
নীলকান্ত মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে যখন বেরিয়ে এলো, তখন তার মুখে অপ্রতিভ হাসিটা ঝুলে আছে, সে জানেও না, ঠিক এরকমই একটা হাসি নিয়ে তার বাবা ও তার একমাত্র পিসির বড়লোক শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঁচ বছরের নীলকান্তর হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিলেন। পিসির সঙ্গে সেই তাদের শেষ দেখা। কিন্তু ছোট্ট নীলকান্তর এখনও একটা জিনিষ স্পষ্ট মনে আছে, পিসির বড় বড় চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে কথা বলার ছবিটা।
পরে বড় হয়ে জেনেছে তার বাবার খুব আদরের রূপসী ছোট বোনই বড়লোক শ্বশুরবাড়ি গিয়ে আর তাদের মত গরীব ঘরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়নি। মা,বাপ-মরা ছোট বোনটাকে বড়ই ভালোবাসতেন নীলকান্তর বাবা, তাই জীবনের শেষ দিন অবধি বোনের জন্যে কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু বোনের উপরে কোনো অভিযোগ করেননি।
নীলকান্তও ওর বাবারই মত আলাভোলা মানুষ। ছোট থেকেই সে ঘরমুখো, বড় একটা বন্ধুবান্ধবও তার নেই। কিন্তু যে ক’টি বন্ধু তার আছে, তাদের কাছে সে খুবই প্রিয় তার উপকারী মনোভাবের জন্য। তবে সে ঘরে থাকতেই বেশি ভালোবাসে, আর ভালোবাসে মা বাবার যত্ন নিতে। সর্বদা তার সতর্ক দৃষ্টিতে বাবা,মায়ের কোনো অসুবিধে হতে দিতো না।
পড়াশোনায় তার মন ছিল না। কোনরকমে বিদ্যালয় শিক্ষা সম্পূর্ণ করতেই তার বাবা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে হাতে পায়ে ধরে শূন্য পিয়নের পদটিতে বহাল করিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয় বয়স কুড়ির ঘরে পৌঁছতে না পৌঁছতেই একটি সুশীলা,মোটামুটি সুশ্রী কন্যার হাত নীলকান্তর হাতে ধরিয়ে দিলেন।
বধূটিও একদম নীলকান্ত র উপযুক্ত। বড় মধুমাখা স্বভাবটিও। কয়েকদিনের মধ্যেই বউ থেকে বাড়ির মেয়ে হয়ে উঠলো সে। একটি সুখের নীড় হয়ে উঠল তাদের সাদাসিধে সংসারটি।
কিন্তু দুবছরের মাথায় একটি ফুটফুটে কন্যার জন্ম দিয়ে ঘরের লক্ষ্মী বিদায় নিলো। বছর ঘুরতে না ঘুরতে নীলকান্ত মাকেও হারালো। বাপ, ব্যাটার জগত এখন ওই একরত্তি মেয়েটাকে ঘিরেই আবর্তিত। মেয়েটিও যেন ছোট্ট থেকেই তার দায়িত্ব বুঝে গেছে। টলমলে পায়ে কখনো গাছে জল দিতে যায়, তো কখনো কুটনো কুটতে যায়।
নীলকান্ত মেয়েকে চোখে হারায়। নিজের দিকে কোনদিনই সে তাকায় নি, এখন তো মেয়ে ছাড়া কিছু জানে না। বউ তাকে অনেকবার বলেছে, তাদের সন্তান হলে তাকে অনেক পড়াশোনা শেখাবে। নিজেদের মত মুখ্যু করে রাখবে না।

নীলকান্তর এখন ধ্যানজ্ঞান তাই মেয়ের লেখাপড়া। সে তার স্কুলের এক শিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে মেয়েকে কাছের শহরে সবথেকে বড় স্কুলে ভর্তি করে দিলো। বাপের একটু আপত্তি ছিলো প্রথমে, অত টাকা কোথায় পাবে। কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আর আপত্তি করেন নি, বরং নিজের মুদির দোকান থেকে আয়ের সঞ্চিত অংশ থেকে কিছু কিছু নাতনির জন্য বাঁচিয়ে রাখতেন।
মেয়েটি যেন ছোট থেকেই বাবার ইচ্ছে পূরণের ব্রত নিয়েছিলো। স্কুল, কলেজের সব পরীক্ষাতেই সে অত্যন্ত ভালো ফল করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দোরগোড়ায়, তখন তার দাদামশাই তাদের ছেড়ে পরলোকে পাড়ি দিলেন। নীলকান্ত খানিক অসহায় বোধ করতে লাগলো। মেয়েও আর পড়াশোনা চালাতে রাজি হল না। কারণ এবার শহরে থেকে পড়তে হবে। বাবাকে ফেলে সে যাবেই না।
কিন্ত নীলকান্ত র মন সায় দেয় না। সবাই যে বলে তার মেয়ে একদিন খুব বড় চাকরি করবে। সে অনেক করে বুঝিয়ে, প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, নিজের যত্ন নেবে কথা দিয়ে মেয়েকে শহরের মেয়েদের হোস্টেলে রেখে এলো।
সে রাতে বাপ, মেয়ে কেউ ঘুমোলো না। একলা ঘরে ছোট ছেলের মত মেয়ের খুঁটিনাটি জিনিস নাড়াচাড়া করে কেঁদে কাটিয়ে দিলো নীলকান্ত। আর বাপের একলা ঘরে থাকার চিন্তা করে মেয়ে কেঁদে ভাসালো।
প্রথম সপ্তাহ শেষে মেয়েকে বাড়ি আনার আগের দিন থেকে নীলকান্ত ছটফট করতে লাগলো। মেয়ে যা যা ভালোবাসে কিনে ঘরে গুছিয়ে রেখে ভোর হতে না হতে সে বেরিয়ে পড়লো মেয়েকে আনতে। মেয়েও বাড়ি এসে বাবাকে কি করে আনন্দ দেবে ঠিক করে উঠতে পারে না।
এইভাবে চলতে চলতেই মেয়ে একদিন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর পেরিয়ে চাকরি জীবনে প্রবেশ করলো। বাবাও স্কুলের চাকরি থেকে অবসর পেলো। মেয়ে বাবাকে আর কিচ্ছু করতে দেয় না। মায়ের স্নেহ দিয়ে সে নীলকান্ত কে আগলে রাখে।

নীলকান্তকে সবাই মেয়ের বিয়ে দিতে বলে। সে মেয়েকে রাজি করাতে পারে না। বাবাকে ফেলে বিয়ে করে চলে যাওয়ার কথা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। কিন্তু পাড়াপড়শির কথাবার্তা নীলকান্ত কে অস্থির করে তোলে।
সে এবার মেয়ের ওপরে রাগ করে। জোর করে পাত্র খুঁজতে বেরোয়। দু একজন এসে দেখেও যায়, কিন্তু মেয়ে রাজি হলেও প্রস্তাব করে বসে, শ্বশুরবাড়ি সে একা যাবে না, তার বাবাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। এমন অদ্ভুত প্রস্তাবে ছেলের বাড়ি অবাক হয়, নীলকান্তর মাথা হেঁট হয়ে যায়।
মেয়ে নাছোড়বান্দা। এমন ব্যবস্থা হলেই সে বিয়ে করবে, নচেৎ নয়। অতএব নীলকান্তকে রাজি হতেই হয়।
অবশেষে এমন প্রস্তাবে সায় দেওয়া পরিবারও খুঁজে পাওয়া গেলো। তারা এ প্রস্তাব অত্যন্ত ন্যায্য মনে করে খুশি হয়ে সায় দিলেন। মেয়ে নিজেই উদ্যোগী হয়ে দাদামশায়ের মুদির দোকানটি বিক্রি করে, বসতবাড়ির দুটি ঘরে ভাড়ার বন্দোবস্ত করে, বাকি দুটি ঘর নিজেদের জন্য রেখে নীলকান্তর কোনো অজুহাতের আর অবকাশ না দিয়ে, শুভদিনে শুভলগ্নে বিবাহ সম্পন্ন করে, বাবা একসপ্তাহের মধ্যে বাকি টুকটাক কাজ সমাপ্ত করে রওনা দেবে, এ কথা আদায় করে বরের সঙ্গে গাড়িতে গিয়ে উঠলো।
আজ নীলকান্তও যেন একটু হালকা, নির্ভার। মেয়েকে ছেড়ে থাকার কথা ভাবলেই তার মন যেন অবশ হয়ে আসতো। মেয়ে এমন সব কথা বলায় সে বেশ লজ্জিত হয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু কোথায় যেন একটু নিশ্চিন্তই বোধ করেছিল। জামাইটিও খুব ভালো, শ্বশুর, শ্বাশুড়ি মানুষদুটিও খুব অমায়িক।
সকাল হতেই ছোটখাটো যা কাজ বাকি ছিল, সেসব সেরে সে খুব ফুরফুরে মেজাজে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি রওনা দিলো। আজ বেশ পরিপাটি করে মেয়ের গুছিয়ে রেখে যাওয়া জামাকাপড় পড়ে সে বেরিয়েছে। হাতে ঘড়ি পড়তেও ভোলে নি। এই এক দোষ মেয়েটার, ঘড়ি হতে পড়ে না বেরোলেই এমন চিৎকার জুড়ে দেয়। না বাবা, আজ আর মেয়েটাকে চিৎকার করতে দেবে না সে। মেয়ের পছন্দের রাবড়ি ও বেশ অনেকখানি নিয়েছে। শ্বশুরবাড়ির সবাইও তো খাবে।
মেয়ের বাড়ি পৌঁছে সে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে সদর দরজায় নাড়া দিলো। মেয়ে যেন কান খাড়া করে বসেই ছিল। দরজার শব্দ পেতে সে নিজেই দৌড়ে এসে দরজা খুলে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। ওমা বাবা সেই আতর টা লাগিয়েছে, যার গন্ধটা তার খুব ভালো লাগতো। বাবার বুকে নাকটা চেপে খুব জোরে গন্ধটা নিয়ে বাবার মুখের দিকে চেয়ে হেসে উঠল। বাবা তো ইচ্ছে করেই আতরটা লাগিয়ে এসেছে, মেয়েটা এই গন্ধটা নিতে খুব ভালোবাসে যে। কন্যার কপালে চুমু খেয়ে নীলকান্ত ও হেসে ফেললো।
“ও বৌমা, দরজায় দাড়িয়েই কি বাবার আদর খাবে? ওনাকে ভেতরে আসতে দাও, বসতে দাও।” ভেতর থেকে শাশুড়ির গলা ভেসে এলো।
তাড়াতাড়ি বাবার হাত থেকে মিষ্টির হাঁড়ি আর ব্যাগটা নিয়ে বাবাকে বসার ঘরে এনে বসালো পাখি। হ্যাঁ এই নামটাই মেয়ে হলে দেবে বলে মেয়ের মা র ইচ্ছে ছিলো। তাই মেয়ে হতেই নীলকান্ত র মা এই নাম টা রেখে দেয়।
শ্বাশুড়ি চা, জলখাবার হাতে ঘরে ঢুকলেন। পিছনে জামাই এবং তার বাবাও এলেন। খাওয়া দাওয়া শেষ হতে পাখি বাবার ব্যাগটা হাতে তুলে বাবার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই তার শ্বশুরমশাই বলে উঠলেন,
“দাঁড়াও বৌমা, বেয়াইমশাই একটু বসুন, কথা আছে।” নীলকান্ত বসতেই তিনি বলে উঠলেন,”আসলে বৌমাকে বলে ওঠার সময় হয়নি, কাল আমার বড়দাদা আসছেন আসাম থেকে, কিছুদিন থাকবেন। আপনাকে যে ঘরে থাকতে দেবো বলেছিলাম, ওই একটিই ঘর আমার বাড়তি। তাদেরকে আমায় ওই ঘরেই বন্দোবস্ত করতে হয়েছে। তাই বলছিলাম, আপনি আজ রাতটা থেকে কাল বাড়ি ফিরে যান, ওনারা চলে গেলে একদম পাকাপাকিভাবে চলে আসবেন”।
পাখি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ওপরে ফাঁকা চার চারটে ঘর রয়েছে, তারপরেও উনি এসব কি বলছেন!!!!
নীলকান্ত, ভোলাভালা নীলকান্ত এককথায় রাজি হয়ে মাথা নেড়ে বললো, “ঠিক আছে, তাতে কি হয়েছে, আমি কাল চলে যাবো। ওনারা চলে গেলেই আমি চলে আসবো। কি বলিস মা? চল আমায় ঘরটা একটু দেখিয়ে দিবি। আমি হাত, মুখটা একটু ধুয়ে নি।”
অত্যন্ত দৃঢ় গলায় পাখি বলে উঠলো,”না বাবা, তুমি এখনই বেরিয়ে পড়। আর একঘন্টা পরেই ফেরার একটা ট্রেন আছে, তুমি ওটা পেয়ে যাবে, সন্ধ্যের মধ্যে পৌঁছে যাবে।”
নীলকান্ত মৃদু গলায় বললো, “কেন রে আমি কাল ফিরে যাবো, আজকে থেকে যাই”।
পাখি বলে উঠলো,” না বাবা, তুমি এক্ষুণিই বেরিয়ে পড়”।
পাখির আচরণের পরিবর্তনে নীলকান্ত অবাক হলেও, অবাধ্য হতে পারে না, বরং মেয়ের উপর একটু অভিমান করেই সে আস্তে আস্তে ব্যাগটা হাতে নিয়ে বাকি সকলের দিকে চেয়ে একটু অপ্রতিভ হেসে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়, মেয়ের দিকে আর চেয়ে দেখেও না।

………
সে চলে যায়, কিন্তু দেখতে পায় না বুকে একরাশ কান্না আর চোখে চাপা আগুন নিয়ে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে আছে তার একমাত্র অমূল্য সম্পদ,তার কন্যা, যে তার সরল, সাদাসিধে পিতার অপমান আর দীর্ঘায়িত করতে চায় নি বলেই তাকে জোর করে চলে যেতে বলেছে এবং পর মুহূর্তেই নিজের জরুরি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে সকলের সম্মিলিত বাধাদানকে অগ্রাহ্য করে ওই একই ট্রেনের উদ্দেশ্যে একই পথে রওনা দিয়েছে।।
“পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপ
পিতোরি প্রিতিমা পন্নে প্রিয়ন্তে সর্ব দেবতা,”।।

