
তিনটে জাহাজ হাওয়া ভরা পালে
বেঁধে নিল দূরপাল্লা,
বুড়ো ক্যাপ্টেন বুকে ক্রশ আঁকে,
সারেঙরা হাঁকে আল্লা।
কুন্ডলী পাকে অজগর বাঁকে
ক্ষ্যাপা ঢেউ বুঝি গিলে খায় –
পাগলা হাওয়ার তালতরঙ্গে
তটিনী-নটিনী নেচে যায়।
খুশীর তুলিতে ব্যাথার ইজেলে
লোহিত-নীলাভ বীতশোক ;
জাহাজ চলেছে বারদরিয়াতে,
এপারে,ওপারে বহু লোক।
প্রথম জাহাজ পশ্চিমা মুখে
চকমকী চরে নোঙ্গর পায়,
বরফে বাঁধানো সাদা সভ্যতা
রাতেও সেদেশে চোখ ধাঁধায়।
বহু বৈভবে, বহু বিপ্লবে,
বহু ধনরাশি, ভোগের ঢল —
হাঁফাতে হাঁফাতে সময় বলছে,
সামনে না গিয়ে পিছনে চল।
জাত্যাভিমান, ইওরোপীয়ান,
পরতে পরতে উন্মোচন —
সাদা-কালো ভেদে মানুষ বেচার
আজও হলোনা শাপমোচন।
বাণিজ্য শেষে, বেলা অবশেষে,
মাস্তুলে ফের হাওয়া দিলো —
পশ্চিম থেকে প্রথম জাহাজ
সাবেকী ঘাঁটিতে ফিরে এলো।
দ্বিতীয় জাহাজ পূরবের পথে
কুয়াশাতে পেল জম্বুদ্বীপ,
ওংকার রবে মন্দ্রসাগরে
জ্বলছে সেখানে যাগপ্রদীপ।
বেদমন্ত্রিত প্রণবের ধ্বনি
আদি পিতাদের অভিজ্ঞান,
সনাতনী রীতে বহুমুখী হিতে
পদাবলী হলো রাগপ্রধান।
এত সাধনার, ভগবত্তার
পূত পুরাতনী পুরস্কার,
তবুও চিতায় পুড়েছে কিশোরী
অছিলায় রেখে সংস্কার।
মহাপ্রাচ্যের প্রসাদী মালাতে
জাহাজী বাঁশিতে সুর ছেড়ে –
সিঁদুরে গোধূলি নেভিগেট করে
দ্বিতীয় জাহাজও ঘরে ফেরে।
তৃতীয় জাহাজ উত্তর দিকে
খোঁজে অদেখার সিন্ধু,
যতই এগোয় রামধনু পথে
সরে সরে যায় বিন্দু।
হাওয়ারা হঠাৎ বোবা হয়ে গেলো
সমুদ্র হলো ক্ষমাহীন –
লেলিহান কোনো তারাকে দেখলে
মনে হতো যেন আলাদীন।
উদ্ধত হয়ে নিষ্ফলা ঢেউ
ইশারাতে বলে কাছে আয়,
কি আছে জাহাজে?বোঝা ভরেছিস।
কি হবি? কি পাবি? দোটানায়?
পূবে-পশ্চিমে জাহাজেরা এলো
উত্তরাপথী ফিরলো না,
শক্তি, ভক্তি কিছু না পেয়েও
নতজানু হয়ে ঝুঁকলো না।
হারিয়ে গেল সে অজানার পথে
দ্বীধাহীন জলে অথৈ থৈ –
ঘরে ফেরাদের বাঁধা স্বরলিপি
এ জাহাজে তার ঠিকানা কই?
তিনটে জাহাজ, তিনটে রাস্তা
তিন দরিয়ার বিষম টান,
ত্রিবিধ আচারে আজো রেখে চলে
আবহমানের খ্যাতির মান!
প্রথম জাহাজী কর্মেতে পেল রজঃগুণী সফলতা,
দ্বিতীয় জাহাজী স্বতঃগুণে পেল ভক্তির আকুলতা,
কর্ম-ভক্তি মহাযোগ হলে আত্মদীপের জ্ঞানে -–
তরঙ্গ কেটে তৃতীয় জাহাজী অবিকল্পিত ধ্যানে-
যোগ হয়ে গেলো; মায়াতরঙ্গে দেখলো না ওঠানামা
বিন্দুসাধনে আরশীনগরে শ্যাম হয়ে গেলো শ্যামা।
সুখে বা দুঃখে স্পৃহা চলে গেলো তাপ হয়ে গেলো শীত
অনিমাদি আলো বিবিদিষা হলে সেহেন কর্মকৃৎ –
আর ফিরলো না জনমে-মরণে বীততের বীতংসে
নিরূপাধি হয়ে তার ছায়ানট মিশলো পরমহংসে।
কর্ম, ভক্তি, যোগের সাধনে জ্ঞানের সমুচ্চয় –
আধিদৈবিক, আধিভৌতিক, আধ্যাত্মিক ভয়
সব কেটে যাবে কন্ঠ মেলালে আদিপুরুষের গানে
লোকজীবনের জাহাজ চলবে মহাজীবনের পানে।

ফিলিপ লারকিনের দ্য নর্থ শিপ কবিতাবলম্বনে ভিন্নতর আধ্যাত্মিক প্রেক্ষিতে উপস্থাপিত। কবিতাটি অধুনা মাধ্যমিক পাঠ্যসূচীতে নবম শ্রেনীর ইংরাজি পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত।

