শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

কড়্ কড়্ কড়্…. কড়াৎ!
কালো আকাশের বুক চিরে আলোর ঝলকানি থেকে থেকেই দেখা যাচ্ছে। সাথে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া।
বছর তিরিশেক আগের কথা।
ঠাকুরঘরে ঠাকুমার পোঁ পোঁ শাঁখের আওয়াজ আর কালবৈশাখীর শোঁ শোঁ শব্দে চৈত্রের সন্ধ্যায় একটা অদ্ভুত উন্মাদনা।
পাড়া জুড়ে লোডশেডিং। বেলা চারটে নাগাদ চারিদিক কেমন ‘থ’ মেরে গেল। মা তাই গোগলকে তখনই বলেছিলেন, ‘যা ছাদ থেকে মেলা কাপড়গুলো নিয়ে আয় গিয়ে।’ শেষ মুহূর্তে সামলাতে গিয়ে শেষরক্ষা আর হলনা। কয়েকটা কাপড়-চোপড় পাশের বাড়ির অবনী কাকুদের কার্নিশ আর ছাদের অ্যান্টেনায় জড়িয়ে আছে। তার মধ্যে পাঞ্জাবি দুটো তো ওর নিজেরই। দুদিন আগেই চৈত্র সেলে ছোটকার সাথে গিয়ে পছন্দ করে কিনেছে।
কিছুদিন আগেই হয়ে গেল রামনবমীর মেলা। জিলিপি, পাঁপড়, ফুটকড়াই, চিনাবাদাম, তেলেভাজা, কাঠিগজা, জিভে গজা, গুড়কাঠি, মট, মালপোয়া- সারি দিয়ে আরো যে কত কী। তিন্নি আর মুন্নির জোরজবরদস্তিতে নাগরদোলায় চড়াটা গোগল, হাবলু, পিকুদের রুটিন মাফিক হয়ে গেছে। কাঠের তৈরি বামন গোছের দেখতে হলে কি হবে, কী জোরে বনবন করে ঘোরে বেঁটে বেঁটে ওই নাগরদোলাগুলো। ওপর থেকে নামার সময় পেটটা কী সাংঘাতিক সুড়সুড় করে ওঠে। প্রতিবার ভাবে গোগল যে এটাই শেষবার। আর কক্ষনো না। তিন-চার মিনিটের জয় রাইড। কিন্তু মজা অফুরান।

নাগরদোলা

টুক-টাক টুক-টাক ঠনাক-ঠনাক। শিলাবৃষ্টি শুরু হয়ে গেল মনে হচ্ছে। হ্যারিকেন-লণ্ঠন সন্তর্পনে পাশ কাটিয়ে ছুটে যায় গোগল বারান্দার দিকে শিলা সংগ্রহ করতে। বৃষ্টিটা মনে হচ্ছে একটু ধরেছে।

অ্যাই বাবলু টাবলু ? কি রে চল্ চল্। আর দেরি করা যাবেনা।
সদর দরজার ওপার থেকে শঙ্করদা’র গলা ভেসে আসে। বাবলু আর টাবলু ওর দুই জেঠতুতো যমজ দাদা। শঙ্করদা, কেষ্টদা, বনমালী দা, পটাদা আর ভূতোদা-ওদের একটা টিম আছে। গোটা পাড়া কাঁপিয়ে রাখে সারা বছর। আজ লাহাবাড়ির পেয়ারা বাগানে হামলা তো কাল মুখুজ্জেদের আম বাগান। গরমের ছুটিতে লাকু বাবুদের পুকুরে তো স্নান হুটোপুটি সারা দিন ধরেই লেগে আছে। পুজো-আচ্চার দিনে কারোর বাগানে কোনক্রমে এক আধটা ফুল অবশিষ্ট থাকলে হয়। তবে, বিপদে-আপদে, সময়-অসময়ে সবার আগে ওদেরই দেখা যায়। মাঝরাতে তপন জেঠুর হার্ট-অ্যাটাকের সময় তো ওরাই তো কোথা থেকে বড় ম্যাটাডোর জোগাড় করে ঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে গেল। আর একটু দেরি হলেই নাকি ভালমন্দ কিছু একটা হয়ে যেত। নার্স দিদি, ডাক্তারবাবুরা বলছিলেন বারবার।
তার আগের বছরে নন্দীবাড়ির বেচি পিসি সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে গুরতর জখম হন। আশেপাশে কোনও হাসপাতাল নেই গ্রামের। বনমালীদা’র কোন এক তুতো দাদা শহরে অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার। শেষমুহূর্তে সামাল দেওয়া গেল কোনওরকমে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ায় একটু বেগড়বাই হয়ে গেছিল। হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল টানা দু সপ্তাহ। পাড়ায় নিজেদের একটা অ্যাম্বুলেন্স থাকলে হয়তো বিপদটা এড়ান যেত।

দলবল

’না রে ভাই, তোরা যা এবার। বাড়ির ফিউসটা খুব গন্ডগোল করছে।’
কোনও রকমে কাটিয়ে দেয় বড়দা।
’কি রে গোগল যাবি নাকি?’ বনমালীদা শুধোয় ওপাশ থেকে।
বুঝতে অসুবিধে হয়না, ছাতা টর্চ নিয়ে দল বেঁধে ওরা যাচ্ছে লাকু বাবুর বাগানবাড়িতে। ঝরে পড়া আম, নারকেল, বেল কুড়োতে।

কিন্তু এ বছর গোগল আর ওর দাদাদের মন খুব বিষণ্ন। এইবছর যে ওদের দোকানে শুভ নববর্ষ পালন হচ্ছেনা। অন্যান্য বার এই সময় হালখাতার নেমন্তন্ন’র সব চিঠি বিলি হয়ে গেছে।
গোগলের ঠাকুরদাদা, নগেনবাবুর ছোটখাট জুয়েলারির দোকান। ওনার কারিগরি হাত তো নয়, যেন জাদুকাঠি। এমনটাই বলে ওঁর পুরনো খদ্দেররা। সত্তর বছর বয়সেও নেকলেস, নাকছাবি, কানপাশা ডিজাইনগুলো এখনও নিজে হাতে আঁকেন। গেলবার শীতে ছানি কাটার পরে চোখের দৃষ্টিটা নাকি আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। তার সাথে তাল মিলিয়ে বেড়েছে কাজের সময়টাও। আজকাল আর দোকানে নিয়মিত যাওয়া হয়না। গোগলের ছোটকাই সামলায় দোকান। সারাদিন ঘরে বসেই তাই চলতে থাকে ঠুকঠাক। একের পর এক নতুন সৃষ্টি। বড় বড় চার-চারটে ক্যাটালগ থাকলেও দাদুর খদ্দেররা ওঁর নিজের হাতের নিত্য-নতুন নকশাগুলোই বেশি পছন্দ করেন বরাবর।

পয়লা বৈশাখ। সিদ্ধিদাতা গনেশ ঠাকুরকে পুজো দিয়ে ওই দিনই আরম্ভ হয় নতুন বছরের হিসেবনিকেশ। গ্রাহকদের প্রতি কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন আর বকেয়া আদায়- এই দুই মিলিয়ে আয়োজন করা হয় ছোটখাটো সাধ্যমত ব্যবস্থা। থাকে ছয় রকমের মিষ্টি, নিমকি, সিঙ্গাড়া। আর সাথে একটা করে ক্যালেন্ডার।

সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক আগেই ঘটে গেল আচমকা এক দুর্ঘটনা। দোকানের দেয়ালে সিঁদ কেটে চুরি হয়ে গেছে বেশ কিছু গয়না।
এদিকে, বিশিষ্ট সজ্জন ব্যক্তি অঘোর মল্লিকের ছোটমেয়ের বিয়ে এই বৈশাখেই। অত্যন্ত সৎ আর সুনিপুণ দক্ষতার জন্য নগেনবাবুর বেশ নামডাক এলাকার বাইরেও। দুটো গ্রাম পেরিয়ে অবস্থাসম্পন্ন সমৃদ্ধিশালী মল্লিক পরিবার ঠাকুরদা’র বহুকালের খরিদ্দার। বড় মেয়ে উষশী-জামাই-নাতি-নাতনি অনেকদিন ধরেই বিদেশে। ওখানেই প্রায় থিতু হয়ে গেছে। বছরে একবার করে দেশে ঘুরতে আসে ওরা। আর প্রত্যেকবারই কিছু না কিছু বানিয়ে নিয়ে যায় নগেনবাবুর দোকান থেকে। ওনার হাতে তৈরি গয়নার নাকি খুব তারিফ করে ওদের প্রবাসী বন্ধুরা। উষশীর বিলিতি বন্ধুদের কাছেও নাকি নগেনকাকার হাতে গড়া জুয়েলারির খুব কদর। গোগল ওর বাবার মুখে শুনেছে, ওদের পরিবারের সব কটা শুভ অনুষ্ঠানেই নাকি ঠাকুরদা’র হাতে গড়া গয়না গেছে মল্লিক বাড়িতে। বিয়ের কাজেরই দুটো সীতাহার, একটা করে পাটিহার, মটরমালা রাখা ছিল প্রায় তৈরি অবস্থায় দোকানের শো-কেসে। পালিশ করে সবেমাত্র এসেছিল দোকানে। এমন সময় ঘটে গেল এই অঘটন। চিক, টিকলি, টায়রা, বাজুবন্ধ, কাঁকনগুলো আগেই সিন্দুকের ভেতরে রাখা ছিল। লোহার সিন্দুকটা অবশ্য চোরেরা কিচ্ছুটি করতে পারেনি। অঘোর মল্লিক অবিশ্যি আবার পাকা সোনা কিনে বরাত দিয়ে এসেছেন নগেনবাবুর দোকানে। আর বলে এসেছেন কিচ্ছুটি দুশ্চিন্তা না করতে। ব্যবসা থাকলে এসব ঝুঁকি নিয়েই চলতে হয়। গোগলের ঠাকুরদা কি আর সেসব জানেননা বা বোঝেননা? কিন্তু অপরের সম্পত্তি খোয়া যাওয়া! তা-ও আবার নিজেরই হেফাজত থেকে। ব্যাপারটা কিছুতেই মানা যাচ্ছিলনা। মল্লিকবাবুর শত অনুরোধ আশ্বাস সত্বেও গোগলের দাদু একটা কানাকড়িও সাহায্য নেননি এই চরম সংকটেও। ঠাকুমার কিছু গয়নাগাঁটি বিক্রি করে ঠ্যাকনা দেওয়া গেছে কোনওমতে। এই দুর্যোগে বাড়ির সবাই তাই মনমরা। মিষ্টিমুখ করে হালখাতা করা তাই এবার শুধু সাধ নয় সাধ্যেরও বাইরে। পুজোটাই শুধু হবে নিয়ম করে।

তবে, কঠিনতম পরিস্থিতি সামলানোর ব্যাপারে ঠাকুরদা যে কত দৃঢ় মনোভাবাপন্ন সে কথা গোগল জেঠা-বাবা-কাকাদের কাছে বহুবার শুনেছে।
ওর আর এক কাকা ছিলেন। খেলাধুলা, পড়াশুনা, গানবাজনা সবেতেই এক্কেবারে তুখোড়। এনসিসি তে লিডার। ১৫ই আগষ্ট ২৬শে জানুয়ারি প্যারেডে পুরো টিমকে নেতৃত্ব দিতেন একাই। ফুটবল আর ক্রিকেটে স্কুল টিমের ক্যাপ্টেন টানা তিন বছর ধরে। পাড়ায় বিপদে-আপদে সবার আগে এগিয়ে যেতেন। বন্ধুবান্ধব,পাড়া প্রতিবেশী, শিক্ষক -স্কুল কর্মী – প্রত্যেকের কাছে উনি ছিলেন নয়নের মণি। মায়ের এ বাড়িতে আসার আগেই নাকি আচমকা এক জ্বরের প্রকোপে এক রাতেই চলে যান সকলকে ছেড়ে। আশেপাশে ডাক্তার-বদ্যি-হেকিম সেরকম ছিলনা। একটা অ্যাম্বুলেন্স থাকলে অন্তত সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যেত। প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগটুকুও পাননি স্বর্গীয় মেজকাকা। সঠিক সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে একটা তরুণ প্রাণ ঝরে পড়ত না অকালে। এ আপসোস নগেনবাবুর সারাজীবনেও ঘুচবেনা। দেখতে দেখতে পঁচিশ বছর কেটে গেল।

শতদল সংঘের উদ্যোগে গত চারবছর ধরে শুরু হয়েছে সাংস্কৃতিক বিচিত্রানুষ্ঠান। সকালেই হয়ে যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। আর ওবেলায় বসে বৈশাখী বৈঠক। বছরের প্রথম সন্ধ্যায় ছোট মাঠটাতে তিল ধারণের জায়গা হয়না। কচিকাঁচা ও বড়দের কবিতা, নাচ, গান, গীতি আলেখ্য, নাটক নিয়ে বেশ জমটিয়া ঘণ্টা তিনেকের অনুষ্ঠান। একটু রাতের দিকে শুরু হয় গোগলদের দোকানে দোকানে নেমন্তন্ন রক্ষা করার পালা। চালের দোকানের শচি কাকু থেকে ধর মেডিক্যাল, অন্নপূর্ণা ভান্ডার, রাজলক্ষী বস্ত্রালয়, প্রিয় পাদুকালয়….. লম্বা তালিকা। কোথাও কোথাও আবার যাওয়া মাত্রই হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় রং বেরঙের কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল। আহা! কেন যে সারা বছর ধরে চলে না হালখাতা উদযাপন।
কিন্তু এবছর যেন কোনও কিছুই আর টানছেনা গোগলকে। চুরি হয়ে যাওয়া গয়নার বিপুল লোকসানের ধাক্কাটা বারবার যেন ম্লান করে দিচ্ছে সবকিছু।

পরের দিন ভোরবেলায় গোগলের ঘুমটা ভেঙে যায় একটু আগে আগেই। আজ দুপুরে আবার মধুমন্তিদির মহড়ার মেগা রিহার্সাল ডে। রবি ঠাকুরের ছোটদের নাটক ‘পেটে ও পিঠে‘ মঞ্চস্থ হতে চলেছে এবার। ডায়লগ সিঙ্ক্রোনাইজেশনের সমস্যাগুলো আজকেই রপ্ত করতে হবে যে করেই হোক। মাঝে মোটে একটা দিন।

মাঠের মাঝখানে মঞ্চ

মাঠের ঠিক মাঝখানটায় একটা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। কাল রাতে বৃষ্টি হওয়ায় একটু কাদা কাদা। তবে, অনুষ্ঠানের দু-একদিন আগে ঝড়বৃষ্টি- ওদের কাছে পয়মন্তর। কিন্তু, ঘুরে ফিরে মন ভাল নেই। কী এক অসম্ভব মানসিক চাপ, সেটা বাড়ির বড়রা প্রকাশ না করলেও গোগল ঠিক বুঝতে পারে। গোগলের বাবা ব্যাংকের কর্মী হওয়ায় আপৎকালীন লোন পেতে অসুবিধে হয়নি অবিশ্যি। বাবা-জেঠা-কাকাদের ক্রমাগত ভরসায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও কোথায় যেন কী একটা নেই। সব কিছু থেকেও ১লা বৈশাখের ঠিক আগের দিনও তাই বড় একলা একলা লাগে গোগলের।

প্রতিবারের মত এবারেও নববর্ষের সকাল শুরু হল জনকল্যাণমূলক কাজকর্ম নিয়ে। রেললাইনের ওপারে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোতে বস্ত্র বিতরণ করে শুরু হল অনুষ্ঠান।
’এ বারে আমরা ডেকে নেব আমাদেরই পাড়ার বর্ষীয়ান সম্মানীয় শ্রীযুক্ত নগেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী মহাশয় ওরফে নগেন দাদুকে।’
মাইকের ঘোষণায় চমকে ওঠে গোগল।
একি ঠাকুরদা এখন, আবার এই মঞ্চে? কারণ ভেবে পায়না ও।
’বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আমাদের পাড়ার স্বপ্ন আজ স্বার্থক হতে চলেছে। নগেনবাবুর আন্তরিক আর্থিক অনুদানে শতদল সঙ্ঘে একটু অ্যাম্বুলেন্স কেনা হচ্ছে।‘
মঞ্চে তখন বিষ্টুজেঠুকে দেখা যাচ্ছে হাত ধরে ঠাকুরদাকে দর্শকাসন থেকে নিয়ে আসতে।
গোগল তো আকাশ থেকে পড়ছে। ঠাকুরদা এত বড় অনুদান তা-ও আবার এই চরম সংকটে? এটা কীভাবে সম্ভব?
পেছন থেকে ঘাড়ে দুটো টোকায় সম্বিৎ ফেরে গোগলের। দেখে ওর বাবা স্মিত হাসছেন।
‘আয় এদিকে। শোন তবে।’
বাবা সস্নেহে একপাশে নিয়ে যায় গোগোলকে।
’তোদেরকে ইচ্ছে করেই বলিনি। বাবার নিষেধ ছিল। শুধুমাত্র আমাকে আর তোর জেঠু-ছোটকাকেই বলেছিলেন এই কিছুদিন আগেই।’
জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে গোগোল বাবার দিকে।
‘মল্লিক মশাইয়ের বড় মেয়ে উশষী’র বিদেশী বন্ধুদের কাছে তোর ঠাকুরদা’র কাজ যে কতটা জনপ্রিয় সে তো জানিসই। হপ্তা খানেক হল ওরা দুটো বড় বড় কাজের অর্ডার দিয়েছে। অ্যাডভ্যান্স চেক দিয়ে আগাম বুকিংও করে ফেলেছে। সময় আছে এখনও অনেক। পুজোয় ডেলিভারি। ততদিনে চুরির ধাক্কাটা আরো সামলে নেওয়া যাবে। কি বলিস?
’তাই নাকি? বল কী গো বাবা!’
আনন্দ ভরা বিস্ময় গোগললের চোখেমুখে।
’কিন্তু ওই চুরির ব্যাপারটা? গয়নাগুলো তো আর ফিরে পাওয়া গেলনা। অত দামী!’ পরক্ষণেই হতাশ সুরে জিজ্ঞাসা করে।
‘তোর ঠাকুরদাদা ঠিক হিসেব বুঝে নিয়েছেন। বড় কাজ তো। লাভের অঙ্কটাও একটু বেশি বইকি। তবে অত পয়সা নিয়ে আমাদের কী হবে। বরং সেটা দিয়ে যদি সবার উপকারে আসা যায় এমন কোনও কাজ….এর থেকে ভাল আর কী? দ্যাখ্ কতকাল হয়ে গেছে তোর মেজকা নিরু আমাদের মধ্যে নেই। বাবা চান যে ওই দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে কখনও। কারোর সাথেই।
তোর ঠাকুরদাদার অনেকদিনের ইচ্ছা আজ পূরণ হল বুঝলি গোগল?’

’আমাদের নিরু যেন তোমাদের মনের মাঝে এভাবেই বেঁচে থাকে আজীবন। ‘
বলতে বলতে রুদ্ধ হয়ে ওঠে মাইকে ঠাকুরদা’র কন্ঠস্বর। সিধু-গুপি-বিষ্টু জ্যাঠারা জড়িয়ে ধরেন নগেনবাবুকে।
’এখানেই শেষ নয়। নগেনবাবুরই অর্থ সাহায্যে একটা লাইব্রেরির জন্য দান তহবিল গড়া হচ্ছে। আমাদের সবার প্রিয় নিরুর স্মৃতি উদ্দ্যেশে যার নাম রাখা হবে নিরঞ্জন স্মৃতি পাঠাগার।

পাঠাগার

হাততালি আর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে দর্শক শ্রোতারা।
গোগল এক ছুটে গিয়ে মঞ্চে উঠে ঠাকুরদাকে জড়িয়ে ধরে।
’আরে গোগল চল্ চল্। অনেক কাজ রে দোকানে। ক্যালেন্ডারগুলো এইমাত্র ডেলিভারি করে গেল প্রেস থেকে। আলাদা করে একটা একটা করে রোল করতে হবে। ঠাকুরমশাই এই এসে পড়লেন বলে। মিষ্টির প্যাকেটগুলোও তো বানানো বাকি।’’ একটু দূরে ছোটকার গলা শোনা যায়।

বছরের প্রথম রোদ্দুরের আলোয় এখন খুশির জোয়ার। উরিব্বাস! এই না হলে পয়লা বৈশাখ! দু-দুটো বাড়তি উপহার বছরের শুরুতেই!
এবার শুধু মিষ্টির প্যাকেট সংগ্রহ নয়। বিতরণেই হবে আসল মজা, মনের তৃপ্তি। হৃদয়ের শান্তি।
ছোটকার সাইকেলে চেপে দোকানে যাওয়ার পথে মোড়ের মাথায় মাইকে তখন সুরের ঢেউ- “আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও। আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও…॥”

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.