
(১)
কে যায়
তিনি হেঁটে চলেছেন।
দৃপ্ত পদক্ষেপ।
ইস্পাতের মতো দৃঢ় শিরদাঁড়া, সোজা।
মাথা উঁচু। সূর্যের দিকে হেঁটে যাওয়া
দীর্ঘতম বৃক্ষের মতো।
পায়ে শুঁড়তোলা চটি, পরণে ধুতি, গায়ে উড়নি।
তিনি হেঁটে চলেছেন যেন একটা জাতির আত্মা
সশরীরে হেঁটে চলেছে।
দিনের পরে দিন, মাসের পরে মাস,
মাস গড়িয়ে যায় বছরে, বছর দশকে,
দশক গড়িয়ে যায় শতকে, শতক দ্বিশতকে ।
তিনি হেঁটে চলেছেন, একাকী, নিঃসঙ্গ;
পেরিয়ে যাচ্ছেন ছোটো ছোটো পচে ওঠা
ডোবাগুলির দিকে ঝুঁকে পড়া বর্ণহীন গ্ৰামগুলি,
গ্ৰীষ্মকালে ধারালো বাঁশের পাতার
জঞ্জালভরা পথগুলি –
বর্ষায় পথ গিলে ফেলে নদী,
তিনি অকুতোভয় তার ওপর পা রাখেন,
শরতে শিউলির চেয়েও শুভ্র বাতাস বুকে টেনে
তিনি হেঁটে চলেছেন;
শীতে কুয়াশার মতো দুঃখকে গায়ে জড়িয়ে
তিনি হেঁটে চলেছেন;
যেখানে পথ বলতে কিছুই ছিল না,
তিনি হাঁটতে হাঁটতেই
পথ করে নিয়েছেন সেইখানে,
সে সব এখন বাড়তে বাড়তে রাজপথ, বর্ণময়,
সারি সারি গাড়ি, ঝাঁ চকচকে, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত,
তারা আমাদের নিয়ে চলে যায়,
আমরা আর হাঁটি না, হাঁটতে হয় না,
আর, গাড়িতে যেতে যেতে দেখি
সেই তিনি সামনে হেঁটে চলেছেন,
আমরা যতই দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে যাই
তিনি ততোধিক দ্রুততায়
আমাদের পিছনে ফেলে এগিয়ে যান,
কিছুতেই ধরতে পারি না তাঁকে,
তারপরে একসময় দেখি
আমাদের সামনে সারি সারি পাহাড়ের দুর্লঙ্ঘতা;
পাহাড়ের ওপর আলো আর অন্ধকার, আর
তিনি অনায়াসে পেরিয়ে যাচ্ছেন সে সব,
ক্রমশ আমাদের দৃষ্টির অতীতে,
আমাদের গম্যতার ওপারে।
তিনি হেঁটে চলেছেন।
আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে,
পৌঁছে যাচ্ছেন সেই দেশে যেখানে, শোনা কথা,
আদিম দেবতাদের বাসভূমি।
আমরা আর আমাদের পরবর্তী বংশধরেরা
আমাদের পিতামহদের মতই স্মৃতিকাতর হয়ে
বলাবলি করব :
এই পথে একদিন ঈশ্বর হেঁটে গেছেন।
আর, আমরাই সেই সবুজ ছায়াঘেরা পথকে
আমাদের মতো করে বাড়াতে বাড়াতে
এ্যাসফল্টের নিকষ কালোর দিকে
গড়িয়ে দিয়েছি,
পাহাড়গুলিকে দিয়েছি গুঁড়িয়ে, আর
সবুজ ভুট্টাক্ষেতের ওপর কংক্রীটের স্তূপ দিয়ে
বানিয়ে দিয়েছি আদিম দেবতাদের সমাধিফলক।
তখনও তিনি হেঁটে চলেছেন
সকলকে পিছনে ফেলে ঈশ্বরের নিজের পথে,
এক অন্তহীন পথ, যা সতত প্রসরমান।
তিনি হেঁটে চলেছেন।

(২)
ঈশ্বরের মর্মর মস্তক
তাঁর মর্মর মস্তক খণ্ডটি স্বপ্নের ভিতরে
আমার পায়ে এসে ঠেকল,
চমকে উঠলাম,
শিরশির করে উঠলো সমস্ত শরীর,
ওপরে দেখি, ছিন্নমুণ্ড দেহটিতে
শুকনো রক্তের মতো কালো রেখাগুলি
ঝুলে রয়েছে তখনও।
পোড়া বই আর বারুদের গন্ধ
এখনও গাছের পাতায় পাতায়,
পাশেই জ্যোছনার আতর গায়ে মেখে
মায়াবী দিঘি যথারীতি ফাঁদ পেতে,
সেখানে একঝাঁক তারারা আটকে পড়ে
হাঁসফাঁস করছে –
এই তো সেই কলেজ স্কোয়ার,
উত্তরে এখনও ভূতের মতো দাঁড়িয়ে
কফি হাউস, ইন্টেলেকচুয়াল ভূত!
আর ঠিক তখনই ক্য, ক্য, ক্য …
দেখি একটা কাক মুণ্ডহীন ধরের ওপর –
ভাঙা মূর্তির কাঁধে একটা মলিন চটি বই,
দেখে মনে হল বর্ণপরিচয়ের প্রথম সংস্করণ!
কাকটা একটানা সুরে দুলে দুলে পড়ছে ক্য, ক্য, ক্য…
আর নীচের মস্তক খণ্ডটি ক্রমাগত বলে চলেছে
ক্য নয়, ক্য নয়, ঐ ক-এ-য-ফলা, ঐক্য, ঐক্য।
কাকটা সেই ক্য, ক্য, ক্য …

আর তখনি ভেসে এল এক অতিপ্রাকৃত কণ্ঠস্বর:
‘ঈশ্বর, এ যে সেই ত্রিকালজ্ঞ শ্রীভূশণ্ডি,
সম্রাট কণিষ্কের কাঁধে বসেও
একই ভাবে ডেকেছে,
এমন কি স্বয়ং পাণিনিও ওকে
শুদ্ধ উচ্চারণ শেখাতে পারেন নি,
তা, তুমি তো কোন ছার।
আসলে জম্বুদ্বীপেই ওই শব্দটা কবেই মরে ভূত,
মমির মতো অন্ধকারকে পাশে নিয়ে
ঘুমিয়ে আছে অভিধানে।
এই কাক যে ত্রিকালজ্ঞ,
তাই উচ্চারণ করে না।
ঈশ্বর, এবার বলো আর কতদিন,
আর কতদিন অপেক্ষা করবে,
পড়ে থাকবে এই ভগ্নস্তূপের ওপর,
এই ভগ্নদশা নিয়ে?
মূর্তি ওরা ভেঙেছে,
আমরা হেসেছি ওই মূর্খদের কাজে,
কিন্তু, তোমার প্রেস- তোমার স্বপ্ন,
তোমার তিল তিল করে গড়ে তোলা
সর্বজনীন শিক্ষার বুনিয়াদ –
সারা দেশ জুড়ে গড়ে তোলা বিদ্যালয়গুলি,
সব ভেঙে পড়ছে এক অব্যক্ত কান্নার ভিতরে,
কীসের জন্য আর স্মৃতিকাতরতা?
ঈশ্বর, এবার সময় হয়েছে চলো।”

“তুমি ঠিকই বলেছ অক্ষয়, আর নয়,
এবার সত্যি হয়েছে যাবার সময়।”
অতিলৌকিক কণ্ঠে ঈশ্বরের শান্ত প্রত্যুত্তর।
দেখতে দেখতে ভাঙা মূর্তিটি
ছায়া ছায়া আরেকটি মূর্তির হাত ধরে
দূরে, আরো দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে,
দিগন্তের ওপারে,
ধ্বনিগুলির ওপারে,
কোনো এক অমানুষী নৈঃশব্দের দেশে।
দুটি ছায়া একাকার, অভিন্ন হয়ে উঠল;
অক্ষয় ঈশ্বর, ঈশ্বর অক্ষয়!
স্বপ্ন ভেঙে যেতে যেতেও আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে
জেগে রইল একটা মস্তকহীন মর্মর মূর্তি
যার মাথা স্বপ্নেই মিলিয়ে গেছে,
আর সেই ভগ্নমূর্তি অসংখ্য হয়ে
মিশে যাচ্ছে দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা
শতাব্দী প্রাচীন বিদ্যালয়গুলির জীর্ণ শরীরে।
বাইরে তখন মেঘের আঁধারে হারিয়ে যাচ্ছিল আলো,
যেন সকাল ফিরে যাচ্ছে রাতের গভীরে,
বৃষ্টি পড়ছে, কান্নার মতো বৃষ্টি,
আকাশের চাপা মেঘ গর্জনে
কী একটা অজানা বেদনা,
হাহাকার উঠছে মনে,
আর, চোখের মণি গলতে গলতে
বর্ষার বৃষ্টিধারা
একাকার হয়ে যাচ্ছে
শরতের আনন্দভৈরবী
সেই অবিরাম ক্রন্দনে।

অক্ষয়কুমার দত্ত (জন্ম: ১৫ জুলাই,১৮২০, মৃত্যু: ১৮ মে, ১৮৮৬) এবং ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর (জন্ম: ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮২০, মৃত্যু: ২৯ জুলাই, ১৮৯১) সমবয়সী এই ব্যতিক্রমী দুই প্রতিভার নাম সমকালে একই সঙ্গে উচ্চারিত হত, স্বতন্ত্রভাবে নয়, যেমন সাধারণে, তেমনি বিদ্বৎসমাজে।
দ্র : স্বপন বসু ‘সংবাদ -সাময়িকপত্রে বিদ্যাসাগর (১৮৫১- ১৮৯৩)’ আকাদেমি পত্রিকা, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ষষ্ঠ সংখ্যা, বৈশাখ, ১৪০১।


অসাধারণ ! দুটি কবিতার দুরকম ব্যঞ্জনা !বঙ্গ সমাজে তাঁর চিন্তাধারা যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল তার অভিঘাত সইতে হয়েছিল একাকী মানুষটিকে। মনে হয় সেই ঋজু দেহটি যেন আজও হেঁটে চলেছেন অক্লান্ত ! আর বাংলা ভাষার বর্ন পরিচয় তো ওনার হাত ধরেই ! তবু তাঁকেও কত আঘাত সইতে হয় ! হ্যাঁ ঈশ্বর, ক্ষমা করুন আমাদের মত অর্বাচীন দের !
অনবদ্য রচনা । ঈশ্বরচন্দ্রের দেখানো পথে চলতে গিয়ে যখন হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছি , ঠিক তখনই এমন লেখা আবার উঠে দাঁড়িয়ে নতুন উদ্যমেএগিয়ে যাওয়ার ডাক দেয় ।