শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

দেব আর দেবী । ট্রেনে ট্রেনে, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে শিব দুগ্গার নাচ দেখায় । ওদের বাপ হাসান শেখ রোজ সস্তা রং নিয়ে আসে আর সৎ মা ফাতিমা বিবি সেই রং ওদের গায়ে মাখিয়ে ওদের তৈরী করে দেয় সক্কাল সক্কাল । ওরা বেরিয়ে পড়লেই বাপ তাড়ি খেয়ে বেহেড হবে আর সৎমা ওদের দুই ভাই বোনকে গাল দিতে দিতে সংসারের কাজ সারবে । এটাই রোজকার রুটিন । সেই কখন ভোরবেলা দুটি পান্তা খেয়ে শ্যামনগর লোকালে উঠে বসে দুই ভাই বোন । গন্তব্য কলকেতা । যেতে যেতে গান গাইবে কামরায় কামরায় । দেব হাতের ডুগডুগি বাজাবে আর দেবী এক পায়ে ঘুঙুর পরে নাচবে । সে সব গান নাচ অবশ্য একেবারেই ঠাকুর দেবতার নাম সংকীর্তন নয় । ওদের বাবা হাসান শেখ ওদের বলে দিয়েছে, হিন্দি বাংলা ছিনামার নাচ গান করবি, দেখবি, আয় বেশি হবে । ঘরে রোজ পঞ্চাশ ষাট টাকা ফেরাতেই হয় ওদের, নাহলে মারধর, রাতের রুটি বন্ধ । পেটে ছুঁচো-দৌড়নো খিদে পায় ছেলে মেয়ে দুটোর কিন্তু রোজগারের পয়সা থেকে এক পয়সা যদি খরচ করতে পারে । মাঝে মাঝে ইস্টিশনের চায়ের দোকানের মাসি ওদের পাউরুটি ঘুগনি খাওয়ায় । খুব খিদে পেলে মুখে চোখে ফুটে ওঠে যে । মায়ের মন সরলা মাসির, ঠিক বোঝে ।

দেব বা দেবী ওদের নাম নয়, বাবা বলে দিয়েছে ওই নাম সকলকে বলতে । এই নামে নাকি পয় আছে, তাছাড়া দেবের সিনামার গান সব মুখুস্থ আমাদের মহাদেবের । ওই গান শুনিয়েই সে আর তার বোন তাদের সংসারের গ্রাসাচ্ছাদন জোগাড় করে কোনমতে । রোজ যখন সকালে ট্রেনে তারা নাচে গায় তখন অনেক ইস্কুলের বাচ্চাদের দেখে, পড়তে যাচ্ছে । দেবী বলে, “আমাদের মা থাকলে আমাদের লিচ্চয় পড়তে পাঠাত, না রে দাদা?” দেব জানে, মা থাকলেও কিছু করার ছিল না, সবই তাদের কপাল । ফোঁশ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঐটুকু ছেলে । বলে ওঠে – “তর ছেলে মেয়েদের পড়াস ইস্কুলে, কেমন? আমি ভার নিলাম ।” আহা ঐটুকু ১২ বছরের দাদা, বনের প্রতি এই অসম্ভব আশ্বাসের বাণী শোনাতে পারে, এই তো অনেক । দাদার কাঁধে মাথা রাখে ছোট বোন, ফিরতি ট্রেন এ রুজু রুজু হাওয়া দেয় ; মুখের রং ধুয়ে গেছে অনেকটাই, তবু পরম শান্তিতে ঘুম যায় জীবন নাটকের এক খুদে রঙ্গকর্মী, দেবী শেখ ।
প্রথম যেদিন ওরা ট্রেনে নিজেদের নাম বলেছিল অনেকেই হেসেছে, ঠাট্টা তামাশাও করেছে বুঝি । তাতে অটল অনড় দুইজনা, টাকা তাদের তুলতেই হবে, যা বাবা বলে দিয়েছে, না হলেই বেধড়ক মার, আর রুটি বন্ধ । এইটুকুই জানে ওরা, পেটের জন্য রুটি আর পান্তা আর রঙ মেখে সঙ সাজা এই জীবন যুদ্ধে । শিব পার্বতী, রাধা কেষ্ট সাজা, এই সব আর কি । হলদে উড়না জড়িয়ে মুখ ঢেকে অঙ্গ ভঙ্গি করে নাচে আট বছরের দেবী । নাচ গান তুলে নেয় টিভি দেখে । পাশের বাড়ি মুন্না উসমানের টিভি । চাচা আর চাচি খুব ভালো, কখনো কখনো জিলাবি বা সিঙ্গারাও একটা একটা জুটে যায় ভাগ্যে ।

এই তাদের দিন গুজরান । চলাচল ।

তা সেদিন রাতে ট্রেনের লাইন ছেড়ে গেল । রাতে বাড়ি ফেরা হলো না । ওই একটা দিন তাদের কাছে পিকনিক । টাকা দেবার দায় নেই বাপকে আজ । নয় নয় করে ষাট সত্তর টাকা রোজগারও হয়েছে । বরানগর ইস্টিশানে গাড়ি আটক । তাই ওই ইস্টিশানেই খেল ভাই বোন, মাছের ঝুল আর ভাত, আহ্ যেন অমৃত, গালে লেগে ছিল সে স্বাদ কতদিন । একবার মনে হলো না, কাল বাবা ডবল টাকা চাইবে রাতে ফিরলেই, তখন কী হবে … সৎ মার গালাগালও মনে পড়ল না , শুধু পেট ভরে খেয়ে, তারা ভরা রাতের আকাশের নিচে বসে – দেবী বলে উঠলো, “দেবতা মাঝে মাঝে আমাদেরও দয়া করে না রে দাদা ? কত্ত দিন মাছ ভাত এর জন্যে মন পড়েছিল, আজ কেমন খাওয়া হয়ে গেল, তাই না?” দাদা তাকিয়ে থাকে বোনের দিকে; দেবীর চোখে চাঁদের তিলক আঁকা । চারিদিকে ঝুম জোচ্ছনা, তারার শামিয়ানার তলায় রাতের নিঃসীম নীল মায়াময়তায় ঘেরা শিশুরা এক অদ্ভূত মুহুর্তসুখে বিমোহিত । এইটুকুই তাদের জীবন থেকে পাওয়া, এক একটা হঠাৎ অন্যরকম রাত দিন, যদিও খুব কালেভদ্রে আসা, তবুও ইস্কুলের প্রাইজের মতই ।

দেব নিঃশব্দে বোনের কথা শোনে, তারপর খানিক গম্ভীর হয়ে বলে, “হুম, এই যে দেবতা আছে এইখানে আমার আর তর মধ্যে, দেব আর দেবী ।” – বলেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে দুই দেবশিশু, এই বিরাট পৃথিবীর এক কোনায়, এক অনামা স্টেশনে, বসে বসে । যেন তাদের মা বাপ নেই, তাদের কেউ নেই, তারা দুই অনামা বালক-বালিকা, পৃথিবীর কোন তারকাখন্ডের ধুলিগুড়ি দিয়ে বানানো তাদের ছোট্ট দুটি দেহ …. হঠাৎ পথভুলে এইখানে এসে পড়েছে জীবনের সবথেকে বড় উদার চিরকেলে সত্যটিকে উপলব্ধি করতে।

আর ঠিক তখনই, পৃথিবীর অন্য এক কোনায় পৃথিবীর শিশুদের শিশু শ্রমিকত্ত্ব, শিক্ষা ও খাওয়া দাওয়ার সুব্যবস্থা নিয়ে ইউনিসেফএ একটি দীর্ঘ সেমিনার শেষ হয় ।

[লেখকের অন্য রচনা]


Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x