শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

ঋত্বিকের চিত্রনামা

এই কাহিনী ঋত্বিক ঘটকের।
ঋত্বিকের জন্ম ঢাকায় ৪ নভেম্বর ১৯২৫; মৃত্যু কলকাতায় ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬। ইহলোক যখন ছাড়লেন, বয়সটা তদুপযুক্ত নয়। বেহিসেবি জীবনে অর্থকষ্টে রোগে ভুগে জীবনদীপ আস্তে আস্তে নিভে আসছিল। তবে পঞ্চাশোর্ধে বনং ব্রজেৎ উপমাটা ঠিক খাটবে না, কেননা তাঁর বেপরোয়া মেজাজ, এলোমেলো প্রকাশ, অতীতের আকৃতি এবং সংযমের ন্যূনতা সমস্ত মিলিয়ে বাঙালি মন থেকে তাঁর নির্বাসন কোন দিনই হবে না. বরং তাঁর সৃষ্টির ভিতরে যে গভীর উপলব্ধি এবং যতটুকু চিরন্তন সত্য আছে সেটি ফুটে উঠে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী আসন করে দেবে।
ঋত্বিক খুব বেশী ছবি করেননি। প্রথম পূর্ণাঙ্গ ছবি ‘নাগরিক’ (১৯৫২-৫৩) – এটি সহ পরিচালনা করেছেন সর্বমোট আটটি ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮), ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯), ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১), ‘সুবর্ণরেখা (১৯৬৫), ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) এবং ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৪)। ১৯৭৩-এর শেষের দিকে ঋত্বিক যখন পার্ক সার্কাসের একটি ছোট টি বি হাসপাতালে, তখন এক বক্তব্য রেখেছিলেন, “আমার ছন্নছাড়া জীবন ‘অযান্ত্রিক’ থেকে আরম্ভ করে ‘সুবর্ণরেখা’ অবধি পাঁচখানা ছবি যখন রিলিজ হয়, চলে না, কয়েক বছর যাবার পরে লোকের টনক নড়ে, তখন খানিকটা দেখেটেখে…”। ‘কোমল গান্ধার’, যেটিতে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মিলনের কথা বলা হয়েছে, সে সম্বন্ধেও ঐ সালেই ঋত্বিকের উক্তি: “আমার সব চেয়ে ইন্টেলেকচুয়াল ছবি দর্শকেরা খুব স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পারল না। আমার মনে হয়, আর বিশ পঁচিশ বছর পরে ঐ ছবির কদর ফিরে আসবে। হয়ত বাঙালির কাছে এই সমস্যা এখনও তীব্রমুখী হয়ে তাদের অস্তিত্বকে খুব সংকটাপন্ন করে তোলেনি।”
সত্যজিৎ রায় ঋত্বিক সম্বন্ধে বলেছেন যে, তাঁর উপরে হলিউডের কোন ছাপ নেই, কিছুটা সোভিয়েট ছবির প্রভাব থাকতে পারে। তবে “ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল – আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি।” এই বাঙালিয়ানার মূল খুঁজতে বাংলাদেশের ইতিহাস-ভূগোলের কিঞ্চিৎ আলোচনা প্রয়োজন।

প্রথমে সত্যজিৎ-এর সঙ্গে ঋত্বিকের খানিক তুলনা করা যেতে পারে। উভয়েরই দেশ অবিভক্ত বঙ্গের পূর্বাঞ্চল। সত্যজিৎবাবুরা ময়মনসিংহের লোক কিন্তু গত তিন পুরুষ যাবৎ কলকাতাবাসী। ঋত্বিকের পিত্রালয় পাবনা জেলার ভারেঙ্গা গ্রামে, মাতুলালয় মালদায়, বাবা বাড়ি বানিয়েছিলেন রাজশাহীতে অর্থাৎ পাকাপাকি বরেন্দ্রভূমির সন্তান। সত্যজিৎ অনেক আগে থেকে কলকাতার সঙ্গে অনেক বেশি বিজড়িত হলেও তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ গ্রামবাংলার পরিবেশে। ঐ কাহিনির ধারাবাহিকতায় তোলা ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’-এ কলকাতাকে ধীরে কিন্তু অবধারিত ভাবে উপস্থিত করা হয়েছে শিয়ালদার পিছন দিককার ইয়ার্ড, ময়দান ও বস্তি সব মিলিয়ে। কলকাতার নগরসত্তা ‘মহানগর’-এ পূর্ণপরিস্ফুট। তাঁর আগেকার তোলা তিনটি ছবি ‘দেবী’, ‘তিন কন্যা’ ও ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ কলকাতার বাইরে তোলা হলেও নগরমনস্কতার ছাপ বা আকর্ষণ তাদের মধ্যে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। ‘মহানগর’-এর পরের ছবি তো সবই কলকাতার জীবনযাত্রা বা চিত্ত-বৃত্তির জটিলতা নিয়ে কেবল ‘অশনি সংকেত’ ছাড়া।
ঋত্বিক কিন্তু কোনদিনই শহুরে হতে পারেননি। তিনি বাঙালি মানে গ্রামবাঙালি, বিশেষ করে বলা যায় পূর্ববাঙালি। শৈশবস্মৃতিচারণা প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন পদ্মা ধরে হাজার-দু হাজার-মনী মালবাহী নৌকার পাটনা, বাঁকিপুর, মুঙ্গের থেকে আসা; সারেঙের ঘণ্টা, খালাসীর বাঁও না মেলার চিৎকার, কাতলামারীর চরে ভারি সাপ, ডাকাত কাশের সাদা কেশরের রেণু, দিগন্তলীন বিলে মাঝে মাঝে দ্বীপের মত গ্রাম, বাঁ পায়ে পেতলের মল পরে মুসলমান চাষিদের সারী গান ইত্যাদি। ঋত্বিকের আবির্ভাব পূর্ব বাংলাকে অনেক পিছনে ফেলে ছোটনাগপুর মালভূমির প্রত্যন্ত প্রদেশে মোটর রাস্তার ‘অযান্ত্রিক’এ হতে পারে; তার পর ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ কলকাতার অবাক পৃথিবীতে বড় বড় চোখে চাওয়া। ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় শহরের একটি নিবেদিতপ্রাণ মেয়ের শেষ পরিণতি টি বি স্যানাটোরিয়ামে হতে পারে, ‘কোমল গান্ধার’-এ কলকাতার নাট্য সংস্থা লালগোলাঘাট বা কার্সিয়াং পর্যন্তই যাক না কেন, অথবা ‘সুবর্ণরেখা’র রূপরেখা মেদিনীপুর পেরিয়ে প্রকৃতি ও আকৃতিতে পূর্ব বাংলা থেকে ভিন্ন অন্য এক নদীকে ঘিরে হোক না কেন, তবু এই ত্রয়ী কাহিনিতে পূর্ব বাংলা সম্পর্কে ঋত্বিকের নস্টালজিয়া, বঙ্গভঙ্গজনিত তীব্র বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক পুনর্মিলনের অসম্ভাব্যতায় সাংস্কৃতিক মিলনের আকৃতি এত গভীর ভাবে ফুটে উঠেছে যে বেশ বোঝা যায় এখানে কলকাতা বা পশ্চিমবাংলা একটি ফ্রেম, আসলে ছবিটি পূর্ব বাংলার।
ঋত্বিকের মতে বঙ্গভঙ্গ বাঙালির অর্থনীতিকে চুরমার এবং রাজনৈতিক জীবনকে তোলপাড় করেছে; দেশ ভাগকে তিনি মনেপ্রাণে কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। অবশ্য আবেগকে বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি রাজনৈতিক পুনর্মিলনের কথা বলেন নি, কারণ ইতিহাসে একবার যা হয়ে যায় তাকে পাল্টানো দুঃসাধ্য। এই ভাবটা আরও ব্যক্ত হয়েছে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ করে বাংলাদেশ থেকে ঘুরে আসার পর। ছবি করতে ঢাকায় গিয়েও সেখানে কদাচিৎ তিনি থাকতেন, প্রায়ই যেতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, আড়িচাঘাট, পাবনা, নারায়ণগঞ্জ, বৈদ্যবাজার, এখানে সেখানে গ্রামে গঞ্জে, কৈশোর ও প্রথম যৌবনের ছবিগুলিকে উজ্জ্বল করে তুলতে। কিন্তু তা হল না। সেই জন্য তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি: “বাংলাদেশ বলতে আমার যা ধারণা ছিল, এই দুই বাংলা মিলিয়ে সেটা যে তিরিশ বছরের পুরনো সেটা আমি জানতাম না ছবি করতে করতে বুঝলাম সেই অতীতের ছিটেফোঁটা আজ আর নেই, থাকতে পারে না। ইতিহাস ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর, সব হারিয়ে গেছে ফুরিয়ে গেছে, আর কোন দিন ফিরবে না…।” এতেও আছে ঋত্বিক-চরিত্রের একই উদঘাটন- আবেগের আধিক্য এবং প্রেক্ষিতে দূরত্ব ও শৃঙ্খলার অভাব।
আত্মজীবনীমূলক এবং স্বমৃত্যুতে ছেদ-টানা ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ ছবিতে এই আবেগতাড়িত মনের ঝটিকা যেমন প্রকট তেমনি পশ্চিম বাংলার একটা বিশেষ রূপ তাঁর নিজের মত করে তুলে ধরার প্রয়াসও পরিস্ফুট। পুরুলিয়ার ঐ গ্রামে ছৌ নাচ হয় (যে ছৌ নাচ সম্বন্ধে তিনি চার বছর আগে একটা তথ্যচিত্র তুলেছিলেন), খর রৌদ্রে রাস্তাঘাট পুড়তে থাকে, চারদিকে জনমানবহীন এক অবিশ্বাস্য শূন্যতা, বাতাস থমকে দাঁড়িয়ে যায়, জঙ্গলে একটা পাখি পর্যন্ত নেই। অবশ্য, ঋত্বিক এক কৈফিয়ৎ দিয়েছিলেন: “যদি কেউ মনে করেন আমার পশ্চিম বাংলার হু হু উধাও খোয়াই, মেদিনীপুরের ছোট ছোট নদী আর গাছ, কি চব্বিশ পরগণার শহরের রক্তশোষা ক্ষয়িষ্ণু সমাধিস্থ ভাঙা ভাঙা ইমারতওয়ালা গাঁ – এদের বক্তব্য নেই, তবে আমার প্রতি অবিচার করা হবে। ঘ্রাণ যেখানে সেখানেই নিংড়ে পাওয়া যাবে রস…।”
ঋত্বিক ঘটকের মানসিকতা অনুধাবন করতে হলে তাঁর পারিবারিক পরিবেশের পরিচয় আরও একটু নেওয়া দরকার। তাঁর বাবা সুরেশচন্দ্র সে যুগে পড়াশোনায় ছিলেন মেধাবী, ছিলেন পালি, গ্রীক ইত্যাদি বহুভাষাবিদ। ইংল্যান্ড যাওয়ার জন্য স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। চাকরিতে অবশ্য ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েই ঢুকেছিলেন। সাহেব ছিলেন ভয়ংকর রকমের, তখনকার দিনেই স্ত্রীকে নিয়ে টেনিস খেলতে যেতেন, নিষিদ্ধ মাংসে এবং মদিরায় আপত্তি ছিল না। চাকুরি জীবনের শেষের দিকে দু’ একটা ছোট জেলায় অস্থায়ী ম্যাজিস্ট্রেটও হয়েছিলেন। কিন্তু ব্যয়বাহুল্য এবং সামাজিক কারণে দশ বছর আগেই চাকরি থেকে অবসর নেন। রাজশাহীতে বাড়ি করে যখন স্থিত হলেন তখনকার চাল সাধারণ হলেও সিভিলিয়ান আমলের স্বভাব ছাড়তে পারলেন না। যেমন মাটিতে বসে খেলেও দ্বিতীয় একটা গেলাস চাই যাতে ডুবোনো থাকবে ছুরি, কাঁটা ও চামচ হাতে খাওয়ার আদত একদম ছিল না। চটে গেলে গাল দিতেন ‘অবোধ’ বলে আর রেগে আগুন হলে ক্রোধের পাত্রটি যদি হত অব্রাহ্মণ, তাহলে বলতেন, ‘শূদ্রের সন্তান, বেদে অধিকার নেই’। ঐ পর্যন্ত। ক্রোধ উপশম হওয়া মাত্র আবার মন খারাপ করতেন। ভর্ৎসিত ব্যক্তিকে যত শীঘ্র সম্ভব মিষ্টি কথা না বলতে পারলে শান্তি পেতেন না। ঋত্বিকও যে মেজাজ খারাপ হলেই ‘আদ্যন্ত শুয়োরের বাচ্চা’ এবং আরও সব ঝাঁঝালো কথা বলতেন কিন্তু মনে কিছু পুষতেন না, এর উৎস হলেন তার পিতা সুরেশবাবু।


ঋত্বিকরা পাঁচ ভাই, চার বোন। তিনি ও যমজ বোন সবচেয়ে ছোট। ডাক নাম ভবা ও ভবি। এদের কৈশোরেই ভবিকে নিয়ে পরিবারের এক গভীর ট্রাজেডি। সবচেয়ে বড় হলেন ভাই মনীশ, যিনি নিজ নামে কবিতা ও ‘যুবনাশ্ব’ নামে গল্প লিখে এক কালে বাঙালী বিদগ্ধ সমাজকে চমকিত করেছিলেন। জীবনধারার সঙ্গে সাহিত্য সাধনার সঙ্গতি রাখতে না পারার কারণে আজ বিস্মৃতপ্রায়। ঋত্বিক খুব ভাল ছবি আঁকতেন, লিখতেন ও সংগীত ভালবাসতেন। ছোট থেকেই বেপরোয়া, বিদ্বেষহীন, স্নেহশীল, কৌতুকবোধসম্পন্ন, গল্প-বলিয়ে এবং খরচে। টাকার পরোয়া কোন দিনই করেননি। ওঁর হাতে যখন টাকা থাকত, মনভেজানো গল্প বলে কত লোক টাকা নিয়ে যেত। খেতে, বিশেষতঃ মিষ্টি খেতে খুবই ভালবাসতেন। খাওয়া ও নাটুকে সিচ্যুয়েশন তৈরী করার যুগপৎ উদাহরণ কিশোর ঋত্বিকের এই কাণ্ডটি। দেশ ভাগ হওয়ার ঠিক আগে তখন তিনি কলকাতায়। দুই মামাতো ভাই দেশ থেকে এসেছে, তাদের নিয়ে তিনি বেরুলেন কলকাতা দেখাতে। ওদের সাজগোজ করার উপদেশ দিয়ে সোনার বোতামও গায়ে চড়ানো হল। প্রথম দ্রষ্টব্য স্কুল এবং অবশ্যই ভীম নাগের দোকান। আকণ্ঠ মিঠাই খেয়ে ঋত্বিক বেরুল পান কিনবে বলে। ফিরতে দেরী দেখে আর এক ভাইও বেরুল খোঁজ নিতে। পথের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শেষে অপর ভাইও যখন সন্ধানে বেরুল, ততক্ষণে সোনার বোতাম দোকানীর কাছে বাঁধা পড়েছে।
ছবি তোলার মূলসূত্র বোঝাতে গিয়ে সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা পূর্ব বাংলার কথা ছাড়া আর যে কটি মূলসূত্র ঋত্বিক বারে বারে তুলে ধরেছেন সেগুলি হল আর্কেটাইপাল ইমেজ যেটির বাংলা করা যায় মৌল প্রতীক বা আদিম চিত্রকল্প, কম্প্যারেটিভ মাইথোলজি বা তুলনাত্মক পুরাতত্ত্ব, কালেকটিভ কনশাসনেস বা যৌথ সচেতনতা এবং ল অফ লাইফ বা জীবনের ধর্ম। ঋত্বিকের নিজের বিশ্লেষণ থেকেই এই কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করা যাক।
‘অযান্ত্রিক’এর বিমল চরিত্রটি আর্কেটাইপাল যেমন ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় নীতা। মৌল চিত্রকল্প বা প্রতিমার সাথে সাথে আসে আদিম প্রতিক্রিয়া যা ‘অযান্ত্রিক’এ জড় পদার্থে জীবন আরোপে পাই। – “নতুন গাড়ী নিয়ে যখন দিল্লী থেকে কলকাতা ঘুরে ঘুরে আসি তখন গাড়ীই আমাদের স্থায়ী ঠিকানা ও অন্তরঙ্গ সঙ্গী। ভোর বেলা ডাক বাংলোর গ্যারেজে গাড়ীটা ধোবার জন্য বালতি হাতে গেছি, পিছু পিছু চার বছরের ছোট মেয়ে। গাড়ীর চাকা দুটো টেরচা ভাবে আছে, মাডগার্ডের খোপ থেকে খানিকটা যেন উঁকি মারছে। শিশু কন্যা হাততালি দিয়ে বলে উঠল “বাবা, গাড়ী চাকা বাঁকিয়ে আমাদের দেখছে, হাউ সুইট, চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।“ জড় পদার্থে এই অনুভূতির আরোপেই তো ‘অযান্ত্রিক’ সার্থক।
নীতা চরিত্র অবশ্য আর একটু এগিয়ে লিপিবদ্ধ কাহিনী বা স্মৃতিতে আনা হয়েছে। সে শত শত বছরের বাঙালী ঘরের গৌরীদানের প্রতীক। ‘সুবর্ণরেখা’র ছোট্ট সীতার সামনে এক বীভৎস কালীমূর্তি – আসলে পেটের ধান্ধায় সাজা বহুরূপী এসে যখন দাঁড়াল তখন সীতা আতঙ্কে আধমরা। এখানে গোটা মানবসভ্যতা যেন টেরিবল মাদার বা ভয়ঙ্করী মাতার মৌল প্রতিমার মুখোমুখী। ঋগ্বেদ, সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ, স্মৃতি, পুরাণ, মহাকাব্য-ভারতীয় ঐতিহ্যের পুরো বিস্তার তুলে ধরে ঋত্বিক এক দিকে যৌথ সচেতনতা বুঝিয়েছেন অন্য দিকে মাইথোপিয়া বা পুরাণসুলভ পরিমণ্ডল আরোপ করার চেষ্টা করেছেন। যৌথ চেতনার দ্বারাই আমরা মাথার মধ্যে বয়ে বেড়াই বিচিত্র সব চিত্র যাদের মূল মানুষের মানুষ হবার আগে থেকেই প্রাগৈতিহাসিক কালে বিবৃত। প্রাচীন ঋষিরা মানুষের মনের গভীরে যে কথাগুলি আয়ত্ত করেছিলেন, আজকের মনো-বিজ্ঞানীরা মনোবিকলনের দ্বারা সেই সত্যেই পৌঁছান। এই প্রাচীন ব্যাপারগুলি সোজাসুজি বলতে বাধা, তাই ঋত্বিকের প্রচেষ্টা মনের ও মানসিকতার গভীর থেকে টেনে তুলে এগুলিকে আজকের জগতে পাশা-পাশি দাঁড় করানো। মহাকালের প্রসঙ্গকে নানা ভাবে ছবিতে এনে পুরাণকে আধুনিক জীবনের সাথে জুড়ে সমকালীন শূন্যগর্ভতাকে প্রতিফলিত করার প্রয়াস: “লোককথায় শাশ্বত কালের জন্য বিধৃত” সত্য প্রকাশ করা।
ঋত্বিক তাই ‘চরৈবেতি’ মন্ত্র এবং চ্যাপলিনকে একসঙ্গে স্মরণ করেছেন। ‘সুবর্ণরেখা’র শেষে ভারতীয় দর্শনের চরৈবেতি-এগিয়ে যেতে হবে, থামলে চলবে না। আর চ্যাপলিন সাহেব তাঁর কাছে মাইথোপিয়ার নাগরিক, কোন বিশেষ দেশের বাসিন্দা নন- তাঁর দুর্বল নিষ্পেষিত শরীরের কাঠামোয় ধরা আছে বঞ্চিত জীবনের নির্যাসটুকু। একেবারে গোড়ার ছবি ‘দি ট্র্যাম্প’ (১৯১৫), এতে করুণারসে সিক্ত করে তিনি সেই যে ভবঘুরে ছোট মানুষটিকে একাকী দিগন্তলীন পথের মাথায় ছেড়ে দিলেন, সে চলার তো আজও শেষ হল না।
‘অযান্ত্রিক’এর বিশেষ উপজীব্য জীবনের নিয়মধারাও বটে। আদিবাসী ওরাওঁদের উপরে ঋত্বিক ১৯৫৫ সালে একটি হ্রস্ব তথ্যচিত্র তৈরী করেছিলেন। তাদের নাচের দৃশ্য অসংযত ভাবে বড় হয়ে গেলেও ‘অযান্ত্রিকে’ এগুলির সন্নিবেশ করে তাঁর মন ভরেছে, কেননা এর মাধ্যমে তিনি জীবনের আবর্তন দেখাতে চেয়েছেন। তাঁর নিজের কথায় বলি “কোহা বেঞ্জা, খাতুরা, চালি বেচনা, ঝুমের, লুঝরি ইত্যাদি বহু সাংকেতিক নৃত্যের সমাবেশে মহাযাত্রা দৃশ্য সন্নিবিষ্ট ছিল। এতে করে প্রকাশ পাচ্ছিল জন্ম, শিকারে যাওয়া, বিবাহ, মৃত্যু, পূর্বপুরুষের প্রতি পূজা এবং নবজন্ম, এই সমস্ত সাইল্লা।”


‘অযান্ত্রিকে’ জীবনধারার আরও বিস্তার আছে পাগলের নতুন গামলা পেয়ে পুরোনটি ভুলে যাওয়ায়, কিংবা শিশুর হাতে জগদ্দল মোটর গাড়ীটির ভাঙা হর্ণ বাজানোয়। গফুরের মহেশকে যেমন শরৎচন্দ্র কসাই-খানায় পাঠিয়েছেন, জগদ্দলকে তেমনি চুরমার করে নিয়ে যাচ্ছে কালোয়ারদের জন্য। বিমল দেখছে, আবার শিশুটি যখন জগদ্দলের কাটা গলায় ভেঁপু বাজাচ্ছে তখন হাসছে।
তিতাস একটি নদী, যে নদী দু পারের জীবনযাত্রার পালনশক্তি। সে যেই একদিন শুকিয়ে গেল, জলের জেলেরা মিলিয়ে গেল, কিন্তু এসে গেল চরের চাষীরা। জীবনের নতুন আবর্তনে তিতাসের বুকে ধানের অঙ্কুর মাথা তুলল। এইজন্য ঋত্বিক বলেছেন, “ইন্ডিভিজুয়াল মানুষ মরণশীল, কিন্তু মানুষ অমর।” রবীন্দ্রনাথ হয়ত এই ব্যাপারটা খানিকটা ঘুরিয়ে ঘোষণা করেছেন, “জীবনের খরস্রোতে ভাসিছ সদাই। ভুবনের ঘাটে ঘাটে। এক হাটে লও বোঝা, শূন্য করে দাও অন্য হাটে।”
আলাদা আলাদা ভাবে ঋত্বিকের ছবিগুলি থেকে কিছু কিছু অংশ তুললে ওঁর মনের ছোঁওয়া আরও খানিকটা পাওয়া যেতে পারে। ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা ঘরপালানো একটি ছেলের কয়েক দিনের কলকাতা পর্যটনের কৌতুক ও কৌতূহলোদ্দীপক হালকা কাহিনী, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে শান্ত বাংলার পটভূমিতে লেখা। ঋত্বিক সেটাকে নিয়ে এলেন যুদ্ধপরবর্তী বাংলায়, অবাধ প্রকৃতির প্রতিতুলনায় কলকাতার বস্তির পাঁক ও পাষাণ পথের হৃদয়হীনতা ফুটিয়ে তুললেন। ঋত্বিকের স্বীকারোক্তি: “মূল বক্তব্যটাকে নিশ্চয়ই বদলে দেবার চেষ্টা করেছিলাম।” এবং এই বদল ডালার উৎস খুঁজতে তিনি গল্পের সেই সূত্রটিকে নিয়েছিলেন যেখানে কাঞ্চন মনে করছে বাপ অত্যাচারী দৈত্য, আর মা বন্দিনী রাজকন্যা। মাকে গঞ্জনা দিয়ে তার চোখে জল দেখতেই অত্যাচারীর আনন্দ। একদিন বড় হয়ে মানুষ হয়ে কাঞ্চন ফিরে আসবে মাকে উদ্ধার করতে। শিশু মাও-সে-তুংয়ের ক্ষেত্রেও নাকি এই মনোবৃত্তি কাজ করেছিল। বাপ মা দুজনেই বৃহৎ সংসারের প্রতিপালনে উদয়াস্ত পরিশ্রম করলেও মাও ছিলেন মায়ের ন্যাওটা; বাপকে নিষ্ঠুর এক দুর্গাধিপতি কল্পনা করা তার পরবর্তী পদক্ষেপগুলিকে প্রভাবিত করেছে।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ঋত্বিকের শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় ছবি। এই ছবি করতে ঋত্বিক নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। গ্রামে, গঞ্জে, নদীতে, খালে ঘুরে বেড়াতেন পূর্ব বাংলার হৃদয়টিকে যদি ধরতে পারেন। কিন্তু হায়, বাংলাদেশী বিবর্তন কখন যেন এনে দিয়েছে মৌল পরিবর্তন! ঋত্বিকের আন্তরিকতা ও পরিশ্রমের কিন্তু অবধি নেই। এক গলা জলে দাঁড়িয়ে ছবির অ্যাংগল ঠিক করছেন। ক্যামেরাম্যানের সাথে নিজের দৃষ্টিকোণ না মিললে তো মন ভরবে না। তখনও তাঁর গায়ে জ্বর; বন্ধুরা বলতেন, “ইউ আর কিলিং ইওরসেল্ফ।” ঋত্বিক নির্বিকার।


শারীরিক অসুস্থতার জন্য ছবিটা এডিট করতে পারলেন না। বিরাট ক্যানভাসে গভীর বক্তব্য রাখবার চেষ্টা করে চলে গেলেন। অগোছাল, এলোমেলো যা ধরা রইল তাতেই ঋত্বিকের দুরন্তপনার শেষ দিককার স্বাক্ষর রইল। ঋত্বিকের প্রিয় ‘কোমল গান্ধার’ দিয়ে এই আলোচনার ছেদ টানি। কোমল হল নরম সুর, কড়ির বিপরীত। গান্ধার স্বরগ্রামের তৃতীয় স্বর, সংক্ষেপে গা। পাশ্চাত্য সংগীতে এর নাম ঈ-ফ্ল্যাট। ভৈরবী, কাফি, টোড়ি, আশাবরী ঠাটে এর প্রয়োগ হয়। কিন্তু কানাড়ার কোমল গান্ধারের যে বিশেষ একটি রহস্যময় রূপ আছে তাকেই মনে হয় রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় ইঙ্গিত করেছেন: “নাম রেখেছি কোমল গান্ধার/মনে মনে।/যদি তার কানে যেত অবাক হয়ে থাকত বসে/বলত হেসে ‘মানে কী’।” কবি অবশ্য বিশদ করার চেষ্টা করেছিলেন-অন্তর্যামীর পায়ের কাছে ওর ব্যথাধূপের পাত্রখানি ধরা, যেখান থেকে ধোঁয়ার আভাস চোখের উপর পড়ে; গলার সুর ওর করুণায় ঝাপসা, জীবনের তানপুরা তার ঐ সুরেই যে বাঁধা সেটি সে জানে না। বিষ্ণু দে এই চেতনাকে, এই সুর, তান ও মীড়কে এগিয়ে নিয়ে গেছেন শহর কলকাতা থেকে প্রকৃতির বাংলায়: “নিয়ে চলো মনপবনের নায়ে দীর্ঘ অভিযান/গন্ধবণিকের দেশে দূর দেশে জলে হাওয়ায় হাওয়ায়…/সবুজে ও নীলে দূর ফিরোজায় / ধুয়ে দাও কলকাতার গলিত সন্তাপ / ঢেউ তুলে সমুদ্রে হাওয়ায় দীর্ঘছন্দ তোমার বাহুতে দুলে দুলে / সমুদ্রের কোমল গান্ধার॥” ঋত্বিকের ‘কোমল গান্ধারে’ তাই দুই বাংলার মিলনের সুর। ওখানে অনবরত বেজেছে বিবাহের প্রাচীন সুর, চরম বিরহের মধ্যেও একাত্মীকরণের আবহাওয়া তৈরীর চেষ্টা। তাই অনসূয়ার মন, বাংলা গণনাট্য আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ – এই তিন স্তরেই দ্বিধা ও বিভক্তিকে একসূত্রে মেলাতে গিয়ে বিবাহ ও মিলনের লোকগীতি তিনি তুলে ধরেছেন:
“আমের তলায় ঝামুর ঝুমুর, কলাতলায় বিয়া আইলেন গো সোন্দরীর জামাই মটুক মাথায় দিয়া, মিস্ত্রী বানাইছে পিড়ি চাইর কোণা তুলিয়া, ব্রাহ্মণে চিত্রাইছে পিড়ি মধ্যে সোনা দিয়া, আইজ হইব সীতার বিয়া।“
ঋত্বিক এই বিবাহের ঘটক এবং পুরোহিতও বটে।

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.