শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

১
বিকেল শেষপ্রায়। গোয়ালপাড়ার ডাকঘর মন খারাপ করেছে যেন। এবছর শীত একটু সময় নিচ্ছে। ডাকবাড়ির দেওয়ালে নিয়মমাফিক সাইকেল রাখল শঙ্কর। সাইকেলটায় জং ধরেছে। সিটের রঙ মুছে ফেলেছে সময়। শঙ্কর মুছে দিল আরেকবার। তা তো হবেই চল্লিশ বছরের কিছু বেশিই হল সাইকেলটার বয়স।
ওর বাবার সাইকেল এটা। সেদিন সন্ধ্যায় ফিরছিলেন পড়িয়ে। সাপের কামড়ে শেষ। মাঝমাঠে দু’চাকার এই সাইকেলটা নিয়েই পড়েছিল ওর বাবা। এই সাইকেল ছিল বাবার শেষদিনের সঙ্গী। শঙ্কর উত্তরাধিকারে পেয়েছিল এটা। এই সাইকেলে চেপেই চাকরি করল এতগুলো বছর। ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ থেকে চাকরির চিঠি সবই এনেছিল। এমনকি ছেলের চাকরির চিঠিও এই সাইকেলে চেপেই এসেছিল।
সাইকেলটাই ওর দাদা, বন্ধু সব। এই সাইকেলটাই সাক্ষী ছিল স্কুল ছাড়ার। হেডমাস্টারমশাই বলেছিলেন, “কেন ছাড়বি পড়াটা? তুই ফার্স্ট বয়। মাধ্যমিকে লেটার। তুই কিনা… চিঠি দিবি ঘরে ঘরে?”
ওর যে উপায় ছিল না। সেবারই একটা পোস্ট খালি হল। ওর হয়েও গেল। মাস্টারমশাইও হঠাৎ চলে গেলেন স্ট্রোকে।
সেই থেকে রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে একদিনও শঙ্কর কামাই দেয়নি। ছুটিও নেয়নি। কারণ, রোজই দরকারি চিঠি থাকে। জীবনের কত যে দরকারি খবর থাকে, এই কাজটা করতে করতেই বুঝছিল শঙ্কর।
আজ ওর চাকরির শেষদিন। ওর চাকরি শেষের চিঠিটাও এই সাইকেলে চেপেই এসেছে স্টেশন থেকে। সবশেষে ওর হাতে দিলেন চিঠিটা অফিসারমশাই। হাসিমুখে সবাই ওকে মালা পরাল। ফুল দিল। ও বেরিয়ে এসে বলল সাইকেলটাকে। “এই নে মালা পর।” বলল, “নে এবার অবসর শুরু হবে আমাদের। এখন থেকে আমরা ঘুরব-ফিরব বেড়াব।”
জং-ধরা হ্যান্ডেলটা যেন হাসল। হাঁটতে হাঁটতে বড় মোড় ছাড়িয়ে সোনাঝুরি গাছের বাগানে ঢুকেছে ওরা।

একটা ইয়া বড় গাড়ি থামল হর্ন বাজিয়ে। ছেলে এসেছে। ছেলের গাড়ি।
ছেলে বলল, “বাবা, চল। উঠে বসো।”
শঙ্কর ইতস্তত করে বলল, “আর সাইকেলটা?
ছেলে বলল, “মানে? ওটা কে নেবে, থাক এখানে পড়ে।”
বুকটা মোচড় দিল শঙ্করের। যেন বিছে কামড়ে ধরল। শঙ্কর এত দামি গাড়িতে চড়েনি কখনও। ছেলে বাবাকে স্মার্টফোন দিল। বলল, “বাবা, জীবন মানেই ডিজিটাল।”
শঙ্কর এরকম ফোন দোকানে দেখেছে। মসৃণ। আলো বেরোচ্ছে। হাতের ছোঁয়াছুয়ির খেলা। কিন্তু প্রাণ নেই, ভালবাসা যায় না। ছেলে খুব খুশি। সকালেই বাবাকে নিয়ে চলে যাবে বহু দূর দেশে। তাই বলছে, ‘সব গুছিয়ে নাও।’ শঙ্কর কি কি নেবে? সেটাই বুঝতে পারছে না।

২
শীতের রাত বলে লোক কম। কুয়াশা এসে ঘুমাচ্ছে মাঠে। শঙ্কর হাঁটতে হাঁটতে এসে গেছে তিন কিলোমিটার।
হ্যাঁ, মাঠেই রয়েছে ওর সাইকেলটা। শঙ্কর তুলে দাঁড় করালো। বুকে চেপে ধরল ঠাণ্ডা লোহার হ্যান্ডেলটা। মুছিয়ে দিল কুয়াশাজলের ভেজাটুকু। কিছু পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে। এবারে ঢেকে দিল সাইকেলটাকে। কম্বলটা ওর বাবার।
“খুব কষ্ট হল তো ঠাণ্ডায় এই বয়সে। তোকে ফেলে কখনও যাই আমি? কি করব বল তো, ছেলের কাণ্ড।” শঙ্কর বলল। সাইকেলটা শুনল নিশ্চিত। কারণ, ওকে জড়িয়ে ধরতে আপত্তি করল না। কম্বলে ওমে দুজনের গল্প দেখে বোধহয় আলোর চোখও ঝাপসা হয়ে এল।

সোনাঝুরি গাছগুলো কাঁদছে? নইলে টুপটুপ জল পড়বে কেন? পাতা ঝরবে কেন?

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x