শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

অমল মাথা উঁচু করে একবার আকাশ দেখল। ওটা অনেক অনেক উঁচুতে। আকাশ দেখতে দেখতে ঘাড় ব্যথা হয়ে যায় অমলের। শুধু কি আকাশ? কলকাতা শহরের আকাশছোঁয়া বাড়িগুলোও অমল মাথা উঁচু করে এমনিভাবেই দেখতে থাকে। ওর বিস্ময়ের সীমা থাকে না। যা কিছু উঁচু তার প্রতিই ওর বোধহয় তীব্র আকর্ষণ। আর এই আকর্ষণের মধ্যেও ওর বুকের মাঝে একটা চোরা বিষাদ লুকিয়ে থাকে।

হলদিয়ার চকদ্বীপার পূর্বপল্লী গ্রামে ওদের বাড়ি। একমাত্র ওদের পরিবারেই পাঁচজন বামন। তাই ওদের বাড়িটার নাম ‘বামনবাড়ি’ হয়ে গেছে। দুটি মাটির ঘরে গাদাগাদি করে ওরা থাকে। শ্বাস নেয়, অন্নগ্রহণ করে, ওঠে বসে এবং জীবনধারণ করে। বিপুলা এই পৃথিবীতে তিনফুটিয়া মানুষদের জন্য আর কতখানি জায়গার প্রয়োজন! না, কোনও অসুবিধা হয় না। ঘরের সঙ্কীর্ণ পরিসরে খুব ভালোভাবে না হলেও কুলিয়ে যায় ওরা। মাটির ঘরের নিচু ছাউনিটাও তখন ওদের কাছে অনেক উঁচু বলে মনে হয়। তাই আকাশ দেখে ওর বিস্ময়। দিনের বেলা নীল আকাশের মাঝে সূর্য আর রাতের আকাশভরা গ্রহ নক্ষত্র দেখতে দেখতে অমল গেয়ে ওঠে –“আকাশভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ / তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান … / “। হ্যাঁ, ঈশ্বর ওর গলায় বেশ ভালো সুর দিয়েছেন। মনখারাপ হলেই অমল তাই গান গায় এই উন্মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে। রবিঠাকুরের আরও একটা আশ্চর্য গান সে গায় — “আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে, / আমার মুক্তি ধূলায় ধূলায় ঘাসে ঘাসে।/”।

অমল শুনেছে, রবিঠাকুর ছিলেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। তিনি চোখ মেললেই আকাশ দেখতে পেতেন। অমলদের মতো ঘাড় উঁচু করে তাঁকে আকাশ দেখতে হতো না। তাই বোধহয় আকাশ নিয়ে এত সুন্দর সুন্দর গান তিনি বেঁধেছেন।
অমলের দাদা বিমল তার উপার্জনের টাকা থেকে অনেক কষ্টে টাকা বাঁচিয়ে তাকে একটা সেকেন্ডহ্যান্ড হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছে। সেই হারমোনিয়ামটাও অমলের তুলনায় বড়। ছোট হাতে বেড় পাওয়া মুস্কিল। তাই পায়ের নিচে জলচৌকি রেখে হারমোনিয়ামে সুর ওঠায় সে। সেই গান বিভোর হয়ে শোনে তার পরিবারের মানুষগুলো। পাড়াপ্রতিবেশিরাও উঁকিঝুঁকি মারে তখন।

অমল যখন ছোট ছিল, ওদের দুই ভাইকে নিয়ে তাদের বাবা একদিন কলকাতার এস এস কে এম হাসপাতালে গেছিলেন। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, এটা একটা অসুখ। অসুখটার নাম ওর দাদা লিখে নিয়েছিল একটা কাগজে। খুব কঠিন একটা নাম। তবু পড়া মুখস্ত করার মতো বারবার পড়তে পড়তে নামটা মনে রেখেছে অমল। অসুখটার নাম ‘অ্যাকনড্রোপ্লেসিয়া’। এই অসুখটা নাকি জিন সংক্রান্ত। অমলের বাবাও ছিলেন বামন। কিন্তু মা ছিলেন স্বাভাবিক উচ্চতার। শুধু গরীবের মেয়ে বলেই তার বাবার সঙ্গে তার মা’র বিয়ে হয়েছিল। বামন স্বামী পেয়ে মা অবশ্য অসুখী হননি। তখন জমিজমা ছিল তাদের। চাষবাস হতো। তাতেই চলে যেতো সংসার।

এখন একচিলতে জমি নেই। একমাত্র অমলের দাদাই হাইস্কুল পর্যন্ত পড়তে পেরেছে। অমল ক্লাশ ফোর পর্যন্ত পড়েছে শুধু। বিমল ইন্ডিয়ান অয়েলে ক্যাজুয়াল লেবারদের হিসেবপত্র দেখাশোনা করে। সামান্যই মাইনে পায়। অমলের বৌদিও গরীব ঘরের মেয়ে। সেও স্বাভাবিক উচ্চতার। বিমলের চারটি ছেলেমেয়ের মধ্যে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে বামন। অমলের এক দিদি মাধুও বামন। সে প্রতিবেশীর বাড়িতে রান্নার কাজ করে। মাস গেলে সামান্য টাকা পায়। আর এক দিদি সরলার বিয়ে হয়ে গেছে। তার বিয়ে দিতেও অনেকটা জমি বিক্রি করতে হয়েছে।

অমল আজ সকাল সকাল কলকাতা যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। হাওড়া স্টেশনের আশেপাশেই একটা মেলা বসেছে। মেলায় দোকানপাট আর মানুষজন দেখতে বেশ ভালো লাগে অমলের। মুখের সামনে ছোট্ট আয়নাটা ধরে পরিপাটি করে চুল আঁচড়াচ্ছিল সে। ফুলপ্যান্টটা ওর মাপের চেয়ে একটু বড়। পায়ের নীচটা তাই গুটিয়ে নিয়ে জুতোর ফিতে বাঁধতে লাগল সে। বিমলের ছোট ছেলেটা অবাক হয়ে দেখছিল অমলকে। সাতসকালে সাজগোজের বহর দেখেই সে বুঝতে পেরেছে অমল কোথাও বেরোচ্ছে। আধো আধো স্বরে সে তাই বলে উঠল — ‘কাকু, কোথায় যাচ্ছ গো? আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে? পিসিকে বলি সাজিয়ে গুছিয়ে দিতে? বেশি দেরি করব না।’ অমল জুতোর ফিতে বাঁধা শেষ করে ওর গালটা টিপে দিয়ে বলল –“নন্তু সোনা, আর একদিন নিয়ে যাব তোকে। আজ একটা কাজে বেরোচ্ছি। যেদিন বেড়াতে যাব, সেদিন নিয়ে যাব, কেমন?”

নন্তুর উৎসাহে ভরা হাসিহাসি মুখখানা কেমন যেন মিইয়ে গেল। গাল ফুলিয়ে সে বলল –” তবে কি কলকাতার চিড়িয়াখানা দেখাতে নিয়ে যাবে? তিন সত্যি কর, তাহলে।” – অমল কিছু না ভেবেই ওর মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলল –” তিন সত্যি”।

হাওড়া যাবার একটা বাস এসে দাঁড়াল অমলের সামনে। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো মানুষগুলো হুড়মুড় করে উঠে পড়ল বাসে। বাসের পাদানিটা বেশ উঁচু। এই পৃথিবীর মানুষগুলো খর্বকায় মানুষগুলোর কথা মনে রেখে কিছুই তৈরি করেনি। হাসপাতালের বেড, রেলের টিকিট কাউন্টার সব উঁচু। মনটা দমে যায় অমলের। তবু অনেক কসরত করে বাসের পাদানিতে পা রাখল সে। বাসের বাকি যাত্রীরা আগেই উঠে যে যার সিট দখল করে বসে আছে। অমল বাসের ভেতর ঢুকতেই একটা হাসির রোল উঠল। একজন মহিলা পাশে বসা ছেলেটাকে বলল — ” বাবু, দেখ একটা বামন উঠেছে বাসে।” ছেলেটা সিটের ওপর থেকে গলা বাড়িয়ে অমলকে দেখে বলল — “এ মা! এ তো আমার থেকেও হাইটে ছোট। কী করে হল মা? ভগবান আমাদের মতো কেন বানায়নি ওকে?” মহিলাটি কী জবাব দিল, অমল অবশ্য তা শুনতে পেলো না। অমল দেখল পিছনের সিটে যারা বসে আছে, সকলেই মাথা তুলে ওকে দেখছে। ওর নন্তুর কথাটা মনে পড়ে গেল। আর একটু আগেই নন্তুর কাছে কলকাতা গিয়ে চিড়িয়াখানা দেখানোর তিন সত্যি করে এসেছে সে। একদিন ওকে তাই নিয়ে যেতেই হবে। এই মুহূর্তে বাসের যাত্রীদের কাছে নিজেকে একটা চিড়িয়াখানার জানোয়ার বলেই মনে হচ্ছে। কৌতূহল ও বিদ্রূপ মাখানো সব চোখগুলো। অমলরা যেখানেই যায়, ওদের দেখে থমকে যায় পথচলতি মানুষ। চলন্ত গাড়ির স্পিড কমিয়ে দেয়। দুর্গাপুজোয় প্রতিমা দেখা ছেড়ে ভিড়ের মধ্যে থেকে উঁকি মারে অনেক কৌতূহলী মুখ।

ড্রাইভারের পাশে বনেটের উপর পিছনটা ঠেকিয়ে কোনোরকমে বসতে পারল অমল। ওর পা দুটো ঝুলে থাকল। ড্রাইভারের নাম রতন। সে অমলকে চেনে। কারণ অমল প্রায়ই এই বাসে কলকাতায় যায়। তাকে দেখে রতন তার সামনের পাটির অসমান দাঁতগুলো বের করে হেসে বলল, ‘কি- গো, কাজ খুঁজতে বেরিয়েছ নাকি? এখানে সার্কাস পার্টিতে দেখতে পারো তো। তোমাদের মতো লোকদের দরকার হয় সেখানে। ওখানে গেলে একটা হিল্লে হয়ে যাবে হয়তো।’ – অমল রতনের কথায় হাসল শুধু। কোনো জবাব দিল না। বামন হলেই সকলে ভাবে, ওদের একটাই গতি। সার্কাসের জোকার হওয়া। অমল মুখটা বেজার করে বসে থাকল।

এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে বাসটা ঝড়ের বেগে ছুটে চলেছে। টাল সামলাতে না পেরে অমল দু- একবার পড়ে গেল। আবার পিছনটা ঝেড়ে সে উঠে বসল বনেটে। বাসের মানুষগুলো ওকে দেখে হাসছিল, কিন্তু কেউ উঠে ওকে একটা সিট ছেড়ে দিল না। অথচ যে কোনো একজন মানুষ এই বনেটের ওপর ভালোভাবেই বসতে পারত। অমল উইন্ডো স্ক্রিনের সামনে একটা খাঁজ-কাটা জায়গা হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে ব্যালান্স করে বসল এবার। সে জানে সারাটা জীবন নানা বিদ্রূপ আর অপমান গায়ে মেখেই চলতে হবে। জীবনের মায়ার বড় জোর। আষ্টেপৃষ্ঠে তা বেঁধে রাখে। সামনের কাচ দিয়ে রাস্তাঘাট আর বিচিত্র মানুষজন দেখতে দেখতে একসময় অমল হাওড়ায় পৌঁছে গেল।

বেঁটে শরীরটার দু’ পাশে বলিষ্ঠ হাত দুটোকে দু’ পাশে ছড়িয়ে কোমরের আড় ভেঙে অমল হাঁটতে শুরু করল ছোট ছোট পদক্ষেপে। সে খেয়াল করল, রাস্তার মানুষগুলো ওকে কৌতূহলভরে দেখছে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সে পৌঁছে গেছে মেলা প্রাঙ্গণে। অনেক উঁচু উঁচু গাছ ঘিরে আছে মেলাটাকে। অমল মাথা উঁচু করে গাছগুলোকে দেখল। মেলার মানুষজনকে দেখে সে বুঝতে পারল আশেপাশের গ্রাম থেকেই সকলে এসেছে। অমলকে দেখে মানুষগুলো মুখ বেঁকিয়ে হাসল। এ ওর গায়ে ঠেলা দিল। কতগুলো যুবতী মেয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ল। রঙিন শাড়ি, চুড়ির রিনিঠিনি আর উদ্ধত যৌবনের ঝাঁঝে গরবিনী ওরা। অমল ওদের পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। যুবতী মেয়েদের ও পারতপক্ষে দেখতে চায় না। বামন হলেও ওর মনটা তো স্বাভাবিক পুরুষদের মতোই। ভালবাসতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কে ভালবাসবে ওকে! মাথা উঁচু করা গাছগুলোর পাশে একটা বেঁটে গাছ দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক ওর মতো। বাড়েনি। তাহলে গাছেদের জগতেও ওর মতো বামন গাছ আছে! ও শুনেছে, শহরের মানুষগুলো অনেকেই ভালবেসে তাদের বাড়ির ড্রয়িংরুমে পটের মধ্যে বনসাই সাজিয়ে রাখে। তেমনভাবে ওকে কি কেউ ভালবেসে সম্মানের একটা জীবন দিতে পারে না? এই মানুষগুলোর কি কোনো মন নেই?

অমল দেখল একটা কাঁসার থালায় স্তরে স্তরে মালপোয়া সাজানো রয়েছে। ঠিক পাহাড় চূড়ার মতো দেখতে লাগছে। রসে ভরা মালপোয়াগুলো দেখে ওর জিভে জল চলে এল। ও পকেটে হাত ঢোকালো। টাকা বের করে চারটে মালপোয়া কিনে ওখানেই দাঁড়িয়ে খেতে শুরু করল। রসে ভরে গেল ওর সারামুখ। পাশের দোকানটায় থালার মধ্যে সীতাভোগ সাজানো রয়েছে। এবার অমল লোভ সামলালো। নন্তুর জন্য একটা ভালো বাঁশি কিনতে হবে। অমল যখন গান গায়, তখন তন্ময় হয়ে গান শোনে ছেলেটা। ওকে বাঁশিতে সুর শেখাবে অমল। পায়ে পায়ে সে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুদূর গিয়েই দেখতে পেল একটা দোকানে নানারকমের খেলনা সাজানো। সে দোকানটার সামনে গিয়ে খেলনাগুলো দেখতে লাগল। ওপরের দিকে তারে ঝোলানো অনেকগুলো বাঁশি রয়েছে। দোকানী ওকে দেখে হেসে বলল –‘ কী চাই ভাই? টুপি না মুখোশ?’

অমল বুঝতে পারল দোকানী ওকে সার্কাসের জোকার ভেবেছে। সে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘ না- না, ওসব কিছু চাই না। একটা ভালো দেখে বাঁশি দাও আমাকে।’ দোকানী ওপরে ঝোলানো বাঁশিগুলোর থেকে একটা বাঁশি পেড়ে কাপড়ে ভালোভাবে মুছে ওর হাতে ধরিয়ে দিল। অমল বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে একবার পরখ করে নিল। নন্তু খুব খুশি হবে। ওর আনন্দোজ্জ্বল মুখটার কথা ভেবে অমলের মুখটাও হাসিতে ভরে গেল। অমল দাম মিটিয়ে বাঁশিটা পকেটে পুরে নিল। বাঁশির মাথাটা বেরিয়ে রইল পকেট থেকে।

এ পাশটায় ঘর গেরস্থালির জিনিসপত্র সাজানো। হাতা, খুন্তি, গামলা, বালতি, ডেকচি, সাঁড়াশি নানারকমের রান্নাবান্নার সামগ্রী। অমল সেসব ফেলে মেলার অন্যদিকে চলে এলো। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল মেলার এধার- ওধার। উঁচু উঁচু গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে ঝকঝকে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। অমল সেদিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে গেল।
তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অমল এবার আতঙ্কিত হল। এভাবে আর কতদিন? কে দেবে ওকে কাজ? লেখাপড়া শেখেনি। শ্রমিকের কাজও কেউ দেয় না তাকে। কাজে পিছিয়ে যায়। ছোট ছোট হাত দিয়ে কোনো বোঝা ওপরে তোলা বেশ কষ্টসাধ্য। ওর ছোট ছোট পদক্ষেপ জীবিকার ভিড়ে ওকে কেবলই পিছিয়ে দেয়। বড় সাধ ছিল অমলের অনেক উঁচুতে ওঠার। উঁচু থেকে পৃথিবীটাকে দেখার। সেই সাধ আর এ জনমে মিটবে না। না চড়তে পারল সে কোনো পাহাড়চূড়ায়, না পারল কলকাতার আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাটগুলোর মাথায় উঠতে, না পারল এরোপ্লেনের জানালা দিয়ে আকাশ থেকে পৃথিবীর মাটি দেখতে। উদাসমনে মেলার ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে সে গান গেয়ে উঠল — “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ / খেলে যায় রৌদ্র ছায়া, বর্ষা আসে বসন্ত… “।

সেই মুহূর্তে ওর হঠাৎ মনে হল, ওর এই গানকেই তো সে জীবিকা করতে পারে। এতদিন এটা মাথায় আসেনি ভেবে সে বেশ অবাক হল। আশ্চর্য! এ কথা ওকে কেউ মনেও করিয়ে দেয়নি। আজ মেলার এই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের মাঝে নীল আকাশের নীচে শ্রমজীবী এই মানুষগুলোই তাকে মনে করিয়ে দিল তার জীবিকার কথা। সে অন্যমনস্ক ছিল। হঠাৎ ওর চওড়া কাঁধে কে যেন হাত রাখল। একটা ভরাট কন্ঠস্বর বলে উঠল –‘এই যে একটু শুনবে?’ অমল পিছন ফিরে দেখল প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার এক মানুষ নীচু হয়ে ওর কাঁধ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটার পরনে দামী স্যুট, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মাথার চুল ও জুলফিতে আঁকাবাঁকা রুপোলী রেখা। নাকের নীচে পুরু গোঁফ। উঁচু গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে রোদের আভা মানুষটার মুখে পড়ছে বলে তাঁকে যেন আরও বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
অমল তাঁর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল — ‘আপনি কি আমাকে বলছেন স্যার?’
মানুষটা সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সারামুখে প্রসন্ন হাসি ছড়িয়ে পড়ল। তিনি খুশি হয়ে বলে উঠলেন — ‘হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি। আমি একটা সার্কাস পার্টির ম্যানেজার… ‘।

মানুষটার কথা শেষ হওয়ার আগেই অমল কয়েক পা পিছিয়ে দূরে সরে দাঁড়ালো। ভয় ও ঘৃণায় মুখ কুঞ্চিত করে সে বলল, ‘না- না, আমি সার্কাসের জোকার হতে চাই না। আমাকে মাপ করবেন।’

মানুষটা এবার ওর হাত ধরে অনুরোধের সুরে বললেন–‘ আমার সার্কাসে একজন জোকারের খুব প্রয়োজন। তোমাকে ভালো স্যালারি দেব ভাই।’ অমল ওর হাতটা ছাড়িয়ে নিল এক ঝটকায়। তারপর তাকালো মানুষটার দিকে। বড় মায়া হল। একবার ভাবল, আজ পর্যন্ত কেউ কি ওকে এত গুরুত্ব দিয়েছে! কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল সকাল থেকে আজকের দিনটা। বাসযাত্রীদের কথা, মেলার মানুষগুলোর হাসি- মশকরার কথা, যুবতী মেয়েগুলোর হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ার দৃশ্যটুকু। সারাজীবনের ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, করুণা আর অপমানের ক্ষতগুলো ওর সারা শরীরে ফুটে উঠল। সে হেসে বলল –‘ না- স্যার, আমাকে অনেক স্যালারি দিলেও আমি আপনার সার্কাসে কাজ করতে পারব না।’
মানুষটার মুখের সেই প্রসন্ন হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। মুখে ফুটে উঠল ক্রোধের রেখা। একটা ব্যঙ্গের হাসি খেলে গেল তাঁর মুখে। গলার স্বর উঁচু করে তিনি বললেন, — ‘কী কাজ করবে হে তুমি? জোকারের কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ কি জুটবে তোমার?’

অমল কিছু বলল না। শুধু হাসল। এতদিনে একটা স্বাভাবিক উচ্চতার মানুষকে সে অপমান করতে পেরেছে। তার শরীরের সেই ক্ষতগুলো এবার মিলিয়ে যাচ্ছে। মনের সেই চোরা বিষাদটা হালকা হয়ে যাচ্ছে। একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে ওর। মাথা তুলে বুক উঁচু করে সে বেরিয়ে আসছে মেলা থেকে। বেরোবার আগে একবার পিছন ফিরে সেই মানুষটাকে দেখল অমল। মানুষটা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে। এখন সেই মানুষটাকে কী ভীষণ ছোট দেখাচ্ছে।

[লেখকের পূর্ব রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Shouvik De
Shouvik De
4 months ago

একটি সংবেদনশীল বিষয়ে সংযমী লেখা। পরিণতি চমৎকার। নাটকীয়তা শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল। এই গুণ টেনে – টান টান গল্প বেয়ে যাওয়াই ছোটগল্পকার কৃতিত্ব।

Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
Reply to  Shouvik De
4 months ago

অশেষ ধন্যবাদ।

Alak Baauchoudhury
Alak Baauchoudhury
2 months ago

Brihot Bongo
আহা, চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক গল্প! বামনেরও যে মন আছে, এটা স্বাভাবিক শরীরের মানুষদের মনে থাকে না সব সময়। শারীরিক খামতি থাকলেও একজন বেঁটে মানুষের মেধা বা বুদ্ধি যে স্বাভাবিক মানুষদের থেকে কোন অংশে কমতি নয়, সেটা তারা ভুলেই যায়!
গল্পটিকে একই সঙ্গে বামনিক এবং মানবিক বলা চলে

Alak Baauchoudhury
Alak Baauchoudhury
2 months ago

চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক গল্প! বামনেরও যে মন আছে, এটা স্বাভাবিক শরীরের মানুষদের মনে থাকে না সব সময়। শারীরিক খামতি থাকলেও একজন বেঁটে মানুষের মেধা বা বুদ্ধি যে স্বাভাবিক মানুষদের থেকে কোন অংশে কমতি নয়, সেটা তারা ভুলেই যায়!
গল্পটিকে একই সঙ্গে বামনিক এবং মানবিক বলা চলে।