রাজী হয়ে গেলাম। ওর অটো করে একটা সংকীর্ণ গলির সামনে এসে পৌঁছলাম। রাস্তা এতই সংকীর্ণ যে একটা বড় গাড়িও ঢুকতে পারবে না। গলির দুপাশে গাদাগাদি করে গড়ে উঠেছে বাড়ী। এমনই একটা জরাজীর্ণ বাড়ীর সামনে কাঠের বড় দরজা ঠেলে আমাকে ভেতরে আসতে বলল। ছোট একটা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলাম। একটা প্রশস্ত ঘরে মেঝেতে একটা কার্পেট পাতা রয়েছে, সেখানেই বসলাম।




অরমানের বাবা বহুদিন হল গত হয়েছেন, আরমান ও তার ভাই আসগর এবং একবোন ফাতেমা। মা এখনও জীবিত। তাঁর সঙ্গে এবং পরিবারের আর সকলের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল। আরমান এবং আসগর এবং আসগর দুজনেই অটোচালক। এদের মধ্যে আরমান বিবাহিত, একটা ফুটফুটে ছোট ছেলেও আছে। খুব শীঘ্রই ফতেমার বিবাহ স্থির হয়েছে জম্মুতে কোন এক কাশ্মিরী পরিবারে। বিবাহে আসার জন্য আমাকে নিমন্ত্রণও করল ওরা। আমার অবশ্য যাওয়া হয়ে ওঠেনি। শুরুতেই কাশ্মীরে এক ধরনের বিশেষ চা ‘কাওয়াটি’ দিয়ে অভ্যর্থনা করল। তারপর নানাবিধ কাশ্মিরী খাবার দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন হল। সেদিন অপরাহ্নে একটি কাশ্মীরী পরিবারের আন্তরিক আতিথেয়তা আমাকে মুগ্ধ ও আপ্লুত করল। কথাপ্রসঙ্গে আরমানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম – ধর, ভারত সরকার তোমাদের হাতেই কাশ্মীরকে তুলে দিল, তোমরা কি পারবে তাকে অন্য কোন বিদেশী আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে। দেখলাম আসগর কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে – আর আরমান মাটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, আমরা শান্তি চাই। পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে চাই।
আমার বুকের ভিতর থেকে একরাশ দীর্ঘশ্বাস ওদের অলক্ষে ঘরের বাতাসে মিলিয়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম এই ছোট্ট শিশুটা, যাকে রোজ স্কুলে প্রার্থনার মত করে ভারতের জাতীয় সংগীত গাওয়ানো হয় যে যদি ছোট্ট দুটো হাত মুঠো করে আকাশের দিকে তুলে বলে আমি স্বাধীনতা চাই— কি বলে বোঝাব তাকে? কিংবা এই তরতাজা যুবক আসগর কোনদিন কেন বিশেষ সম্প্রদায়ের প্ররোচনায় হাতে অস্ত্র তুলে নেয়— হয়তো কোনদিন বুলেটের আঘাতে ঝাঝরা হয়ে যাওয়া নিথর দেহটা ঝিলমের তীরে পড়ে থাকবে শিরোনামে আসবে, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে গুলির লড়াইতে আরও এক আতঙ্কবাদীর মৃত্যু। ভাবতে অবাক লাগে, ভারতের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে ভূস্বর্গ এই ভূখণ্ড বেওয়ারাশি লাশের মত পড়ে আছে। আর দুই পারমানবিক শক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্র প্রতিরক্ষার তাগিদে যে যার অধিকৃত অঞ্চল বজায় রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কারোর শোনার অবকাশ নেই কাশ্মীরের প্রকৃত বসবাসকারী মানুষগুলি সত্যিই কি চায়।
আশ্চর্য ভ্রমণ। অদ্ভুত কথা হল বহু নিসর্গ লোভী নিয়মিত কাশ্মীর যাত্রা করলেও এই স্থান গুলিতে যান না। আমিও গিয়েছি কিন্তু স্থানীয় দের নির্দিস্ট করে দেওয়া পথে। লেখক সেই ছক ভেঙ্গে পৌঁছে গেছলেন অন্দর মহলে । তাঁর সাহস আছে। অজানা কে জানার আগ্রহ ও। ইতিহাস এর উল্লেখ করেছেন কিন্তু ভারাক্রান্ত করেন নি লেখাটিকে। আশা করি এ ধরনের সফর তার জারি থাকবে এবং আমরাও ভাগ পেতে থাকবো।