শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বিপর্যয়ের ক’দিন আগে… ভূস্বর্গ

ভোর সাড়ে পাঁচটা, শ্রীনগর তখনও শুনশান। প্রায় পা টিপে টিপেই হোটেলের ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গতকাল রাতে জম্মু থেকে শ্রীনগর ঢুকেছি সড়কপথে। এসেছি মহিলাদের এক জাঁদরেল গ্রুপের সাথে, সকলেই প্রায় চল্লিশের উপরে। নতুন জায়গায় এলেই ভোর দেখার তাড়নায় বেড়িয়ে পড়ি। শুনশান রাস্তা, কিছু গাবলুগুবলু লোমশ কুকুর ছাড়া আর কেউ নেই।

বেশ কিছুটা হেঁটে পড়লো জিরো ব্রিজ। ডাল লেকের সংলগ্ন এক খালের ওপর কাঠের ব্রিজ—বন্ধ ক্যাফে, ফুড কর্নার, সুন্দর কাঠের কারুকাজ করা গুমটিও বন্ধ। চোখে পড়লো ছিপছিপে এক তরুণ – পিঠে ব্যাগ, চোখা চোখ, নাক, গালে অল্পসল্প দাড়ি – হাঁটছে। আমায় দেখে জিজ্ঞেস করলো, “টুরিস্ট কোথাকার? কদ্দুর যাবেন? ডাল লেক আর একটু গেলেই।”

আমি প্রশ্ন করলাম, “আপনি কি করেন?”

হোটেলে কাজ করে, বাড়ি ইসলামাবাদ। ওখানে মজুরি ভালো নয়, তাই এখানে হোটেলে কাজ করে। কী সহজভাবে বকবক করে গেল হিন্দিতে—পাখতুন আর উর্দু টান কথায়। আমি ঢোঁক গিলে চুপচাপ হেঁটে ব্রিজ পেরিয়ে ডাল লেকের রাস্তা ধরলাম।

একটা ট্রাফিক মোড়ে সুসজ্জিত ছাপছাপ আর্মি, কাঁধে কালাশনিকভ। এটা সারা রাস্তাঘাটে দেখেছি। সেই পাকিস্তানি ছেলেটির সহজ অনুপ্রবেশ তখন বিচলিত করেনি, কিন্তু এখন বৈশরণ ভ্যালির হামলার পর ভেবেই কেমন লাগছে। এরকম পুরো উপত্যকা জুড়ে কতজন পেটের টানে অথবা জেহাদি মন্ত্রে মগজধোলাই হয়ে ছড়িয়ে আছে কে জানে!

পথে একমাত্র চায়ের দোকান দেখলাম খুলেছে। বুড়ো মুনির শেখ-এর কাছে চিনি ছাড়া চায়ের আবদার করতেই আমায় চমকে দিয়ে পরিষ্কার বাংলায় উত্তর দিলেন – বসিরহাটে যেতেন শাল নিয়ে। দোকানের অন্য ক্রেতারা প্রায় সকলেই ড্রাইভার, একা মহিলা হয়ে চায়ে চুমুক দিতে এতটুকু অস্বস্তি হল না। চা খেয়ে ডাল লেক, সদ্য পাতা আসা চিনার গাছের ফাঁকে ফাঁকে তখন সূর্যোদয়ের ওম – হাত পেতে নিয়ে হোটেলে ফিরলাম। পথে প্রতি মোড়ে সেনা, ট্যাঙ্ক, পাহারা। অথচ সেই দুর্গম এলাকায় আর্মি ছিল না – এই ধাঁধার কোনো উত্তর নেই।

এরপর আসি আমাদের গাড়ির চালক বিলাল ভাইয়ের কথায়। এত ভদ্র মানুষ কম দেখেছি। আর এত পছন্দের গান বাজাতেন! খুব সুন্দর ঝরনা, পাহাড়, ভিউপয়েন্ট এলেই বলতেন, “নজরিয়া দেখিয়ে—খুবসুরত হ্যায় মৌসম।”

শোনমার্গ, গুলমার্গ, পহেলগাঁও – সব জায়গায় ওঁর নাম্বার নিয়ে রেখেছি সবার আগে। কে কোথায় ছড়িয়ে পড়ছি, সেই সময় একমাত্র ভরসা বিলাল ভাই। সেসময় বিলাল ভাইয়ের মতো আপনজন যেন আর কেউ ছিল না। আর ছিল আমাদের কচি ম্যানেজার তাহির, কলেজ ছাত্র। পড়াশোনার পাশে ট্যুরিস্টদের সামলে দু-পয়সা পকেটে আসে।

এখনও নিষ্পাপ, সরল মন – এতজন অবাধ্য মহিলাদের সামলাতে গিয়ে রীতিমত নার্ভাস। পেটে দুমুঠো বিদ্যে থাকায় রাজনীতি, সন্ত্রাস নিয়ে স্পষ্ট ধারণা আছে। ওই নিষ্পাপ মুখের আড়ালে জেহাদি মগজ থাকতে পারে – এটা মানতে পারছি না। তাহিরের পড়াশোনা করে রোজগার আর একটা সুস্থ জীবন ছাড়া আর কিছু দাবি নেই। আর এটাই তো সমস্ত মানুষের কথা।

উসমার্গ এর কথা না বললেই নয়। অফবিট স্পট, দুর্গম ভ্যালি। সেদিন মেঘলা ছিল আকাশ। যেতেই পনিওয়ালারা ছেঁকে ধরলো। আমরা চার-পাঁচজন মহিলা ছাড়া কেউই ঘোড়ায় চড়ে ওই কাদামাখা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যেতে রাজি হল না।

সে কী ভীষণ নির্জন, অনাঘ্রাত প্রকৃতি! দুজন পনিওয়ালা আর চারখানা ঘোড়ায় আমরা। কঠিন রাস্তা, চেরিফুলের বাহার, খরস্রোতা নদী, ঝরনা, পাইনবন – দেখাতে দেখাতে হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে এগোই। ওরা নিজেদের ভাষায় বকবক করে, কেমন এক খসখসে লাগে কানে – মনে হয় টার্কিশ সিনেমা দেখছি। জঙ্গল, পাহাড় ঘেরা নদী, ঝরনা, সবুজ পাইনবনে কোনো আর্মি দেখিনি।

পনিওয়ালারা তখন একমাত্র ত্রাতা – একবারও গা ছমছম করেনি। পাহাড়ের মাথায় পৌঁছলাম যখন, এক কাশ্মীরি বোন আর তার ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে গরম গরম মকাইরুটি আর সর্ষে শাক, সাথে পেঁয়াজ দিয়ে প্লেট এগিয়ে দিল। তখন মনে হয়েছে, “এই তো জীবন, কালিদা।” কাংরির তাপ নিতে নিতে মনে হয়নি একবারও যে উগ্রপন্থী হামলা হতে পারে। এখন ভেবেই আতঙ্ক লাগছে – ভ্যালিতে কোনো আর্মি দেখিনি ত্রিসীমানায়।

পহেলগাঁও-এর হোটেলের আশপাশ ছিল সবচেয়ে সুন্দর। ভোরবেলা হোটেলের পেছনেই লিডার নদীর কলোচ্ছ্বাস, সামনের বরফ পাহাড়, পাইনবনে অচেনা পাখির শিস—”আর বাড়ি ফিরবো না, পিসেমশায়!” – বলতে ইচ্ছে করছিল তখন। তবে বৈশরণ ভ্যালি যাওয়ার কথা উঠতেই সকলে কেন জানি বারণ করলো – বললে খুব খারাপ রাস্তা, ঘোড়ায় যাওয়া বেশ চাপের।

বেতাব, আরু ভ্যালিতে গেছি, পহেলগাঁওতে বাঙালি দোকান খুঁজে ডিম পাউরুটি খেয়েছি। কিন্তু স্থানীয় মানুষের ব্যবহারে কেমন যেন রাখঢাক ছিল। আর্মি টহলদারি খুবই কম। বিলাল ভাইয়ের কাছেই পরে শুনেছি অনন্তনাগ, বানিহাল জেলাগুলো একটু উপদ্রুত, একটু কেমন যেন।
এর মাঝে একটা হালকা খবর এল—পরবর্তী গন্তব্যে একটা টেনশন তৈরি হয়েছে। আতঙ্কবাদীদের উপদ্রব বা কিছু। তখন থেকেই নিশ্চয়ই পরিবেশে ধিকিধিকি সন্ত্রাসের আঁচ দেওয়া শুরু হয়েছিল। তাই সিদ্ধান্ত হল ওটা বাদ দিয়ে যাওয়া হবে কোকরনাগ।

সিন্ধু নদের একটি ধারা পাকিস্তান থেকে এখানে ঝরনা হয়ে ঢুকেছে—তার আশপাশ তাই বাগান ঘিরে ট্যুরিস্ট স্পট। জায়গাটা বেশ ফাঁকাই ছিল। আরেক বাঙালি বাস পার্টি আর আমরা ছাড়া কিছু স্থানীয় ট্যুরিস্ট। সেদিনটা ছুটির দিন ছিল। বুড়ো এক ফেরিওয়ালা, কিছু আইসক্রিমের দোকান ছাড়া বিশেষ কিছু চোখে পড়লো না।

কি জানি কেন ওই নির্জন বাগানে একটা গা শিরশিরে ব্যাপার ছিল। কেমন যেন বিষণ্ণতা – সারা মানুষজনের চোখেমুখে, যেটা অন্য জায়গায় চোখে পড়েনি। আর কোকরনাগ বর্ডার এলাকা সত্ত্বেও আর্মি দেখিনি – লোকাল সিকিউরিটি দেখেছি। এগুলো বেশ আশ্চর্য লেগেছিল।

আমাদের ষষ্ঠেন্দ্রিয় যে নিরাপত্তার অভাব অনুভব করেছিল, সেরকম কি গোয়েন্দা দপ্তর বুঝেও পাত্তা দেয়নি? প্রশ্নটা রয়েই যাবে।

গুলমার্গ, সোনমার্গে ছিল অসম্ভব ভিড়, লাইন – তার সাথে ছিল বরফ আর বরফে হুটপাটি। স্লেজওয়ালা, পনিওয়ালা, কেওয়া-কফি বিক্রেতা, ফটোগ্রাফার – সকলেই ট্যুরিস্টদের চোখের মণি করে রেখেছিল। আর দেখেছি, প্রতি চারজন কাশ্মীরির একজন বাংলা বলতে পারে।

শোনমার্গের হোটেলের সামনের গিফটের দোকানিও বলে কিনা – ওর ক্যানিংয়ে দোকান আছে! বিক্রির থেকেও বেশি গল্প করে নিল সেলিম ভাই। শ্রীনগরের লালচকে তো মনে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সবাই হাজির। হইহই করে বাজার করছে বাঙালি।

আর তার মধ্যেই সাজোয়া গাড়ি নিয়ে, বন্দুক কাঁধে আর্মি। দিব্যি খোশমেজাজে ট্যুরিস্টদের সাথে কথা বলতে দেখেছি। আমাদের তো অটো অবধি ধরে দিয়েছিলেন এক মিলিটারি।

যে লালচকে এত টইটই করেছি অনেক রাত অবধি, সেই লালচকের প্রতিবাদ মিছিলের ছবি খবরে দেখে বিষাদে মন ভরে উঠেছে। বিশ্বাসই হচ্ছিল না – সাত দিন আগেও যেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি, সেই জায়গা শুনশান, শোকমিছিলে পথঘাট ঢাকা।

সবে কাশ্মীরে রেকর্ড সংখ্যায় লোক বেড়াতে যাওয়া শুরু করেছিল, সবে স্থানীয় মানুষ দুটো পয়সার মুখ দেখেছিল, শান্তি এসেছিল শহরে, গ্রামে – মেয়েরা নির্বিঘ্নে একটু বাইরে বেরোতে শুরু করেছিল – সব পিছিয়ে গেল আবার কয়েক বছর।

কাশ্মীর আর ওখানকার মানুষের সাথে মিশে মনে হয়েছে – ট্যুরিস্টদের ওঁরা মাথায় করে রাখেন, কারণ রুজি-রোজগার ট্যুরিজম ঘিরেই। কিন্তু কোথাও যেন একটু আড়াল, রাখঢাক রেখে মেশে ওরা। একটা বিষণ্ণতা ঘিরে থাকেই ওদের মুখগুলোতে।

আশা করি, সব অন্ধকার কেটে আবার ভূস্বর্গ ঝলমল করে উঠবে, আবার শান্ত হবে সব। তবে বেশ কিছুদিন কাশ্মীরে ভ্রমণের পরিকল্পনা থেকে আমরা দূরেই থাকবো – আর এটাই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক।
শেষে একটা কথাই এখনও বলবো:
agar firdaus bar-rū-e-zamīñ ast
hamīñ ast o hamīñ ast o hamīñ ast

“যদি পৃথিবীতে কোথাও স্বর্গ থেকে থাকে, তবে সেটা এখানেই, এখানেই, এখানেই।”

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.