
[এটি বাঙালির একশো বছরের অর্থাৎ বঙ্গাব্দের চতুর্দশ শতকের ইতিহাসের একটি ধারাবিবরণী। গ্রামীন কথকতার আসরে যেভাবে সাধারণত পাঁচালি গান পরিবেশিত হয়, এটি তার উপযোগী করে রচনা করা হয়েছিল এই শতকের শুরুতে। পাঁচালির মাঝে মাঝে যাতে বিশিষ্ট রচয়িতাদের কবিতা বা গান সংযোজন করা যায়, তার দিকে লক্ষ রেখেই পাদটীকায় বিভিন্ন গানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পাঠ্য রচনা হিসেবে প্রকাশের সময় সুপরিচিত গানগুলির শুধু প্রথম কয়েকটি পংক্তির ও নির্বাচিত কিছু কবিতার অংশবিশেষ উল্লেখ করা হল। মূল কথকের পাঁচালী পরিবেশনের মাঝে মাঝে সহযোগীরা যেরকম ধুয়া ধরেন, সেই রীতি বজায় রেখে এখানেও পাঁচালীর মাঝে মাঝে বিভিন্ন ধুয়া সংযোজিত হল এটিকে বর্তমান কালের মঞ্চেও গীতি আলেখ্য হিসেবে পরিবেশনার সম্ভাবনা মাথায় রেখে।]

পর্ব – ২
দ্বিতীয় দশকে হেরি নব চমৎকার–
ওড়িশায় প্রমথ বসুর লৌহ আবিষ্কার!
শিক্ষানেতা আশুতোষ নবীন এ সময়ে
বাংলা ভাষায় প্রতিষ্ঠা দেন বিশ্ববিদ্যালযয়ে।।
জ্ঞানীগুণী বিদ্বজ্জনে করি আবাহন
গড়িলেন এই শিক্ষাপীঠ মনের মতন।
প্রতিভায় যুগস্রষ্টা কর্মে সুমহৎ ,
তাঁর অপর কর্মক্ষেত্র ছিল আদালত।
তেরো শ’ বারোতে বাংলার লাট সে কার্জন
কূটনীতি ছলে করে বঙ্গ বিভাজন।।
বঙ্গভঙ্গ রুধিবারে বাঁধিলা কোমর
নববলে বলীয়ান বাঙালি আপামর।।
করিলেন সুরেন্দ্রনাথ নেতা, রাষ্ট্রগুরু
কার্জনের কার্যরোধে আন্দোলন শুরু।।
বাঙালিরা মনে প্রাণে একাত্ম সকলে,
সেই ঐক্য টুটিবে না কাহারও কৌশলে —
এই পণে জনমিল স্বদেশী আন্দোলন
ভারত কাঁপায় বাংলার বীর জনগণ।।
[ধুয়া :- “আহা, বেশ বেশ বেশ!…”]
বঙ্গভঙ্গ দিবসেতে শোকের কারণ
ঘরে ঘরে পালিত হইল অরন্ধন।।
সভা সমিতি মিছিলে উথলিল দেশ,
স্বদেশী চেতনার যেন হইল উন্মেষ।।
হিন্দু-মুসলিম এক লক্ষ্য, এক কার্যক্রম,
স্বরাজলাভের মন্ত্র ‘বন্দেমাতরম্’!
বঙ্গবাসীর প্রাণে প্রাণে ভেদ ঘুচাইতে
রবিকবি আসিলেন রাখী বেঁধে দিতে!
রাখীই নয় যে শুধু, বাঁধিলেন গান,
মিলনের মন্ত্রে পূর্ণ বাঙালির প্রাণ!

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী গান :-
“বাংলার মাটি, বাংলার জল,
বাংলার বায়ু, বাংলার ফল,
পূর্ণ হউক পূর্ণ হউক
পূর্ণ হউক, হে ভগবান!….” ইত্যাদি।
স্বদেশীর অর্থ নয় শুধু প্রতিরোধ —
জাগাইতে হবে প্রাণে জাতীয়তাবোধ!
জাতীয় শিক্ষার বিধি হইল প্রণয়ন,
স্থাপিত হইল জাতীয় বিদ্যায়তন।।
তাহার অধ্যক্ষ পদে দিতে যোগদান
আসিলেন অরবিন্দ বাংলার সুসন্তান!
বাংলায় বিপ্লবের তত্ত্ব করেন প্রচার,
এই কাজে সাথী ভাই বারীন্দ্র তাঁহার।।
যুবমনে ঘুচাইতে সাহেবের ভীতি
গড়ে ওঠে শরীরচর্চা ও গুপ্ত সমিতি।।
স্বদেশী যুগের যাহা ছিল প্রাণবাণী,
প্রচারিল স্বদেশী কাগজ কয়খানি।।
সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘সন্ধ্যা’ সে পত্রিকা,
জ্বালাময়ী ভাষা তার আগুনে শিখা!
নির্ভীক সম্পাদক ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়
গ্রেপ্তার হইলেন রাজদ্রোহের মামলায়।।
‘ফিরিঙ্গি’র সাজা নিতে তেজস্বী ব্রাহ্মণ
অপেক্ষা না করে লীলা করেন সমাপন।।
[ ধুয়া:- মরি হায়, হায় রে,…]
অন্যদিকে নেতাগণ চালান প্রচার —
বিলাতি মাল ছেড়ে কর দেশী ব্যবহার।।
স্বদেশী শিল্পকে করো উৎসাহ প্ৰদান,
শোনো ওই কান্তকবি বাঁধিলেন গান!

রজনীকান্ত সেনের স্বদেশী গান:-
“মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়
মাথায় তুলে নে রে ভাই,
দীন দুখিনী মা যে মোদের,
তার বেশি আর সাধ্য নাই।।…” ইত্যাদি।
বিপ্লবীরা গুপ্তকর্মে উঠিলেন মাতি,
ব্রিটিশ নিধন আর স্বদেশী ডাকাতি।।
অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডে বধিতে
ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল ধায় ভয়হীন চিতে!
তেরশো পনেরোর গ্রীষ্মে ফাটে বোমা জোর —
শহীদ হইল দুই বিপ্লবী কিশোর।।
মুরারিপুকুরে দিল পুলিশেরা হানা,
ধরা পড়িল সেখানে বোমার কারখানা।।
অরবিন্দ আর যারা বানাতেন বোমা,
সবে লয়ে আলিপুরে চলে মোকদ্দমা।।
বিশ্বাসঘাতকদের করিতে সংহার
কানাই ও সত্যেন প্রাণ দিল চমৎকার।।
মামলাতে কৌঁসুলী হয়ে চিত্তরঞ্জন দাশ
যুক্তিজালে বিপ্লবীদের ঘটান দণ্ডহ্রাস।।
মুক্ত হয়ে অরবিন্দ তাঁরই পরিশ্রমে
বাংলা হতে পন্ডিচেরি যান কালক্রমে।।
কালে সেথা গড়িলেন যোগের আগার,
অতিমানসের তত্ত্ব তাঁরই উপহার।।
বাংলার বিপ্লববাদে শংকিত ইংরেজ,
দেখে সবে বাংলার যৌবনের তেজ!
ক্ষুদিরাম বাংলায় প্রথম ফাঁসির শহীদ,
তারে স্মরি পল্লী কবি বিরচিলা গীত!
প্রচলিত স্বদেশী গান :-
“একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি। হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে জগৎবাসী।।…” ইত্যাদি।
ভারতের বড়লাট হার্ডিঞ্জের পানে
বোমা ছুঁড়ে রাসবিহারী পালান জাপানে।।
অবন ঠাকুর উজলিল আর্ট সোসাইটি।।
প্রাচ্যরীতি চিত্রকলা লভিল মূরতি।।
এ দশকে বাঙালির সাহেব বিজয়I
ফুটবল মাঠেও কীর্তি রাখিল অক্ষয়।।
মোহনবাগান শিল্ড জয় করি আনে,
গর্ববোধ জাগাইল বাঙালির প্রাণে।।
নাট্যমঞ্চে গিরিশের শেষ অভিনয়
চোদ্দ শতকের বড় ঘটনা নিশ্চয়।
নটনাট্যকার মহাকবি শুধু নন,
গিরিশের হাতে নবযুগ-প্রবর্তন।
বঙ্গ রঙ্গালয়ে কত গৌরব কাহিনী,
অর্ধেন্দু, অমৃতলাল ও নটী বিনোদিনী!
গিরিশপুত্র দানীবাবু — সেও কম কিবা–
নাট্যরচনায়ও কত নবীন প্রতিভা!
জ্যোতিরিন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল,ক্ষীরোদপ্রসাদ–
সর্বোপরি সব্যসাচী রবীন্দ্রনাথ!
সাধারণ রঙ্গালয়ের বাইরে তখন
ঠাকুরবাড়ির অভিনয়ে নূতন ধরন।।
[ ধূয়া – “আগে কহ আর,
আহা আগে কহ আর।” ]
সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ মহাবনস্পতি,
তাঁরে অঙ্কে ধরি বঙ্গমাতা ভাগ্যবতী।।
নন শুধু বিশ্বকবি, অর্ধশতক জুড়ে
গল্পে উপন্যাসে গানে শক্তি তাঁর স্ফুরে।।
বাংলা ভাষা তাঁরই হাতে হয়ে প্রসাধিত
বিশ্বসুধীসভা মাঝে হইল নন্দিত।
ইংরাজিতে অনূদিত গীতাঞ্জলি তাঁর
সাহিত্যে জিনিয়া আনে নোবেল পুরস্কার।।
বাঙালিকে আত্মবিশ্বাস দিল এ সংবাদ, গর্বে গাথা গাহে কবি অতুলপ্রসাদ।।

অতুলপ্রসাদ সেনের গান :-
“মোদের গরব মোদের আশা,
আ মরি বাংলা ভাষা !
ও মা তোমার কোলে তোমার বোলে
কতই শান্তি ভালোবাসা ।….” ইত্যাদি।
রবীন্দ্র এ যুগের চিন্তা-নেতাও একজন,
দেশোদ্ধার ব্রত তাঁর – আত্ম-উন্নয়ন।।
বোলপুরে গড়া তাঁর ব্রহ্মবিদ্যালয় —
প্রাচীন তপোবনের যেন নবীন উদয়।।
শুরুতে আশ্রম ছিল শান্তিনিকেতন,
হল সেথা ক্রমে বিশ্বভারতীর পত্তন।।
বিশ্বের জ্ঞানী গুণী রবির আবাহনে
জুটিয়া বিতরেন নানা বিদ্যা সেইখানে।।
রবি আলো দেন বসে শান্তিনিকেতনে —
নৃত্য-গীতি-নাট্য-কাব্য অজস্র কিরণে!
বাঙলার রবি যবে করেন বিশ্বজয়,
ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্রের হইল অভ্যুদয়।।
তিনি বঙ্গসমাজের দরদী কথাকার,
বঞ্চিতের, নারীর ব্যথা উপজীব্য তাঁর।
[ধুয়া :- "আহা, বেশ বেশ বেশ!..."]
বিশের দশকে নানা মুখে নানা স্রোতে
বাংলা মনীষা ধায় চরিতার্থ হতে।।
চর্যাপদ আবিষ্কার হরপ্রসাদের
প্রাচীনত্ব সিদ্ধ করে বাংলা সাহিত্যের।।
মহেঞ্জোদারোতে খনন করি রাখালদাস
নূতন আলোকে রচেন ভারত-ইতিহাস!
বিজ্ঞানেও পিছপা নয় বাঙালি সন্তান–
কালাজ্বরের টীকা উপেন ব্রহ্মচারীর দান।।
বিজ্ঞানে নূতন তত্ত্ব তাপ আয়নন
মেঘনাদ সাহা করিলেন উদ্ভাবন।।
রণভূমের শৌর্যেও কি বাঙালি কম যায় —
কীর্তি রাখেন বৈমানিক ইন্দ্রলাল রায়!
ভূপাতিত করি তেরো শত্রুর বিমান
ফ্রান্সের মাটিতে দেহ রাখে কীর্তিমান।।
রাজনীতিতে বাঙালির অক্ষুণ্ন নেতৃত্ব —
দু ধারাতেই নিবেদিত দেখি তার চিত্ত।।
অহিংস সংগ্রামে আর গণসংগঠনে —
শ্রমজীবী মানুষের মনোজাগরণে
দেশকে নেতৃত্ব দেন ত্যাগী নেতাগণ–
চিত্তরঞ্জন, বীরেন শাসমল, যতীন্দ্রমোহন।।
স্বদেশীর তরে ত্যাজি আইন ব্যবসায়
দানিলেন চিত্ত তাঁর ধন সমুদায়।।
উজ্জীবিত বাংলার নগর আর গ্রাম
দেশবন্ধু ডাকে তাঁরে জানায় প্রণাম।।
বলি দিয়া সিভিল সার্ভিস দেশসেবা-যূপে
আসিলেন সুভাষচন্দ্র তাঁরই শিষ্য রূপে!
যতীন্দ্রমোহনের ডাকে ব্রহ্মে, চট্টগ্রামে
দলে দলে শ্রমিকেরা ধর্মঘটে নামে।।
[ ধূয়া - "আগে কহ আর,
আহা আগে কহ আর।" ]
আর এক যতীন্দ্র সে যে শস্ত্রপাণি বীর,
জার্মান অস্ত্রের জন্য অপেক্ষায় অধীর।।
সমুদ্রের ধারে জাহাজের প্রতীক্ষায়
চার সঙ্গী সহ তাঁর দিন কেটে যায়।।
আসিল না অস্ত্র হায়, আসিল ইংরেজ,
দেখিল সংগ্রামে পাঁচ কেশরীর তেজ!
ওড়িশার বালেশ্বরে বুড়িবালাম-তীরে
সিক্ত হলো মাটি পঞ্চবীরের রুধিরে।।
বাঘা যতীনের সেই আত্মবলিদানই
ঘুচায়েছে বাঙালির কাপুরুষ গ্লানি।।
ইতিহাসে সেই শৌর্যের নাহি কোন তুল —
সে গাথা গান বিপ্লবের কবি নজরুল!

নজরুলের কবিতা ‘নব ভারতের হলদিঘাট’ —
“বালাশোর – বুড়িবালামের তীর –
নব-ভারতের হলদিঘাট,
উদয়-গোধূলি-রঙে রাঙা হয়ে
উঠেছিল যথা অস্তপাট।…
অভিমন্যুর দেখেছিস রণ?
যদি দেখিসনি, দেখিবি আয়,
আধা-পৃথিবীর রাজার হাজার
সৈনিকে চারি তরুণ হটায়।
ভাবী ভারতের না-চাহিতে আসা
নবীন প্রতাপ, নেপোলিয়ন,
ওই ‘যতীন্দ্র’ রণোন্মত্ত –
শনির সহিত অশনি-রণ।
দুই বাহু আর পশ্চাতে তার
রুষিছে তিনটি বালক শের,
‘চিত্তপ্রিয়, ‘মনোরঞ্জন,
‘নীরেন’ – ত্রিশূল ভৈরবের!
বাঙালির রণ দেখে যা রে তোরা
রাজপুত, শিখ, মারাঠি, জাঠ!
বালাশোর – বুড়িবালামের তীর –
নব-ভারতের হলদিঘাট।…” ইত্যাদি।
ইংরেজ পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে
নিরস্ত্র জনতার ‘পরে গোলাগুলি দাগে।।
সমস্ত ভারত যবে নির্বাক শঙ্কায,
কবি রবি স্বদেশের সম্মান রক্ষায়
ত্যাজিলেন ইংরেজদত্ত নাইট উপাধি
নির্ভয়ে একাই তিনি হলেন প্রতিবাদী।।
[ক্রমশঃ]
v
লেখা খানি পড়িয়া আবার জাগিয়া
উঠিল মনেতে পুরানো ইতিহাস খানি
গ্রহন করিবেন ধন্যবাদ আনন্দেতে ,
আশায় রহিলাম আপনার সনে
বাঙালির ইতিহাস ছিল যাহা শুরুতে।