শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

ঋত্বিক – একটি অসমাপ্ত উপাখ্যান

বাঙালি ঋত্বিক ঘটক নামের একজন মানুষকে নিয়ে কিছুটা মাতামাতি করে বটে , কিন্তু সেটা বোধহয় তারা যতটা তাঁর সৃষ্টির প্রতি আগ্রহ আছে বলে করে, তার চেয়ে বেশি করে তাঁর বেপরোয়া বেহিসেবী, আপোষহীন জীবনযাপনের প্রতি একধরনের ঔৎসুক্যের জন্য। ঋত্বিকের জীবনযাপন সম্বন্ধে প্রচুর গল্প, কাহিনি, অতিকথা এবং মিথ, বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। সেই ঋত্বিকের কিছু কিছু উক্তি বাঙালি এখানে সেখানে ব্যবহার করতেও ভালোবাসে। ব্যক্তি ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে । ইদানীং একটি নাটকও মঞ্চস্থ হয়ে থাকে। চলচ্চিত্র এবং নাটক দুটিই জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু ঋত্বিকের নিজের তৈরি কোনো ছবিই মোটেই জনপ্রিয় হয় নি ।
এই সব সিনেমা, নাটক এবং গল্পগাছা যা ঋত্বিক ঘটকের নামে চালু আছে, তা থেকে ঋত্বিকের যে ছবিটা বাঙালি মানসে ভাসে, সেটা হল তিনি ছিলেন একজন বামপন্থী, ছন্নছাড়া, দুর্বিনীত, মেজাজী, বাউন্ডুলে, আপোষহীন, দুর্মুখ, নির্লোভ, দাম্ভিক, অবিশ্বাস্য রকমের মদ্যপ এবং বিশাল আকারের প্রতিভাবান সিনেমা স্রষ্টা । কিন্তু তাঁর করা সিনেমার বিশেষত্ব নিয়ে বাঙালি তেমন কিছু গুরুত্ব দিয়ে ভাবিত হয় বলে মনে হয় না। খুব বেশী হলে, কেউ কেউ ‘মেঘে ঢাকা তারা’সিনেমায় নীতার সেই মর্মন্তুদ আর্তনাদের কথা বলে – ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’ । কিম্বা কোমগান্ধার ছবিতে অনিল চট্টোপাধ্যায়ের লিপে – দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে – আকাশ ভরা সুর্য তারা গানের প্রয়োগের অভিনবত্ব নিয়ে কথা বলে। তার বেশী আর আলোচনা এগোয় না। আসলে বাংলা সিনেমার গড়পড়তা দর্শক, ঋত্বিক-সৃষ্ট সিনেমার বিষয়ে এর বেশি খবর রাখে না বললেই চলে। তবুও কিন্তু এই বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাবার প্রথম কৃতিত্ব যাঁদের প্রাপ্য, তাঁরা হলেন সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন এবং তৃতীয় জন, যাঁর কোনো ছবিই কোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কার পায় নি, সেই ঋত্বিক কুমার ঘটক। এই রকমটা কেন ভাবা হয় সেই প্রশ্নে যাবার আগে আমরা ঋত্বিক ঘটকের হয়ে ওঠাটা একটু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি ।
ছোটোবেলা থেকেই ঋত্বিক ছিলেন ডাকাবুকো এবং দামাল ছেলে । ওপার বাংলায় ছোটবেলা কেটেছে পাবনা, ময়মনসিংহ , রাজসাহীতে । ওপার বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে ঘটে গিয়েছিল নিবিড় পরিচয়। পদ্মার ধারে তাঁর দিন কেটেছে । সেখানে শুনেছেন ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে নৌকো থেকে মাঝিদের সুরে বেসুরে ভাটিয়ালি গান । শুনেছেন স্টিমারের হুইসিল, সারেঙ্গীর ঘন্টি , খালাসীর বাঁও-না-মেলা আর্তনাদ। কখনো শরৎকালের নদীতে নৌকো নিয়ে পালাতে গিয়ে হারিয়ে গেছেন তিন মাথা সমান কাশ বনের মধ্যে। তাঁর নিজের কথায় – … “মা,বাবা, দাদা-দিদি, অনেক মানুষ, হৈ হৈ করিয়া বহুজনা মিলিয়া ভাত খাওয়া , দুগগাপুজা, মুসলমান চাষাদের সেই বাঁপায়ে পিতলের মল পরিয়া সারিগান, ডানপিটা সব বন্ধু । মারপিট। আম-লিচু-ডাব চুরি। পড়িয়া পা ভাঙিয়া যাওয়া, ধরা পড়িয়া মার খাওয়া। বাড়ীর দেওয়ালে নোনা ধরিয়া কর দাগ। কত শব্দ, ছবি, কত মন।”

এই ছোটবেলায় দেখা সব শব্দ, ছবি, গান, প্রকৃতি এবং মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষগুলি, তাঁর চেতনা জুড়ে এমন ভাবে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল যে তাঁর সব ছবিতেই এই সবের অনুষঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে ।
এবং বাংলার মাটি, জল, আকাশের সঙ্গে তাঁর ভালোবাসাটা এতটাই তীব্র ছিল যে বাংলা ভাগ হয়ে যাওয়াটা, বিশেষ ভাবে এক বাংলা থেকে আর এক বাংলার সাংস্কৃতিক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটাকে তিনি প্রায় অস্বীকার করেই এসেছেন সারাটা জীবন।
১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৪৬-এ ইন্টারমিডিয়েট আর ১৯৪৮-এ ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বিএ পরীক্ষা পাশ করা । এম, এ-তে ভর্তি হয়েও ছেড়ে দিয়ে অনিশ্চিত জীবনের পথে ঝাঁপিয়ে পড়া । এবং সেই ঘোর অনিশ্চয়তার সঙ্গে বাকি জীবনটা লড়াই করে বিপজ্জনকভাবে বাঁচতে বাঁচতে মাত্র একান্ন বছর বয়সে প্রায় আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া। তারই মধ্যে পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা করেছিলেন আটটি । এবং আছে বেশ কিছু তথ্যচিত্র । তবে প্রতিটি ছবিই তাঁকে করতে হয়েছে নানা বিরুদ্ধ পরিস্থিতি পার হয়ে। তাই তাঁর ছবিতে তাঁর অনন্য চলচ্চিত্র-প্রতিভার দ্যুত্যির সঙ্গে সেই অনটনও ছাপ ফেলে গেছে কোথাও একটা ।
সিনেমার জগতে আসার আগে থেকেই তিনি তাঁর নিজের কিছু কথা শিল্পের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন একটা বড়ো সংখ্য়ার মানুষের কাছে । সেটা তাঁর জীবনের ব্রত বলেই মনে করেছিলেন । কিন্তু সেই কথা তিনি কি ভাবে বলবেন, তা নিয়ে প্রথম থেকেই সংশয় ছিল তাঁর মনে । বাংলা সিনেমায় যে ভাবে তখন গল্প বলা হোত, তার একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ছিল। তখনকার চলচ্চিত্রের সেই ভাষা তাঁর পছন্দ ছিল না। তিনি চাইতেন সিনেমার ভাষা হবে এমন একটি ভাষা – “ যাহা কম বলিবে । যাহা স্বয়ং দ্যোতনাময়। যাহার allusion – এর ভার নাই, পরিপূর্ণ ধার আছে। যাহা Reference – ভারাক্রান্ত করে না, অথচ মনে পড়াইয়া দেয় – কারণ ছোঁয়ায় ছোঁয়ায় যে অনুভূতি আর যে চিত্রকল্প, তাহারা Archetypal – যে ভাষা সমস্ত mood-কে একটি Patriarchal ভঙ্গিতে ধরাইয়া দিবে। আপাতত শুষ্ক, ভিতরে মালদহের কালাচাঁদ ভোগ আমটি একেবারে টইটম্বুর।“
মনে রাখতে হবে, ‘পথের পাঁচালি’ নামের যে সিনেমাকে আমরা আধুনিক বাংলা সিনেমার পথিকৃৎ সিনেমা বলি, সেই সিনেমার কল্পনা সত্যজিতের ভাবনায় আসার অনেক আগেই তিনি এমন ভাবনা ভেবে ছিলেন । শুধু ভেবেই ক্ষান্ত হন নি, অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের বাংলা ছবিও নির্মাণ করে ফেলেছিলেন। ১৯৫২ সালে নির্মিত সেই ছবির নাম ‘নাগরিক’। ছবিটি রামু নামের এক যুবকের গল্প, যে এমন একটি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে যারা দেশভাগে উদ্বাস্তু হয়ে গেছে। উদ্বাস্তু হলেও তারা বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে পারে না । রামুর উপর বৃদ্ধ বাবা মায়ের দেখা শোনা করা, ছোটো ভাইকে লেখা পড়া শেখানো, বোনের বিয়ে দেওয়া সব দায় এসে পড়ে । রামু স্বপ্ন দেখে একটা চাকরি পেলেই সে সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দিতে পারবে । কিন্তু রামু বার বার চাকরির চেষ্টা করে বিফল হয় । শেষ পর্যন্ত পরিবারটি বাড়ি বিক্রি করে শ্রমিক শ্রেণির পাড়ায় চলে যেতে বাধ্য হয়।
এই ছবিটি বানিজ্যিক ভাবে মুক্তি পায় নি । কিন্তু অনেক দিন পরে সেই ছবির কপি বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে আছে, খোঁজ পেয়ে সত্যজিৎ রায় তা দেখেছিলেন। এবং সেটি দেখে মন্তব্য করেছিলেন – “খুবই অসুবিধার মধ্যে তোলা হয়েছিল ছবিটা, সেটা দেখলেই বোঝা যায়। তার বাইরের পালিশ একেদম নেই বলতে গেলে, কিন্তু তার মধ্যে কতকগুলো এমন গুণের পরিচয় আমি পেয়েছিলাম যে তাতে এই নবীন পরিচালক সম্বন্ধে একটা প্রচন্ড শ্রদ্ধা জাগে আমার মনে ।”

এই মন্তব্য থেকে মনে করা যেতে পারে যে এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করার সময় যদি ঋত্বিক ঠিক মতো অর্থের জোগান পেতেন, সিনেমা করার জন্য প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম ও অন্যান্য পরিকাঠামোগত সাহায্য পেতেন তাহলে এই ছবিকেই হয়ত বাংলার নিও-রিয়ালিজম ছবির সূচনা বলে ধরা হতে পারত ।
রাজশাহী কলেজে পড়ার সময় থেকেই ঋত্বিক নাটক করা শুরু করেছেন । উনিশ-কুড়ি বছর বয়স থেকেই গণনাট্যের সঙ্গে এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। গণনাট্যে থাকাকালীন দলিল, জ্বালা, সাঁকো, ভাঙা বন্দর ইত্যাদি নাটক লেখেন এবং কিছু নাটক নিজে পরিচালনা করেন । এই সময়ের স্মৃতি উঠে এসেছে তাঁর চলচ্চিত্র ‘কোমল গান্ধার’-এ । আসলে নাটক এবং ছোটো গল্পের মধ্যে দিয়ে ঋত্বিক যা কিছু বলতে চেয়েছিলেন বরাবর, তার মূল সুরটি ছিল মানবিকতা। তিনি মাঝে মাঝেই রবীন্দ্রনাথকে উল্লেখ করে বলতেন, শিল্পকে প্রথমে সত্যের কাছে এবং তার পরে সুন্দরের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে হবে।
প্রথমে নাটক এবং পরে সিনেমা মাধ্যমটি বেছে নেওয়ার কারণ এক সঙ্গে অনেক লোকের ভাবনাকে মোচড় দেওয়া। সেইটাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য ।
একজায়গায় ঋত্বিক বলেছিলেন – “এই ভাবে আমি সিনেমাতে এসেছি, সিনেমা করব বলে নয়। কাল যদি সিনেমার চেয়ে better medium বেরোয় তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি চলে যাব। I don’t love film. সিনেমার প্রেমে মশায় আমি পড়িনি।”
‘পথের পাঁচালি’র সর্বজয়া হয়ে যিনি বিশ্বখ্যাত হয়েছিলেন সেই সেই করুণা বন্দোপাধ্যায়, যিনি ঋত্বিককে আই পি টি এ-র দিন থেকে চিনতেন, তিনি মাত্র দুটি বাক্যে ঋত্বিক ঘটকের একটি অব্যর্থ মূল্যায়ন করেছিলেন – “ঋত্বিক : দোষে অনন্য, গুণে অনন্য “

ঋত্বিক ঘটক সারা জীবন ধরে ক্ষত বিক্ষত হয়ে বাঙালিকে যা দিতে চেয়েছেন, তা তিনি নিজে দিতে পারেননি, নাকি বাঙালি তা নিতে পারেনি, তা নিয়ে তর্ক করা যেতেই পারে। তবে তাঁর ‘সারি সারি দেয়াল‘ লেখায় বাঙালিকে যে তিরস্কারটি তিনি করেছিলেন, তা তাঁর শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আজ বোধহয় আমাদের আবার ভাবা প্র্যাকটিশ করার জন্যে নতুন করে ধমক দিচ্ছে –
“আপনারা যা ভালবাসেন তাই পান। আপনারা নতুন ধরনের ছবি ভালোবাসেন না । … দর্শকের মধ্যে যাঁরা চেতনাসম্পন্ন তাঁরা যদি ‘ফিল্ম ক্লাব’ করার মাধ্যমেই হোক, আর অন্য কোনো উপায়েই হোক , সাধারণ মানুষের শুভবুদ্ধিকে উদ্বুদ্ধ করতে না পারেন , তাহলে বটতলাই আপনাদের ভাল, রবি ঠাকুর নেই বলে চেঁচিয়ে কোনো লাভ নেই । আমি আমার সমস্ত অন্তরের সঙ্গে বিশ্বাস করি ক্ষতি আপনাদের, যারা ছবি করছে তাদের নয় । তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং পরিবারগত জীবনকে বিপন্ন করছে , তার দ্বারা তারা একটি তীব্র আনন্দ পাচ্ছে , উগ্র তপস্যার আনন্দ। আপনারা সামান্যই পেলেন এবং অচিরে একদম পাবেন না।”

এখন থেকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখে পত্রিকা প্রকাশিত হবে

“বিষণ্ণ খড়ের শব্দ’ লেখাটি ভালো লাগলো। সমৃদ্ধ হলাম। অনেক ধন্যবাদ এই ধরনের লেখা উপহার দেওয়ার জন্য।” … হেমন্ত মন্ডল

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
3 months ago

শ্রদ্ধেয় ঋত্বিক ঘটকের যথার্থ মূল্যায়ন এবং শতবর্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি খুব ভালো লাগল।