শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বাঙালির থিয়েটারে প্রথম বাংলা নাটক

সেদিনটা ছিল ৬ই অক্টোবর। কোজাগরী পূর্ণিমার দিন। ১৮৩৫ সালে এই দিনে সৃষ্টি হয় এক ইতিহাস। ঠিক তার চার বছর আগে সখের থিয়েটারের যাত্রা শুরু। একজন বাঙালি গড়ে তোলেন তাঁর সখের থিয়েটার — ‘হিন্দু থিয়েটার’। অথচ সেখানে কোনও বাংলা নাটক অভিনীত হল না। অভিনীত হল সংস্কৃত নাটক ও সংস্কৃত নাটকের ইংরেজি অনুবাদ। ১৭৯৫ সালের ২৭শে নভেম্বর একজন বিদেশি কিন্তু বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। প্রসন্নকুমার ঠাকুর সেই পথে হাঁটলেন না। হাঁটলে চার বছর আগেই বাঙালি থিয়েটারে বাংলা নাটক মঞ্চের মুখ দেখতো। প্রথম বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করার গর্ব বুকে নিয়ে আছে ‘শ্যামবাজার থিয়েটার’। বলা যেতে পারে নবীন বসুর থিয়েটার।

প্রসন্ন কুমার ঠাকুর

কে এই নবীন বসু? কথায় আছে, বাজে খরচেই মানুষকে চেনা যায় বেশি। বাজে খরচ করে দেউলিয়া হয়েছেন এমন বাঙালির সংখ্যা নেহাত কম নয়। বাবু নবীন বসুও দেউলিয়া হয়েছেন। তবে তিনি নিঃস্ব হয়ে ছেন তাঁর স্বপ্নের থিয়েটার গড়তে গিয়ে। একটা ছড়া সেদিন লোকের মুখে মুখে ঘুরতো:
‘বৃন্দাবনে কৃষ্ণরাম,
কুঞ্জ স্থাপন করে।
সর্বস্বান্ত নবীনচন্দ্র,
তথায় গিয়ে মরে।’
কৃষ্ণরাম হলেন দেওয়ান কৃষ্ণরাম বসু। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল হুগলি জেলার ‘তাড়া’ গ্রামে। ব্যবসার কারণেই তাঁরা শ্যামবাজারে এসে বসবাস করেন। পরবর্তীকালে ব্যবসা ছেড়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান হন মাসিক দু হাজার টাকার বেতনে। কয়েক বছরের মধ্যেই কৃষ্ণরামবাবু টাকার কুমীর হয়ে যান। নানা খাতে টাকা খরচ করতে থাকেন, বিশেষ করে ধম্মোকম্মোর ক্ষেত্রে। হুগলির শ্রীরামপুরের মাহেশের রথ তাঁরই প্রতিষ্ঠিত। দেওয়ান কৃষ্ণরাম বসু ছিলেন বাবু নবীনচন্দ্রের ঠাকুরদা। উত্তরাধিকার সূত্রে নবীন বসুও বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়ে যান। যেন টাকা খরচের লাইসেন্স পেয়ে যান ঠাকুরদার কাছ থেকে। অবশ্যই ভালো কাজে। মঞ্চ তৈরি ও নাট্য প্রযোজনার জন্যে।
শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় থেকে আপনি যাচ্ছেন হাতিবাগানের দিকে। ডানদিকে পাবেন ট্রাম ডিপো। এককালে সেখানে ছিল ঘোড়ায় টানা আস্তাবল। এর পিছনে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে কৃষ্ণরাম বসু স্ট্রিট আর ন্যায়রত্ন লেনের সংযোগস্থলে ছিল বাবু নবীনচন্দ্রের বিশাল অট্টালিকা। চারপাশে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল বড়ো বড়ো পুকুর, গাছ, মন্দির, কাঁচা রাস্তা আর মাটির বাড়ি। এখানেই নবীনচন্দ্র গড়ে তোলেন তাঁর সখের নাট্যশালা-‘শ্যামবাজার থিয়েটার’। সময়ের পলিতে চাপা পড়ে আজ তার কোনও চিহ্ন নেই।

Proscenium style of theatre in 18th century Calcutta

ঠিক কোন বছরে এই নাট্যশালা গড়ে উঠেছিল, কত বছর স্থায়ী ছিল, কি কি নাটক অভিনীত হয়েছিল তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে সকলে একমত যে, শ্যামবাজারে নবীন বসুর বাড়িতে একবার ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর অভিনয় হয়েছিল। শ্রদ্ধেয় ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্গীয় নাট্যশালার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন—’এখন যেখানে শ্যামবাজার ট্রাম ডিপো অবস্থিত, সেইখানেই নবীনচন্দ্রের বাড়ি ছিল বলিয়া জানা যায়। তাঁহার বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত এই নাট্যশালায় বৎসরে চার পাঁচটি করিয়া বাংলা নাটকের অভিনয় হইত। ১৮৩৫ সনের ৬ই অক্টোবর ইহাতে বিখ্যাত বাংলা উপাখ্যান বিদ্যাসুন্দর নাট্যাকারে অভিনীত হয়।’ নাটকটি রাত বারোটায় শুরু হয়ে শেষ হয়েছিল সকাল ছ’ টায়। এক হাজারেরও বেশি দর্শক সেদিন উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, কতিপয় ইংরেজ ও ফিরিঙ্গি ছিল। ‘বিদ্যাসুন্দর’ বাংলা নাটক, বাঙালিদের দ্বারাই অভিনীত। বাবু নবীনচন্দ্র মহিলা চরিত্রে বাঙালি মেয়েদের দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন। বিদ্যার ভূমিকায় অভিনয় করেন ষোল বছরের কিশোরী রাধামণি। মণি নামেই তিনি বেশি পরিচিত। তাঁর বিপরীতে সুন্দর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বরানগরের শিক্ষিত যুবক শ্যামাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রাইমণি সুন্দরের সঙ্গে প্রেমের অভিনয়ে দর্শকদের মাতিয়ে দিয়েছিলেন। সুন্দরের মৃত্যুদন্ডের সংবাদ শোনার দৃশ্যে তাঁর অভিনয় দেখে দর্শকের চোখ ভিজে উঠত। প্রৌঢ়া জয়দুর্গাদেবী বীরসিংহের রানি ও মালিনী চরিত্রে অভিনয় করে, গান গেয়ে সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন। বিদ্যার সখীর ভূমিকায় রাজু বা রাজকুমারীও ভালো অভিনয় করেন। যাত্রায় তখন কালুয়া-ভুলুয়া চরিত্র বিশেষ চরিত্র হিসেবে হাজির থাকত। ‘বিদ্যাসুন্দর’ যাত্রাও বেশ জনপ্রিয় ছিল। সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নাটকেও কালুয়া-ভুলুয়া চরিত্র যুক্ত করা হলো। বাবু নবীনচন্দ্র নিজে কালুয়া চরিত্রে এবং ভুলুয়া চরিত্রে রাজা বৈদ্যনাথ রায় অভিনয় করেন। এই নিয়ে গান বেঁধে ছিলেন জনৈক ছড়াকার-‘নবীন বসু কালুয়া/রাজা বৈদ্যনাথ ভুলুয়া/বরানগরের শ্যামাচরণ/হলেন সুন্দর।’

Proscenium Theatre

সংস্কৃত নাটকের মতো বিদ্যাসুন্দর নাটকের শুরুতে স্তোত্রপাঠ বা নান্দীপাঠ করা হতো। নবীনচন্দ্র বিলেত থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি এনে আলোর ব্যবস্থা করলেন। মঞ্চে আলোর যাদুতে ঝড়বিদ্যুৎ দেখানো হয়েছিল। প্রচুর অর্থ তিনি খরচ করলেন আলো ও দৃশ্যপট অঙ্কনে। রাজা বীরসিংহের প্রাসাদ, তার কন্যার ঘরের চিত্রপট, মেঘ, জল ইত্যাদি আঁকা হয়েছিল। মিউজিকে সেতার, সারেঙ্গী, পাখোয়াজ, বেহালা ব্যবহৃত হয়েছিল। বাবু ব্রজনাথ গোস্বামীর বেহালাবাদন দর্শকের প্রশংসা লাভ করেছিল। নির্দিষ্ট স্থানে মঞ্চ বেঁধে এই নাটকের প্রদর্শন হয়নি। নাটকের দৃশ্যগুলি বাড়ির নানান জায়গায় সাজিয়ে রাখা হতো। যেমন নবীন বসুর বৈঠকখানায় রাজা বীরসিংহের দরবার, উদ্যানের একপাশে মালিনীর কুটির, বাগান সংলগ্ন পুকুরঘাটে বসে থাকত সুন্দর, সুন্দরের গোপন পথে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল সুরঙ্গ পথ ইত্যাদি। দর্শকরা উঠে গিয়ে নানা স্থানে অভিনয় দেখতেন। শ্যামবাজার নাট্যশালায় বিদ্যাসুন্দরের অভিনয় খুবই প্রশংসিত হয়েছিল। সমকালীন শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত জনসমাজে বিশেষ উদ্দীপনা ও আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। কেননা এই নাটকে ‘বিলাতী যাত্রা’ এবং ‘স্বদেশী থিয়েটার’-এর একঅপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। বাঙালির তৈরি নাট্যশালায় বাংলা নাটকের অভিনয়, মহিলা চরিত্রে নারীর উপস্থিতি, আলো, আবহ ও দৃশ্যসজ্জায় চমক, নানা স্থানে অভিনয়ের ব্যবস্থা সব মিলিয়ে শ্যামবাজার থিয়েটার বাংলা রঙ্গমঞ্চে যুগান্তর ঘটিয়েছিল। ১৮৩৫ সালের ২২ অক্টোবর ‘হিন্দু পাইওনিয়র’ পত্রিকা ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর অভিনয়ের প্রশংসা করে।
নবীন বসু ইংরেজদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ‘বিদ্যাসুন্দর’ নাট্য প্রযোজনায় মাত্রাতিরিক্ত অর্থ খরচ করেন। চারদিকের ধারদেনায় ডুবে যান। সর্বস্বান্ত হয়ে কলকাতা থেকে পালিয়ে যান বৃন্দাবনে। সেখানে ঠাকুরদা কৃষ্ণরামের কুঞ্জে ১৮৭৬ সালে ৬৭ বছর বয়সে তিনি পরলোক গমন করেন। মহালয়াতে নাকি পিতৃপুরুষেরা পরলোক থেকে ইহলোকে আসেন জল ও পিন্ডলাভের আশায়। প্রয়াত পিতৃপুরুষেরদের তৃপ্ত করা হয় জল ও পিন্ডদানের মাধ্যমে। আমাদের রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসের এক মহান পুরুষ নবীনচন্দ্র বসু। না, তাঁকে জল বা পিন্ডদান নয়। আসুন, আমরা বাংলা থিয়েটারের প্রথম নাট্য দেউলিয়ার জন্য এক ফোঁটা চোখের জল খরচ করি।

[লেখকের অন্য লেখা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x