শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বিস্মৃতিচারণা (১২)

স্মৃতির অন্বেষণ যখন ভেসে বেড়ায় কয়েক দশকের বিস্মৃতপ্রায় অতীতের মহাসমুদ্রে, তখন ঘটনার পারম্পর্য বজায় রাখা বড় কঠিন। কখন কোনটি যে মুখ লুকোয়, কোনটি যে ফিরে এসে ধরা দেয়, কোনটি যে ঝাপসা হয়ে যায় বা পুরোপুরি তলিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে, তা বলা মুশকিল।
সম্প্রতি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের প্ররোচনায় হঠাৎই মনে পড়ে গেল দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর আগেকার বিস্মৃতপ্রায় এক গুণী বাঙালির সংস্পর্শে আসা ও তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতার কথা।
অতঃপর একটু চেষ্টাচরিত্র করে খুঁজে বার করা গেল পুরোনো একটি দিনলিপির খাতা ও তদানীন্তন একটি সাময়িক পত্র, যে দুটিতে পুনরুদ্ধার করলাম সেই দূর অতীতে লিপিবদ্ধ গুণী মানুষটি সম্পর্কিত কিছু তথ্যভান্ডারের, যা আমার আজকের প্রতিবেদনের রসদ।
এই প্রেক্ষাপটেই আর একবার ফিরে দেখতে ইচ্ছে করছে সাড়ে চার দশক আগে আরব সাগরের তীরে তদানীন্তন বোম্বাই শহরে অনুষ্ঠিত বঙ্গ সাহিত্যের সাড়া জাগানো আসরটিকে, যার অনুষঙ্গ এই লেখার আগের কয়েকটি পর্বে এসেছে।

১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের কদিন। বোম্বাইতে উপস্থিত হয়েছেন তদানীন্তন বাংলা সাহিত্যের অধিকাংশ কুশীলব এবং সারা ভারতের তাবৎ বাঙালি সাহিত্যপ্রেমীরা। এ যেন বঙ্গ সাহিত্যের এক বাৎসরিক কুম্ভমেলা। আজকের সময়ের মরুভূমিসদৃশ পটভূমিতে দাঁড়িয়ে সেই সময়ের বাঙালির সাহিত্যের প্রতি ভালবাসা আন্দাজ করা এ যুগের নবীনদের পক্ষে দুরূহ। তখন মধ্যগগনে সমরেশ (বসু), সুনীল, শীর্ষেন্দু, আশাপূর্ণা, সন্দীপন, নিমাই, দিব্যেন্দু, শক্তি, শরৎ, নীরেন, উৎপল, আরও কত কে! জীবনের অপরাহ্নবেলায় তখনও লিখে চলেছেন সুভাষ মুখুজ্জে, অন্নদাশঙ্কর, প্রবোধ সান্যাল, মনোজ বসু, সুমথনাথ, গজেন মিত্তিররা। প্রাচীনেরা হয়তো একমত হবেন যে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, আবুল বাশার, জয় গোস্বামীর মতো পরবর্তী প্রজন্মের কবি সাহিত্যিকরা তখনও আমাদের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করলেও বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের অন্তিম অধ্যায়ের শুরুটা বোধহয় উঁকি মারতে শুরু করেছে এই সময়কালেই।
যাক সে কথা। সম্মেলনের প্রথম দিনের সকালে একটু আগেভাগই হাজির হয়েছি সম্মেলনস্থলে নক্ষত্র সাহিত্যিকদের চর্মচক্ষে কাছ থেকে দেখব ও হাতের নাগালে পেয়ে একটু কথা বলব বলে। তখনও জনসমাগম সেভাবে হয়নি। স্বনামধন্য মানুষগুলোর অনেকেই ইতিউতি ঘুরছেন। আগ্রহী পাঠক ও গুণমুগ্ধরা সুযোগ মতো তাঁদের প্রিয় সাহিত্যিকদের সঙ্গে দু’চার কথা বলছেন, কখনো বা দিলখোলা সাহিত্যিকদের সঙ্গে ছোটখাট আড্ডাতেও জমে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে একটা মিলনমেলার পরিবেশ।
আমি তখন কলেজ-ছাত্র। এই সব সাহিত্য সম্মেলন উপভোগে আমার বাবা ছিলেন আমার পথপ্রদর্শক। ওঁর সঙ্গেই আমার সম্মেলন পরিক্রমা। সেদিন সকালে আসর শুরু হবার আগে তিনি আমাকে বললেন, ‘আমার সঙ্গে এসো, একজন বিশিষ্ট শিল্পীর সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই।’
জীবনের ওই পর্বে কিছুদিন ছবি আঁকার নেশা পেয়ে বসেছিল আমায়। তাই শিল্পীর সঙ্গে পরিচয়ের প্রস্তাব শুনেই আগ্রহী হয়ে উঠলাম।
বাবাকে অনুসরণ করে পৌঁছলাম অতিথিদের জন্য নির্দিষ্ট আসনের কাছে। আসনগুলি তখনও ফাঁকা। দেখলাম, গুণীজনের আড্ডা ও তাঁদের সান্নিধ্য-লোভাতুর জনতার কোলাহলের সঙ্গে দূরত্ব রচনা করে একটি আসনে একা বসে আছেন সাদামাটা চেহারার স্মিতহাস্যময় ক্ষীণকায় এক প্রৌঢ়। বাবার দৌত্যে উপস্থিত নবীন ছাত্রটির সঙ্গে তিনি পরিচিত হলেন আগ্রহ ভরে। পরিচয় পাবার পর বুঝলাম, যে সমস্ত প্রথিতযশা শিল্পীর নাম আমার জানা ছিল, ইনি তাঁদের মধ্যে কেউ নন। ইনি রেবতীভূষণ নামে পরিচিত। পুরো নাম রেবতীভূষণ ঘোষ।

রেবতীভূষণ

প্রাথমিক পরিচয় বিনিময়ের পর তাঁকে বললাম, আমি খুব লজ্জিত যে আপনার ছবির বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা যদিও ছবি দেখা ও যৎকিঞ্চিৎ ছবি আঁকার অভ্যাস আছে। আপনার কাজ সম্পর্কে একটু বিশদে যদি জানতে পারি, খুব ভাল লাগবে।
সহজভাবেই নিলেন কথাটা। বললেন, দেখো, যতই তোমার বাবা প্রখ্যাত শিল্পী বলে আমাকে তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিননা কেন, আমি কতটা শিল্পীগোত্রে পড়ি তা ভাববার বিষয়। ছবি আমি আঁকি বটে, তবে সেগুলো বলতে পার নানান দুষ্টুমির ছবি। তুমি যাকে দেখছ, ঠিক তার ছবি নয়, আমি ছবি আঁকি সেই চরিত্রটার যেটা সে লুকিয়ে রাখে। তাই আমার ছবি গল্প বলে, আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষের গল্প। সেজন্য তার চেহারার আদলটা ঠিক থাকে, কিন্তু বদলে যায় বাইরের মানুষটা। তাই আমি আদতে চিত্রশিল্পী নই, কার্টুনিস্ট বা ব্যঙ্গচিত্রী। জগৎ সংসার ও আশেপাশের মানুষগুলোকে আমি দেখি তির্যক ভঙ্গিতে। একটু বিরতি নিয়ে বলেন, বুঝলে হে, এসব ছবি আঁকতে গেলে বেশ একটা প্যাঁচালো দৃষ্টি দরকার হয়, যেটা আমার আছে বলে লোকের বিশ্বাস।
প্রথম আলাপের পর মানুষটির সম্পর্কে বেশ একটা কৌতুহল তৈরি হল। পরের তিন দিন ধরে পর্বে পর্বে ফাঁকে ফাঁকে নানান আলাপচারিতায় জেনেছিলাম তাঁর বর্ণময় শিল্পীজীবনের কিছু কিছু বৃত্তান্ত। সেটা আরও বিশদে জানতে পারলাম সেই সময়ের এক সাময়িক পত্রে প্রকাশিত তাঁর শিল্পী জীবন নিয়ে একটি লেখায়। তাঁর শিল্পীজীবনপথের পরিক্রমা মুগ্ধ করেছিল আমাকে।…

কার্টুনে রেবতীভূষণ

ছবি আঁকার প্রাথমিক কোনো প্রথাগত শিক্ষার বালাই ছিল না রেবতীভূষণের। যেটা ছিল, সেটা চিত্রশিল্পের প্রতি ভালবাসা থেকে উদ্ভূত নিরন্তর চর্চা। কার্টুন তাঁর প্রথম ভালবাসা হলেও পাশাপাশি পেন্টিং ও ড্রয়িংয়েও হাত পাকিয়ে চলেছিলেন। এবং হাত পাকাচ্ছিলেন ছড়া লেখাতেও।
ছাত্রজীবনে রিপন কলেজে পড়াকালীন ম্যাগাজিনে হিটলার, মুসোলিনি ও স্টালিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তিন নায়ককে নিয়ে ছাপা হয়েছিল তাঁর প্রথম কার্টুন। শিরোনাম ‘ত্র্যহস্পর্শ’। বৃহত্তর জনসমক্ষে তাঁর কার্টুনের আত্মপ্রকাশ ১৯৪০ সালে সেকালের বহুল প্রচারিত সাময়িক পত্রিকা ‘সচিত্র ভারত’এর প্রথম পাতায়। কার্টুনটির নাম ছিল ‘স্বরাজ সাধন’। বিষয় ছিল, নিপীড়িত মানুষের ওপর ধনবানের চিরন্তন পীড়ন।
১৯৪২ সাল। একদিন বালি থেকে সাইকেলে বরাহনগরে পৌঁছলেন তরুণ রেবতী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুন ঠিকানা ‘গুপ্তনিবাস’এ। উদ্দেশ্য, শিল্পগুরুর কাছে ভারতীয় শিল্পের পাঠ নেওয়া। উদ্দেশ্য সফল হল। অবনীন্দ্রনাথের কাছে শিল্পের বিবিধ বিষয়ে পাঠ নিলেন সুদীর্ঘ ন’টি বছর।
স্নাতক হবার পর কর্মজীবন। ততদিনে ব্যঙ্গচিত্র আঁকছেন ছোটখাট পত্রিকায়। এরপর ডাক পেতে থাকলেন একের পর এক নামী সংবাদপত্রের। আনন্দবাজার, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড, যুগান্তর, বসুমতী, সত্যযুগ ইত্যাদি পত্রিকায়। একই সঙ্গে দেশ, অচলপত্র, যষ্টিমধু, শনিবারের চিঠি, উল্টোরথ, নবকল্লোল ইত্যাদি সাময়িকী ও বিভিন্ন শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হতে লাগল তাঁর রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র। ১৯৫০ এর দশকে যুগান্তর পত্রিকায় তিনি আঁকতে থাকেন ছড়া ও কার্টুনসহ “ব্যঙ্গ বৈঠক”, যা অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে তাঁর পরিচিতি ও সুনাম।

কার্টুন

১৯৬৫ সালে ডাক এল দিল্লী থেকে। ভারতের প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট ও ‘শংকরস্ উইকলি’-র সম্পাদক কেশব শঙ্কর পিল্লাইয়ের ডাকে দিল্লিতে পৌঁছলেন তিনি। কাজ শুরু করলেন পিল্লাই প্রতিষ্ঠিত চিলড্রেনস বুক ট্রাস্ট কার্যালয়ে সিনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে। এছাড়াও ব্যঙ্গচিত্র আঁকতে থাকলেন ন্যাশনাল হেরাল্ড, হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, পাইওনিয়ার, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দিল্লি স্টেটসম্যান প্রভৃতি পত্রিকায়। রেবতীভূষণ তখন সর্বভারতীয় খ্যাতিসম্পন্ন কার্টুনিস্ট।
কর্মজীবনে বাংলা অ্যানিমেশানের ক্ষেত্রেও বিশেষ অবদান রাখলেন রেবতীভূষণ। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদাকে কমিক্সে রূপ দেবার ব্যাপারে উদ্যোগী হলেন তিনি। নিউ থিয়েটার্সের চলচ্চিত্র প্রযোজক বি এন সরকারের অনুরোধে বাংলা ভাষার সর্বপ্রথম অ্যানিমেশান ছবি ‘মিচকে পটাশ’এর চরিত্রায়ণ রেবতীভূষণেরই।
ছবি আঁকার পাশাপাশি ছড়া লেখা, গান বাজনা, সাঁতারেও রেবতীভূষণের বিপুল উৎসাহ আজীবনের। তাঁর রচিত ছড়ার সঙ্কলনটির নাম “ছড়ানো বই”।
কথায় কথায় একটি মজাদার তথ্য জানালেন তিনি। তা হল, তাঁর বিয়ের সময় ‘সাতপাকের পাঁচালী’ নামে একটি পুস্তিকা তিনি প্রকাশ করেছিলেন। ওই পাঁচালির ‘পদকর্তা’রা ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, আশাপূর্ণা দেবী, সাগরময় ঘোষ,
রাজশেখর বসু, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, নরেন্দ্র দেব, মনোজ বসু, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, শিবরাম চক্রবর্তী প্রমুখ।

ডায়রির পাতা


এহেন একজন মানুষের সঙ্গে আলাপের ফাঁকে একদিন তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলাম আমার অটোগ্রাফের ডায়রিটি। বললাম, আপনার ছড়া ও ছবির একটা যুগলবন্দী যদি পাই, পরম সৌভাগ্য জ্ঞান করব। নিরাশ করলেন না। চটজলদি একটি বাসাসহ পাখীর স্কেচ এঁকে আমার নিবাসস্থল আগরপাড়ার অনুষঙ্গে লিখে দিলেন মিষ্টি একটি ছড়াঃ
“আঁকাবাঁকা রেখার পাখী
গান গায় সে খাসা
মাঝে মাঝে কপচায় সে
ছড়ার মতো ভাষা
ওতোরপাড়ার খেয়ে তাড়া
হয়ে গেল বাসাছাড়া
নতুন করে বানিয়ে নিল
আগরপাড়ায় বাসা!”

আমার বিস্মৃতপ্রায় স্মৃতির মতো ছড়াসহ পাখীটিও এতদিন লোকচক্ষুর আড়ালেই বন্দী ছিল ডায়রির পাতায়। আজ তাকেও মুক্ত করে দিলাম আপনাদের দরবারে।


পরিশেষে জানাই, এই বিশিষ্ট বাঙালি ছড়াদার ব্যঙ্গচিত্রীর জীবনকাল ১৯২১ থেকে ২০০৭। গত ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শতবর্ষের সীমানা ডিঙিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, কিছুকাল আগে লালমাটি প্রকাশন একটি জরুরি কর্তব্য পালন করেছেন তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর ‘রেবতীভূষণ: শিল্পী ও কার্টুনিস্ট’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে। বিস্মৃতির পাহাড় পেরিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে তাঁরা দুই মলাটের মধ্যে ধরে রাখলেন শিল্পী রেবতীভূষণকে। তাঁরা আমাদের ধন্যবাদার্হ।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x