শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

(তিন চরিত্রের একটি ক্ষুদ্র নাটিকা, সময় কাল বছর কুড়ি আগে। কুশিলব – ইন্দ্রকুমার ও তুলসি বাবু, দুজনের জন্ম দুই বাংলায় এবং দুজনেই অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী । দেবযানী, ইন্দ্রকুমারের নাতনী, সংক্ষেপে দেবী। ইন্দ্রকুমার-বাবুর মধ্যবিত্ত বসার ঘরে তিন জনের আলাপচারিতা। বিষয় – ক্রমশ প্রকাশ্য। আপাতত বেজে উঠেছে দূরভাষের ঘন্টি, দেবী এসে ফোন ধরল।

দেবী – হ্যালো-ও-ও, হ্যাঁ, এটাই ইন্দ্রকুমার-বাবুর বাড়ি, আপনি … কোথাকার সম্পাদক… ও ভারত মিলন সঙ্ঘ, একটু ধরুন দাদুকে ডেকে দিচ্ছি। দাদু -উ -উ-উ, ও দাদু ।
ইন্দ্র = আ- স- ছি। কি হল এতো হাঁক ডাক কিসের?
দেবী – (চাপা গলায়) তোমাকে মিলন সঙ্ঘি ডাকছে।
ইন্দ্র = মি-ল-ন সিংভি। এরকম কাউকে তো আমি …।
দেবী – আঃ। তুমি না … ভারত মিলন সঙ্ঘের সম্পাদক ডাকছেন।
ইন্দ্র = আরে হ্যাঁ। ওখানেই তো আজকে সভায় যেতে হবে। তোর তুলসি দাদুও আসবে এখানে। দে ফোনটা । হ্যালো – হ্যাঁ, সুপ্রভাত। না, না আমি তৈরি, তবে তুলসি আসেনি এখনও। এলেই বেরিয়ে পড়ব। গাড়ি? তা ধরুন… আধ ঘণ্টা-টাক পরে পাঠান। রাখালাম? দেখা হচ্ছে।
দেবী – দাদু… তোমার ওই সম্পাদক …।
ইন্দ্র = হ্যাঁ, কি হয়েছে?
দেবী – বেশ মজার লোক। মোটা গলায় বলছে কি – এটা কি বিপ্লবী ইন্দ্রকুমারের বাড়ি?
ইন্দ্র – হুম। তা এতে মজার কি হল?
দেবী – আরে তুমি তো বিপ্লবী ছিলে স্বাধীনতার আগে।
ইন্দ্র – অ – অ – অ। তাহলে এখন আমি কি?
দেবী – এখন? ধরো … বলা যায় … হ্যাঁ – অবসর প্রাপ্ত বিপ্লবী, সরকারী ভাবে তাম্র পত্র পাওয়া ফ্রিডম ফাইটার।
( তুলসি- বাবুর প্রবেশ)
তুলসি – যারে কয় গ্যাজাটেড বিপ্লবী। পেন্সনার বিপ্লবীও কইত্যা পারো। থাহুক এই সব কচকচি। তা দ্যাবযানী তোমার কচ কইহানে গ্যাসে গিয়া?
দেবী – কচ আবার কে?
তুলসি – আরে ছেমরি – পুরাণ টুরান কহনও নাইড়া দেহো নাই। তা – রবীন্দ্রনাথ পড়স্যো তো – বিদায় অভিশাপ? ওই হইল কচ, যে কচ-কচ কইরা সম্পর্ক কাইট্যা ফ্যালায়। কি হইল ইন্দির তুমি ভাউয়া ব্যাঙের ল্যাখান মুখ কইরা বইছ ক্যান? কি হইস্যে?
ইন্দ্র – কিছু না।
তুলসি – তাইল্যে কি চার্লস টেগার্ট স্বপ্ন দিসে? কি রে বেটি কি হইস্যে বুড়ার?
ইন্দ্র – বুড়োর আর কি হবে, বুড়ো হয়েছে।
তুলসি – দ্যাহো কান্ড। ওরে দ্যাবি…।
দেবী – কি হল দাদু? এই তো হাসছিলে দিব্বি।
ইন্দ্র – সেটা তুমি বুঝবে না । বুঝলে আমার তাম্র-পত্র নিয়ে হাসি তামাশা করতে না।
দেবী – আমি কখন কি করলাম।
ইন্দ্র – করলে বৈকি। শোনো মা – বিপ্লব কিম্বা বিপ্লবী – এ সব শব্দ এতো হালকা ভাবে বলা যায় না। তোমরা একুশ শতকে দাঁড়িয়ে সেই গ্লানির কথা চিন্তাও করতে পারবে না। কি যন্ত্রনা, বেদনা আমাদের চর্কির মত নাচিয়ে বেড়িয়েছে, দিনের পর দিন বনে বাদাড়ে পুলিশের হাত থেকে বেঁচে পালাতে হয়েছে। খাওয়া ঘুম নেই, সংসার নেই। আজকে সোফায় পাখার তলায় বসে তোমাদের বোঝা হবে না। তুলসি তোমার মনে পড়ে না?
তুলসি – হেই কথা কি ভোলন যায়। কিন্তু অতীতের প্যাচাল পাইড়া আর কি কাম ?
ইন্দ্র – তুমি! তুমিও বলছ এই কথা? আজ তারিখ কত তুলসি?
তুলসি – অ্যাই দেহো। আইজ পনেরোই অগাস্ট। ভারত মিলন সঙ্ঘের সভায় ডাকস্যে আমারে তোমারে। যাওন লাগবো তো।
ইন্দ্র – তাহলে? ঋষি অরবিন্দের জন্ম ছাড়া ১৯৪৭ এর আগে এই দিনের কি মহত্ব ছিল ? কত শহীদের রক্ত, বলিদানের পথ দিয়ে এসেছে এ দিন। এ নিয়ে কোনো পরিহাস আমি সহ্য করতে পারবো না।


দেবী – দাদু মাপ করো। আমি কিন্তু তোমাকে …।
তুলসি – রও, রও – হইস্যে মা। দ্যাহো ইন্দির পোলাডা ক্যাইন্দ্যাই ফ্যালাইব এহোন। দ্যাবযানি আমারে চা খাওইবা না ?
দেবী – হ্যাঁ দাদু এখনি আনছি।
তুলসি – দ্যাহো ইন্দির – তোমারে একখান কথা কই। পরাধীন ভারত বর্ষ তুমি দ্যাখছো, আমি দ্যাখছি । আর দুই চার খান বুড়া এহোনো বাঁইস্যা আস্যে – হ্যারা পটল তুললেই ইতিহাস গ্যালো গিয়ে লাইব্রেরি রে। এহোন এই পোলাপান গুলারে দোষ দিয়ে লাভ কি কও তো? হ্যারা কি কইর‍্যা বুসবো সে দিন পুলিশের লাঠি খাওনের কি মজা আসিল?
ইন্দ্র – ইতিহাস বোধ ছাড়া কোনো জাতির অগ্রগতি হতে পারে না। আর … ছাত্ররা এখনও বোঝে। বোঝালেই বোঝে। জয়প্রকাশ নারায়ণ বিহারে কি করে নাড়িয়ে দিলেন সব কিছু?
তুলসি – হক কথা। তা – এইহানে বোঝাইব কেডা ? তুমি? তোমার দু’চারটা কথার পরেই মুড অফ। এহন-কার পোলাপানদের বুঝাইবার টেকনিক – যারে কয় কাইদা কানুন অন্য-বোঝলা?
ইন্দ্র – বুঝেছি, বুঝেছি। তিরিশ বছর মাস্টারি করে করে তোমার সব সময়েই মনে হয় ছাত্র পড়াচ্ছ। আমাকে শুদ্ধু।
তুলসি – তিরিশ বস্যর না। বত্রিশ বৎসর চাইর মাস তিন দিন। কিন্তু হেইড্যা তো মানবা ছাত্র সাইকোলোজি আমি কিস্যু কিস্যু ব্যুসি?
ইন্দ্র – তো?
তুলসি – দ্যাহো – তুমি দ্যাবযানিরে ইতিহাস পড়াইবা তো? ওর মতো কইরা বুঝাইতে হইব। যারে কয় ইন্টারেস্টিং মেথোড অফ টিচিং।
ইন্দ্র – সেটা কি ? ঘোড়ার ডিম না হাঁসজারু?
তুলসি – উফ! মডার্ন ক্রেজ কারে কয় কিস্য্যু জানা আস্যে?
ইন্দ্র – তুমিই বলছ, তুমিই বল আমি কি আর জানি।
তুলসি – মাইনষ্যের ঠাকার মইরলেও যায় না। জীবন ভোর রবীন্দ্রনাথ পইড়্যা কিস্যু লাভ হয় নাই তোমাগো। থাউক। শোন – এহোন পোলাপানে কুইজ ভালোবাসে, গান ভালোবাসে, জ্ঞান না। হেইড্যা পাঞ্চ করতে হইবো। বোঝলা না ? রও – প্রাক্টিক্যাল দেখাইতে আস্যি। হ্যাঁ মা দ্যাবযানি আইস্যা পড়সো। দেহি চা। আঃ…। খুব ভালো চা বানাইস্যো। দার্জিলিং – না? বাঙলার চা – বাঙলার মাটির গন্ধ। এহন কও দ্যেহি ‘ বাঙলার মাটি বাঙলার জল, বাঙলার বায়ু বাংলা ফল ‘ রবি ঠাকুরের এই গান জানা আস্যে?
দেবী – জানি তো।
তুলসি – গাও দ্যাহি।
দেবী – এই যাহ। দাদু হারমোনিয়াম কম বলছিল, সারাতে দিয়েছি। এখন কি করে গাইবো?
ইন্দ্র – এই তোমাদের হয়েছে এক কথা। সারা বছর গান শিখছো কিন্তু গাইতে বললেই, হারমোনিয়াম রে, তানপুরা রে, তবলা রে। রবীন্দ্রনাথ এই জন্যেই হারমোনিয়াম শান্তিনিকেতনে ঢুকতে দেন নি।
তুলসি – কিন্তু নিজে বাজাইতে পারতেন। ইন্দির তুমি রাত্তিরে এক গ্লাস ত্রিফলার জল খাবা। তোমার চিত্ত ও পিত্ত দুই কুপিত হইস্যে। আরে মাইয়াডা গায় না তো কি হইস্যে আসো আমরাই গাই।
দেবী – তোমরা গান গাইবে? শিখেছ তোমরা?
তুলসি – হাসস না রে ছেমরি। এই গান আমাগো সব ব্যাথা ভুলায়ে র্যাইখতো। জঙ্গলে পাল্যাইতে আস্যি, কিম্বা জেইলে মার খাইতে আস্যি – ধরো গলা খুইল্যা গান। সমস্ত জেইলখানা গর্জন কইর্যা উঠত। মাথা নামায়ে শোনত্যাসে সান্ত্রীরা । আহা – রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মুকুন্দদাস, হেমচন্দ্র। কেউ শেখায় নাই মা, স্বদেশ প্রেম শিখাইতে হয় না।
দেবী – এত কষ্টের মধ্যে …।
তুলসি – ধরো দ্যেহি ইন্দির ‘বাঙলার মাটি বাঙলার জল, বাঙলার বায়ু বাংলা ফল’। (গান দু’লাইন)
দেবী – আই বাস । কি ভালো গাইলে তোমরা।
ইন্দ্র – বলতো গানটা কবে কি জন্যে লেখা?
তুলসি – সাবাস ইন্দির , খেলাডা ধইরা ফ্যালাইসো দেহি।
দেবী – বলছি – ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনের দিনে গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
তুলসি – কি বোঝলা ইন্দির।
ইন্দ্র – কিন্তু সেদিন ছিল বাঙলার ঘরে ঘরে অরন্ধন। শিশু ও রোগী ছাড়া কেউ দাঁতে কাটেনি কিছু। জুতো পায়ে দেয়নি।
দেবী – কেন , কেন?
ইন্দ্র – সে ছিল মাতৃ শোক, অশৌচ পালন।
দেবী – ওহ ।
ইন্দ্র – এবার বল – ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই’, কোন পরিপ্রেক্ষিতে লেখা?
দেবী – দাঁড়াও দাঁড়াও এটা হচ্ছে …।
তুলসি – মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই, দীন দুখিনি মা যে মোদের এর বেশী আর সাধ্য নাই। ওই মোটা সুতোর সঙ্গে মায়ের অপার স্নেহ দেখতে পাই, আমরা এমনি পাষাণ তা ফেলে ওই পরের দোরে ভিক্ষে চাই।
দেবী – ব্যস, মনে পড়েছে। এ তো বিলিতি বস্ত্র বর্জন করার গান, কান্তগীতি । কিন্তু দাদু এ গান ব্রতচারীরাও গাইতেন।
ইন্দ্র – গাইতেন বৈকি। আমরাও ছিলাম ব্রতচারী। তুলসি ওই গানটা – চলো কোদাল চালাই ভুলে মানের বালাই, ছেড়ে অলস মেজাজ হবে শরীর ঝালাই, যত ব্যাধির বালাই করবে পালাই পালাই’।
তুলসি – আরে! আমি ভুইল্যা থুইস্যি।
দেবী – তোমরা ব্রতচারী ও ছিলে? তাহলে তো নাচও জানো। ওদের নাচের স্টাইলটাও একেবারে অন্যরকম।
ইন্দ্র – আমরা অবশ্য খুব একটা ওদের শিবিরে যেতে পারিনি। পালিয়েই বেড়াতাম তো। তবে নিজের কাজ নিজে করার শিক্ষা ওখান থেকেই পাওয়া।
দেবী – ওই নাচ খুব সম্ভব গুজরাটের গারবা থেকে নেওয়া।
ইন্দ্র – কেন রে বাংলায় নেই ? রায় বেঁশে নাচের নাম শুনেছিস? হয়ত ওখান থেকেই …।
তুলসি – হইত্যেও পারে। তবে ইন্দির কইল না – খুব বেশি অইহ্যানে যাওন হয় নাই। হয়ত শিবির লাগস্যে আমরা জেইলে, গান্ধীজির ডাকে…।
দেবী – কি করে সময় কাটাতে তোমরা জেলে?
তুলসি – কি-ই-ই শোনত্যাস্য তাইল্যে – গান, গান।
ইন্দ্র – হ্যাঁ রে। শুধু আমরাই নয় অধিকাংশ বিপ্লবী তখন নিজেকে উদ্বুদ্ধ করা জন্যে গাইতেন।
তুলসি – হ্যাঁ। অধিকাংশ নয় হগ্গলে। কইলকাতা, বক্সার, দেউলি, আন্দামান…।
দেবী – তোমরা আন্দামানেও ছিলে।
ইন্দ্র – না। কালাপানির সাজা তখন প্রায় উঠেই গেছে। তবে স্বাধীনতার পরে দু বার গেছি, ভারত সরকারের অতিথি হয়ে। সেলুলার জেল দেখে … কি বলব তোকে।
তুলসি – ‘কত বিপ্লবী বন্দীর ও রক্তে রাঙা বন্দী শালার ওই শিকল ভাঙা, তারা কি ফিরিবে আর সুপ্রভাতে ? যত তরুন অরুণ গেছে অস্তাচলে।

ইন্দ্র – মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলীদান, লেখা আছে অশ্রু জলে।
দেবী – কি সুন্দর। নজরুল গীতি তাই না দাদু।
ইন্দ্র – না রে। মোহিনী চৌধুরির লেখা।
দেবী – তবু জেলে গান …।
তুলসি – অরে গয়া জেলের সেই বিচিত্তির জলসার কথা শোনাও না ইন্দির। বিভূতি দাসগুপ্ত মশ্যায়ের গান, শোনতে আসিল ফাঁসির আসামী বৈকুন্ঠ শুকুল।
দেবী – ফাঁসি? কেন?
ইন্দ্র – ভগত সিং আর বটুকেশ্বর দত্তর খবর পুলিশের কানে তুলে দিয়ে ছিল দলেরই সদস্য ফণি ঘোষ, আর এই ফনির মৃত্যু দন্ড দিয়েছিল কিশোর বৈকুন্ঠ – তাই। ভাবো তার ফাঁসি হবে পর দিন ভোরে সে শুনতে চাইছে গান সহ বিপ্লবী বিভূতি-বাবুর কাছে। প্রথমে সেই অবিস্মরণীয় গান – ‘ একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি, হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারত বাসী’।
তুলসি – হেইড্যা কে ল্যাখসে জানন যায় না।
ইন্দ্র – আরে না, জানা গেছে। গানটি রচনা ও সুর করেন বাঁকুড়ার লোককবি পীতাম্বর দাস। অযুত নিযুত মানুষ শুনে কেঁদেছেন এই গান।
তুলসি – রামপ্রসাদ বিসমিলের উর্দু গানও শুনতে আসিলেন’। ‘সর ফরোসি কি তমন্না, অব হমারে দিল মে হৈ, দেখনা হৈ এ জোর কিতনা বাজুয়ে কাতিল মে হৈ’।
ইন্দ্র – সব থেকে অদ্ভুত রবীন্দ্রনাথের ‘মরণ মিলন’ কবিতাটি শুনতে চান শুকুল – যেটা গানই নয়। তবে মৃত্যু পথযাত্রির অনুরোধে কন্ঠ ভরে সুর এসেছিল বিভূতি বাবুর, দরবারী কানাড়ায় তিনি ধরলেন ‘এত চুপি চুপি কেন কথা কও ওগো মরণ হে মোর মরণ’।
দেবী – এ যে অসম্ভব। এ কবিতাকে সুরে গাওয়া – গানের যা ব্যাকরণ স্থায়ী, অস্থায়ী অন্তরা…।
তুলসি – অন্তরের টান থিক্ক্যা মা। স্বদেশী গান গাওয়নের ল্যাইগ্যা খুব ওস্তাদ হ্যইতে হয় না। একটাই লইক্ষ্য স্বাধীনতা, ব্যস। তবে মাঝে মইধ্যে কিন্তু গান গাইয়া বেশ বিপদে পড়ত্যেন বিপ্লবীরা।
দেবী – সেকি ? কেন?
তুলসি – কইত্যাসি। একবার শ্রী জীবন সরকার বন্দী আস্যেন দেউলি জেইলে। তারে গান পাগল ও কওন যায়। একদিন তিনি মইধ্য রাত্তিরে রবীন্দ্রনাথের চয়নিকা কাব্য থিক্যা নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ সুর কইর্যা ধইরা ফ্যালাইলেন।’ আজি এ প্রভাতে রবির কর , কেমনে পশিল প্রানের পর’। রাইত তখন তিনটা কি চাইরটা -। জেইলের সান্ত্রি সেই বজ্র নির্ঘোষ শুইন্যা পাগলা ঘন্টি বাজায়ে দিছে। হগগলে আইস্যা দেহে – গান হইত্যাসে।
ইন্দ্র – হ্যাঁ। এ গল্পটা রয়েছে নিকুঞ্জ সেনের ‘ বক্সার পরে দেউলি’ বইটাতে।
তুলসি – হ। আমিও পইড়াই জানস্যি।
ইন্দ্র – জেলখানায় বন্দীরা গানও বাঁধতেন বুঝলি দেবী। যেমন ধর তখন গোয়েন্দা বিভাগের বড়কর্তা সামসুল আলম, যেমন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি তেমনি নির্মম। পেট থেকে কথা বার করার ওস্তাদ তাই সরকারের খুব প্রিয় পাত্র। তাকে দেখলেই বন্দীরা গান ধরতেন ওগো সরকারের শ্যাম তুমি আমাদের শুল, কবে ভিটেয় চরবে ঘুঘু, দেখবে চোখে সর্ষে ফুল’।
দেবী – বাবা প্রানের ভয় নেই?
তুলসি – হেইডাই তো জয় করন লাগে। আরেকজনের লগেও গান বান্ধস্যিল জেইলে , আই, বি র দন্ডমুন্ডের কর্তা রায় বাহাদুর ভুপেন চাটার্জি … ।
দেবী – কি গান – ও দাদু?
তুলসি – রও – রও , মনে করি । হ্যাঁ – ‘তোমায় নেয় না কেন যম, এত লোকের গরু মরে তোমার বেলায় একি ভ্রম? মা শিতলার বাহন তুমি ধোপার প্রিয় ধন, তোমায় নেয় না কেন যম। হেইড্যা কাজী সাহেবের কাইন্ড্য।
ইন্দ্র – তবে নজরুল যে রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্যারোডি লিখেছিলেন – তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে তুমি ধন্য ধন্য হে – তার তুলনা নেই। উনি জেল সুপার আর্সটনের উদ্দেশ্যে লিখলেন তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে তুমি ধন্য ধন্য হে, আমার এ গান তোমারি ধ্যান তুমি ধন্য ধন্য হে। রেখেছ সান্ত্রী পাহারা দোরে, আঁধার কক্ষে জামাই আদরে, বেঁধেছ শিকল প্রণয় ডোরে তুমি ধন্য ধন্য হে।
তুলসি – হে, হে, হে। আর একটা লাইন আস্যিলো ‘ ওল ছোলা দেহ ধবল কুস্টি, তুমি ধন্য ধন্য হে’ সাহেব খুব ফর্সা আস্যিলো তো।
দেবী – আচ্ছা বলত দাদু – ‘ কারার এই লৌহ কপাট , ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট ‘ এই গানটি কাজী সাহেব কোন জেলে বসে রচনা করে ছিলেন?
তুলসি – হেইড্যা কি বক্সারে নাকি প্রেসিডেন্সি জেইল…।
দেবী – কোথাও না। এই টা উনি ঘরে বসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস সম্পাদিত মাসিক পত্রিকা ‘ বাঙলার কথা’ পত্রিকার জন্যে রচনা করেছিলেন। একাসনে বসে বড় জোর দু ঘণ্টা সময়ের মধ্যে। সাল ১৯২১।
ইন্দ্র – বাঃ। আমার জানা ছিল না। তবে ‘ এই শিকল পরা ছল ‘ গানটি উনি হুগলি জেলে বসে লিখেছিলেন।
তুলসি – ইন্দির তুমি সম্পাদক মশাইরে কহন গাড়ি পাঠাইতে কইস্য। এহোনো আসে না।
দেবী – আঃ দাদু। এই তো কেমন আড্ডা জমে উঠেছে, খালি এসেই যাই যাই।
ইন্দ্র – না মা। সময় দেওয়া আছে। হয়ত সবাই অপেক্ষা করছে, দেরী করা কোনো কাজের কথা নয়।
তুলসি – দেহো সুন্দরী। ফ্রিডম ফাইটার যে দুই চারটা পইড়া আস্যে তাগো খবর হয় শুধু ২৬ জানুয়ারি আর ১৫ই অগাস্ট । বাকি সময় তো কেউ তত্ব তালাস করো না। ( বাইরে গাড়ির হর্ণ বাজে) । ওই – ওই আইস্যা পড়স্যে। ওঠো ওঠো ইন্দির, আইজ আস্যি মা। তুমি যে বুড়া মাইনষের লগে এতটা সময় দিলা, কথা শোনলা ঈশ্বর মঙ্গল করুন।
দেবী – দাদু তোমার এই কথাটার আমি স্ট্রং প্রটেস্ট করছি। আমরা তোমাদের সময় দিই না? কথা বলি না?
তুলসি – না – কও । তবে পালাইতে চাও বেশি।
দেবী – ঠিক। কিন্তু তোমরাও যদি সব সময় – আমাদের সময় কি ছিল, আর কালে কালে কি হল – বলতে না থাকো তবে বেশ জমিয়ে আড্ডা হয় । যেমন আজ হল।
তুলসি – দ্যাখস্যো ইন্দির। ছেমরি ঠিক কইত্যাসে। মা প্রমিস। এইবার থিক্যা সমানে সমানে।
দেবী – দাদু তোমাদের আর একটা পরামর্শ দি?
ইন্দ্র – আবার কি বলবি ?
দেবী – দ্যাখো তোমরা দুজন এখানে যেমন খুব স্বাভাবিক ভাবে কত কথা আলোচনা করলে, সরস করে, কিছুটা গান গেয়ে – যদি সভাতেও এমনটা করো কেউ পালাবে না। বসেই থাকবে।
ইন্দ্র – ও,কে কুইন ভিক্টোরিয়া। আমরা তাই করবো, এখন আসি মা?
দেবী – এসো । দুর্গা দুর্গা। সঙ্গে বলি জয়হিন্দ।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x