শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

দণ্ডবৎ হই মা

এবড়োখেবড়ো মাটিতে বাঁচতে গেলে বোধহয় প্রকৃতির রূপ রস বাস নিয়ে জীবনের গরিমাটা — নিয়ত বেঁচে ওঠার মহার্ঘ্য ভাবটা সবার আগে রক্ষে করতে হয় ৷ আর এটা আমি শিখি — আমার বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের কাছে ৷ কখনো গোপন জল লুকোই ওদেরই বাঁচার মরীয়া চেষ্টা দেখে ৷ আমি তাই ওদের দিই আমার পছন্দসই নানা নাম ৷ আমার দেওয়া নামে কেউ বখতিয়ার – কেউ খলিফা – কেউ বা চাকবাদাম ৷ এক বন্ধু আমার এই পাগলামো দেখে বলেছিলেন — আরে! তোর ছাত্রছাত্রীরা জ্যান্ত জ্যান্ত মানুষ রে ৷ কল্প-নামে ডেকে ডেকে তুই কি ওদের মিছে-মানুষ বানিয়ে দিবি? দেখিস না ওরা বাবা মায়ের দেওয়া নাম ভুলে তোর ওই মিছে ডাকে হাঁটে চলে — ড্রইং খাতায় পাখি আঁখে — ৷ তারপর তুই যখন বলিস আঁকা পাখিতে প্রাণ আছে তখন সেটাও কেমন বিশ্বাস করে ৷ সেদিন বন্ধুকে আমি জোর গলায় বলেছিলাম — ওরা মিছে-মানুষ নয় রে ৷ ওরা আমার কল্প-তারা — রোজই ওরা কেউ না কেউ এসে আমার মনআকাশে আলো দিতেই থাকে ৷ মিছে ডাকে কি আর সত্য আহবান থাকে ? বন্ধুকে বলা এই কথাগুলো কোনোদিন ভুল প্রমাণিত হয় নি আমার নিজের কাছে ৷ বলা ভাল — এইসব শিশু ভুল হতে দেয়ইনি আমায় ৷

আজো বৃষ্টির মাঝে আমার সেই আকাশমনে আলো ছিটকালো ৷ স্কুল শেষেও মাঝারি বর্ষা চলছে ৷ দেখি — প্রিয় ছাত্রী বখতিয়ার ওরফে বখা একটা প্লাস্টিক নুলিয়া টুপি করে মাথায় পরে নিয়েছে ৷ বখতিয়ার Multiple disabled-spasticity ভীষণ মাত্রায় – সঙ্গে চোখের সমস্যা ৷ মায়ের হাত ধরে পায়ে হোঁচট খেতে খেতে চলছিল আজ ভেজা রাস্তা ধরে ৷ মায়া হল ৷ রিকশা ডাকলাম ৷ তখন থেকেই দেখছি –মাথা ঝাঁকিয়ে প্রত্যাখ্যান দিতে শুরু করেছে বখতিয়ার ৷ বললাম — No পাকামি বখা ৷ মাকে নিয়ে রিকশায় ওঠ — বাড়ি যা ৷ উত্তরে বখা মাথার নুলিয়া টুপিটা আরো ভালো করে নিজের সতের রকম ক্লিপ পরা মাথায় ঠেসে নিল ৷ বুঝলাম — রিকশায় উঠবে না সে ৷

কেন ? ভাড়া তো স্যার দিচ্ছেন ৷ তোর কী! ওঠ না শয়তান মেয়ে !

এতক্ষণ চুপ ছিল ৷ এবার গলার শির ফুলিয়ে চিৎকার করে উঠল –
আমি হাঁটতে পারি ৷ বাবা আমায় স্পেশাল বুটও কিনে দিয়েছে ৷ রেগুলার আমার মা ব্যায়াম করায় ওয়ান টু থ্রি করে ৷ দেখেছ আমার গায়ের জোর ৷
রোগা হাতের শিরা গুল্লি পাকাবার চেষ্টা করল বখা ৷

ময়ূরীটা খালি পয়সা নষ্ট করে ৷ আমি পুরো পথ হাঁটব ৷ কেন তোমাদের পয়সা নষ্ট করব আমি ৷ মা তুমি যাবে কিনা —৷
ততক্ষণে ভিজে পথে বখার বুট থপথপ আওয়াজ শুরু করেছে ৷ পাছে রিকশায় তুলে দি — তাই কি আজ বড়ো বেশি জোরে দৌড়োবার চেষ্টা করছে বখা ? কিন্তু জলকাদায় হাঁটতে অত তাড়াতাড়ি হাঁটতে তোর যে খুব কষ্ট হবে রে বখা !

চলল সবার আগে — পিছনে আমরা সবাই ৷
বৃষ্টির মাঝেই বৈকালিক আজান শুরু হল ৷ মনে হল — একটি আধা অক্ষম শিশুর সবল হয়ে ওঠার চেষ্টায় ভগবান গান নিবেদন করছেন ৷

[চিত্রঋণ- আন্তর্জাল সাটারস্টক]

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
10 months ago

বিশেষ আত্মসম্মানবোধই এই শিশুদের সক্ষমতার প্রধান হাতিয়ার।
খুব সুন্দর করে বললেন।

Sulata
Sulata
10 months ago

” নিরাশেরে কহ আশার কাহিনী প্রাণে নব বল দাও রে।”
আঁধার পেরিয়ে আলোকের পথে নিয়ে যাবার মশালটি ধরে রাখার বিশ্বাস জাগানোর কাহিনীটি কারুণ্যে এবং মাধুর্য্যে অপরূপ। ধন্যবাদ।