
‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে, বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর; ধরণীর বহিরা-কাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা।’। স্বর্গত বীরেন্দ্রকৃ্ষ্ণ শান্ত হলে এবং আপনি নিষ্ঠাবান হিন্দু হলে ভোর ভোর উঠে পড়ুন । স্নানাদি সেরে যে কোন জলাশয়ে দাঁড়িয়ে তিন গণ্ডূষ জলের অঞ্জলি দিয়ে বলুন ” ওঁ আগচ্ছন্তু মে পিতরঃ ইমং গৃহ্ণন্তু অপঃ অঞ্জলিং ” অর্থাৎ হে পিতৃপুরুষ অঞ্জলি পুর্ণ জল গ্রহণ করুন।
কৃতাঞ্জলি পুটে জল তো দিলেন লোকান্তরিতকে। চোখের জল দেবেন কি ? না কি শুধু লৌকিকতার দাঁড়ে বসে – দাঁড়ালেন হাঁটু জলে? যদি কিছুটা দ্বিধায় থাকেন তাহলে মিনিট আটেক সময় নিয়ে এই রচনাটি পাঠ করুন। মা ভয়ং কুরু। শাস্ত্রালোচনা নয়, রাজনীতি নেই, আর দুখিরামের জ্ঞানগম্মি তো আপনাদের অজানা নেই। একটি সোজা সাপটা কৌতূহল সম্প্রতি হয়েছে তার।
বৌ একটি বই পড়ছেন। খুব মন দিয়ে পড়ছেন। সাধের কালো চা – মুখ কালো করে পাশেই ঠাণ্ডা হচ্ছে। মেরি বিস্কুট মুষড়ে পড়ে মিইয়ে যাচ্ছে আরো। অল্প বিস্ময়ের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। তিনি একটু বিরল পাঠক। অবসর পেলে দেশলাই কাঠি দিয়ে মা দুর্গা কিম্বা বাজার ফেরত পলিথিনের ব্যাগ ছিঁড়ে পাপোষ বানাতে পছন্দ করেন বেশী। তাহলে হটাত তার এমন ‘আত্মঘাতী বাঙালী ‘ হবার চেষ্টা কেন? যাই হোক বৌ বৈ তো নয়। দুখিরাম তার ব্যক্তিগত পরিসরে একটু উঁকি দেবার লোভ সামলাতে পারল না। কিন্তু – যেখানে বাঘের ভয়…
বইটি ইংরেজি ভাষায়। সেটিই অবশ্য স্বাভাবিক, কারণ তার বিদ্যালয়ের পাঠ ওই ভাষাতেই। তিন ভাইয়ের পরে এক বোন এবং তার বাবা রীতি-মাফিক ‘এক মেয়ের বাপ’। এই ‘এক মেয়ের বাপ’দের – আপনারা মিলিয়ে নেবেন – মেয়ে নিয়ে অল্প একচোখোমি থাকে – সেটা দুখিরাম তার নাতি ক্ষুদ্র জীবনে বার বার দেখেছে। প্রসঙ্গত তার – বৌ ছাড়াও এক দিদি, এক বৌদি, এক মেয়ে। উপরন্তু তার আবার একটি নাতনীও এসেছে আর স্বাভাবিক বাপ হিসেবে সে ভাবতেই পারে যে ভবিষ্যতে একটি পুত্রবধূও পাওয়া যাবে। একা কুম্ভ বাঘ বন্দী খেলছে। সুতরাং সে ভালোই জানে কি ভাবে বাপের বাড়ির ক্ষীর ননীটি এই এক মেয়েরা – ভাইদের থেকে কিছুটা বেশী খেয়ে থাকে। অন্য ভাইয়েরা স্বদেশী ভাষার দ্বারস্থ হলেও – মেয়ে গিয়েছিল কিছুটা কলার উঁচু ইংরেজি মাধ্যম ট্যাঁশকুলে। তারপর কি রকম ভাগ্য বিপর্যয়ে তাকে – ঘোর অনিচ্ছায় – দুখিরামের জীবনসঙ্গিনী হতে হল – ইয়ে এক লম্বি আঁসু ভরি কহানি হৈ। ‘শরৎবাবু’ থাকলে লিখতেন। এত দিন পরে ‘সেই বিধাতার বিচার করার আদালত নাই’।
বাজে বকার অভ্যাস দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে দুখিরামের, এ এক আজন্ম পাপ। পাঠকরা এত দিনে মালুম পেয়েছেন নিশ্চয়ই। বিষয় হল বৌ ঠাকুরানির পাঠ – দুখিরাম হাটে নিয়ে ফেলল তাকে। এবার – বই । আলোচ্য বইটি একজন বহুল বিক্রিত ‘শর্মার’ রচনা । শীর্ষনাম চমকপ্রদ, বিদ্ধকারী এবং কণ্ডূয়ন যোগ্য – Who will cry, When you die’. হুম।

এই ‘শর্মাজি’র লেখা অতীতে নেড়ে চেড়ে দেখেছে দুখিরাম। তিনি পাঠকের নাড়ি বোঝেন ভালো। চিত্তাকর্ষক প্রচ্ছদ পংক্তির পর – সহজ ও সুপাচ্য ভাষায় ঝর ঝর ঝর্নার মত লিখে যান। বিষয় নির্মাণে চমক থাকে, তবে চিন্তার সমুদ্র কতটা মন্থন হয়, কি ওঠে সুরা না সুধা – বলা শক্ত। আর কত সংখ্যা অদ্যাবধি বিক্রি হয়েছে সেটা এই রচনার শেষে থাকবে। সংখ্যাটি – ক্ষুদ্র পত্রিকার সংগ্রামী চিরতরুনরা তো বটেই, বঙ্গ সাহিত্যের বৃহৎ ঠিকাদাররাও কল্পনায় আনতে পারবেন না। তবে বইটির শিরোনামায় কিছুটা বিষাদময় বিদ্রূপ আছে, সংশয় আছে। কে কাঁদবে? কেউ কাঁদবে কি? আসুন এক কাপ ধূমায়িত চা নিয়ে অশ্রুজলে নামা যাক।
মৃত্যু সম্বন্ধে কোনও আলোচনা হলেই সবাই গীতা খুলে বসেন এবং ‘ইঁহা কে তাঁহা কে’ বলে সরল সত্যকে খুব জটিল করে তোলেন। দুখিরামের সে পথ পছন্দ নয়। ব্যক্তিগত ভাবে তার মত – গীতাভাষ্য শ্রাদ্ধে না পড়ে নব বিবাহিতদের পড়ে শোনালে ‘কুরুক্ষেত্র’ কম হবে। পন্ডিতেরা ভাববেন একবার। দুখিরামের মর্তে আগমন – ঈশ্বরের ইয়ার্কি ছাড়া কিছু নয় । নিয়ত সৃষ্টির কাজে ব্যাপৃত থাকার কারণে ‘দেহতত্ত্বের’ অনেক গুঁড়োগাঁড়া কর্মশালায় ছড়িয়ে পড়ে। শেষ প্রহরে ঝাঁট পাট দেবার সময় হয়ত দেখা যায় যা জঞ্জাল জমা হয়েছে তাতে এক আধটা পরীক্ষামূলক নমুনা গড়ে নেওয়া যেতে পারে। এতে সঠিক মাত্রার মিশেল থাকবে না। হয়ত কানটা বড় হবে কিন্তু নাকটা ধ্যাবড়া, বুদ্ধি থাকবে হাঁটুতে তবে গলায় লাগতে পারে গাঁক গাঁক গান্ধার। মোটের ওপর যা হবে কালো – ধলো – মানব সমাজে চরে খেতে পারবে। কিম্বা হয়ত সেই মহাজাগতিক কর্মশালায় তখন Target পূরণের চাপ ছিল। কয়েকটা দুখিরাম হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে। তালে গোলে Quality Check পেরিয়ে তাদের পৃথিবীতে আসা – সবাইকে জ্বালাতে। এসেছে, থাকছে, তাই য-থে-ষ্ট। যাবার পরে আবার কান্না কাটির বায়না করা – ব্যাটা ছেলের বিধবা ভাতার চাওয়ার মত আবদার। কিন্তু অন্যের তেমন দাবী থাকতেই পারে।
যারা নিজের দাঢ্যে দীপ্যমান, বসুধায় এসেছেন মূর্তি বসাতে। কেউ একচল্লিশটা ভাষা অনর্গল বলতে পারেন, কেউ বা একশ এক বছর বেঁচে থেকে রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চান। কারো প্রখর গণিত বোধ – চৌষট্টি হাজার কোটি ধার, ষোল হাজার কোটি শোধ – ব্যাস শোধ-বোধ। কারো মুখ ভরতি দাড়ি আর বাড়ি ভর্তি ‘শ্রী’ ও ‘ভূষণ’। এহ বাহ্য। সাধারন হলেও সিংহ ভাগ মানবক আশায় বাঁধেন খেলা ঘর ‘মনে পড়বে আমায় পড়বে মনে’। অন্তত অশ্রু সজল বিদায় ভাতা চাইতে কোনো দুর্নীতি তো নেই। দাতার দরবারে দরখাস্ত দিয়ে দেখা যাক।
প্রথমে বুঝি মৃত্যুর পরিভাষা, তার ঠিকানা । তারপর তো শোক। কেউ একজন জীবিত বা মৃত, এটা আপনারা বোঝেন কি করে? আপনারা এবার হাঁই মাই তেড়ে আসতেই পারেন – এ যে হাতি-মুখখু একটা, মৃত্যু বোঝে না? হৃৎস্পন্দন, রক্ত প্রবাহ আর নিঃশ্বাস বন্ধ, ব্যস। তাই? মৃত্যুর বাস তবে হৃদয়ে। একটি বন্ধ হৃদয়ের জন্যে যখন আরেকটি হৃদয়ের একুল ওকুল দুকুল ভেসে যাবে, দুঃখের বরষায় চোখের জল নামবে তখন। কিন্তু মৃত্যু কি শুধু তাই?

আরেক মল্লিনাথ তাকে দুঃচ্ছাই করে টিকা দেবেন ‘ওসব অর্ধ শতাব্দী আগের ধারণা। শারীরিক ক্রিয়া আবার চালু করা এখন কোনো ব্যাপারই নয়। কোটি টাকার ventilator তবে আছে কি করতে ? আজকে মৃত্যু প্রমান পত্র দেওয়া হয় “মস্তিষ্কের মৃত্যু” বা “জৈবিক মৃত্যু” হলে। বিস্তারিত বললে যখন মানুষের মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়’। অর্থাৎ মৃত্যুর ঠাঁই বদলে গেছে । তাহলে তো শোকের কারণ ও গেল হৃদয় থেকে মস্তিষ্কে । সে এক আজব কারখানা। আট থেকে দশ কোটি neurons নাচানাচি করছে সেখানে, জন্ম নিচ্ছে এক ক্ষুদ্র রাসায়নিক neurotransmitters, সে আবার সৃষ্টি করছে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ । মানুষের মনে ভাসিয়ে দিচ্ছে যুক্তিযুক্ত চিন্তাধারা। শঙ্করাচার্যের ভাষ্য পাঠ করাচ্ছে, বোঝাচ্ছে অদ্বৈত বেদান্ত। মানুষ এবার জগতকে ডেকে বলছে ‘ ভো মনুষ্য – একমাত্র ব্রহ্মই সত্য এবং এ জগত মিথ্যা ও মায়াময়’। তাহলে মায়ার জন্যে আবার দুঃখ কি? ঠিক, ঠিক । কিন্তু কান্নার কী হবে তবে?
তত্ত্বজ্ঞানী বলবেন ‘যখন পার্থিব শরীর মিশে যাবে পঞ্চভূতে, শ্রাদ্ধাদি শেষ হবে, পৃথিবীর দড়ি ছিঁড়ে, গোধনের লেজ ধরে আত্মা হবে পগার পার – প্রকৃত মৃত্যু বলবে তাকেই’। হবেও বা। চার্বাক পন্থী বলবেন … এটা একটু পরে বলা যাবে। আপাতত দুখিরামের একটি সুবিনীত খটকা আছে।
ধরুন একজনের নিকটাত্মীয় – হয়ত পুত্র বা কন্যা – থাকেন দূর দেশ/ বিদেশে। ক্ষীণ যোগাযোগ বলতে মুঠোফোন। স্পর্শ নেই, জাদুই ঝপ্পির প্রশ্ন নেই, এমন কি চোখের দেখাও হয় না যার সঙ্গে – খবর এলো তিনি আর নেই। সেই ক্ষেত্রে সেই লোকান্তরিত ব্যক্তির আত্মা, মস্তিষ্ক, হৃৎস্পন্দন, রক্ত প্রবাহ কিম্বা নিঃশ্বাস বন্ধ হবার কোনো ঐহিক প্রভাব প্রবাসীর জীবনে আসা কি সম্ভব ? মাটির নিচে থাকলেন না উপরে ছাই হলেন তাতেই বা কি যায় আসে। তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যু শুধু একটি মানসিক অবস্থার পরিবর্তন, এক রকমের Switch Off । প্রকৃত পক্ষে সাত সাগরের পারে তার সেই স্বজন স্মৃতিতে ছিলেন, সেখানেই রইলেন । হয়ত সংবাদ পেয়ে কয়েক মিলিলিটার বাষ্প বিসর্জন হল। সে নেহাতই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। প্রথম ফুচকা জিভে লাগলে যেমন চিড়িক দিয়ে ঝাল লাগে, চোখ দিয়ে জল বেরোয়, দুমিনিট পরে আর ঝাল / জলের অস্তিত্ব থাকে না, তেমনি। ‘ নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখি জল’।
সেই আত্মজনের প্রকৃত মৃত্যু কবে হবে জানেন পাঠক? যে দিন এই স্মৃতির ইতি হবে । তবে ততদিনে অশ্রুর উৎসও শুকিয়ে গেছে। যে কান্নার সন্ধান পাঠক উল্লিখিত বইটির পাতায় পাতায় করছেন – তা আজ ‘এক নম্বর পরিমল নস্যের’ মতই দুর্লভ। আর একটু খুঁজে দেখা যাক।
বিদগ্ধ ব্যক্তির বাগধারা ছাড়া নিবন্ধের ওজন বাড়ে না, দুখিরাম বোকা হলেও এই চালাকিটা জানে। দু একটি পড়ে দেখা যাক।
“জন্ম যেমন সত্য, মৃত্যু তেমনই অনিবার্য। শুধু মাঝখানের সময়টাই আমাদের পরীক্ষা।”— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তা হলে তো অবস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনই হল না। নিরন্তর চলার পথে এক দুটো ষ্টেশন ছোঁয়া হল শুধু। আবার দেখা হবার সম্ভাবনা। অশ্রু বিসর্জন বাজে খরচ হবে।
“মৃত্যু কোনো শেষ নয়, এটি নতুন শুরুর দুয়ার।”— কাজী নজরুল ইসলাম।এই শুরুটায় তো আনন্দের আভাস। Endorphins আর Dopamine এর রাসায়নিক খেলা, cranial nerve এর কোনো ভূমিকা নেই।
“মৃত্যু কোনো শত্রু নয়, এটি আমাদের বিশ্রামের ঠিকানা।”— বুদ্ধদেব বসু। দেখা যাচ্ছে এনার অশেষ ভরসা মৃত্যুর উপর। নামের সঙ্গে মোকামের সামঞ্জস্য রেখেছেন।
“মৃত্যু মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়, অনেক সময় তা চিরকাল থেকে যাওয়ার অন্য রূপ।”— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এই তো,পাওয়া গেছে, আর ভার বাড়িয়ে লাভ নেই। এই চিরকালীন আকাঙ্ক্ষাই মৃত্যুর পর কান্নার প্রত্যাশা টেনে আনে।

মরে যাওয়া সহজ, কিন্তু কারো স্মৃতিতে বেঁচে থাকা কঠিন। আর চিরকাল? হতেই পারে তেমন টা। তবে তার আগে কাঁঠালের আমসত্ত্ব বিকোবে বাজারে। অনেক মহৎ কর্ম করলে লোক-চিন্তায় একটা গর্ত খোঁড়া যায়। তাতে জমে থাকে কীর্তি মুখর স্মৃতি-জল ছল ছল। কিন্তু কালের নিয়মে তাতে বিস্মৃতির পলি পড়ে, ফাঁক বুজে যায়। প্রচুর পণ্ডিত, রাষ্ট্র নায়ক, সাধক, শিল্পী, খেলোয়াড় প্রথমে বেঁচে থাকেন প্রবল ভাবে। ধীরে ধীরে জন্ম দিনে সঙ্কীর্ণ হয় স্মরণ, শনৈ শনৈ সামাজিক পট পরিবর্তনের আড়ালে নিমজ্জিত হন অতল অচেতনে। নকশাল আমলে কিছু প্রাতঃস্মরণীয়ের মূর্তির মুণ্ডপাত হয়েছিল। যারা সে সময় বেঁচে গেছলেন – আপাতত পাখিদের নিয়মিত কোষ্ঠ শুদ্ধির আশ্রয় হয়েছেন। জন্ম / মৃত্যু দিনে কেউ কেউ এখনও স্নান করেন , মালা পান। পঁচিশে বৈশাখে বঙ্কিম চন্দ্র মালা পেয়ে যান কখনও সখনও। কেউ বা থাকেন যথাবৎ। বরং দুর্নামের সময়সীমা কিছুটা দীর্ঘ।
ভুবন কুখ্যাত স্বৈরাচারী, কুম্ভিলক, ভ্রষ্ট নেতা,ধর্ষকের নাম তুলনা মূলক ভাবে বেশি দিন মানুষ মনে রাখেন। হেতাল পারেখের যন্ত্রণা ভোলা যায়, ফাঁসি যাওয়া লোকটির নাম ভুলি না। মুম্বাই তাজ হোটেলে গুলি চালানো সন্ত্রাসবাদীর নাম ও ধর্ম আমাদের বিলক্ষণ মনে থাকে, কিন্তু যে শান্তি রক্ষকরা প্রাণ দিলেন (অম্বাদাস পাওয়ার, অরুণ চিত্তে, বিজয় খন্দেকর, প্রকাশ মোরে, গজেন্দ্র সিং, শশাঙ্ক শিন্ডে, তুকারাম ওম্বলে, উন্নিকৃষ্ণান, বিজয় সালাসকার, অশোক কামতে, হেমন্ত কারকারে) তাদের নাম ভুলে গেছে ভারতবর্ষ। ( মুম্বাই তাজ হোটেলে একটি দেওয়ালে রয়েছে মৃত মানুষের নামাবলী। আপনি স্তব্ধ হবেন সেই তালিকার দৈর্ঘ্য দেখলে।) মনের কি বিচিত্র গতি। এমন কি দফতরের খ্যাঁকানো উপরওয়ালা, প্রতিবেশীর অর্থ লোপাট করে পাড়ার পাট গোটানো ব্যাপারী, দজ্জাল পাড়া কুঁদুলে, হাড় কিপটে বুড়ো বা মহিলা দেখলেই ছুঁকছুঁক মাঝবয়সীর কথা চল্লিশ বছর পরেও জীবিতরা মনে করেন । অথচ বাড়ির পাশের বিখ্যাত গীতিকারের গান – তাঁর জীবৎকালেই – দ্বিজেন্দ্রলালের বলে চালিয়ে দেন ঘোষক। এই মৃত্যু উপত্যকা কারো দেশ হতে পারে না। তবে কান্না এখানেই জরুরি ।
দেবদাসের মৃত্যুর পরে লেখক দু ফোঁটা চোখের জল চেয়ে নিয়ে ছিলেন পাঠকের থেকে। তা পাঠক পাঠিকা একসময় বালতি ভরে দিয়েছে সেই উপহার । আজ শরৎ রচনাবলী সাজানো থাকে বটে ভবনে বা পাঠভবনে – তবে কেউ পড়েন, না কি তিনি একলা পোড়েন – সেটা অকল্পনীয় নয়। দু ফোঁটা চোখের জল আজ তাঁরই দরকার। তাহলে? আপনি কি এখন থেকে গ্লিসারিন কিনে আত্মীয় স্বজনকে দিয়ে যাবেন?
সম্প্রতি দুখিরামের ভাইঝি তাকে একটি সংক্ষেপণ শব্দ বন্ধ বলেছে। Gen G তে চলছে খুব ‘ YOLO’ । You Only Live Once. আপনি শুধু একবারের জন্যে থাকছেন স্যার। দুনিয়ার সংক্ষিপ্ততম সারাৎসার । চার্বাক সম্প্রদায় তো এমন কথাই বলেন।
যাবজ্জীবেৎ সুখং জীবেদ্ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ।
ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ।। ৫৫।।চার্বাক-ষষ্ঠি।
‘কে কাঁদবে আমার পর’ সেটা নিয়ে একটি বইয়ের দু কোটি বিক্রি হয়েছে, হয়ে চলেছে। যারা পড়ছেন কি জানতে চাইছেন তারা? এই জ্যোতিষ চর্চার কি বা প্রয়োজন? আপনি যদি আজ কারুর প্রয়াণে কাঁদছেন – একবার ভাববেন জীবিতাবস্থায় তাঁর খবর রেখে ছিলেন তো। জবাব ‘না’ হলে, সে ও আপনি দুজনেই – জীবিতই মৃত । আর যদি জবাব ‘হ্যাঁ’ তবে তার জন্যে কান্না অপ্রয়োজনীয়। দেখা তো হবেই। বরং যোগাযোগ বাড়ান, খবর রাখুন অন্যের, চওড়া করে হাসুন দেখা হলে। কারু ক্ষতি না করে যত রকমের পার্থিব ইচ্ছে পূরণ করা সম্ভব – করে নিন। যে জীবনটা রয়েছে করতলে তার আনন্দসুধা নিংড়ে নেওয়া যাক এখন। আমার পরে – ভস্মীভূত দেহ কিম্বা বাস্পীভূত অশ্রুরাশি – যা হবার তা হবে।


সাধারণ মেয়ের যে বড় দুঃখ দুখিরাম অসাধারণ কিছু ভালো লাগা প্রকাশের ভাষা যে তার অজানা।