
কয়েকদিন ধরেই সংবাদ মাধ্যমে আলোচনা চলছে, চিঠিটা এসেছে আজ, তখন থেকেই যেন একটা থমথমে ভাব বাতসকে ভারি করে রেখেছে। এখন থেকে জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে রাষ্ট্রগান বন্দে মাতরম-ও গাইতে হবে। খুবই সামান্য অনুরোধ কিন্তু অভিঘাত অনেক গভীর। কেমন করে যেন খবর চাউর হয়ে গিয়েছে। ইতিউতি অসন্তোষের গুনগুন স্বর ভেসে বেড়ায়।
শ্যামলবাবুর কপালে চিন্তার ভাঁজ। বেল বাজিয়ে নটবরকে ডাকেন। নটবর এই স্কুলের পুরানো কর্মচারী। হেডস্যারের ফাইফরমাইশ খাটে বলে, ছাত্রছাত্রীরাও ওকে সমঝে চলে।
দরজা ঠেলে নটবর মুখ বার করে। শ্যামলবাবু বলেন, “কী হচ্ছে? এসব?”
নটবর গম্ভীর মুখে বলে, “অবস্থা ভাল নয় স্যার। মুসলমান ছাত্ররা গান গাইবে না।”
“তুমি কী করে জানলে? কেউ তোমাকে বলেছে? নিজে নিজে বানিয়ে মনগড়া কথা বলোনা।”
“সেভাবে বলেনি, তবে ভাবগতিক দেখে কেমন লাগছে। কাল বাজারেও এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।”
শ্যামলবাবু পোড় খাওয়া প্রধান শিক্ষক, বহুদিন ধরে এই স্কুলে আছেন। অঞ্চলে তাঁর একটা প্রতিষ্ঠা আছে। এলাকার মানুষ সুবিধা অসুবিধায় তাঁর মতামত নিতে ছুটে আসে। “আমাদের স্কুল কি বাজারি হয়ে গেল? ওই মসজিদের ইমাম বা মন্দিরের পুরোহিত কী বলল, তাতে আমার স্কুল চলবে না। তুমি, রঞ্জিতা ম্যাডাম, মইদুল স্যার আর স্বরূপ স্যারকে ক্লাসের পর দেখা করতে বল।”
সীমান্ত লাগোয়া জনপদ, সেখানে হিন্দু মুসলমানের বাস প্রায় সমান সমান। আম কাঁঠাল সুপুরি নারকেল ছাওয়া গ্রামের স্কুল, ন্যায়রত্ন উচ্চ বিদ্যালয়। মোটামুটি শান্ত নিরুপদ্রবে বিরাশি বছরের ওপর পার করেছে। এতগুলো বছরে অনেক দাঙ্গা দুর্বিপাক সমাজ দেখেছে, কিন্তু ন্যায়রত্ন বিদ্যালয়ে তার আঁচ পড়েনি। এর আগেও যে সব প্রধান শিক্ষকরা ছিলেন, তাঁদেরও দাপট কিছু কম ছিল না। শ্যামলবাবুর প্রায় তেরো বছর এই স্কুলে হয়ে গেছে। অবসরের সময়ও প্রায় হয়ে এল। নিজের কক্ষে বসে ভাবছেন কী করে এই সঙ্কট সামলাবেন, এমন সময় আবার নটবরের প্রবেশ। শ্যামলবাবু জিজ্ঞাসু চোখে তাকান। নটবর বলে, “স্যার কাজী সাহেব এসেছেন। সঙ্গে কয়েকজন মোয়াজ্জেন।”

শ্যামলবাবুর চিন্তা বেড়ে গেল, “এঁরা কী মনে করে? পাঠিয়ে দাও, আর কী করব? কথা বলে দেখি, কী চাইছেন।”
নটবর বলে, “চা দেব? স্যার।”
শ্যামলবাবু, নটবরের উৎকন্ঠাও অনুভব করতে পারেন। ওর মতো করে পরিস্থিতি লঘু করতে চাইছে। হেসে বলে, “বেশ তো, দাও।”
চার পাঁচ জন টুপি দাড়ি শোভিত মানুষ প্রধান শিক্ষকের ঘরে প্রবেশ করল। শ্যামলবাবু তাঁদের আপ্যায়ন করে বসতে বলেন। দরজার বাইরে কয়েকটি কৌতুহলী চোখ। নটবর চা দিতে এসে তাদের সরিয়ে দেয়। সকলকে চা বিস্কুট সাজিয়ে দিয়ে, নটবর বাইরে এসে নিজের চেয়ারে বসে আর শ্যামলবাবুর ডাকের অপেক্ষায় কান খাড়া করে থাকে। এমন করে আধঘন্টা পার হয়, তারপর কাজীসাহেব সদলে বেরিয়ে যান।
বাইরে তখন গভীর দুপুর। কোথাও একটানা ঘুঘুর ডাক, মাঝে মাঝে একটা হাল্কা বাতাস এসে যেন থমকে থাকা সময়কে একটু নাড়িয়ে দিয়ে যায়। নটবরের মনে কৌতুহল গাঢ় হয়ে ওঠে, খুব জানতে ইচ্ছে করে, ঠিক কী আলোচনা হল? কিন্তু এখন ঘন্টা দেবার সময় হয়েছে। ছুটির সময় অনেকটা কাজ থাকে, সব ক্লাসের ছেলেমেয়েরা ঠিকঠাক বেরল কিনা নজর রাখতে হয়, চৌকিদার থেকে শিক্ষক শিক্ষিকা সকলের সুবিধা অসুবিধা খেয়াল রাখতে হয়।

ক্লাসের শেষে জরুরী তলব পেয়ে হেডস্যারের ঘরে সকলে এসে জমা হয়েছে। ইস্কুলে যে কাজী সাহেবরা এসেছিল, এতক্ষণে খবর হয়ে গিয়েছে। কী কথা হল, অন্যান্য শিক্ষকরাও জানতে আগ্রহী। শ্যামলবাবুই প্রথম বলেন, “গানটা কত তাড়াতাড়ি তুলতে পারবেন? আমাকে রিপোর্ট পাঠাতে হবে।”
সকলে একটু অবাক! রঞ্জিতা ভূগোলের সঙ্গে ছেলেমেয়েদের গানের ক্লাসও নেয়। সব সময় খুব পরিপাটি করে সেজে থাকে, “দুই দিনেই উঠে যাবে স্যার, আপনি চিন্তা করবেন না।”
স্বরূপ সাহিত্যর শিক্ষক, “আপনি হয়তো পারবেন, কিন্তু ছেলেমেয়েরা কি পারবে?”
“কোন সমস্যা নেই, আমি গানটা গেয়ে ওদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ওরা তৈরি করে নেবে।”
স্বরূপ, শ্যামলবাবুর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে, “স্যার শুনলাম, মসজিদ থেকে ওঁরা এসেছিলেন?”
শ্যামলবাবু বলে “হ্যাঁ, এসেছিলেন, অনেকটা আলোচনা হয়েছে। সে কথায় পরে আসছি।” এবার শ্যামলবাবু মইদুল স্যারের দিকে তাকিয়ে বলেন, “আপনি এই অর্ডার কীভাবে দেখছেন?”

মইদুল বিজ্ঞানের শিক্ষক, খুব স্বাভাবিকভাবে বলে, “একটা সরকারী নির্দেশ, পালন না করার মতো কিছু নেই। আমরা তো অন্য অনেক দেশাত্মবোধক গান গাই, এটিকেও তেমন ভাবে নিতে অসুবিধা কোথায়?”
স্বরূপ বাবু বলে, “আসলে গানটা যে উপন্যাসের অংশ, সেখানে এক অন্য প্রেক্ষাপট ছিল।”
মইদুল হেসে ফেলে, “স্যার, গল্প উপন্যাস নয়, বন্দেমাতরম দেশ ভক্তির অন্যতম শ্লোগান রূপে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে স্বীকৃত। শুধু উপন্যাসের অংশ হলে, এতদিনে মানুষে ভুলে যেত।”
স্বরূপ বলেন, “ঠিকই বলেছেন। উপন্যাসে মুসলমান শাসকের বিরোধ করে এই গানের অবতারনা হয়েছে। বঙ্কিম চন্দ্র সরাসরি সেই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচনায় নানা রূপক সমাজের ছবি এঁকেছেন।”

মইদুল বলে, “গল্প উপন্যাসে এমন অনেককিছুর অবতারণা করতে হয়। সেটা অত আপত্তির বিষয় নয়। বিশেষ করে যে সময়কে তুলে ধরা হয়, লেখক সেই সময়কে তাঁর মতো করে ফুটিয়ে তুলতে, যা প্রয়োজন সেটাই করেন। আনন্দমঠ তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এই গানের ভিতর পৌত্তলিকতার প্রভাব রয়েছে। দেশ বন্দনাকে অনেকে হিন্দু দেবীর আরাধনা রূপে ভাবতে পারেন।”
শ্যামলবাবু যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, “কাজী সাহেব এসেছিলেন। অনেক কথা হল। তিনি বললেন, ‘আমার প্রথম স্কুল রাজশাহী জেলায়, তখনও বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেনি। আমরা তখন তারানা-ই-পাকিস্তান গানটি জাতীয় সঙ্গীত রূপে বিদ্যালয়ে গাইতাম। একাত্তর পরবর্তী সময়ে এল, আমার সোনার বাংলা। তারপর দাদাজানের কাছে পশ্চিমবঙ্গে চলে এলাম। জনগণমন হল আমার জীবনের তৃতীয় জাতীয় সঙ্গীত।’”
সবাই একাগ্র হয়ে শ্যামলবাবুর কথা শুনছে। শ্যামলবাবু বলে চলেন, “কাজী সাহেব স্পষ্ট করে বলেন, যে দেশে বাস করছি, তার নিয়ম আর আইন মেনে চলা প্রত্যেক সুনাগরিকের কর্তব্য। আপনারা এগিয়ে চলুন, আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি।”
কথা শুনে সকলেই চাপ মুক্ত হল, ঠিক তখন নটবর চা-বিস্কুট নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে।

[লেখকের রবিচক্রে পূর্ব প্রকাশিত রচনা]
ঠাঁই – ছোট গল্প
গয়না – ছোট গল্প
ছোটদের গল্প: পুজো আসছে
শাড়ি
পূর্বাভাস
অভিযোগ
জঙ্গলের প্রতিশোধ
গল্পঃ ঘুড়ি
মানুষ

