
[প্রাককথনঃ – এই লেখায় কোন শব্দ কী অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। এখানে বুদ্ধি, হৃদয়, মন, সংস্কার প্রভৃতি শব্দগুলি এসেছে। বুদ্ধি জিনিসটা হৃদয় ও মনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হলেও ধর্মে আলাদা। বুদ্ধি একাধারে মন ও হৃদয়ের ধারক। বুদ্ধি তার ব্যাপক কর্মকাণ্ডের জন্য একটা শক্তপোক্ত ভাঁড়ার রক্ষা করে। এই ভাঁড়ারটি হল স্মৃতি। এই স্মৃতি আমাদের মনের সংস্কার ও প্রকৃতি গঠন করে। বুদ্ধি যে অবস্থায় সহজাত ও অনৈচ্ছিকভাবেও স্মৃতির সংস্রবে নিত্য এসে পড়ে সেই অবস্থাটার নাম হল মন। মন স্বভাবতই স্মৃতির দ্বারা প্ররোচিত ও প্রতারিত। মন স্মৃতিতে এতটাই অভিভূত বর্তমান অবস্থাটা তার থাকেই না।
অন্যদিকে হৃদয়ের সঙ্গে স্মৃতির যোগ নেই, থাকলেও তা নিতান্তই ঐচ্ছিক। হৃদয় ক্রিয়াশীল একমাত্র বর্তমানে। হৃদয় হল বুদ্ধির সেই অবস্থা যা স্মৃতির আবেশমুক্ত।
স্মৃতির নিত্য প্রভাবে মনের মধ্যে যেসব আবিষ্ট ধারণা রচিত হয়েই চলে সেগুলির বিন্যাস ও সমন্বয়ে আমাদের অচেতন ও অবচেতন মনে যে অমোচনীয় ছায়া পড়ে চলে তাকে বলা যায় সংস্কার।]
ভাবনা করবার সামর্থ্যকে অনেকেই বিশেষ সামর্থ্য বলে বিবেচনা করেন। এই বিবেচনাটা শুধু এখনই করছেন এমন নয়, অতীতেও করতেন। অবশ্য, সাধারণ বিচার অনুযায়ী সেটা সু-ভাবনা হওয়া চাই। ব্যবহারিক প্রয়োগ অনুসারে মানুষ ভাবনাকে বরাবরই সু-ভাবনা বা কু-ভাবনা – এই দুই ভাগে ভাগ করে দেখে থাকে। প্রসঙ্গত, কু-ভাবনাকে অনভিপ্রেত এবং ক্ষেত্রবিশেষে মানসিক সামর্থ্যের, এমন-কি স্বাস্থ্যেরও, অভাব বলে মনে করা হয়। আমাদের এটা মানতে কোনোই অসুবিধে হবার কথা নয় যে, দুর্ভাবনায় (যা দুর্ভাবনার মতোই) থাকাটা কোনো কাজের কাজ নয়। কিন্তু, মনুষ্য সমাজে বাস করতে হলে, ধারাবাহিকভাবে কু-ভাবনা বা দুর্ভাবনা কোনোভাবে এড়াতে পারলেও, অন্তত মাঝে-মধ্যে সাময়িক দুর্ভাবনার পর্বটা এড়িয়ে চলাটা প্রায় একটা অসম্ভব ব্যাপার।
এখন বক্তব্য হল যে, সু-ভাবনাই বলি আর কু অথবা দুর্ভাবনাই বলি – সেগুলোর কোনোটার মধ্যেই আটকে থাকাটা যে কোনো কাজের কথা নয় সেটা প্রমাণ করা যায়। ভাবনা যেমনই হোক তার মধ্যে লাগাতার জড়িয়ে থাকলে মানুষ গভীর কিছু অর্জন করে উঠবার সুযোগ পায় না। তবে একটা কথাও খুব ঠিক যে, যে-কোনো রকমের ভাবনার বাতাবরণের মধ্যে থাকতে পারলে মানুষ অন্তত একটু সাময়িক আরামও পায়। সেটা সম্ভবত ভাবনার আশ্রয়ে পলায়ন বৃত্তির ক্ষণিক তোষণের সুযোগ পাওয়ার কারণেও হতে পারে। কেননা ভাবনার মধ্যে দিয়ে আর যাই পাওয়া যাক না কেন, একটা জিনিস অবশ্যই পাওয়া যায়। সেটা হল এই যে, এই মুহূর্তেই যদি আসন্ন কোনো জরুরি বিষয়ে সাড়া দেবার অনিবার্যতা দেখা দেয়, তাহলে সেই সাড়া দেওয়ার ব্যাপারটাকে সাময়িক মুলতুবি কিংবা বিলম্বিত করে দেওয়া যায় চলমান ভাবনার আশ্রয়েই। পলায়ন বৃত্তির প্রতি আনুকূল্যের জন্যও ভাবনা যে কখনও অজানিতে উপজীব্য হয়ে উঠতে পারে তার নিদর্শন সংসারে খুঁজে পাওয়া একেবারেই কঠিন নয়।

ভাবনার প্রসঙ্গে আপাতত এইটুকু বলে রাখা যায় যে, অন্তত ভাবনা দিয়ে মানুষ কখনই তার অন্তর্জীবনের নাগাল পেতে পারে না। এছাড়া, একটু ধ্যান দিলেই বোঝা যায় যে, সত্যে উপনীত হতে ভাবনা কখনই উপযুক্ত বাহন হয়ে উঠতে পারে না।
সামগ্রিক বিচারে একথা স্পষ্ট যে, প্রযুক্তির দুনিয়ায়, এবং, সামাজিক ও আর্থিক লেনদেনের দুনিয়ায় সু-ভাবনা রীতিমতো ফল প্রদান করে থাকে সচরাচর। এমন-কি কখনও কখনও কু-ভাবনা বা দুর্ভাবনা এবং তাদের থেকে ত্রাণ লাভের উপায় খুঁজতে খুঁজতেও যে ভাবনার উদয় হয় সেই ভাবনা প্রযুক্তি ও সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক সুফল ফলিয়ে তোলে। এমনি ভাবে বিষয়টা দেখতে পারলে দেখা যায় যে ব্যক্তি ও সামষ্টিক মানুষের বহির্জীবনে সু-ভাবনা তো বটেই, – এমন-কি কু-ভাবনা বা দুর্ভাবনারও, বিপুল ভূমিকা অস্বীকার করবার উপায় থাকে না।
আপাতত ভাবনার সু ও কু এইসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে দেখা যাক মূল ভাবনা জিনিসটাই বা কী! দুর্ভাবনাই হোক আর কু-ভাবনা বা সু-ভাবনাই হোক – সেগুলি তো ভাবনারই অঙ্গ।
ভাবনার কাজ হল খোঁজা এবং বোঝা, কিন্তু কি খোঁজা আর কি বোঝা? তা হল, এক জানা-বোঝার সাপেক্ষে অন্য এক জানাকে খোঁজা যা কোনো-না-কোনোওভাবে ইতিমধ্যেই মানুষের সামষ্টিক জানার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সেই জানার মধ্যে দিয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু একটা বুঝে ওঠা। এই জানা-বোঝা হতে পারে নিজেরই ইতিমধ্যে অন্যভাবে জানা-বোঝা হয়ে থাকা কিছুকেরও অন্যরকম করে জানা-বোঝা! একথা বলা যায় যে, ভাবনার বৈধতার ক্ষেত্র এই ধরনের জানা-বোঝার জগতের সীমানা ঘিরেই। বস্তুত, এই জানা-বোঝার জগত নিয়েই ধ্যানবঞ্চিত প্রায় সব মানুষেরই জীবন অতিবাহিত হয়। ভাবনার গঠনগত উপাদান ও চরিত্রের দৌলতেই ভাবনার দৌড় কখনও অজানার এলাকায় প্রবেশ অবধি গড়ায় না।
কেবল দুরূহ দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলিই যে অজানার জগতের মধ্যে পড়ে তাই নয়। আমি কে এবং কী, ব্যক্তির সঙ্গে আরেক ব্যক্তির সম্পর্কের স্বরূপটা কী, সত্য বস্তুটা কী, সময় কী – এইসমস্ত জিজ্ঞাসা মিটাতে হলে অনিবার্যভাবে অজানার জগতে উঁকি দেবার চেষ্টা করতেই হয় আমাদের। জানা জিনিসের উপর নির্ভর করে এইসব অজানাকে কখনই জানা যায় না। ভাবনা জিনিসটা ঘুরে-ফিরে জানা জিনিস দিয়েই ঠাসা। তবু অজানার নাগাল পাবার জন্য আমাদের যা সম্বল আছে তাই নিয়েই আমাদের মেহনত করতে হয়। সেই মেহনত করবার জন্য আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের যে একমাত্র সম্বল বা সরঞ্জাম তারই গালভরা নাম হল ভাবনা।

অজানার নাগাল পেতে নিজের অতীত থেকে জানা-বোঝা বিষয় এবং সব মানুষের সামষ্টিকভাবে জানা-বোঝা বিষয়গুলিকে অবলম্বন করে, অর্থাৎ কেবলই ভাবনাকে সম্বল করে আমাদের যাত্রা চলে। একথা মানতে হবে যে, যা জানা হয়ে গেছে তা পুরনোও হয়ে গেছে। অজানা যদি জানায় পরিণত হয় তাহলে সেই জানাটা জেনে যাওয়ার মুহূর্ত পরেই পুরনোর গোত্রভুক্ত হয়ে পড়ে। যে মুহূর্তে অজানাকে জানা হয়, যদি আদৌ জানা হয়, সেই মুহূর্তের জন্য সেই জানাটা চকিত রূপে নতুন, তার পরে আর নয়। সেইজন্য যেকোনো উদ্ঘাটনের মুহূর্তই নির্বিকল্পরূপে নতুনত্বময়। অন্যদিকে ভাবনার উপাদান আহরিত হয় সেই পুরনো সঞ্চয় থেকেই। যা পুরনো তা আমার, তোমার বা মানুষের সামষ্টিক জানা-বোঝার মধ্যেই বিধৃত – তার মধ্যে উদ্ঘাটনের ঝলসানি নেই। জানা-বোঝা হয়ে থাকা জিনিস নিয়ে ভাবনার কারবার বলে সেইসব জানা-বোঝা দিয়ে অজানায় ভরা অন্তর্জগতের সীমানায় পৌঁছাবার কোনো রাস্তা নেই।
এইখানে আরেকবার স্মরণ করে নেওয়া ভাল যে অন্তর্জগতের জানা-বোঝা নিয়েই – যা ভাবনার দ্বারা জেনে বুঝে ওঠার কোনো রাস্তা নেই – এখানে আলোচনার প্রয়াস করা হচ্ছে। সেইজন্য যাবতীয় প্রযুক্তিগত জানা-বোঝা এবং পরিমাপযোগ্য জানা-বোঝাকে এই আলোচনার পরিসীমার মধ্যে রাখা হচ্ছে না। কারণ প্রযুক্তিগত দুনিয়াকে, পরিমাপযোগ্য দুনিয়াকে নেহাত বুদ্ধির সহযোগেই ধারণার মধ্যে আনতে হয়। বুদ্ধির জগতটা জ্ঞান ও ভাবনার দ্বারা জানতে বুঝতে হয়। একথা দাবি করা সঙ্গত যে, বুদ্ধি দিয়ে জানতে বুঝতে পারা যায় যেসব জিনিস তার গোত্র এক, এবং, যেসব জিনিস জানতে বুঝতে বুদ্ধির অতীত কিছু লাগে তাদের গোত্র আরেক।

প্রযুক্তিগত দুনিয়ায় কোনো কিছুকে বুদ্ধি দিয়ে জানতে বুঝতে পারাটাই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু, অন্তর্জগতের ব্যাপার জানা বোঝার প্রশ্নে বুদ্ধির ভূমিকা মুখ্য নয়। কারণ, অন্তর্জগতের অনেকটাই অজানা আমাদের, অন্যদিকে বুদ্ধির জগতটা যা জানা যায়, তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। খেয়ালে রাখতে হবে যে বিজ্ঞানের নতুন কোনো মৌলিক উদ্ঘাটন যা ভবিষ্যতে প্রযুক্তির দুনিয়ায় কাজে লাগানো হয়, তাও প্রযুক্তিগত দুনিয়ার নিজস্ব উদ্ভাবন নয়। ঈশ্বর কী, সত্য কী, আমি কে ও কী, সত্য কি – অন্তর্জগতের এই পর্যায়ের সন্ধানের পথ বেয়েই কোনো একভাবে সেইসব উদ্ঘাটন ঘটে ওঠে। মনের কোনো এক অবস্থা যা জ্ঞান ও ভাবনা থেকে মুক্ত তেমন মুহূর্তেই উদ্ঘাটনের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে অকস্মাৎ। উদ্ঘাটন জিনিসটি অভূতপূর্ব ও অনাবিলভাবে নতুন বলে উদ্ঘাটন মুহূর্তে ঠিক কি ঘটে তা যুক্তির ভাষায় স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করে ওঠা যায় না। কারণ উদ্ঘাটনের মুহূর্তটি উপলব্ধির মুহূর্ত। উপলব্ধির অনুভূতিটা অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করে দেওয়া সম্ভব নয়।
সত্যের বিষয়ে, অর্থাৎ অন্তর্জগতের বিষয়ে, ভাবনাকে অবলম্বন করে – অর্থাৎ জ্ঞান ও বুদ্ধিকে অবলম্বন করে – যে ধরনের জেনে ওঠা সম্ভবপর হয় সেই জানাটা বস্তুত বহিরঙ্গের জানা। সেই জানা হল বুদ্ধিবৃত্তিক (ইন্টেলেকচুয়েল) জানা। এইজন্য বুদ্ধিবৃত্তির জানার দৌড়টা ভাবনার জগতেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেই জানা হৃদয়মন সকল সত্তায় সঞ্চারিত হতে পারে না। এমন তো কতই দেখা যায় যে, দুঃখী মানুষের দুঃখের কালে তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এমন মানুষ যিনি দুঃখীর দুঃখটাকে বুদ্ধিবৃত্তির সহযোগে আঁচ করেছেন। তাঁর সেই আঁচের উপর নির্ভর করে নিজস্ব ভাবনার বাহন তাঁর আয়ত্ত করা শব্দময় ভাষা দিয়ে তিনি দুঃখীকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেন। অধিকাংশ সময়ই দেখা যায় যে, সেই সান্ত্বনায় ব্যবহৃত ভাষা বড্ড শব্দময় এবং অনুভবের দিক থেকে বেশ ওপর-ওপর!
এমনটি হওয়ার একটিই কারণ। দুঃখীর অবস্থাটা তিনি বুঝেছিলেন তাঁর নিজের বুদ্ধি ও ভাবনা দিয়ে। দুঃখীর স্থানে নিজেকে যদি অনায়াসে বসাতে পারতেন তাহলে হয়তো তিনি দুঃখীর পরিস্থিতির সম্যক উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারতেন। তখন তাঁর সান্ত্বনার ধরন ও ভাষা সম্ভবত আমূল অন্যরকম হত। অন্যের অবস্থানে বুদ্ধি দিয়ে, কি ভাবনা দিয়ে নিজেকে কি বসানো যায়? যেটুকু যায় সেটুকু দিয়ে পরিস্থিতির কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক বোঝাপড়াটুকুই শুধু সম্ভব! অন্তর্জগতের যে বোঝাপড়া বুদ্ধিবৃত্তিক পথে ঘটে তাকে কোনো বোঝাপড়া বলাই যাবে না। সেই বোঝাপড়া বাইরের দিককার ব্যাপার। সেই নিয়ে ভাবনার কিছু কসরত চালিয়ে যাওয়া যায়। সেই ধরনের বোঝাপড়ার ফল হিসেবে অনুপযুক্ত শব্দ ব্যবহারের তোড় আসতে পারে, ঝরে পড়তে পারে অনাবশ্যক জ্ঞান ও উপদেশ বর্ষণের ধারা।
তাহলে কি শুধু বুদ্ধি আর ভাবনা সম্বল করে দুঃখীর দুঃখকে, বা কোনো অবিকারী সত্যকে সম্যকভাবে বুঝে ওঠার কোনো রাস্তা নেই? সম্ভবত নেই – যদি-না বুদ্ধি ও ভাবনার অতিরিক্ত কোনো সম্বল আমাদের না থেকে থাকে। পাঠকবৃন্দ সম্ভবত এইখানে এসে ভাবছেন বোধহয় এবার হৃদয়ানুভূতি, দয়ালু মন ইত্যাদির প্রসঙ্গ এসে পড়বে। এই নিয়ে আমাদের সংক্ষিপ্ত উত্তরঃ – না।

হৃদয় ও মনও ব্যাপক-অর্থে ভাবনা থেকেই উপজাত। সেজন্য ভাবনার যেসব সীমাবদ্ধতা আছে সেগুলি হৃদয় মনেও অবধারিতভাবে বর্তে যায়। একজন মানুষ পলে পলে তাঁর সংস্কারময় শিক্ষার হাত ধরেই ভাবনা করতে শেখেন। পারিপার্শ্বিকতা থেকে ঘুমে জাগরণে শিক্ষা নিয়ে তাঁর ভাবনার উপকরণ ও ধরন তৈরি হয়ে চলে। ভাবনা কখনও স্বয়ম্ভূ নয়, ভাবনার রসদ হাত-ফেরতা পথেই জোটে – ইংরেজিতে যাকে সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেট বলে সেখান থেকেই যাবতীয় ভাবনার জোগান এসে থাকে। ভাবনা তিলে তিলে একটা শিখে ওঠা জিনিস, কেউই ভাবনা নিয়ে জন্মায় না। এজন্য ভাবনা কখনই নিজস্ব নয়। ভাবনাকে নিজের বলে ভুল আমরা অনেকেই করি। ভাবনা জিনিসটা শুধু যে নিজস্ব নয় তাই নয়, ভাবনার চলনবলনও কার্যত গভীরভাবে সংস্কারায়িত এবং একভাবে বিশ্বায়িত!
এই সংস্কার নিছক বাইরের দিক থেকে হিন্দু মুসলমান ক্রিশ্চান পারসিক জাতীয় সংস্কার নয়, এই সংস্কার জীবনের মূলে প্রোথিত। এই সংস্কারের প্রকাশ পরিলক্ষিত হয় ব্যক্তি মানুষের দেখবার বিশেষ ধরনে, ভাববার বিশেষ ধরনে এবং জীবনযাপনের পলে পলে ছোটোখাটো পদক্ষেপেও। এমন গভীর সংস্কার আত্তিকরণ করার পর দেখা শুরু হলে যা আছে তা না দেখে মন যা চাইছে তাই দেখে যেতে হয়। এমন সংস্কারের উপস্থিতি দেখাকে আবিষ্ট ও বিকৃত না করেই পারে না। তার প্রভাব থেকে ছাড় পেলে একমাত্র তখনই দেখা, শোনা, ভাবনা প্রভৃতি প্রকৃতপ্রস্তাবে আবেশমুক্ত হয়। এই সংস্কারমুক্তির অভাবে সংসার জুড়ে কেবলই নানা বিভেদপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দৌরাত্ম চলতে থাকে, সংঘর্ষপূর্ণ মতবাদের হট্টগোল চলতে থাকে আর তর্কে-বিতর্কে ঘুরপাক খাওয়া অনর্গল কথার ফেনা উঠতে থাকে।
এই সংস্কারের বেষ্টনীর মধ্যে থেকেও আমরা যতই মনে করি-না কেন যে আমরা বাস্তব জগতেই আছি কিন্তু বস্তুত সেখানে আমরা থাকি না। থাকি নিজ নিজ সংস্কার দিয়ে তৈরি মন-গড়া এক-একটা কল্পজগতে এবং পৃথিবীতে ষাট সত্তর আশি বছর কাটিয়ে সেই কল্পজগত থেকেই লোকান্তরিত হই। ভাগ্যের কথা যে, এক-একটা কল্পজগতে কেবল একজনই বাস করেন না, এক-এক ব্যক্তির ধরন অনুযায়ী তাঁর নিজের পক্ষে উপযোগী কোনো একটা কল্পজগতে ভিড়ে যান তিনি, এবং, সেখানে ভিড়ে তাঁর সংস্কার অনুসারে নির্দ্বিধায় তাঁর মতো করে অবাধ অনুশীলন, ভাবন, মনন জাতীয় কর্মগুলি চালিয়ে যান। এত করেন তবু ভাবনার অতিরিক্ত কোনো সম্পদের সন্ধান না পেয়ে অন্তর্জগতে প্রবেশের কোনো পথই খুঁজে পান না অগত্যা।
যেকোনো সংস্কারের মধ্যেই, সে সুসংস্কারই হোক আর কুসংস্কার, ভাবনা জিনিসটা গিজ গিজ করে। উল্টোভাবে বললে, ভাবনা আছে কিন্তু সংস্কার নেই এমন বাস্তবতাটা অকল্পনীয়। জন্মগত কিংবা আহরিত সংস্কার যেমন স্পষ্ট চোখে স্পষ্ট করে দেখবার পরিস্থিতিটা ঘেঁটে দেয়, তেমনি দেখার মুহূর্তে ফল্গুধারায় বইতে-থাকা ভাবনাও দৃষ্টিকে অস্বচ্ছ করে দেয়। ভাবনা চলাকালীন গভীর কোনো দেখা দেখে ওঠা যায় না। বাস্তবে, ভাবনার অনুপস্থিতি ছাড়া গভীরভাবে কিছু দেখে ওঠা অসম্ভব। সাধারণ জীবনে ভাবনার অনুপস্থিতি আর অমাবস্যার চাঁদ দেখতে পাওয়া একই রকম বিস্ময়কর ঘটনা।
চারপাশে শব্দ সৃষ্টি হয়ে চললেও যে-মনের মধ্যে কিছু মুহূর্তের জন্য অযাচিতভাবে ভাবনার অনুপস্থিতি ঘটে যায় সেই মনকে তখনকার মতো নীরব মন বলা যায়। সচেতন না হয়েই সেই নীরব মনের মধ্যে বাস করবার যে অভিজ্ঞতা তা একমাত্র ধ্যানাবস্থার সঙ্গেই তুলনীয়। সম্ভবত সব ধরনের সৃজনশীলতার লগ্ন এই অবসরটুকুই। ভাবনার একটানা শৃঙ্খলের মধ্যে বিজড়িত থাকা অবস্থায় কোনো নতুনের সন্ধান পাওয়া বা কোনো সৃষ্টি কিংবা উদ্ঘাটন ঘটে ওঠা অসম্ভব। ভাবনা পুরনো জিনিসকে বড় জোর নতুন পোশাক পরিয়ে হাজির করতে পারে, এইটুকুই যা। অন্যদিকে, নির্মাণকার্য যেহেতু ঠিক সৃষ্টিকার্য নয় তাই সেখানে বুদ্ধি ও মনের, এক কথায় ভাবনার, বিপুল ভূমিকা থাকে।

আমাদের জীবনের পনেরো আনা দখল হয়ে বসে থাকে নানা জাতের নানা মাত্রার নির্মাণকে ঠাসাঠাসি করে জায়গা দিতে গিয়ে। এই কারণে বুদ্ধি ও ভাবনার অতীত কোনো বস্তু নিয়ে মাথা-ব্যথা ঘটানোটাকে বর্জনযোগ্য বিলাসিতার মতো লাগে আমাদের অধিকাংশের কাছেই। ভাল ডিগ্রি অর্জন করে, ভাল চাকরি করে, ভাল বাড়ি বানিয়ে, ভাল খাওয়া-দাওয়া, ভাল বেড়িয়ে বেড়িয়ে আমরা দিব্যি ভাল থাকি। আমাদের সফলতার নিদর্শনকে আদর্শ করে আমাদের উত্তরপুরুষরাও বুদ্ধিতে শান দিয়ে, ভাবন-ক্ষমতার নিত্য পুষ্টি ঘটিয়ে সমাজের আর সকলের চোখের সামনে মাথা উঁচিয়ে জীবনযাপন করাকে মোক্ষের সমতুল্য জ্ঞান করে জীবনপথে এগিয়ে চলবার ব্রত গ্রহণ করে। এই জীবনে নীরবতা ও ধ্যানের স্থান নেই। এই জীবন বেছে নেন যাঁরা তাঁরা তাঁদের ব্যতিব্যস্ত জীবনের ঠাসা দৈনন্দিনতা থেকে বহু কসরত করে বছরে একআধবার একটু সময় টেনে ফেড়ে বের করে নিয়ে কর্পোরেট সদ্গুরুদের ব্যবস্থাপনায় কখনও-বা হলিডে প্যাকেজ ট্যুর কেনার ছন্দে যান্ত্রিক নীরবতা ও ধ্যান কিনে নেন।
এখনকার জীবন-দর্শন অনুযায়ী বুদ্ধিবৃত্তি ও ভাবনা ক্ষমতার চর্চা সর্বাগ্রে স্থান পাচ্ছে। এতে অবশ্য বস্তুজগতের সমূহ উন্নতি ঘটবার সম্ভাবনাই প্রবল। এই সম্ভাবনা প্রতিদিন সম্ভবায়িতও হয়ে চলেছে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। সেই দৃষ্টান্তে বিশ্বজুড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ মুগ্ধ, বিস্মিত ও অনুপ্রাণিত। ফলে সামগ্রিকভাবে অন্তর্জগতের খোঁজের চেয়ে বহির্জগতের যে যে জিনিস নিয়ে ঔৎসুক্য বা লোভ আছে সেইসব জিনিসের খোঁজ নেওয়াটাই যে প্রাধান্য পাবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এই বাইরের খোঁজ মাত্রাতিরিকভাবে বেড়ে গেলে অন্তরের দেউলিয়াপনা নিত্যই বেড়ে চলে। এই দেউলিয়াপনার হাত ধরে বর্তমানে যত জ্ঞানী ব্যক্তি দেখা যায় তত রসিক ব্যক্তি দেখা যায় না, যত চিন্তুক ব্যক্তি দেখা যায় তত প্রেমিক ব্যক্তি দেখা যায় না, যত মতবাদী ব্যক্তি দেখা যায় তত বিশ্বজনীন বোধে পূর্ণ ব্যক্তি দেখা যায় না। তবে, এখানে একথাও স্মরণে রাখা দরকার যে কেউ জ্ঞানী হলে রসিক হতে পারেন না এমন নয়। চিন্তাশীল হলে প্রেমিক হতে পারেন না এমন নয়। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন জ্ঞান, চিন্তা প্রভৃতির চড়া দামে বিক্রি করা যায়। রস, প্রেম (সেগুলো উচ্চাঙ্গের হলে তো কথাই নেই!) সূক্ষ্ম স্থূল কোনো বাজারই নেই।

অন্তর্জগতের সন্ধান না মিললে এই দেউলিয়াপনা আর তার সঙ্গে আনুসঙ্গিক সঙ্কট দিনে দিনে বেড়েই চলবে। কোন ধরনের সজাগতায় এই সঙ্কট থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে তার অনুসন্ধান কি অতি জরুরি হয়ে ওঠে নি এখন? প্রাত্যহিক জীবনের পরতে পরতে আবার কি নীরবতা, ধ্যান প্রভৃতি দুর্মূল্য সম্পদের পুনর্সন্ধান সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠেনি? তবে, গোড়া ঘেঁষে সংস্কারমুক্ত না হয়ে কি সেই অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে?

