শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

“গতর নড়ে না মোটে! পুরুষ মানুষ এত বেলা অবধি বিছনায় না গড়িয়ে, একটু বাজারের দিকে গেলে তো পারো।”

সকাল সকাল লবঙ্গর ঝাঁজে ঘুম ভাঙে মনতোষের। “জন্মানোর পর, তোর জিভে কি একটু মধু দেয় নি কেউ?” কথাটা মনে মনেই বলে মনতোষ। লবঙ্গর মুখের ওপর কথা ফোটানোর সাহস বা সুযোগ, কোনটাই নেই। কিছু বলা অর্থ, আগুনে ঘি ছেটানো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে।

রাত থেকেই উপুর চুপুর ঝুম বর্ষা। চারদিকে জল থই থই করছে। এই জলের মধ্যে বাইরে কুকুর বেড়াল পর্যন্ত নেই, মনতোষ কোথায় যাবে? কিন্তু সে কথা লবঙ্গকে বোঝানোর সাধ্যি নেই। বিয়ে হয়ে আসা ইস্তক বৌ-এর ঝাঁজে মনতোষের অভ্যেস হয়ে গেছে। আগে এই ঝাঁজটা পছন্দই করত, কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড্ড তিরিক্ষি হয়ে গেছে। মনতোষ বোঝে, কোন ছেলেপিলে হল না, হতাশাটা সেখান থেকেই বাড়তে বাড়তে আজ এমন হয়ছে। যদিও মনতোষ ওর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিল, ডাক্তার বদ্যি থেকে ঝাড়ফুঁক-মানত পর্যন্ত। কপালে না থাকলে আর কী করবে? এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই আবার ঘরে ঢোকে লবঙ্গ, “এখনও শুয়ে আছো? এত আলসি লোক হয়?”

মনতোষ মিনমিন করে বলার চেষ্টা করে, “এই জলের মধ্যে, কোথায় যাব?”

লবঙ্গ গলার স্বর সপ্তমে তুলে বলে, “জলের জন্য কোন কাজটা আটকে আছে? ঘরে মাছ ডিম কিছু নেই। যাও একটু শরীরটা নাড়াও। পাড়ার দোকান থেকেই না হয় কটা ডিম কিনে আনো।”

মনতোষদের বৈষ্ণব গ্রাম। এখানে কেউ মুরগি পালন করে না। গ্রামের ভেতর কয়েকটা দোকান আছে, সেখানে ডিম রাখে। দু’একজন সবজি মাছ নিয়েও বসে। কিন্তু এই জলের মধ্যে তারা কি দোকান খুলবে?

মনতোষকে কথা বলতে হয় না। লবঙ্গ বলে ওঠে, “সুভাষকাকাদের বাড়িতেই দোকান। ওদের দোকান খুলতে সমস্যা নেই। যাও ওখান থেকেই নিয়ে এসো।”

ব্যাজার মুখে উঠে পড়ে। বিড় বিড় করে বলে, “সকালে উঠে, লোকে ঠাকুর নাম করে। তোমার কি সারারাত মুখে বিষ জমে? যে সকাল হতেই সেগুলো ঢালতে শুরু কর?”

মনের কথা নিজেই শোনে মনতোষ, লবঙ্গ অবধি পৌঁছয় না। স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় একটু চা খাবে ভেবেছিল, চাইতে সাহসে কুলোয় না। ছাতা, তালপাতার টোকা, একটা খুরপি আর কটা টাকা একটা প্লাস্টিকের ঠোঙায় মুড়ে নিয়ে দাওয়া থেকে নিচে নামে। উঠোনে পায়ের চেটো ডুবে গেছে। সারি দিয়ে ইট পেতে রাস্তা অবধি যাওয়ার পথ করা আছে, মনতোষ সেদিকে যায় না। বাড়ির সামনের দিকে রাস্তা আর পিছন দিকে ক্ষেত। মনতোষ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে লবঙ্গকে দেখা যায় কিনা? তারপর রাস্তার দিকে না গিয়ে, কতকটা জেদ করেই মাঠের দিকে যায়। দুদিন হল অম্বুবাচী সাঙ্গ হয়েছে। চাষীরা এখনও মাঠে আসেনি। বৃষ্টির জলে নতুন ফসলের জন্য মাঠ কেমন তৈরি হচ্ছে, দেখতে ভাল লাগে। 

এবারে ঠিক সময়ে বর্ষা এসেছে। মাটি ভিজছে খুব। মনতোষ নিজের জমি পরখ করে খুশি হতে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যেই লাঙল নামাবে। খানিক ঘোরাঘুরি করে মাঝমাঠের ছাউনির তলায় গিয়ে বসে। ডিম কেনার কথা বর্ষার জলের সঙ্গে ধুয়ে গেছে। ক্ষেত-র মাঝে কয়েকটা বড় গাছ ঘেরা একটু দ্বীপের মতো, সেখানে খড়ের ছাউনি দেওয়া একটা মাচা আছে। চাষের কাজ করতে করতে অনেকেই এখানে দু দন্ড জিরিয়ে নিতে আসে, ভাতটাত খায়। খড়ের ছাউনি গড়িয়ে নামছে জল। আজ কেউ নেই। সকাল থেকেই মাঠ ফাঁকা। মনতোষ খুরপি আনলেও মাঠে ছোঁয়ায় না। সদ্য অম্বুবাচী পার হয়েছে, আর দুটো দিন যাক। 

ধারাজলের সঙ্গে ধীরে ধীরে সকালের শোনা লবঙ্গের বিষাক্ত কথাগুলোও নামছে। হঠাৎই লক্ষ করে, দূরে আলপথে কেউ আসছে। জলের দেওয়ালের ওপারে একটা ঝাপসা নারী শরীর, কোমরে খালুই বাঁধা। নিশ্চয়ই মাছ ধরতে গিয়েছিল। বিলের জলে, প্রথম বর্ষাতেই মাছ পাওয়া যাবে। মনতোষ সোজা হয়ে বসে। মেয়েটাকে ডাকলে হয়, ওর কাছ থেকেই যদি মাছ পাওয়া যায়, বেশ হবে। লবঙ্গর বিষাক্ত শাসানি আবার মনে পড়ে। 

মেয়েটি কাছে আসতে মনতোষ বোঝ, এ জেলেপাড়ার মঙ্গলা। একেবারে ভিজে কাঁই হয়ে গেছে। শরীরে শাড়ি লেপ্টে ধারালো হয়ে আছে। আলগোছে জিজ্ঞেস করে, “কিছু পেলি?”

“কেন জামাইবাবু? মাছই লাগবে? আমায় পেলে হবে না?”

মঙ্গলাটা বরাবর ঠোঁট কাটা। সবসময় ইঙ্গিত করে কথা বলে। লবঙ্গর বাপেবাড়ির লাগোয়া এই জেলেপাড়া, সেই সূত্রে মঙ্গলা জামাইবাবু বলে। 

“আমি তোর জামাইবাবু কবে হলাম?”

“কেন গো শালি হিসেবে পছন্দ নয় বুঝি?”

“ওইসব কথা ছাড়! তোর খালুই-এ কী আছে দেখা।”

“খালুই দেখে কী মন ভরবে? যা দেখাতে চাই, তা দেখবে না?”

মনতোষ বিরক্ত হয়। সকালের ঘটনায় মন তেতো হয়ে আছে। এইসব মেয়েলি রসিকতা ভাল লাগছে না। কড়া গলায় বলে, “মাছ থাকলে বল, কিনব। না হলে, বাড়ি যা। পুরো ভিজে আছিস, ঠান্ডা লাগবে।”

“ভীষণ গরম! এটুক বৃষ্টির জলে ঠান্ডা হয় না। তুমি ছুঁয়ে দেখো।”

মঙ্গলা ওর ডগডগে লাউ লতার মতো হাত বাড়িয়ে দেয়। মনতোষ এবার ভয় পায়। বর্ষার জন্য আশেপাশে কোন লোকজন নেই, এই অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না। তার চেয়ে সুভাষকাকার দোকান থেকে ক’টা ডিম নিয়েই আসবে।

মনতোষ বলে, “থাক তোর মাছ নিয়ে কাজ নেই, আমি যাই।”

মঙ্গলা এবার প্রগলভ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে, “আমার খালুই-এ যা আছে, তা তোমার নেওয়ার ক্ষমতা নেই।”

“মানে?” মনতোষ অবাক হয়।

মঙ্গলা এবার মনতোষের কাছে এগিয়ে আসে, আলতো করে খালুই-এর ঢাকা ফাঁক করে। ভেতরে এক ঝলক দেখে মনতোষ চমকে ওঠে, “ওটা কী? শোল?”

মঙ্গলা হাসে, “শোল চেন না জামাইবাবু!”

“তাহলে?”

আবার ফাঁক করে মঙ্গলা। ভেতরে প্রাণীটা হিসহিস করে ওঠে। মিশমিশে কালো আশঁটে শরীরে একবারের জন্য মাথা তোলার চেষ্টা করে, ফণাটা যেন খোলা তরবারির মতো ঝলসে ওঠে। ছিটকে সরে আসে মনতোষ, “কী সাংঘাতিক মেয়েরে! সাপ নিয়ে ঘুরছিস কেন?”

“মাছ ধরতে গিয়ে এনারে পেলাম, তাই নিয়ে এসেছি।”

“এসব কেউ সাথে রাখে? যা ছেড়ে দে!”

“ওমা! ছাড়ব কেন? চিকনপাড়ার বিপিনদাকে বিক্রি করব। অন্ততঃ চারশো টাকা দেবে।”

“সে কী? টাকা দেবে কেন?”

“ও কীসব পরীক্ষা করে, জানিনা। কোথাও সাপ ধরা পড়েছে, খবর পেলেই চলে যায়। উদ্ধার করে নিয়ে যায়।” 

মনতোষ কিছু ভাবতে থাকে, “তোর সাপটা যদি আমি নিই?”

“তুমি নেবে? কী জন্যি?”

“আমার কাজ আছে।”

“এটা কিন্তু বুনো। বিষদাঁত আছে। ভয়ঙ্কর বিষ।”

“হ্যাঁ, আমার বুনো সাপই চাই।”

“কালাচ বা কাল কেউটে। কটলে কিন্তু বাঁচানো যায় না। এরা রাতে বের হয়। এই সকালে কী করে আমার সামনে এল, জানা নেই।”

মনতোষ গেঁজ থেকে প্লাস্টিকের প্যাকেট খুলে একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে, “পুরোটাই তোকে দেব। ওটা আমায় দিয়ে দে।”

মঙ্গলার চোখ চকচক করে ওঠে, “সত্যই নিবা, জামাইবাবু? কিছু হয়ে গেলে, কিন্তু আমি স্বীকার যাব না।”

“তোর চিন্তা নেই, আমি কাউকে বলব না, যে কার কাছ থেকে পেয়েছি।”

টাকাটা হতে নিয়ে মঙ্গলা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। তারপর খালুইটার কাছে মুখ নামিয়ে বলে, “জামাইবাবু ভাল লোক। দুষ্টামি করে না। তুইও ভাল হয়ে থাকবি।”

তারপর খালুইটা মনতোষের হাতে তুলে দিয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে যায়।

সংগ্রহ করতে ওপরের লিঙ্ক ক্লিক করুন

মনতোষ গাঢ় চোখে খালুইটার দিকে তাকিয়ে থাকে। বৃষ্টি একভাবে ঝরছে। চোখের দৃষ্টির মধ্যে কাউকে দেখা যায় না। শুধু, ও আর এই বিষধর প্রাণীটা ছাড়া আর কারও কোন অস্তিত্ব নেই। একগাদা টাকা দিয়ে, হঠাৎ এটাকে নিজের কাছে কেন রাখলো, এখনও বুঝে উঠতে পারে না। আলতো করে খালুই-তে হাত রাখে, ছোট একটা চাপড় দেয়। নাড়া পেয়ে ফোঁস করে ওঠে। চট করে হাত সরিয়ে নেয় মনতোষ। মনে মনে হাসতে থাকে, এবার যেন ঘটনার একটা অর্থ খুঁজে পাচ্ছে। 

সন্তর্পনে খালুই হাতে উঠে পড়ে। টোকা মাথায় দেয়। একহাতে ছাতি অন্য হাতে বুনো কালাচ। মনতোষের ঠোঁটে একটা ক্রূর হাসি ফুটে ওঠে। এবার ও দেখবে, কে বেশি বিষধর!

[লেখকের রবিচক্রে পূর্ব প্রকাশিত রচনা]

অন্যত্র প্রকাশিত কিছু গল্পঃ

আরও গল্প

বাংলা লাইভে প্রকাশিত গল্প

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Saurav Bhattacharjee
Saurav Bhattacharjee
1 year ago

মনস্তাত্বিক গল্প, খুব সুন্দর।

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Saurav Bhattacharjee
1 year ago

অনেক ধন্যবাদ

Alak Basuchoudhury
Alak Basuchoudhury
1 year ago

বেশ ধারালো গল্প! অনেকটা যেন ডগডগে লাউ লতার মতোই !

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Alak Basuchoudhury
1 year ago

অনেক ধন্যবাদ।

Subhasree Sarkar
Subhasree Sarkar
1 year ago

আবহ টা খুব সুন্দর কল্পনা করা যায়। গ্রামের আকাশ, ঘন মেঘে ঢাকা, অঝোরে বৃষ্টি, তার শব্দ। কিন্তু তারপরই মনোতোষ এর প্রতিহিংসা। ভয়ঙ্কর! ছোটগল্পের মতনই জানার অনেক ইচ্ছে নিয়ে রইলাম। শেষ হয়েও শেষ হলো না।

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Subhasree Sarkar
1 year ago

অনেক ধন্যবাদ। বর্ষার রঙটাই একটা আবেশ নিয়ে আসে।