শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বাংলা গানের উজ্বল কারিগরেরা (পর্ব – ৩)

সলিল চৌধুরী ও অনল চট্টোপাধ্যায়

‘বাংলা গানের উজ্জ্বল কারিগরেরা’ শীর্ষক আলোচনার দ্বিতীয় পর্বের শেষ দিকে গীতিকার-সুরকারদের সম্বন্ধে বলা শুরু করে সেই সময়কার একজন বিশিষ্ট সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব সুধীন দাশগুপ্ত সম্বন্ধে কিছুটা লেখার চেষ্টা করেছি। এই পর্বের শুরুতে গীতিকার সুরকার হিসেবে বাংলা বেসিক গানের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র সলিল চৌধুরীর কথায় আসব। সলিল চৌধুরীকে নিয়ে পাঠকদের কাছে কিছু বলা হয়তো পুনরাবৃত্তি হবে, এটা জেনেও এই বিস্ময়কর প্রতিভাটির সম্বন্ধে কিছু আলোচনা না করলে বাংলা গানের কারিগরদের উপাখ্যান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলে মনে করি।

১৯২৫ সালের ১৯ শে নভেম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুর সোনারপুর অঞ্চলের গাজীপুরে সলিল চৌধুরীর জন্ম। ওঁর বাবা জ্ঞানেন্দ্র চৌধুরী আসামের কাজিরাঙার কাছে হাথিকুলি চা বাগানে ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ডাক্তারীর চাকরিতে ছিলেন। ওঁর সংগ্রহে পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের রেকর্ডের এক বিশাল সম্ভার ছিল। আর ডাক্তারী করার পাশাপাশি তিনি চা বাগানের শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত মানুষদের নিয়ে নিয়মিত নাটকের অনুষ্ঠান করতেন। যে নাটকগুলিতে ওই সব মানুষের সুখ, দুঃখ ও নানা রকমের সমস্যার কথা থাকত। বাবার কাছেই সলিল বাবুর সঙ্গীত শিক্ষার হাতেখড়ি।

পড়াশুনা শুরু করার জন্য বালক সলিলকে কলকাতায় সুকিয়া স্ট্রিটে তাঁর জ্যাঠামশাইয়ের বাড়িতে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে থাকাকালীন তিনি তাঁর জ্যাঠতুতো দাদা নিখিল চৌধুরীর কাছেও সঙ্গীতের তালিম নেন খুব ছোটবেলা থেকে। মাত্র ছ’ বছর’ বয়সেই তিনি তাঁর দাদার কাছ থেকে পিয়ানো বাজাতে শেখেন। মূলতঃ নিখিল চৌধুরীর বৃন্দবাদনের দল ‘মিলন পরিষদ’ এর মাধ্যমেই গানের জগতে শৈশবেই তিনি প্রবেশ করেন। ছেলেবেলা থেকেই যেহেতু তাঁর সঙ্গীতের প্রতি তীব্র আকর্ষণ ছিল,অল্পদিনের মধ্যেই তিনি বাঁশী, হারমোনিয়াম এবং এস্রাজ বাজানো শিখে গিয়েছিলেন। কিন্তু কলকাতায় খুব বেশিদিন তাঁর থাকা হয়নি। এরপরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুভাষগ্রামে (কোদালিয়া) মামার বাড়িতে থেকে তিনি পড়াশোনা করেন।

আবার শৈশবের বেশীর ভাগ সময় যখন তিনি আসামের চা বাগানে কাটাতেন, তখন তিনি তাঁর বাবার সংগ্রহে থাকা পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতেন প্রাণভরে। তাছাড়া সেখানকার শান্ত, মুক্ত প্রকৃতি থেকে ভেসে আসা নানা রকমের সুর তাঁকে আকৃষ্ট করতো। আর বাবার জীবনচর্যা থেকেই তিনি আভাস পেয়েছিলেন, যে কোন শিল্পসৃষ্টির সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার যোগ থাকাটা আবশ্যিক।

হরিনাভি বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পরে তিনি কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বি এ পাশ করেন। পড়াশোনা চলতে চলতেই তিনি সঙ্গীত বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন। ১৯৪৩ সালে মামার বাড়ির গ্রামে থাকতে থাকতেই তিনি একটি বড় কৃষক আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেন। তিনি সেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে কৃষকদের নিয়ে গান তৈরী করেন। ১৯৪৪ সালে এম-এ পড়ার সময় তিনি পঞ্চাশের মন্বন্তরের পরিণতিতে মনুষ্য-সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের কারণে কলকাতার রাস্তায় মানুষের মৃত্যু-মিছিল দেখেছিলেন। সাধারণ মানুষের উপরে নেমে আসা এইসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার ইচ্ছে নিয়ে তিনি কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং আই পি টি এ-তে যোগ দেন।

আই পি টি -এর কর্মী-শিল্পীরা তখন অশেষ কষ্টের মধ্যে দিয়ে গ্রামে গঞ্জে ঘুরে ঘুরে মানুষকে সচেতন করার জন্য নাটক ও গানের অনুষ্ঠান করতেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় সকলেই স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। তাঁরা বেশিরভাগ জায়গায় তাঁরা পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতেন। সলিল বাবু নামমাত্র কিছু পারিশ্রমিক পেতেন। শাসকের বিরুদ্ধে প্রচার করতেন বলে তাঁদের ভাগ্যে অত্যাচার জুটতো। সলিল বাবু তখন ‘বিচারপতি’, ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’ শিরোনামের গানগুলি তৈরী করে জনপ্রিয় হয়েছেন। ফলে তাঁর নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা বেরিয়েছিলো এবং তাঁকে আত্মগোপন করতে হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূ’ গানটি রেকর্ড করিয়েছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত একদিন নানা কারণে তাঁকে আই পি টি এ্রর সংযোগ ছাড়তে হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে তিনি ‘পরিবর্তন’ নামের একটি ছায়াছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন। এটিই ছায়াছবিতে তাঁর প্রথম কাজ। কিছু পরে তাঁর লেখা একটা ছোটগল্প ‘রিকশাওয়ালা’ নিয়ে একটি ছবি তৈরী হয়। সেটাতেও তিনি সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। পরে সেই গল্প নিয়ে বিমল রায় হিন্দিতে ‘দো বিঘা জমিন’ নামের ছায়াছবিটি তৈরী করেন। সেই ছবিটি সেই বছর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিল এবং পরে কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে নেয়। এই ছবিটি সলিল বাবুর কর্মজীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।

তিনি আনুমানিক ৭৫টি হিন্দী, ৪১টি বাংলা, ২৭টি মালয়ালম এবং বেশ কিছু মারাঠী, তামিল, তেলুগু, কান্নাড়, গুজরাটি, ওড়িয়া এবং অসমিয়া ছবিতে সুর দিয়েছিলেন। তাঁর সুরে পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সঙ্গীতের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছিল।

বাংলা পুজোর গানের জগতে সলিল চৌধুরীর গান অতীব জনপ্রিয় হয়েছিল। ওঁর লেখা ও সুর করা বেশীর ভাগ গান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর, শ্যামল মিত্র এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মত বড় শিল্পীরাই গাইতেন। অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে যে বছর যে শিল্পীকে দিয়ে তিনি গান গাওয়াতেন, সে বছর তাঁর গানও নিশ্চিতভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠত। তাঁর গানে সুরের আকর্ষণ এতটাই প্রবল ছিল যে সেখানে কথার আবেদন প্রায় সময়ই গৌণ হয়ে যেত। কিছু ক্ষেত্রে সুরের সঙ্গে কথা মানানসই হয়নি এমন উদাহরণও আছে। যেমন শ্যামল মিত্রের ‘ওই আঁকা বাঁকা যে পথ যায় সুদূরে’ অথবা লতা মঙ্গেশকরের ‘অন্তবিহীন’ গানদুটি। তবু সে সব কারণে গানের জনপ্রিয়তায় কোন বাধা হয়নি কখনো।

বাংলা পুজোর গানের জগতে সলিল চৌধুরীর যে অবদান, সেখানে গীতিকার বা সুরকার হিসাবে সেই অবদানকে আলাদা করা যায়না। কারণ, ওঁর সুরে উনি নিজেই কথা বসাতেন। হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরের সুরে যে কটি গান বাংলায় লতা বা আশা গেয়েছেন, তার সবগুলোতেই উনি কথা লিখেছেন। এ ছাড়া অন্য অনেক সুরকারের জন্যও উনি গান লিখেছেন। কিন্তু কিছু বিখ্যাত কবিতা ছাড়া অন্য কারো গানের কথায় উনি বোধহয় সুর করেননি। একমাত্র ব্যতিক্রম, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধে ওঁর কথায় নির্মলা মিশ্রের জন্য একবার পুজোয় উনি দুটি গানের সুর দিয়েছিলেন। গান দুটি হল, ‘এ মন মোর জানিনা কোথা যে হারালো’ এবং ‘আমার এ বেদন মাঝে তুমি অশ্রু হয়ে এলে’।

সাধারণত গানের কোনো বিষয় মাথায় এলে উনি সুর এবং যন্ত্রায়োজনের কাজটা আগে করতেন। কথা বসাতেন পরে। একবার উনি সাগর সেনের জন্য গান রেকর্ড করাবেন। এইচ এম ভি স্টুডিওতে যন্ত্র শিল্পীদের নিয়ে দুবার রিহার্সাল করানো হয়ে গেছে। সাগর সেন এসে সলিল বাবুর কাছে গান চাইলেন। জানা গেল গানের কথা তৈরী হয়নি। সলিল বাবু তৃতীয় বার রিহার্সাল করতে বলে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে এইচ এম ভি র সুইমিং পুলের কাছে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে গান লিখে নিয়ে সাগর সেনের হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই নে তোর গান’। গানটি ছিল, ‘এই জীবন এমনি করে আর তো সয় না’। মোটামুটি একই রকম অভিজ্ঞতা ওঁর স্ত্রী সবিতা দেবীর কলকাতা বেতার কেন্দ্রে প্রথম গান গাইবার সময় হয়েছিল। গানটি ছিল, ‘হলুদ গাঁদার ফুল দে এনে দে’। পিন্টু ভট্টাচার্যের বোম্বের স্টুডিওতে গান রেকর্ড করাবার সময়ও এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। গানটি ছিল, ‘ওগো আমার কুন্তলিনী প্রিয়ে’।

এবার সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে আধুনিক মূল ধারার কিছু উল্লেখযোগ্য বাংলা গানের তালিকায় চোখ রাখা যাক।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘কোন এক গাঁয়ের বধূ’, ‘হেই সামালো’, ‘ও মাঝি ভাইও’, ধিতাং ধিতাং বোলে’, ‘পথ হারাবো বলেই এবার’, ‘দুরন্ত ঘূর্ণির’, ‘মনের জানালা ধরে’, ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম’, ‘আমায় প্রশ্ন করে’, ‘শোন কোন একদিন’, লতা মঙ্গেশকরের ‘ও বাঁশী কেন হায়’, ‘কেন কিছু কথা বলনা’, ‘যা রে যা রে উড়ে যা রে পাখী’, ‘ওগো আর কিছু তো নাই’, ‘কিছু তো চাহিনি আমি’, ‘এবার আমি আমার থেকে’, ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’, ‘ও মোর ময়না গো’, ‘ও প্রজাপতি প্রজাপতি’, ‘কি যে করি’, ‘ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক’, ‘পা মা গা রে সা’, ‘কে যাবি আয়’, ‘না মন লাগে না’, ‘বড় বিষাদ ভরা রজনী’, ‘না যেওনা’, শ্যামল মিত্রর ‘আহা ওই আঁকা বাঁকা পথ’, ‘যদি কিছু আমারে শুধাও’, ‘দূর নয় বেশী দূর ওই’, ‘যা যারে যা যা পাখী’, ‘ধিন তাক কুড় ধিন তাক’, ‘যাক ধুয়ে মুছে যাক’, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘গুন গুন মন ভোমরা’, ‘যদি নাম ধরে তারে ডাকি’, ‘নি সা গা মা পা নি সা রে গা’, মুকেশের ‘মন মাতাল সাঁঝ সকাল’, ‘ঝুন ঝুন ময়না নাচ না’, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নাও গান ভরে’, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের ‘শ্যামল বরণী ওগো কন্যা’, ‘একদিন ফিরে যাব চলে’, ‘পল্লবিনী গো সঞ্চারিনী’, ‘ক্লান্তি নামে গো’, ‘মেঘ বরণ কালো চুলে’, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’ , ‘ওই যে সবুজ বন বীথিকা’, ‘এবার আমার সময় হল যে যাবার’, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের ‘ঝনানা ঝনানা বাজে’, ‘অন্ত বিহীন এই অন্ধ রাতের শেষ’, পিন্টু ভট্টাচার্যের ‘আমি চলতে চলতে থেমে গেছি’, ‘ওগো আমার কুন্তলিনী প্রিয়ে’, সবিতা চৌধুরীর ‘এনে দে এনে দে ঝুমকা’, ‘হলুদ গাঁদার ফুল দে এনে দে’, ‘যা রে যা,আমার আশার কূল ভেসে যা’, ‘দূর দূর দূরান্ত ওই দূর পাহাড়ে’, ‘সুরের ওই ঝর ঝর ঝরনা’, ‘ও বউ কথা কও বলে পাখী আর ডাকিস না’, অন্তরা চৌধুরীর ‘আয় রে ছুটে আয় পূজোর গন্ধ উঠেছে’, ‘বুলবুল পাখী ময়না টিয়ে’, ‘এক যে ছিল মাছি’, ‘ও সোনা ব্যাঙ ও কোলা ব্যাঙ’ ইত্যাদি।

ভারতীয় সঙ্গীতের এই বিস্ময়কর প্রতিভা একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত আয়োজক (Arranger), কবি এবং গল্প লেখক ছিলেন। সঙ্গীতের জগতে তাঁর অসামান্য কুশলতার জন্যে দেশে-বিদেশে সম্মানিত হয়েছিলেন সলিল চৌধুরী। সেরা সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে ১৯৫৮ সালে মধুমতী ছায়াছবির জন্য তিনি পেয়েছিলেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। ১৯৮৮ সালে তিনি সম্মানিত হয়েছিলেন সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমী পুরস্কারে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় সলিল চৌধুরী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। ওঁর ১৯৭১ সালের অ্যালবাম ‘বাংলা আমার বাংলা’-তে উনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গান প্রকাশ করেছিলেন। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে তাঁকে মরণোত্তর ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মান’ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।

১৯৯৫ সালে মাত্র ৭০ বছর বয়সে কলকাতায় এই সৃষ্টিশীল প্রতিভা বিদায় নিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে। সলিল লিখে গিয়েছিলেন, ‘ধরণীর পথে পথে ধুলি হয়ে রয়ে যাব, এই কামনা’। বাংলা তথা ভারতীয় সঙ্গীত জগতে গানের অসামান্য এক সম্ভার রেখে যাওয়ার পরেও কত ছোট তাঁর চাওয়া! উনি কি জানতেন না যদি ওঁর করা গানগুলি শোনানো যায়, তবে সেগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে বয়ে চলবে? আজও ওঁর গানের প্রভাব সঙ্গীত ও যন্ত্রশিল্পীদের এবং সংগীতপ্রেমী মানুষদের মনে কতটা আছে তার প্রমাণ শতবর্ষের প্রাক্কাল থেকে ওঁর বিভিন্ন স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন থেকে অনুভব করা যায়।

সলিল-সহযোগী

সলিল চৌধুরীর পরে তাঁর তিন সহযোগীর কথায় আসব। সবাই জানেন, তাঁরা হলেন অনল চট্টোপাধ্যায়, প্রবীর মজুমদার ও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। সলিল বাবু সন্ধি করে তাঁদের বলতেন, “প্রবিরানলাভিজিৎ”। বয়সের হিসাবে এঁদের মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায়। সলিল জন্মেছেন ১৯২৫-এ, ১৯২৭-এ অনল, ১৯২৯-এ প্রবীর, ওই বছরে কিছু পরে সুধীন দাশগুপ্ত এবং ১৯৩১-এ অভিজিৎ।

এঁদের মধ্যে সুধীন দাশগুপ্ত সমসাময়িক হয়েও এই বৃত্তের বাইরে। যদিও তিনি আলাদা ভাবে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের যুক্ত ছিলেন। বাকিদের সলিলের সঙ্গে পরিচয় এই গণনাট্য সংঘেই। তিনি এঁদের সবাইকেই গণ জাগরণের গান তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এঁদের প্রতিভাকে লালন ও বিকাশের জন্য সব সময়েই সচেষ্ট ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই তিন ঘনিষ্ঠ সহযোগী সলিলের প্রভাবের বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে এসে স্বকীয়তায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

অনল চট্টোপাধ্যায়

বয়স অনুসারে পরবর্তীতে যে গীতিকার – সুরকারের কথা আসে, তিনি হলেন অনল চট্টোপাধ্যায়। আধুনিক বাংলা গানের জগতে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়েই তাঁর স্নিগ্ধ উপস্থিতি। ১৯২৭ সালের ২৪-এ অক্টোবর কালীপূজার দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি বাড়ী বাংলাদেশের বরিশাল জেলার সিদ্ধকাটি গ্রামে হলেও হাওড়ার সালকিয়ায় তাঁদের পরিবারটি বেশ প্রাচীন।

বাড়িতে সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশ ছিল।তাঁর পিতামহী অত্যন্ত গুণী শিল্পী ছিলেন। ওঁর কাছেই অনলের সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছিল।

পরিবারে তাঁরা চার ভাই পাঁচ বোন ছিলেন।বাড়িতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁরা অংশগ্রহণ করতেন। তাঁরা সবাই মিলে “আমাদের দল” নামে একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী তৈরী করেছিলেন। তিনি হতে চেয়েছিলেন লেখক। ছোটবেলা থেকেই তাঁর গল্প কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল। সতেরো বছর বয়সেই তিনি এক প্রকাশনার “প্রহেলিকা সিরিজের ২৩-তম গ্রন্থ কিশোর রোমাঞ্চ উপন্যাস লিখে বেশ নাম করে ফেলেন। এই লেখালেখির কল্যাণেই তাঁর আলাপ হয়েছিল হেমেন্দ্র কুমার রায় ও প্রভাত কিরণ বসুর সঙ্গে। ওঁদের উৎসাহে তিনি কলেজে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখতেন। এই সময়েই সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে পরিচয় হলে ১৯৪৬ সালে প্রগতি লেখক সংঘে যোগ দেন। ওই বছরেই দেব সাহিত্য কুটির থেকে তাঁর লেখা বই “রত্নতৃষ্ণা কাহিনী” প্রকাশিত হয়।

ক্রমশ তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন এবং সেখানেই সলিল চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় এবং জীবনের দিক বদল। প্রচুর লেখালেখির মধ্যেও গান তাঁকে আকর্ষণ করতে থাকে। ছোটবেলা থেকেই গানের তালিম নেওয়া ছিল। নাড়া বেঁধে শিখেছিলেন গুরু পঞ্চানন রায়ের কাছে। পরে পেয়েছিলেন সলিল চৌধুরী, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখের সঙ্গীত আদর্শে নিজেকে তৈরী করার সুযোগ। শিক্ষা পেয়েছিলেন তারাপদ চক্রবর্তী, গণেশ বসু, নিত্যপ্রিয় ঘোষ দস্তিদার প্রমুখের কাছে।

অনল চট্টোপাধ্যায়

তেভাগা আন্দোলনের (১৯৪৬-১৯৪৭) পরিপ্রেক্ষিতে রচনা করা ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অনেক গণসঙ্গীত জনপ্রিয় হয়েছিল। তার মধ্যে অনলের লেখা “গুরু গুরু মেঘের বাদল” এবং “অনেক ভুলের মাশুল তো ভাই দিলাম জীবন ভরে” গান দুটিতে সুর দিয়েছিলেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। অনলের লেখা ও সুর দেওয়া “আজ বাংলার বুকে দারুণ হাহাকার” দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল অনলের কথায় এবং অভিজিতের সুরে প্রকাশিত হয়েছিল “কোথায় সোনার ধান” নামের বিখ্যাত গানটি। গণনাট্য সংঘের আর একটি উদ্দীপক গান “যুব সম্মেলনে সমবেত হয়ে গাহি জীবনের জয়গান” গানটিও অনলের লেখা এবং অভিজিতের সুর দেওয়া।

ক্যালকাটা ইউথ কয়ারের সঙ্গেও উনি সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। “আমাদের জপতপ মন্ত্র” ও “এ দেশের দিকে” গান দুটির লেখা ও সুর অনল চট্টোপাধ্যায়ের।
গণনাট্য সংঘের কাজ করে ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়া সম্ভব ছিলনা বলেই অনলদের জীবনধারণের জন্য বিকল্প উপায়ের প্রয়োজন। সলিল চৌধুরীর সহায়তায় ব্যবসায়িক সঙ্গীত জগতে পা রেখেছিলেন অনল (প্রবীর ও অভিজিতের মতই)।

১৯৫৪ সালে ‘আজ সন্ধ্যায়’ ছায়াছবিতে গীতিকার হিসেবে কাজ করেন অনল। সেই ছিল ছায়াছবির জগতের সঙ্গে অনলের প্রথম পরিচিতি। সলিল চৌধুরীর সহকারী হিসাবে ‘পাশের বাড়ী’, ‘আজ সন্ধ্যায়’, ‘মহিলা মহল’, ‘ভোর হয়ে এল’, ‘তাদের কেল্লা’, ‘বাড়ী থেকে পালিয়ে’, ‘গঙ্গা’ প্রভৃতি ছায়াছবিতে কাজ করেন। ১৯৫৫ সালে মৃণাল সেনের ‘রাত ভোর’ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন সলিল। এই ছবিতে অতিরিক্ত গীতিকার ছিলেন অনল। পরবর্তী কালে নিজেই সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন ‘জন্মভূমি’, ‘উপলব্ধি’, ‘উৎসর্গ’, ‘মেঘ রোদ বৃষ্টি’, ‘মায়া’, ‘মায়াবিনী লেন’, ‘জি টি রোড’, ‘রাজ পুরুষ’, ‘শেষ অঙ্ক’, ‘দেবী গর্জন’ ছায়াছবিতে।

অনল চট্টোপাধ্যায়ের আধুনিক বাংলা গানের প্রসঙ্গে বলতে গেলে দেখা যাচ্ছে, গীতিকার সুরকার হিসেবে একই গানের গীতিকার ও সুরকার অনল চট্টোপাধ্যায়, এরকম খুব কম গানেই দেখা গেছে। প্রথম দিকে ওঁর ভূমিকা মুখ্যত ছিল গীতিকারের। সুরকার ভিন্ন কেউ। আবার পরে যখন সুর দিয়েছেন, তখন গীতিকার অন্য কেউ। দুটি ক্ষেত্রেই অনল অসাধারণ। উদাহরণ হিসাবে যদি একজন শিল্পীর গান ধরা যায়, যেমন কানু ঘোষের সুরে গীতা দত্তের ‘ওই সুর ভরা দূর নীলিমায়’ বা ‘আকাশ জুড়ে স্বপ্ন মায়া’ গানের কথা অনলের। আবার ‘কত গান হারালাম’ বা ‘কৃষ্ণনগর থেকে আমি কৃষ্ণ খুঁজে এনেছি’ গান দুটির সুরকার অনল। অনলের সুর মনমাতানো নয়, মন মজানো।

গীতা দত্ত

কানু ঘোষের সুরে গাওয়া উল্লিখিত গান দুটির গীতিকার হবার সুবাদে গীতা দত্তের সঙ্গে ঘনিষ্ট পরিচয় হয়েছিল অনলের। ১৯৬২ সালে গীতা দত্তের পূজোর গানের সুরকার অনল। ‘কত গান হারালাম’ গানটির গভীরে আছে গীতা দত্তের আশাভঙ্গের ব্যথা, অপ্রাপ্তির হতাশা। অনলের অনেক অনুরোধের পর গীতা ওই গানটি গাইতে রাজি হয়েছিলেন। তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নানান সংঘাতে বিধ্বস্ত, সম্ভবত আসন্ন ঝড়ের সংকেতে ভাবনা তখন ত্রস্ত। শোনা যায়, রেকর্ডিংয়ের সময় নাকি অঝোরে ঝরেছিল শিল্পীর চোখের জল। গানটি যখন শোনা যায়, সুর বিস্তারের সাথে সাথে বিষাদ যেন মনের গভীরে ছড়িয়ে যায়। গানটি চিরকালের সেরা আধুনিক বাংলা গানগুলির অন্যতম হয়ে রয়েছে। আবারন ‘কৃষ্ণনগর থেকে আমি কৃষ্ণ খুঁজে এনেছি’ গানটির উচ্ছল সুরের রেকর্ডিংয়ের সময় শিল্পীও উচ্ছল হয়ে উঠেছিলেন।

একবার সুবীর সেনের জন্য একটি গান লিখে, সুর করে সুধীন দাশগুপ্তর বাড়িতে নিয়ে গেছেন। সুধীন বাবু গানটি পড়েই বললেন, ‘এটার সুর আমি করব’। অনল বললেন, ‘কিন্তু আমি তো সুর করেই ফেলেছি’। সুধীন বাবু নাছোড়বান্দা। অতঃপর সুধীন বাবু সুর করলেন। যেহেতু তাঁর সুরটাই ভাল লাগল, তাই ১৯৫৭ সালে সুবীর বাবুর কণ্ঠে সেই ‘তোমার হাসি লুকিয়ে হাসে’ গানটি পূজোর গান হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল।

একজন সাধারণ শ্রোতা হিসাবে অনলের লেখা ও সুর করা গানগুলি নিয়ে অনেক কথা বলার ইচ্ছে হলেও সেসব এড়িয়ে ওঁর লেখা কিছু গানের তালিকা নিচে দিলাম। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘ক্লান্ত চাঁদের নয়নে ঘুম’, ‘পথে যেতে যেতে ফিরে ফিরে চাই’, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘জীবনের এই বালুবেলায়’, ‘ক্লান্ত যে আমি জীবন বীণার সুর বেঁধে’, ‘বোঝ না তো কেন এত ভালবাসি’, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কঙ্কাবতীর কাঁকন বাজে’, ‘ভোর হল দোর খোল’, নির্মলেন্দু চৌধুরীর ‘তোমার লাগিয়া রে’, ‘আমার সাধের নাও’, গায়ত্রী বসুর ‘রিনি ঝিনি মঞ্জির বাজে কার পায়’, ‘দেখ দেখ কৃষ্ণচূড়া’, সুবীর সেনের ‘তোমার হাসি লুকিয়ে হাসে’, গীতা দত্ত র ‘ওই সুর ভরা দূর নীলিমায়’, ‘আকাশ জুড়ে স্বপ্ন মায়া’, সুপ্রীতি ঘোষের শেষ গান ‘আমার এ গান ওই সাত রঙে’ ইত্যাদি।

এবার অনল চট্টোপাধ্যায়ের সুরে কিছু বিখ্যাত গানের তালিকায় আমরা চোখ রাখব।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের ‘কাল সারা রাত চোখে ঘুম ছিল না’, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ছলকে পড়ে কলকে ফুলে’, ‘মেঘ রাঙানো অস্ত আকাশ’, ‘কাজল ধোয়া চোখের জলে’, ‘প্রজাপতি প্রজাপতি রে’, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মধুমতী যায় বয়ে যায়’, ‘তন্বী তনু বহ্নি আঁখি’, ‘না না যাসনে পাখি’, ‘তুমি একটি পলাশ’, ‘তুমি চেয়েছিলে শুধু একটি ঝিনুক’, আরতি মুখোপাধ্যায়ের ‘ওগো মনের দুয়ারে’, ‘জানি এ ভুল’, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘ওই চন্দ্রকলা সে তো তোমারি মতন’, ‘বর্ষাক্লান্ত ও দুটি নয়ন’, গীতা দত্ত-র ‘কত গান হারালাম’, ‘কৃষ্ণনগর থেকে আমি’, সুবীর সেনের ‘তুমি একটি ঝলক হাসি’, ‘তোমার শিশির ভেজা’, ‘কোন পথে যাব দুজনে’, ‘ডাকলেই সাড়া দিতে নেই’, ‘চন্দন আঁকা ছোট্ট কপাল’, উৎপলা সেনের ‘এই মনটাই করে যত গোলমাল’ পিন্টু ভট্টাচার্যের ‘আমার দুখের রজনী’, ‘ফিরে যেতে চাই’, ‘জানি পৃথিবী আমায় যাবে ভুলে’, ‘না দেখাই ছিল ভাল’, ‘জানিনা কখন যে সে’, ‘ভয় হয়, এত ভাল বেসেছ আমায়’, ‘সোনা রোদের গান’, সনৎ সিংহের ‘সরস্বতী বিদ্যেবতী’ ইত্যাদি।

সুরকার হিসাবে আধুনিক বাংলা গানের জগতে অনলের অবস্থান অনেকটা ইংরেজী Part of speech এর মধ্যে adverb এর মত বলে আমার মনে হয়। যেসব শিল্পীরা ওঁর করা সুরে গান গেয়েছেন, তাঁদের কোন অ্যালবামের গান শুনতে শুনতে যদি কোন গান শুনে খুব ভাল লেগে গেল অথচ বিখ্যাত কোন সুরকারের সুরের চলনের সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে না মনে হচ্ছে, তখন ধরে নেওয়া যাবে এটা অনলের সুর। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে মিলে যাবে অনুমান। এটা একান্তই আমার নিজস্ব অনুভব। এটা মেনে নেবার দায় কারো নেই।

তাঁর সুরারোপিত বাংলা গানের এক উজ্জ্বল ভান্ডার রেখে অনল চট্টোপাধ্যায় পৃথিবীকে বিদায় জানান কলকাতায় ২০১৪ সালের ১৭ই এপ্রিল।

(ক্রমশ)

[তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণঃ আন্তর্জাল]

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x