
প্রকৃতির নিরিখে হিমাচল প্রদেশ এক সর্বাঙ্গসুন্দর রাজ্য। এক অমোঘ টানে ভ্রমণপিপাসু মানুষ বারবার ছুঁতে চায় দুর্গম পাহাড়ী বাঁক, অবিশ্রান্ত ছুটে চলা নদী, গভীর গোপন পর্বতের ছায়া। সেই মায়ার টানেই ছুটে গিয়েছিলাম স্পিতি ভ্যালি।
সেখানকার এক অদ্ভুত জায়গার কথা বলি আজ।
সিমলা থেকে কিন্নর হয়ে স্পিতি ভ্যালি যাওয়ার পথে এক বার দাঁড়াতেই হয় খাব সঙ্গমে, শতদ্রু আর স্পিতি নদী মিশেছে যেখানে। ন্যাশনাল হাইওয়ে ৫ এখানে শেষ হয়ে ৫০৫ হয়ে চলে যায় নাকোর দিকে।
নাকোতে মনেস্ট্রি, লেক, নাকো গ্রাম দেখার মতো। তবে সবচেয়ে সুন্দর নাকোর সামনের দৃশ্যপট। সুবিস্তৃত পাহাড়ের সারি, বরফে ঢাকা শৃঙ্গ, নীল আকাশে তুলোর মতো মেঘ! বলতেই হয় “আহা! কী দেখিলাম! জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না!”

নাকো থেকে টাবোর দিকে এগিয়ে গেলে, প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার পরে একটা রাস্তা মূল রাস্তা থেকে ডান দিকে ঢোকে। আমার শ্বাস রুদ্ধ হওয়ার শুরু সেখান থেকে। এই পথে আরও আট কিলোমিটার দূরে সেই বহুশ্রুত স্থান। গিউ মনেস্ট্রি।
ডান দিকে ঘুরে দুই/তিন কিমি যেতেই ঘড়ির সময় বদলে গেল। মোবাইলে সময় অটোসেট হয়ে গেল চীনের সময়ে। খুব কাছেই যে ভারত-চীন সীমান্ত!
রাস্তা সামান্য খারাপ, পাথুরে পাহাড় জনহীন। গা ছমছম করে ওঠে।
একটু পরেই সোনালি গেট চোখে পড়ল, আর একটা বাঁক ঘুরতেই লাল-হলুদ মনেস্ট্রি।
সাদাকালো প্রেক্ষাপটে এক ক্যানভাস রঙ যেন!

উজ্জ্বল রঙের এক মনেস্ট্রির পিছনে বরফে মোড়া ধূসর পাহাড়ের এক অসামান্য ছবি! কিন্তু আমার চোখ তো অন্য কিছু খুঁজছে! পেয়েও গেলাম সঙ্গে সঙ্গে। অত বড় জায়গাটার এক কোণে একটা ছোট্ট ঘর। চার হাত বাই চার হাত হবে। সেখানে কাচের বাক্সে রয়েছেন তিনি। সাঙ্ঘা তেনজিন। ভারতের একমাত্র সাধক, যিনি নিজের ইচ্ছেয় এবং সাধনায় মমি হয়েছেন।
সোকুশিনবুতসু।
জানা গেছে জাপানে তিরিশ জন বৌদ্ধ সাধক ছিলেন যাঁরা স্বেচ্ছায় জীবন্ত মমি হয়েছেন। এঁদের মধ্যে একুশ জনের মমি এখনো সুসংরক্ষিত আছে। এক অসম্ভব তপস্যা আর খাদ্যাভাসের দ্বারা নিজেকে ওই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াই সোকুশিনবুতসু।
নিজেকে মমি করার কারণ কিন্তু সবসময়ই জনহিতকর ছিল।
শোনা যায়, হিমাচল প্রদেশের গিউ গ্রামে একবার বিছের মারাত্মক আক্রমণ হয়েছিল। গ্রামবাসী তথা জনপদকে সে আক্রমণ থেকে বাঁচাতে সাঙ্ঘা তেনজিন এই জীবনদায়ী সাধনা করেন। ১৯৭৫ সালে এক ভূমিকম্পের পর ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশের জওয়ানরা তাদের এক বাঙ্কার উদ্ধার করতে গিয়ে এই মমি উদ্ধার করে।

অনুগামীরা মনে করে সাঙ্ঘা তেনজিন এখনো বেঁচে আছেন। মনে করার কারণ অবশ্যই আছে। তা হল, এই মমির নখ এবং চুল নাকি এখনো বাড়ে। তাছাড়াও অদ্ভুত বিস্ময় হল এই মমি সন্ন্যাসীর দাঁত যা এখনো হুবহু একই আছে যেমন জীবন্ত অবস্থায় ছিল বলে মনে করা হয়।
কীভাবে সম্ভব এইভাবে নিজেকে মমি বানানো, তাও জীবন্ত অবস্থায়?
বিভিন্ন তথ্য জানাচ্ছে, ধ্যানের মাধ্যমে নিজের দেহে অক্সিজেনের প্রয়োজন ৬০ শতাংশ অবধি কমিয়ে ফেলা যায়।
আবার তাম্মো যোগের সাহায্যে ত্বকের তাপমাত্রা এতটাই বাড়িয়ে নেওয়া যায় যে সেটা শরীরকে শুকনো করে ফেলার জন্য যথেষ্ট।
আর খাদ্যাভাস তো আছেই। এই তপস্যায় খাদ্য বলতে গাছের ছাল, বাদাম – এইসব। বলা হয়, এই সামান্য খাবারের কারণে শরীরের ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রত্যাশিতভাবেই শুকিয়ে যেত, আর তার ফলে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণের থেকে বাঁচিয়ে রাখত।

সাঙ্ঘা তেনজিনকে নিয়ে বহুবিধ রিসার্চ হয়েছে। তাঁর শরীরে অত্যধিক মাত্রায় নাইট্রোজেনের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তিনি অপুষ্টিতে ভুগেছেন। মমি সংরক্ষণের জন্য কোন রাসায়নিক ব্যবহার না হওয়া, অপুষ্টি – এইসব উপরে উল্লিখিত আত্মসংযম আর বিভিন্ন ধ্যানের প্রক্রিয়াকেই প্রমাণ করে।
কার্বন ১৪ টেস্ট করে জানা গেছে সাঙ্ঘা তেনজিনের মমিফিকেশন হয় ১৪৭৫ সাল নাগাদ। অর্থাৎ আজকের দিনে এই মমির বয়স ৫৫০ বছর। খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে ছবিতে ওনার স্কালের ওপর কালো চুল চোখে পড়বে। কী অসম্ভব বিস্ময় জাগে মনে। তাহলে সত্যি কী উনি বেঁচে আছেন?
আর তাই কী ওনাদের “Living Buddha” বলা হয়?

