
দয়েহাটা( বড়বাজার) থেকে গোলদিঘি। একটা ন’বছরের ছেলের পক্ষে দুবেলার যাতায়াতে পথটা নিছক কম ছিল না! অথচ আড়াই দশক পরে মাথাব্যাথার কারণ হল অন্য এক অনপনেয় দূরত্ব! এই দূরত্ব যেন শৈশবের সে দূরত্বের কয়েক শো গুণ বেশি! ধুতি ততদিনে অনেক বড় হয়েছে। আলগা গায়ের বদলে গায়ে উঠে এসেছে চাদর। ছাত্র নয়, তিনি এখন এই কলেজেরই অধ্যক্ষ। কিন্তু গোলদিঘি পারের এই কলেজ আর কয়েক গজ দূরের হিন্দু কলেজের দূরত্ব যেন কিছুতেই ঘুচবার নয়। অচলায়তনের শ্যাওলা সর্বাঙ্গে জড়িয়ে বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে যাবতীয় প্রাচীনতা! এই কলেজে পড়ার অধিকার নিয়ে জাতপাত! চলনে, শৃঙ্খলায় মধ্যযুগীয় ঢিলেমি! আর পাঠক্রমে প্রাচীনতার ছড়ানো শিকড়ের অনন্ত দায়ভাগ! বাধা অনেক কিছুই। এই অচলায়তনে তিনি কীভাবে আনবেন ঈপ্সিত আধুনিকতা আর গতি? এই চিন্তাই প্রতি মুহূর্তে যেন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।

আধুনিক চিন্তায়, প্রশাসনের প্রকরণে, পাঠক্রমের সংস্কারে হিন্দু কলেজ গোলদিঘির থেকে এগিয়ে অনেক! অনেক। প্রতিস্পর্ধায়, সমান্তরাল লড়াইয়ে তিনি যে একা! অধ্যক্ষ হয়ে তাই দৈনন্দিন শৃঙ্খলা থেকে পাঠক্রম সংস্কার, সবকিছুতেই নিশ্চিত করলেন পাথুরে নিশ্চলতার ভাঙচুর! আর বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যেই গোলদিঘির এই সংস্কৃত কলেজ পরিদর্শনে এলেন কাশীর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ব্যালেন্টাইন সাহেব। সব দেখে শুনে রিপোর্টে লিখলেন, এই কলেজে এখনই আইরিশ দার্শনিক বিশপ বার্কলের দর্শন পাঠ্য হওয়া উচিত। চাদরের অন্তরালে ঢাকা থাকে তাঁর মরমি হৃদয়।আর জনসমক্ষে উন্মুক্ত করে ফেলেন শানিত যুক্তি আর তীক্ষ্ণ বোধি! কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে সেই রিপোর্টের উপর নির্দ্বিধায় নোট দিলেন, এই সংস্কৃত কলেজে বার্কলে পড়িয়ে কোন লাভ নেই। ওতে লাভের থেকে ক্ষতি বেশি হবে। ঐ সাবজেক্টিভ আইডিয়ালিজম- এর কথা ভারতবর্ষ নিজেই অনেক বলেছে। ‘জগৎ মিথ্যা, চেতনাই সত্যি’– এই বিষয়ে পশ্চিমি দর্শনের থেকে ভারতীয়দের নতুন করে শেখার কিছু নেই। বেদান্ত ও সাংখ্য যে ভ্রান্ত দর্শন তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ঐ দুই দর্শনের উপর এখনও ভারতীয়দের অপরিসীম শ্রদ্ধা। তাই সংস্কৃত কলেজের সিলেবাসে ঐ দুই দর্শনকে ব্রাত্য করার সময় এখনও আসেনি! বার্কলেতো ঐ একই কথা বলবেন। নতুন আর কী জানাবেন ছাত্রদের? বরং সাংখ্য আর বেদান্তর পাশাপাশি পড়ানো হোক যথার্থ পশ্চিমি দর্শন। এতে ছাত্ররা তুলনামূলক পাঠে ছুঁয়ে দেখুক দর্শনের প্রকৃত নির্যাস। তারপরের নির্বাচন তাদের হাতে। তাঁর অমোঘ যুক্তি। ধুতি-চাদর-তালপাতার চটি, এই প্রাচীনতার আড়ালে কী অটল এক আধুনিক মন! আধুনিক এই কারণে নয়, যে তিনি বেদান্ত ও সাংখ্যকে ভ্রান্ত ভাবতেন। আধুনিক এই কারণে যে শিক্ষায় গণতান্ত্রিক পরিসর নিয়ে তাঁর দৃষ্টি ছিল মুক্ত। দুটো বিপরীত প্রবাহ পাশাপাশি বয়ে চলুক, চেয়েছিলেন। চাইলেন গ্রহণ-বর্জনের সিদ্ধান্তটা কোনো ইন্টেলেকচুয়াল রেজিমেন্টেশনের অনুসারী না হয়ে উঠে আসুক নিজস্ব বিচারবোধ থেকে। তাঁর বলতে কোথাও আটকাল না যে, ব্যাকরণ হিসেবে ‘মুগ্ধবোধ’ পড়া একটা পণ্ডশ্রম মাত্র। বাঙালি ছাত্র সংস্কৃত ব্যাকরণ শিখুক বাংলালিপিতে। সংস্কৃত গদ্য ও কাব্য পাঠ করে সাহিত্যবোধের আনন্দ নিক সবার আগে। পরে পড়ুক ‘সিদ্ধান্ত কৌমুদী’।

বলে চললেন, ভাস্করাচর্যের ” লীলাবতী” ও ” বীজগণিত ” চারবছর ধরে ছাত্ররা পড়ে বটে। তবে শেখেনা কিছুই। বই দুটো অনাবশ্যক জটিল! পরিবেশনাও বিজ্ঞানসম্মত নয়। আগে ইংরেজি থেকে ভাল “পাটিগণিত”, “বীজগণিত”, “জ্যামিতি”-র বই অনুবাদ করা হোক। সেগুলো পড়ার পর ছাত্ররা পড়ুক “লীলাবতী”। ‘পেনাল কোড’ আসতে তখনো প্রায় এক দশক বাকি। সিভিল ও ক্রিমিনাল ল’ হিসেবে “মিতক্ষরা”ই ছিল সহায়। সম্পূর্ণ মানুষ তৈরির লক্ষ্যে সেটা পড়া দরকার। ‘মনুসংহিতা’ও পড়তে হবে বৈ কী! এটাই প্রাচীন ভারতের নৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক আচরণের মানদণ্ডের নির্ণায়ক যে! ভাবলেন এমনটাই! শিক্ষার্থীর গ্রহণ-বর্জনের বিবেচনা আসুক পড়ার পর। নাহ্! কোথাও ইন্টেলেকচুয়াল রেজিমেন্টেশনের দাসত্ব নেই! কোন ধোঁয়াশা নেই! স্পষ্ট ও নির্ভীক উচ্চারণ ! মুক্ত বুদ্ধি, স্বাধীন বিবেকে যা ভেবেছেন, নির্দ্বিধায় বলেছেন। একবারও আমাদের মনে হয়, সংস্কৃত কলেজের এই শিক্ষার লক্ষ্য ছিল শাস্ত্রকার তৈরি? অথবা পুরোহিত বা টুলো পণ্ডিত? অথবা সওদাগরি অফিসের দাস? মনে হয় এমনটা? মনে হয় না “হিউম্যানিজম” ছিল এই পাঠক্রম তৈরির মূল প্রেষণা? মানবিক মানুষই তার লক্ষ্য ছিল। মনে হয় না এমনটা? সময় বদলেছিল। উৎপাদন ব্যবস্থার বিবর্তন নতুন সংজ্ঞায় লিখছিল মানুষে-মানুষে সম্পর্ক! সেই পরিবর্তন ধরতে পেরেছিলেন তিনি মরমি হৃদয় দিয়ে। নারীশিক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখেছেন। বিধবাদের হাসিমুখ দেখতে গণপ্রবাহের বিপরীতে একা হয়ে গেছেন। তবু প্রতিক্রিয়াশীলতার বদনাম পিছু ছাড়েনি তাঁকে। ভূলুণ্ঠিত হয়েছেন তিনি। ভূলুণ্ঠিত হয়েছেন নতুন যুগে, আবারও! কখনো অপরিণত খোয়াবপ্রেমী বিপ্লবীদের হাতে! কখনো আাধিপত্যবাদী ধর্মসঙ্ঘ বা বিবেকহীন, বিচারহীন, সংস্কৃতিহীন উন্মত্ত ভোটভিক্ষু পশুদের হাতে! এই দুই মেরু-বিপরীত অসহিষ্ণুতার হাতেই সবচেয়ে বিপন্ন আজ বোধের গণতান্ত্রিক পরিসরটুকু! মেরু পরিচয় যাই হোক, কোনো একমাত্রিক বৌদ্ধিক আধিপত্যবাদই অন্য মত সহ্য করতে পারে না যে! ভাবলে অবাক হতে হয়, গোটা সমাজের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে বিধবা বিবাহ চালু করার কথা বলতে কী দুঃসাহস লাগে! ১৮৫০-এর ধারে কাছে দাঁড়িয়ে বেদান্তকে ভ্রান্ত দর্শন বলতে বোধহয় তার থেকে অনেক বেশি দুঃসাহস লাগে! অনেকে বলেন ১৮৬৪ এর দুর্ভিক্ষের পরই প্র্যাগমেটিক আউটলুক মানুষটাকে অজ্ঞেয়বাদী করেছিল। আসলে এটাও তাঁর বৌদ্ধিক সত্তাকে ছোট করে দেখার একটা চেষ্টা। যেন তিনি দর্শন কিছুই বুঝতেন না! আসলে নাস্তিকতার কাছাকাছি তাঁর অজ্ঞেয়বাদও উঠে এসেছিল দার্শনিক বোধ ও যুক্তিবাদী মনন থেকে। ঈশ্বর লাখ লাখ লোককে দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচাতে পারলেন না। তবেই ঈশ্বরচন্দ্রের ঈশ্বর বিশ্বাস উবে গেল, এটাও অবমাননাকর প্রচার!

তাঁর যুক্তিবাদী চিন্তার এই ধারাটা বাঙালি নিল না শেষপর্যন্ত! তার একটা কারণ হতে পারে, তিন দশকের মধ্যেই বিবেকানন্দ বেদান্তকে ওভাবে গৌরবান্বিত করেছিলেন! বিবেকানন্দ – ঝড়ে বিদ্যাসাগরের যুক্তিবাদী মননের ধারাটাই হয়তো সমাজমানসে কিছুটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। নতুন কিছু নয়। চিরকালই ধর্মশাস্ত্রের বিপরীতে যুক্তিবাদ ও মননের কঠিন লড়াই এটা। ঠিক এই জায়গাটাতে বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত মানুষের মধ্যে গাদা গাদা স্ববিরোধিতা। একথা অস্বীকার করা যায় না। দুটো বিপরীত ধারাকে সমন্বয় করার চেষ্টা করেই চলে আমাদের বৌদ্ধিকতার গোঁজামিলে ভরা সংসার। তবু ঐ দুই ধারার সবটকু গ্রহণ করতে পারুক আর না পারুক বাঙালি এঁদের অবিমিশ্র শ্রদ্ধায় প্রণাম জানিয়েই আসছিল! কিন্তু অতি সাম্প্রতিকের এই বৌদ্ধিক দাসত্বের যুগে তাঁকে প্রণাম করারও যোগ্যতা বোধহয় হারিয়েছি আমরা! এখন সাম্প্রতিকের একটা অপরাধের সমাজ-অনুমোদনের জন্য, বৌদ্ধিক অনুমোদন দিয়ে জাস্টিফাই করার জন্য তাঁর চরিত্রেও কালিমা লেপন করতে আটকাচ্ছে না আমাদের!
ক্ষমা চাইবারও বোধহয় যোগ্যতা লাগে।


“আমাদের এই অপমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন অখণ্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল আমরা বলিতে পারি না৷ কাকের বাসায় কোকিলে ডিম পাড়িয়া যায়– মানব–ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন৷’’ – রবীন্দ্রনাথের এই উক্তি বোধহয় বিদ্যাসাগর সম্পর্কে শেষ কথা।
নির্ভীক ও স্পষ্ট উচ্চারণ। সাবলীল ভাষায় তিনি বিশ্লেষণ করলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে। তিনি প্রণম্য। যাঁরা তা বোঝে না, তাঁদের বোঝার দায়ও নেই। এই অসাধারণ লেখাটির জন্য লেখককে জানাই অশেষ ধন্যবাদ।