শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

(১) কিচমিচ, ম্যাও, ভৌ আর ঠাকুদ্দা

কিচমিচ বড্ডো ছটফটে দুষ্টু পাখি। পিরিক পিরিক ক’রে এসে কিসের আনন্দে কে জানে অকারণে একটু ঠুক লাগিয়ে পালালো। ধুর, খালি খালি এইসব। অমনি মুখ গোঁজ হয়ে গেল তো ম্যাও বুড়োর! মাছটা ফেলে রেখে, খাবো না যা বলে বসে আছে। ভৌভৌ খাচ্ছিলো বসে পাশে, বলল –
— অ্যাই অত রাগের কি আছে? ও তোকে ভালোবাসে তাই একটু পেছনে লাগে। আয়, মাংস খা আমার থেকে।
ম্যাও বললো –
— কেন, তাহলে তুই কি খাবি? খা আমার মাছটা।
— কি মাছ রে?
— কি আবার, আমুদি।
— কি আবার বললি কেন? কি সুন্দর নাম রে মাছটার! খুব মজা করে বাঁচে রে।
— সে আমি কি করে জানবো? আমি তো আর জলের নীচে দেখতে যাই নি। ঠাকুদ্দার সাথে বাজারে গেলে দেখি, রাঙা রাঙা, একসাথে ক’টা থাকলে চোখে খুব টান লাগে।
— চোখ? নাকি জিভ রে?
ম্যাও এর মেজাজ বিগড়ে ছিলো, অমনি গেলো দাঁত খিঁচিয়ে,
— কি বললি? তুই ই শুধু মজা বুঝিস, আর আমি শুধু লোভী, তাইতো? কালকে রাতে খাওয়ার টেবিলে রসগোল্লা দেখে অত ঘেউ ঘেউ করছিলি কেন রে?
— উফফ, তুই এখনও সেই ঠোক্কর ভুলিস নি? তাই আমাকে ঠোকরাচ্ছিস।
— ভুলবো কি? নেই কাজ তার, যখনই বসার ঘরের বড়ো জানলার সামনের ক্যাবিনেটে ওপরে গিয়ে ব’সে রোদ পোহাতে যাবো, কাছাকাছি থাকলেই একটু খোঁচা দিয়ে যাবে। দাঁড়া না, একদিন মটকা মেরে পড়ে থাকবো, এলেই ছিটকে গিয়ে ঠ্যাঙ কামড়ে মেঝেতে পেড়ে ঘাড় মটকে দেবো। তুই জানিস, একদিন দেখি জানলার ওপরে ওই ছোট্ট টবের গাছটার পাতায় ফুলে ঠোঁট দিয়ে ঠেলা দিচ্ছে, যদি পড়ে যায় গাছ, ভেঙে যায় টব?
— কি? কি বললি তুই? মেরে ফেলবি? একজন তোকে ভালবেসে আলতো খোঁচা দেয়, খেলতে চায় ব’লে, আর তুই তাকে মেরে ফেলবি? কিসের অভাব তোর? ও তো সারাদিন ঘুরে ঘুরে এ বাড়ি ও বাড়ি ক’রে খাবার জোগাড় করে। মাঝে একটু মজা ক’রে যায় তোর সাথে। আর বল তো, তুই গাছ বেশী চিনিস ওর থেকে?
তুই আর আসবি না আমার কাছে, ঘুমোবি না আমার পায়ের মাঝখানে, পেটে পিঠ লাগিয়ে।
ম্যাওবুড়োর মুখ কাঁচমাচু, চোখ ছলছল।
— এমন বলিস না ভৌ, আমি কিন্তু কেঁদে ফেলবো। তোর কাছে না শুলে রাতে আমার ঘুম হয় না। পেটের মাছ হজম হয় না।
আমি ঠাকুদ্দাকে ব’লে কাল থেকে ওর জন্যে দানার জোগাড় করবো।
— হুঃ! ঠাকুদ্দা যা রাগী! দেবে?
— তুই ভাবিস না। বিকেলে ইজিচেয়ারে শুয়ে যখন মাথায় হাত তুলে দুলবে, তখন গিয়ে কোলে শুয়ে দুলুনি খেতে খেতে বলে দেবো। হয়তো শুরুতে বলবে, উফ আর পারা যায় না, বাড়িটাকে এরা একটা চিড়িয়াখানা বানিয়ে ছেড়ে দিলো। কিন্তু দেবে ঠিক।
ভৌ এক গাল হেসে, চপাক করে ম্যাও এর মাথা চেটে দিয়ে বললো,
— চ, আমরা ঠাকুদ্দার কাছে বসে খেলা দেখি।
ম্যাও একবার বসার ঘরের বড়ো জানলার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিয়ে বললো, চ, ঠাকুদ্দা দৌড়োদৌড়ি বল খেলা দেখে এখন।


(২) বেলুনওয়ালা

এক খুব বড়লোক তার বিরাট এক গাড়িতে চড়ে শহর বেড়াতে বেরিয়েছে। শহরের হাজারো জৌলুসের কিছুই তাকে টানে না তেমন। সবসময় যেন একটা অন্য কিছু চাই। অন্য এমন কিছু, যার মধ্যে তার সব-পেয়েছি মনটা অন্যরকম চাপা ধারালো উত্তেজনা খুঁজে পাবে।

যেতে যেতে একটা বড়ো পার্কের কাছে এসে পড়ল গাড়ি। লোকটা দেখল, একটা বুড়ো বেলুনওয়ালা, নানারঙের অনেক বেলুন তার লাঠির ঝাঁকায়। সে সরু সরু লম্বা বেলুন দিয়ে মাথায় মুকুট বানিয়ে পরেছে, হাতে বালার মতো ক’রে আর পায়ে ঘুঙুরের মতো ক’রে জড়িয়েছে বেলুন। মুখে ছড়া কেটে হালকা নেচে হেসে হেসে বেলুন বিক্রি করছে। তার কাছ থেকে বেলুন কিনে ছোট্ট ছেলেমেয়েরা হাতে সুতো ধ’রে বেলুনগুলোর সাথে খুব হেসে গল্প করতে করতে হাওয়ায় যেন সাঁতার কেটে ঢুকে পড়ছে পার্কের ভেতরে। এ’সব দেখতে দেখতে লোকটার মনের মধ্যে একটা ঘূর্ণিহাওয়া উঠল, একটা ক্রূর হাসি চোখ আর ঠোঁট লেপ্টে তাকে উত্তেজিত ক’রে তুলল। সে একটা চাপা হিসহিসে স্বরে ড্রাইভারকে বললো, থামাও গাড়ি। আদেশের স্বরের পরিচিত উত্তাপে ড্রাইভার ঘাড় না ঘুরিয়ে একবার আড়চোখে পেছনে দেখে গাড়ি থামাল। গাড়ির দরজা খুলে লোকটা বাঁ হাত উল্টে তর্জনী ওপর মুখে রেখে ছোটো জাতের ডাক পাঠাল,
— অ্যায় বেলুন।
বেলুনওয়ালা উত্তর পাঠাল,
— হ্যাঁ স্যার, কোনটা দেবো। লালগুলো বাচ্চারা ভালোবাসে বেশী, তার সাথে হলুদ নীল সবুজ সাদা মিশিয়ে দিলে আনন্দ ভাগাভাগি ক’রে সবাই সবার সাথে খুব খেলে।
— ওসব কথা ছাড় বুড়ো। আমি তোর সব বেলুন কিনে নেবো। যা ফুলিয়েছিস, আর যা ফোলাসনি, সব।
— বাড়িতে অনুষ্ঠান আছে স্যার? আমি বাড়ি গিয়েও সাজিয়ে দিয়ে আসি।
— না না, ওসব বাজে কথা ছাড়। তোর যা বেলুন ফোলানো আছে সব আমি ফাটাবো, আর বাকি যা ফোলানো নেই তুই একেক ক’রে ফোলাবি আর আমি একেক ক’রে ফাটাবো এখানে ব’সে ব’সে। আর একটা বেলুনও তুই অন্য কাউকে বিক্রি করতে পারবি না।
বুড়ো বেলুনওয়ালা ঠোঁটে পেশাদারি কঠিন হাসি ছুঁইয়ে বলল,
— এসব আনন্দ ক’রে ওড়ানোর বেলুন। ফাটানোর জন্যে বিক্রি করব না।
— আমি কে তুই জানিস? বসতে দেবো না এখানে।
— অন্য জায়গায় চলে যাব। পৃথিবীতে বাচ্চাদের আনন্দ দেওয়ার জায়গার অভাব?
লোকটা সে কথা শুনে বুকের হাওয়ায় এই মাটি থেকে ওই আকাশছোঁয়া গব্বো ভ’রে নিয়ে কায়দা ক’রে গাড়ি থেকে নেমে, ফট করে ব্লেজারের খোলা বোতামের মধ্যে হাত চালিয়ে কোথা থেকে একটা পিস্তল বার ক’রে এনে বলল,
— কে রে তুই? বেলুন দিবি কিনা বল। মেরে লাশ ভাসিয়ে দেবো তোর। কেউ খুঁজতেও আসবে না।
বুড়ো খুব হা হা করে হেসে দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিলো, সেই অবস্থায় মুকুট পরা গয়না পরা তাকে দেখে মনে হল যেন সারা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ, কোথাকার কোন এক ভারী গর্জনের মতো স্বরে সে বলে উঠল,
— সেই কবে থেকে বেলুন ফুলিয়ে আমার বুক ভরা অনেক দম। তোমার গুলি আমি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেবো। তারপর তোমায় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেবো নদীর দিকে, জঙ্গলের দিকে।
এতো হল্লা শুনে বাচ্চারা পার্কের রেলিঙে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারা সব একসাথে চিৎকার ক’রে বলে উঠল,
— বেলুন ক’রে দাও ওকে। উড়িয়ে দাও। দুষ্টু লোক। পচা লোক।
বুড়ো তার ভালোবাসার মানুষগুলোকে কাছে পেয়ে আরো যেন শক্তিশালী হ’য়ে উঠল, বুকভরা দম নিল তারপর একটা ফুঁ ছুঁড়ে দিল লোকটার দিকে। দেখতে দেখতে লোকটার চোখ মুখ হাত পা সারাটা শরীর ফুলতে ফুলতে বিরাট হয়ে গেল… তারপর আরেকটা বিরাট ফুঁয়ে দুলতে দুলতে ভেসে গেলো সে।

হৈ হৈ ক’রে উঠল, হাততালি দিয়ে উঠল বাচ্চারা। দৌড়ে বেরিয়ে এল পার্ক থেকে।
ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে ছুটে এসে বুড়োকে জড়িয়ে ধ’রে কেঁদে ফেলল আনন্দে। তারও যে অনেকদিনের জ্বালা।
অনেক ক’টা মানুষকে বিকেলের নরম লাল আলোয় জড়িয়ে পৃথিবী ভারী শান্ত হয়ে আসতে লাগল আস্তে আস্তে।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


4 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Alak Basuchoudhury
Alak Basuchoudhury
2 months ago

বাঃ, চমৎকার!

Anindya Sanyal
Anindya Sanyal
Reply to  Alak Basuchoudhury
2 months ago

ধন্যবাদ🙏🏼🌿

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x