
“এ শহরে এত দুঃখ কেন?” পৃথিবী নাম্নী জনপদের প্রতি, প্রতি-প্রজন্মের শিশু দৃষ্টির অন্তর্দর্শনে সৃষ্ট, এক শিশু সারল্যে ভরা অন্তরের সহজ প্রশ্ন আজও প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে ক্রমান্বয়ে… তবুও সময় এ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয় বার বার…দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে এ প্রশ্ন সময়ের কাছে! ভবা’র অন্তরে লুকিয়ে থাকা কাঞ্চন “বাড়ি থেকে পালিয়ে” এ প্রশ্ন করেছিল কোনো এক মহানগরের উদ্দেশ্যে গোটা পৃথিবীকে হয়তো! হয়তো বা!
স্নেহসিক্ত শৈশব পার করার পর প্রারম্ভিক কৈশোরের দৃষ্টিতে মনের অতলে বিশ্বসংসারকে দেখার জানার এবং চেনার অগণিত বিস্ময়ের কালবৈশাখী মনকে তোলপাড় করে তোলে। কালবৈশাখীর ঝড়ে এলোমেলো কিশোর মন একা একা খুঁজতে শুরু করে নিজেকে। বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার এক ঘোর তার মনের শরীরকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ভবাও তার কৈশোরে এমনই ঘোরের আচ্ছন্নতায় বাড়ি থেকে পালিয়ে বিশ্বসংসারের মুখোমুখি হয়েছিল কয়েকবার।

শিবরাম চক্রবর্তী’র গল্প অবলম্বনে “বাড়ি থেকে পালিয়ে” চিত্রনাট্য এবং চলচ্চিত্রের অন্তরে “কাঞ্চন” চরিত্রটির মধ্যে আসলে নিজের কিশোরবেলাকেই অনুসরণ করেছেন ঋত্বিক। কৈশোরের অদম্য দুর্বার বাঁধ ভাঙা মন, সহজ সরল অনাবিল ভাবে বিশ্ব সংসারের জাগতিক সকল রূপ দর্শনে, মনের গহীনে এক তীক্ষ্ণ ব্যথার জন্ম হয় আর যে ব্যথায় প্রশ্ন করে কাঞ্চন, “এ শহরে এত দুঃখ কেন?” এ প্রশ্ন কোনো এক শহরের মধ্যে কেন্দ্রীভূত নয়, শহর রাজ্য দেশের সীমানা লঙ্ঘন করে পৃথিবীর মানুষের উদ্দেশ্যে বর্ণভেদে, জাতিভেদ, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক স্তরভেদে গোটা বিশ্বের অগনিত কিশোর কাঞ্চন অনুসরণ করে চলেছে চলমান ক্যানভাসের কাঞ্চনকে…সমাজের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার ক্লেদ কৈশোরের কাঞ্চনদের স্পর্শ করতে পারে না। তাই রাজনীতির যান্ত্রিক ষড়যন্ত্রের যন্ত্রনায় ক্লিষ্ট মানুষের কাছে অতি অক্লেশে পৌঁছে যেতে পারে কাঞ্চনেরা। প্রশ্ন করতে পারে পৃথিবীর সকল দেশের রাজাকে…
কিশোর কাঞ্চনদের চেতনার অভ্যন্তরে, মনের গভীরে জলধারার উষ্ণ প্রস্রবণে বইতে থাকে এক বোধ। নিঃশব্দ চিৎকৃত বোধ।
পদ্মাপারের ভবা গভীর নির্জন পথে, চেতনার সাগরে ডুব দিয়ে নিজেকে দেউলিয়া করে আউলিয়ার অনুসরণে মানুষের সাথে মিশে থাকতে চেয়েছিলেন…আর তাই মানুষের মাঝে মিশে থাকার অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কখনো থিয়েটার কখনো চলচ্চিত্রকে। চলচ্চিত্রের থেকেও সক্রিয় কোনো মাধ্যমের সন্ধান পেলে হয়তো তাকেই আঁকড়ে ধরতেন। ভবা’র ব্যতিক্রমী ভাষার, চিন্তা-চেতনের থিয়েটার এবং চলচ্চিত্রের ভাষার প্রকাশে সঙ্কুচিত হয়ে উঠৈছিল তদানীন্তন চলচ্চিত্র জগৎ। সেইজন্যেই ভবা বার বার অদৃশ্য শক্তির জালে বন্দী হয়েছেন। আবার কখন যে সেই অদৃশ্য শক্তিকেই নিজের গলায় ধারন করে নীলকন্ঠ হয়ে মহাকালকে নিঃসঙ্গ করেছিলেন ভবা! জানতে পারেনি মানুষ অথচ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মানবসঙ্গ ত্যাগ করেননি কখনো!
সময়ের পারে দাঁড়িয়ে সময়ের ভাঙন দেখতে দেখতে ভবার তীক্ষ্ণ সংগ্রামী দর্শনের মননে উঠে এসেছিল মানুষের দুর্বিসহ দুঃসহ জীবনের চালচিত্র। আর সেখান থেকেই চলমান ক্যানভাসে ছবি এঁকেছিলেন “নাগরিক”-এর। ভবা’র ভাষাকে ভয় পেয়ে সময়ের অদৃশ্য শক্তি “নাগরিক”-এর মুক্তির পথকে অবরুদ্ধ করেছিল দীর্ঘ সময় যাবৎ! ভবা’র অন্তরে সময়ের সংকটগ্রস্ত অবস্থা যত প্রখর হয়েছে সময় ততই ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে নিজের কাছে নিজে। মনের অগোচরে ভবা’র ভাবের ঘরে সংরক্ষিত হয়েছে তাঁর ভাষা।
জনপদের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আরো আরো গহীন পথের সাধনে “অযান্ত্রিক”-এর জগদ্দলকে সঙ্গী করে ভবা বেরিয়ে পড়েছিলেন অজানার সন্ধানে! পথের সন্ধান করতে করতে এক ব্যতিক্রমী ভাষার সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন। যার প্রাসঙ্গিকতা আজ আমরা উপলব্ধি করি আমাদের অনুতে পরমাণুতে।
খন্ডিত বঙ্গভূমির যন্ত্রনাকে স্পর্শ করার আকন্ঠ বাসনায়, শিকড়ের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসায়, নিজের মাটির গন্ধ এবং রূপের কাঠামোয় তিনি ‘নীতা’ (মেঘে ঢাকা তারা),’অনসূয়া'(কোমল গান্ধার) ও ‘সীতা’র(সুবর্ণরেখা) ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিলেন। তৎকালীন সময়, ‘নীতা’র মর্ম উপলব্ধি করলেও চিনতে পারেনি ‘অনসূয়া’ কিংবা ‘সীতা’কে। তবে আজ ‘অনসূয়া’, ‘সীতা’ আমাদের মনের শরীরে বাস করছে প্রতিনিয়ত প্রতিক্ষণ…
শক্তিপদ রাজগুরু’র “চেনামুখ” গল্প অবলম্বনে ঋত্বিকের নির্মিত চলচ্চিত্র “মেঘে ঢাকা তারা”র অন্তরে ‘নীতা’ সমাজ সংসারের গহীনে এক বিচরণ ক্ষেত্র। নীতা’র বিস্তীর্ণ জীবনে, সংসারের পাশে আবদ্ধ সকল বন্ধন যাযাবরের মতোই চলাচল করেছে আপন আনন্দে।

নীতা এক সংকল্প। ত্যাগের অন্তরেই সংকল্পের উদযাপন। পৃথিবীর কোনো এককোণে মানুষের জন্যে নিঃশব্দে নীরবে নিজেকে নিবেদন, নীতার সাধক চরিত্রের পরিচায়ক। সামাজিক দারিদ্রতা, নিকট সম্পর্কের সংকীর্ণ মানসিক দারিদ্রতার আঘাতে জর্জরিত হয়েও নীতাদের মতো মানুষেরা অপরাজিত আজও… দীর্ঘ মানবিক চেতনার কাঠামোয় শিল্পী ঋত্বিক ঘটক নীতার ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। জীবন্ত নীতা’র দীর্ঘদেহী মানবিক রূপের ব্যাপ্তি বিস্তৃত হয়েছে স্বর্গের উমা পর্যন্ত…
মহাকালের সাথে শেষ পরিনয়ের মুহূর্তেও নীতার বাঁচার আত্মিক ইচ্ছে যেন সমাজ সংসারের গহ্বরে থাকা মানুষকে আরো আরো স্পর্শ করার এক আর্তি। এ যেন সন্তানদের জন্যে এক মায়ের আর্তনাদ। বিশ্বসংসারের মায়ের প্রতিচ্ছবি “মেঘে ঢাকা তারা”র নীতা’র শরীরে মননে। চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে নীতা’র মৃত্যু, বাস্তব পৃথিবীতে চিন্ময়ী উমার বছরের পর বছর ফিরে আসার আগমনী বার্তাই বহন করে…
শেক্সপিয়ারের “টেম্পেস্ট” নাটকের দুটি চরিত্র, মিরান্দা আর ফার্দিনান্দ। মিরান্দার অন্তরে অনসূয়া এবং ফার্দিনান্দের অন্তরে সমরকে এঁকেছিলেন ঋত্বিক তাঁর চলমান ক্যানভাসে “কোমল গান্ধার” নামে।
সমর এবং অনসূয়া প্রেমের বন্ধনে থাকলেও, সমর থাকত বিদেশে। ‘শকুন্তলা’ নাটকে অভিনয় করতে এসে ভৃগুকে ভালোবাসে অনসূয়া। ফার্দিনান্দের কি হবে! মিরান্দা কি বিদেশে পাড়ি জমাবে! সুখী গৃহকোণের হাতছানির গভীরে দেশভাগের চিত্রকল্প রচনা করেছিলেন ঋত্বিক তাঁর “কোমল গান্ধার”-এর অন্তরে।
ভৃগু আর অনসূয়া দুজনেই ওপার বাংলার মানুষ। অনসূয়া নাট্য আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রান, যে সমস্ত দলাদলির উর্ধ্বে গিয়ে ভৃগু’র দলে নাটক করতে আসে, এবং তৎকালীন সময়ের দুটি দলের অন্তর্দ্বন্দ্বে পূর্ণচ্ছেদ ঘটিয়ে, অনসূয়ার আন্তরিক চেষ্টায় এক নতুন বাড়ির সন্ধান আসে…
সকলপ্রকার ভাঙন অর্থাৎ দেশভাগ এবং গণনাট্যের ভাঙনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ঋত্বিক অনুভব করেছিলেন ভবিষ্যতের আসন্ন সংকটকে। গননাট্যের অন্তর্দ্বন্দ্বে গন আন্দোলনেও ভাটার টান অনুভূত হয়েছিল। ঋত্বিক শঙ্কিত হয়েছিলেন, তাই আন্দোলনের শারীরিক বিশ্লেষণে না গিয়ে তিনি তৎকালীন সংকটজনক অবস্থাই যে একদিন প্রবল দানবীয় আকার ধারণ করবে এবং বলি হবে মানুষের বোধশক্তির, তার দিকেই তিনি দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। দূরদর্শী, চিন্তক ঋত্বিক ঘটকের কাছে সংকটের সমাধান সূত্র ছিল না ঠিকই, কিন্তু সংকটজনক পরিস্থিতির দলিল তিনি রচনা করে যান, যা দেখতে দেখতে মানুষ সচেতন হতে পারবেন তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে। হয়তো মানুষই সমাধানের পথ আবিষ্কার করতে পারবেন একদিন…আসন্ন পরিস্থিতির ইঙ্গিত তিনি দিয়ে গেছেন দর্শকের উদ্দেশ্যে। নিঃশব্দে, এক গন আন্দোলন প্রস্তুতির একটি স্তরে মানুষকে উন্নীত করতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক।
মহাকাব্যের মূল চরিত্র শকুন্তলার যন্ত্রনা,”কোমল গান্ধার” চলচ্চিত্রের সূক্ষ্ম অন্তরের যন্ত্রনাকে ঋত্বিক নিপুণ শৈল্পিক সুতোয় গেঁথেছিলেন। শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রাকালের যন্ত্রনা আর অনসূয়া ভৃগু এবং ঋত্বিকের দেশভাগের যন্ত্রনা সব মিলে মিশে যেন একাকার হয়ে যায়, “কোমল গান্ধার” চলচ্চিত্রে।
অব্যক্ত ভাবে ঋত্বিক তাঁর আত্মজৈবনিক জীবনের কথকতাও লিখেছিলেন “কোমল গান্ধার”-এর সূক্ষ্ম অন্তরে। “কোমল গান্ধার” চলচ্চিত্রের স্তরে স্তরে মানবিক রঙের বিন্যাসে ঋত্বিক দেশের সংকটজনক অবস্থার জলছবি তৈরি করেছিলেন তাঁর শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির গভীরে।
“আমরা সব নিরালম্ব…বায়ুভূত”। ঈশ্বর পলাতক, এ কোন্ ঈশ্বর! ঋত্বিক ঘটকের “সুবর্ণরেখা” চলচ্চিত্রের বাস্তুহারা উদ্বাস্তু হরপ্রসাদ এবং ঈশ্বর যারা একসাথে স্বপ্ন দেখেছিল এক নতুন জনপদের অথচ ঈশ্বর দেশভাগের যন্ত্রনা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে নিজের বোন সীতাকে নিয়ে ব্যক্তিগত সুখের আলপথ ধরে হাঁটতে চেয়েছিল। হরপ্রসাদ উদ্বাস্তুদের জীবনযুদ্ধে নিবেদিত প্রাণ হয়েই রয়ে যায়…ঈশ্বর সেখানে পলাতক ঈশ্বর।

ঈশ্বরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সীতা অভিরামের সাথে তার নতুন বাড়ির সন্ধানে হাঁটতে শুরু করলেও, অভাবের থাবায় সীতা অভিরামের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়। জীবনযুদ্ধের চরমতম পথকে অবলম্বন করেই সীতার ক্ষুন্নিবৃত্তি চলে।
নতুন বাড়ির সন্ধানে ঈশ্বর একদিন এক ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিয়েছিল, ফ্যাক্টরির স্বরূপ আদপে বিশ্বায়ন, যে বিশ্বায়নে আছে কেবল ভোগ আর ভোগবিলাস যা আসলে ধ্বংসের মুখ। বিশ্বায়নের জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ধাবমান গলিত লাভায়, পলাতক ঈশ্বর সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং পরাজিত। আবার নতুন জনপদের স্বপ্ন নিয়ে উদ্বাস্তুদের স্বার্থে নিজের সারাজীবন বিলিয়ে দিয়েও হরপ্রসাদও মুক্তির পথ খুঁজে পায়নি, সেও ব্যর্থ। ধ্বস্ত দুজন মানুষ দুজনের মুখোমুখি হয়ে যেন শেষ জীবনে ভোগের আগ্রাসী খাদের পথ ধরেই হাঁটতে থাকে…খাদের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে ঈশ্বর তার বোন সীতার মুখোমুখি হয়, কামনার বাসনা চরিতার্থতায়… ক্ষুন্নিবৃত্তির এ কোন পথ! যেখানে দাদাই তার খদ্দের! রামায়নের সীতার অগ্নিপরীক্ষার যন্ত্রনা আর “সুবর্ণরেখা”র সীতার যন্ত্রনা মিলেমিশে কোথায় যেন একাকার হয়ে যায়! মহাকাব্যের মাটির কন্যার সাথে বাস্তবের মাটির কন্যা সীতারা রক্তাক্ত হয়ে বিলিন হয়ে যায় পৃথিবীর গহ্বরে। অন্তঃসারশূন্য পৃথিবী নীরব নির্বিকার।
নতুন এক জনপদ নতুন এক বাড়ির নতুন এক বোধের সন্ধান মানুষ আজও করে চলে, বার বার করেই চলে…সীতার সন্তান বিনু অভিরামের সাথে আবার নতুন এক বাড়ির সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে… “সুবর্ণরেখা” চলচ্চিত্রের অন্তরে, গভীর এক বোধ জন্ম নেয়, যার অনুসন্ধান চলমান আজও…
কোনো হতাশা, অবসাদ, নৈরাশ্যবাদ, অবক্ষয় কোনো কিছুই ঋত্বিককে গ্রাস করতে পারেনি কখনোই। তিনি দেশভাগের যন্ত্রনায় ধ্বস্ত হয়েও আগামীর সংকটকে নিয়ে আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়েছেন কিন্তু তারমধ্যেও শৈল্পিক ভাবে কাকতালীয় ঘটনাচক্রের মধ্যে দিয়ে “সুবর্ণরেখা” চলচ্চিত্রের চিত্রায়নের মাধ্যমে মানুষকে নতুন বাড়ির সন্ধান করে যেতে বলেছেন…
বাস্তুহারা উদ্বাস্তু আজ আমরা প্রতিক্ষণ প্রতিনিয়ত অথচ এ সংকট আজ হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা কোনো সংকট সমস্যা নয়। সাল তারিখ দিন ক্ষণ মেপে উদ্বাস্তু হওয়ার পরিমাপ না করে দেশভাগ করার মুহূর্তটুকু ধরলে তা প্রায় আটাত্তর ঊনআশি বছরের পুরনো এক অতি দানবীয় সংকট। মানবিক বোধে যার আঁচে দগ্ধ হয়েছিলেন একক ঋত্বিক।
আমাদের দেশ স্বাধীনতা পেয়েছিল খন্ডিত ভারতবর্ষের নিরিখে। আর সেই খন্ডিত স্বাধীনতায় তৎকালীন সময়েও আমরা বাস্তুহারা ছিলাম আজও স্বাধীন ভারতবর্ষে আমরা বাস্তুহারা উদ্বাস্তু উপাধি বহন করেই চলেছি…কি অদ্ভুত! বিদগ্ধ রাষ্ট্রের বিদগ্ধ রাজনৈতিক মাথা মুন্ডু-ধড়-ল্যাজ শুধুই নিজেদের রাজনৈতিক অর্থলিপ্সার স্বার্থ চরিতার্থতায় ব্যস্ত হয়ে রইলেন তাঁদের অপরিনত শুষ্ক মস্তিষ্কে।

আলোকময় স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখতে দেখতে আবেগের নিয়ন্ত্রণের বেগ হারিয়ে কখন যে বিশ্বায়নের অন্ধকারে আমরা ঝাঁপ দিয়েছিলাম তা আমরা জানতে পারিনি, বলা ভালো জানতে চাইনি। আজও চাইনা!
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানবিক চিন্তক ঋত্বিক কিন্তু সেই যন্ত্রনাকে একা একদম একাকী বয়ে বেড়িয়েছেন সকলের অলক্ষ্যে অতি অজ্ঞাতে। মানুষের মধ্যে থেকেও তিনি বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন তাঁর শূন্য শিকড়ের যন্ত্রনায়। তাঁর বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের অন্তরের মূলে বার বার উঠে এসেছে সামাজিক রাজনীতিক অর্থনৈতিক সংকটের কথা। শিল্পের স্বার্থে দেশের সংকটকে উপেক্ষা করেননি ঋত্বিক কখনোই…সংকটকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন বার বার। মানুষের নিদ্রিত অসাড় বোধকে জাগ্রত করাই ছিল তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রাপথের উদ্দেশ্য…
মহাকাব্যের মাটিকে স্পর্শ করেই হোক বা কোনো এক গল্পের কাঠামোকে আশ্রয় করেই হোক, দেশের সংকটের সর্বনাশা রূপকে চলচ্চিত্রয়িত করে গেছেন প্রতিনিয়ত, অপ্রত্যাশিতভাবে শঙ্কিত ভীতসন্ত্রস্ত সময় ক্রমান্বয়ে চলচ্চিত্রগুলির মুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করে নিজেদের দুর্বলতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। আবার মুক্তির পরেও সাধারণ মানুষ চলচ্চিত্রগুলির সূক্ষ্ম মানবিকতার কাছে পৌঁছতে পারেনি কারণ তৎকালীন রাষ্ট্র চায়নি। আসলে রাজনৈতিক জগতের সংকীর্ণতায় আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে অবরূদ্ধ হয়েছে ঋত্বিকের চলচ্চিত্রের দর্শনের পথ।
সূক্ষ্ম মানবিক স্তর থেকে ঋত্বিক তাঁর চলচ্চিত্রের অন্তরে শুধুই তাঁর আত্মকেন্দ্রিক শুষ্ক শিল্পচর্চায় ব্যস্ত থাকেননি। সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের, দর্শনের, চিন্তনের আকর গ্রন্থ রচনা করে গেছেন তাঁর চলচ্চিত্র থিয়েটার এবং লেখনীর মধ্যে…যা আজও এই একবিংশ শতকেও প্রাসঙ্গিক প্রাসঙ্গিক আর প্রাসঙ্গিক…
অচেতন সারিবদ্ধ দেওয়ালের ভাঙন দেখতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক। গড়তে চেয়েছিলেন এক নতুন চেতন জনপদ…
নীলকন্ঠ ভবা, সময়ের থেকে অগ্রনী এক মানুষ যিনি কেবল মানুষের সাথে, মনুষ্যত্বের পাশে আন্তরিক ভাবে থাকতে চেয়েছিলেন, অথচ তাঁর নিবিড় চাওয়ার কাছে তিনি প্রতিহত হয়েছেন প্রতিনিয়ত, আর নিঃসঙ্গতার দেওয়ালে মাথা কুটেছেন বার বার, আবার পরমুহূর্তে সেই দেওয়ালেই নিজেকে খনন করেছেন অতি অক্লেশে। নিজের আত্মার আত্মিক সম্পর্ক, আর্থিক এবং মানসিক বিপন্নতায় বিচ্ছিন্ন হয়েছে কিন্তু দূরত্ব কখনো গ্রাস করতে পারেনি, সম্পর্কের বন্ধনকে…ভবা’র ভালোবাসার পাগলামির আবেশ এমনই প্রগাঢ়।
তথ্যচিত্রের সন্ধানে ভবা মগ্ন থেকেছেন। বেশ কিছু তথ্যচিত্র শেষ করেছিলেন আবার কিছু অর্ধনির্মিত হয়ে থেকে গিয়েছে, কিছু আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানুষের দুর্বুদ্ধিতায়, অর্থাভাবে অথবা ভবার পাগলপারা স্বভাবের কারণে। কখনো আবার সাহিত্য সৃষ্টিতে ডুবে থেকেছেন, কখনো আবার মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সঙ্গীতের নীরব শ্রোতা হয়েছেন। ভাবের ঘরে বসবাসে যতই অভ্যস্ত হয়েছেন, ততই অনিচ্ছাকৃতভাবে একাকীত্বের সাথে সহবাস করতে হয়েছে তাঁকে।
ইহদেহে যখন তিনি শেষবারের মতো চলমান ক্যানভাসে “যুক্তি তক্কো আর গপ্পো” আঁকছেন তখন তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ ভগ্নপ্রায়, নিঃশেষিত মৃতপ্রায় জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে আরো একবার নিজের সংগ্রামের দর্শনে নিজেকে খুঁজেছেন, সংকটগ্রস্ত সময়কে ধরে রাখতে চেয়েছেন আগামীর উদ্দেশ্যে, একবুক অন্য এক সময়ের স্বপ্নে বিভোর থেকেছেন…

ভবা’র জীবন দর্শনে ভবা কিছু হারায়নি! হারিয়েছি আমরা ভবা’র আত্মপ্রত্যয়ী আপোষহীন মননকে। হায়রে হতভাগ্য সময়! ওঁর চলচ্চিত্রকে বন্দী করতে করতে আমরা যুদ্ধোপর্বোত্তর জীবনের অস্তিত্ব সন্ধান, মুক্ত ভাষার সন্ধানের ব্যতিক্রমী পথকে অবরূদ্ধ করে নিজেরাই নিজেদের অদৃশ্য ষড়যন্ত্রের কারাগারে নির্বাসিত করেছি। খুইয়েছি মুক্তির পথ, হারিয়েছি নিজের অস্তিত্ব এবং নিজের ভাষা। অথচ প্রতিটি চলচ্চিত্র নির্মাণে চরম বিপর্যয় অর্থনৈতিক বাঁধায় পথ যত বন্ধুর হয়েছে, ভবা’র সংগ্রামী আত্মায় আগুনের উদগীরণ ততই বলিষ্ঠ আকার ধারণ করেছে। সংগ্রামের মধ্যেই নিহিত শিল্পী জীবনের সন্ধান…যা ভবা’র জীবনচর্যার ব্রত।
মানবপ্রেমে জর্জরিত ভবা সংগ্রামের অন্তরেই জীবনের অস্তিত্বে অবিচল থেকেছেন মনুষ্যত্বের সন্ধানে…চলমান সভ্যতার, ক্ষীণ নদীর বুকে চরা পড়লেও সভ্যতার বিনাশ নেই আছে কেবল রূপান্তর এই বিশ্বাসে ভর করেই ভবা’র “তিতাস একটি নদীর নাম” আমাদের অনুভবে আজ আন্তরিক।
তৎকালীন সময়ের চলচ্চিত্র জগৎ যখন সময়ের সাময়িক মায়ায় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারের গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসমান, ভবা ওরফে ঋত্বিক তখন নিজেকে খনন করে চলেছেন থিয়েটার, চলচ্চিত্র কিংবা কলমকে অস্ত্র করে, নতুন সময়ের স্বপ্নের সন্ধানে। আজ প্রতিনিয়ত অনুভূত হয় ঋত্বিক এক ধর্ম, ঋত্বিক এক বোধ, ঋত্বিক এক চেতনা, ঋত্বিক এক জীবনীশক্তি যাকে অনুসরণ করার সাধ থাকলেও সাধ্যের পথ আমাদের কাছে অব্যক্ত…

