
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম অর্ধে, বাঙলার নবজাগরণের উষা লগ্নে, সমাজ যে যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশী আলোড়িত হয়েছিল তারমধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল ১৮২৮ খ্রীষ্টাব্দে রাজা রামমোহন রায় কর্তৃক ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা এবং তার পরবর্তী কার্যক্রম। প্রাচীন সনাতন হিন্দু ধর্মকে হাজারো কুসংস্কার আর আচার বিচারের নিগড় থেকে মুক্ত করে সুসংস্কৃত রূপে তুলে ধরাই ছিল তাঁর অন্তরের আকাঙ্ক্ষা। এরই সূত্র ধরে এসে পড়ে সমাজ সংস্কারের অনিবার্য উদ্যোগ। ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে রামমোহনের আকস্মিক মৃত্যুতে কিছুটা ব্যাহত হলেও এক দশক পর ১৮৪৩-এ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্মসমাজে যোগদান ধর্মান্দোলনকে নতুন মাত্রায় সংস্থিত করে। তিনি ব্রাহ্মসমাজের নিয়ম ও নীতি নতুন ভাবে সংস্কার করে লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীকালে কেশব চন্দ্রের আবির্ভাব ধর্মান্দোলনের ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে ব্রাহ্ম সমাজকে বৃহত্তর সমাজ আন্দোলনের পরিসরে উন্মুক্ত করে। খ্রীষ্টান মিশনারীদের ধর্মান্তরকরণের বিপ্রতীপে হিন্দুধর্মের অস্তিত্ব রক্ষায় বিরাট শক্তি নিয়ে উঠে আসতে থাকে ব্রাহ্মসমাজ।
ধর্ম-সমাজ-শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য সমস্ত ক্ষেত্রে যখন নবজাগরণের আলোয় উদ্ভাসিত নগর কলকাতা, তখন সেই আলোর উদ্ভাস কি কোনো ভাবে এসে পড়েছিল জলঙ্গী তীরবর্তী এই প্রাচীন জনপদ কৃষ্ণনগরের বুকে? যে কৃষ্ণনগর ছিল অষ্টাদশ শতকের বাঙলার সাংস্কৃতিক রাজধানী — উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কেমন ছিল তার বৌদ্ধিক অন্দরমহল? কেমনইবা ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ব্রাহ্ম নব্য যুবা সম্প্রদায়ের প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে রক্ষণশীল সমাজের অনিবার্য টানাপোড়েন? আর এই সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বে কৃষ্ণনগর রাজপরিবারের ভূমিকাই বা কী ছিল? এই নিবন্ধে স্বল্প পরিসরে আমরা উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের শহর কৃষ্ণনগরকে ফিরে দেখার চেষ্টা করব।

সময়টা ১৮৪১। নদীয়ার রাজ সিংহাসনে তখন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র রাজা গিরিশচন্দ্রের (কৃষ্ণচন্দ্র>শিবচন্দ্র>ঈশ্বরচন্দ্র>গিরীশ চন্দ্র) দত্তক পুত্র মহারাজ শ্রীশচন্দ্র রায়। শ্রীশচন্দ্র নিজে খুব বিদ্যানুরাগী ও ধার্মিক মানুষ ছিলেন। মনু, স্মৃতি, গীতা, উপনিষদ প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠের পাশাপাশি ইংরাজী শিক্ষার প্রতিও ছিলেন গভীরভাবে অনুরক্ত। বাল্যকালে তিনি ডিরোজিয়ান রামতনু লাহিড়ির কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রী প্রসাদ লাহিড়ির নিজের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত (১৮৩৭ খ্রীষ্টাব্দ) ইংরাজী শিক্ষাকেন্দ্রে কিছুকাল পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালেই ১৮৪৬-এর ১লা জানুয়ারী কৃষ্ণনগর কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। তখন ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন হেনরি হার্ডিঞ্জ। তখনকার দিনে রাজ পরিবারের সদস্যদের বিদ্যাশিক্ষার আয়োজন হতো মূলতঃ রাজ পরিবারের অভ্যন্তরেই। শ্রীশচন্দ্র সে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটালেন। তিনি পুত্র সতীশচন্দ্রকে কলেজে সাধারণ পরিবারের ছাত্রদের সঙ্গে একাসনে পড়তে পাঠালেন। ঘটনাটি তখনকার দিনে অভূতপূর্ব ছিল। শুধু তাইই নয়, তিনি নিজেও হলেন কলেজ কমিটির একজন সভ্য। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন, “কেবল যে নামমাত্র সভ্য হইলেন তাহা নহে, কমিটির প্রত্যেক অধিবেশনে উপস্থিত থাকিয়া কার্য্য-নির্ব্বাহ বিষয়ে বিশেষ সহায়তা করিতে লাগিলেন”। শুধু সভার কাজ নির্বাহ করাই নয়, দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্র তাঁর ‘ক্ষিতীশ বংশাবলী চরিত’এ, উল্লেখ করছেন যে শ্রীশচন্দ্র “প্রতিবৎসর ছাত্রগণের বঙ্গভাষার পরীক্ষার ভার লইতেন”। বিদ্যাচর্চার প্রতি শ্রদ্ধাশীলতাই যে শ্রীশচন্দ্রকে তাড়িত করেছিল, সেকথা বলাই বাহুল্য।

ইতিমধ্যে কৃষ্ণনগর এবং সংলগ্ন এলাকায় খ্রীষ্টান মিশনারী দের ধর্মপ্রচার শুরু হয়েছে জোর কদমে। গড়ে উঠছে গীর্জা, পানশালা, ক্লাব ইত্যাদি। একটা নতুন ধরণের চালচলন ও সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে শুরু করেছে শহর কৃষ্ণনগর। ১৮৩৪ সালে চার্চ মিশনারী সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত স্কুলের মাধ্যমে নদীয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রথম ইংরাজী বিদ্যালয়। শুরু হয়েছে বিদেশী ভাবধারায় শিক্ষা দানের ব্যবস্থা।দরিদ্র এলাকায় চলছে খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরকরণের প্রচেষ্টাও।
এই সময় রামতনু লাহিড়ী হেয়ার সাহেবের স্কুল থেকে শিক্ষা লাভ করে এসে কৃষ্ণনগরে নতুন চিন্তাধারা ও কুসংস্কার মুক্ত ভাবধারা প্রচলন করবার চেষ্টা শুরু করলেন। সঙ্গী ছিলেন তাঁর ভাই প্রসাদ লাহিড়ী। মিশনারীদের ইংরাজী শিক্ষাদানের সঙ্গে লাহিড়ী ভ্রাতৃদ্বয়ের শিক্ষাদানের একটা মৌলিক পার্থক্য ছিল। মিশনারীরা শিক্ষা দানের আছিলায় মূলত ধর্ম প্রচার করতেন। তাই তাঁরা হিন্দু ধর্ম ও দেশীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতেন। লাহিড়ী ভাইয়েরা কিন্তু প্রচলিত ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং প্রথম দিকে ধর্ম-বিরুদ্ধ কোনো উপদেশও তাঁরা দিতেন না। পরবর্তীতে তাঁরা স্বদেশের ধর্ম ও রীতিনীতির গুণাগুণ বিষয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন এবং সাকার উপাসনার অলীকতা ও প্রচলিত আচার-ব্যবহারের দোষগুণ উপলব্ধি করেন। ফলে তাঁরা ধর্মকেন্দ্রিক সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে সমচিন্তক একদল ছাত্রগোষ্ঠী তৈরী করতে শুরু করেন। এ বিষয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বন্ধু সোণডাঙ্গার শ্রীযুক্ত ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়। এই প্রসঙ্গে ব্রজনাথের পরিচয় বোধহয় খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ব্রজনাথ ছিলেন চার্চ মিশনারী সোসাইটি (CMS) স্কুলের শিক্ষক। থাকতেন নেদের পাড়ায়। স্কুলের মিশনারী কর্তৃপক্ষ তাঁকে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করার জন্য বিভিন্ন ভাবে চাপ দিয়েও সফল হয়নি। ইতিমধ্যে একটি ছাত্রকে তার পিতামাতার অজ্ঞাতে খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষা দিলে চারিদিকে খুব শোরগোল পড়ে যায়। প্রতিবাদে স্কুলে ছাত্র ধর্মঘট হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবাদের পেছনে ব্রজনাথের প্ররোচনাকে দায়ী করেন। আত্মাভিমানী ব্রজনাথ চাকরী ছেড়ে চলে আসেন। পরবর্তী কালে তিনি গ্রহণ করেন ব্রাহ্ম ধর্ম। দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্র লিখছেন, “এই রূপে কৃষ্ণনগরে প্রচলিত ধর্মের বিপ্লব ঘটিয়া উঠে। ক্রমে ক্রমে অনেক যুবা এই অভিনব মতের অনুরাগী হইলেন”।

যখন এই দ্বিমুখী প্রবাহে কৃষ্ণনগরের জনজীবন আলোড়িত তখন নদীয়া-রাজের অবস্থান কেমন ছিল তা আমাদের কৌতুহল জাগায়। শ্রীশচন্দ্র এই নব্য সংস্কারার্থী যুবদলকে সাগ্রহে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। হিন্দুসমাজের প্রচলিত আচারকেন্দ্রিক ধর্মাচারণ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও তিনি বিভিন্ন রকম ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ নেন। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় আমাদের সপ্রশংস মনোযোগ আকর্ষণ করতে বাধ্য। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যেমন একথা সত্য — কোনো একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার দীর্ঘ পথে যেমন অনেক বিজ্ঞানীর টুকরো টুকরো গবেষণার ধারাবাহিক অবদান থাকে এবং গবেষণাটিকে চূড়ান্ত আবিষ্কারের শিখরে যিনি উন্নত করেন তাঁর নামটিই ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে, সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রটিও এর ব্যতিক্রম নয়। বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর — এ কথা অবিসংবাদিতভাবে ইতিহাস স্বীকৃত। কিন্তু শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ গ্রন্থে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, “…পন্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ই সর্ব্বপ্রথমে বঙ্গসমাজে বিধবাবিবাহের বিচার উপস্থিত করেন। কিন্তু বোধহয় তাহা ঠিক নহে।“ অর্থাৎ চূড়ান্ত পর্বে সমাজের এই কুসংস্কারের অন্ধকারে প্রদীপটি বিদ্যাসাগর মশাই জ্বাললেও সলতে পাকানোর পর্বটি কিন্তু শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগেই। কারা ছিলেন সেই শুরুর ঋত্বিক? ১৮৪২ সাল থেকে রাম গোপাল ঘোষ প্রমুখ ডিরোজিওর শিষ্যগণ যে ‘বেঙ্গল স্পেক্টেটর’ নামে কাগজ প্রকাশ করতে শুরু করেন সেখানেই তাঁরা বিধবা বিবাহের বৈধতা বিষয়ে প্রথম বিতর্কের উপস্থিত করেন বলে শিবনাথ শাস্ত্রী উল্লেখ করছেন। কয়েক মাস ধরে চলেছিল এ আলোচনা। এমনকি পরবর্তী কালে বিদ্যাসাগর মশাই ‘পরাশর সংহিতা’র যে শ্লোকটির ওপর ভিত্তি করে বিধবা বিবাহের শাস্ত্রীয় বৈধতার যুক্তি সাজিয়েছিলেন এবং বঙ্গীয় পন্ডিত মন্ডলীর সঙ্গে নেমেছিলেন তর্কযুদ্ধে, সেই
“নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ
পঞ্চস্বাপৎসু নারীনাং পতিরন্যোবিধিয়তে”
(বিদ্যাসাগর কৃত ব্যাখ্যা হলো — পতি যদি নষ্ট, মৃত, সন্ন্যাসী, ক্লিব কিংবা পতিত হয় সে ক্ষেত্রে নারীর দ্বিতীয় বিবাহ শাস্ত্র সিদ্ধ)
শ্লোকটিও সর্বপ্রথম ঐ পত্রিকার আলোচনাতেই ব্যবহৃত হয়। যে সময়ে এই ঘটনা ঘটছে তখন বিদ্যাসাগর সদ্য সমাপ্ত করেছেন তাঁর সংস্কৃত কলেজের অধ্যয়ন (৪ঠা ডিসেম্বর, ১৮৪১)।

বিধবা বিবাহের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের আলোচনা নিয়ে রাজধানী কলকাতা যখন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে প্রায় সেই একই সময়ে শহর কৃষ্ণনগরের বুকে মহারাজ শ্রীশচন্দ্র রায় ভাটপাড়া ও নবদ্বীপের বৈদান্তিক, নৈয়ায়িক ও স্মার্ত পন্ডিত সমাজের সঙ্গে বারংবার আলোচনায় বসছেন বিধবাবিবাহের শাস্ত্রীয় সমর্থনের আশায়। কারণ শ্রীশচন্দ্র বুঝেছিলেন, যুগযুগ ধরে হিন্দু জনমনে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে ফেলা এ কুসংস্কারের উৎপাটন শাস্ত্রের সমর্থনে যতটুকু সম্ভব তার্কিক যুক্তির সাহায্যে তা আদৌ সম্ভব নয়। পন্ডিতদের অনেকেই মহারাজের অভিপ্রায় সাধু এবং অনেকাংশেই শাস্ত্র সম্মত — একথা মেনে নিয়েও সমাজের ভয়ে তাতে প্রকাশ্য সম্মতি জানাতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। বিধবা রমণীদের অসহায়তা শ্রীশচন্দ্রকে এতটাই পীড়িত করেছিল যে, এই মহতি কাজের জন্য প্রলোভনের পন্থা অবলম্বন করতেও দ্বিধাগ্রস্ত হননি। পন্ডিতমহলের স্বীকৃতি পেতে তিনি পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে নবদ্বীপের কয়েকজন বিশিষ্ট পন্ডিতকে রাজীও করিয়ে ফেলেন। বিষয়টা রীতিমতো কৌতুহলোদ্দীপক এই কারণে যে ঈশ্বরচন্দ্রের ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ গ্রন্থটি প্রকাশিত (১৮৫৫ খ্রীঃ) হওয়ার অনেক আগেই এই ক্ষুদ্র মফঃস্বল শহর এবিষয়ে রীতিমতো অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল রাজা শ্রীশচন্দ্রের উদ্যোগে। কিন্তু শেষপর্যন্ত ‘বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত’– নবদ্বীপ পন্ডিত মহলের একাংশের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার পূর্ব মুহূর্তে একটি ঘটনা শ্রীশচন্দ্রের সমস্ত উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দেয়।
ইতিমধ্যে কৃষ্ণনগরে একদল নব্য সংস্কারার্থী যুবদল গড়ে উঠেছে, আগেই উল্লেখ করেছি। এই নব্য দল কৃষ্ণনগর কলেজে একটি সভার আয়োজন করেন। এই সভার মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল সমাজের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার গুলির সমালোচনা এবং বিধবা বিবাহ শাস্ত্র সম্মত কিনা তর্ক সাপেক্ষ হলেও যুক্তিসঙ্গত বলে সহমত গড়ে তোলা ও বিধবা বিবাহ প্রচলিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবার জন্য অঙ্গীকার বদ্ধ হওয়া।
এই সভা কৃষ্ণনগর তথা সন্নিহিত অঞ্চলের গোঁড়া রক্ষণশীল মানুষদের রীতিমতো বিচলিত করে তুলল। তাঁরা সরাসরি এই যুব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কিছু করতে অপারগ বুঝে তাঁদের নামে অপবাদ রটিয়ে দিলেন এই বলে যে, এরাঁ স্বহস্তে গোবধ করে মাংস খেয়েছেন ও মদিরা পান করেছেন। প্রশংসার চেয়ে নিন্দা বাক্যের গতিবেগ চিরকালই বেশী, ফলে এই রটনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এই জনরবে প্রভাবিত হয়ে অনেক ভদ্রসম্প্রদায়ের পিতামাতা তাঁদের সন্তানদের এবং স্বসম্পর্কীয় যুবকদের কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন, ফলে কলেজের পঠন পাঠন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। নড়েচড়ে বসলেন ব্রিটিশ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। ফলে কলেজে এইরকম একটি সভার অনুমতি দেওয়ায় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কলেজ অধ্যক্ষ তিরস্কৃত হলেন। এই পরিস্থিতিতে কলেজের পঠন পাঠনের যাতে চিরস্থায়ী ক্ষতি না হয় তারজন্য বিদ্যানুরাগী মহারাজ বিশেষ ভাবে উদ্যোগী হলেন এবং কিছুদিন পর থেকে আবার ছেলেরা কলেজে ফিরতে শুরু করল। কিন্তু এই গোলযোগের মধ্যে অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটে গেল শ্রীশচন্দ্রের মহতি উদ্যোগের।

সমাজ সংস্কারের চেষ্টায় ব্যর্থ মনোরথ হলেও এবং শ্রীশচন্দ্র নিজে পৌত্তলিক হিন্দুধর্মের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও অসম্ভব ধর্মীয় উদারতায় তিনি ইতিমধ্যেই রাজ বাড়িতেই ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করে পরমব্রহ্মের উপাসনা ও প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৮৪৪ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে একটি পত্র লিখে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করার আবেদনপত্র ও নিয়মাবলী সংগ্রহ করেন এবং তিনজন যুবককে প্রতিজ্ঞা পত্রে স্বাক্ষর করান। কৃষ্ণনগরের প্রথম এই তিনজন ব্রাহ্ম হলেন – দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্র রায় (কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পিতা), ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায় (কৃষ্ণনগর অ্যাংলো – ভার্নাকুলার হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা) এবং নীলমণি গড়গড়ি। মাসখানেকের মধ্যেই কৃষ্ণনগরে প্রায় চল্লিশ জন যুবক ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হলেন। শ্রীশচন্দ্র ব্রাহ্ম ধর্ম বিস্তারের জন্য দেবেন্দ্রনাথকে একজন বেদবিৎ উপদেষ্টাকে পাঠাতে অনুরোধ করলেন। উপযুক্ত বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ পন্ডিত হাতের কাছে না পেয়ে হাজারিলাল নামে একজন ব্রাহ্মধর্ম প্রচারককে দেবেন্দ্রনাথ কৃষ্ণনগরে প্রেরণ করেন। কিন্তু হাজারিলালকে নিয়ে ব্রাহ্মসমাজের ভেতর কিছু অসন্তোষ গড়ে উঠলে এবং শ্রীশচন্দ্র নিজেও কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে রাজ বাড়িতে সমাজ করতে নিষেধ করে দিলেন। ব্রাহ্মধর্মের ক্রমবিস্তার লক্ষ্য করে ইতিমধ্যে রক্ষণশীল সমাজ উলা (বর্তমান বীরনগর) নিবাসী বামনদাস মুখোপাধ্যায়কে মধ্যমণি করে গোয়াড়িতে এক ধর্মসভা প্রতিষ্ঠা করে। অনেক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এই ধর্মসভার অংশী হলেন। হিন্দু ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার্থে ব্রাহ্মসমাজের অনিষ্ট সাধনই তাঁদের একমাত্র কর্মসূচি হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু পশ্চাৎপদ রক্ষণশীল সমাজ নবোত্থিত ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের যে বিশেষ ক্ষতি সাধন করতে পারল না তার একমাত্র কারণ দুই দলের মধ্যবর্তী স্থানে পাহাড় সদৃশ মহারাজ শ্রীশচন্দ্রের অবস্থান। কিছু অনিবার্য বিরূপতায় তিনি রাজ বাড়ি থেকে সমাজকে সরিয়ে দিলেও সমাজের পাশ থেকে নিজেকে কখনো সরিয়ে নেন নি। রাজবাড়ি থেকে সরে এসে প্রথমে ব্রাহ্মগণ আমিনবাজারে একটি ক্ষুদ্র বাড়ি ভাড়া নিয়ে সমাজ স্থাপন করেন। অনতিকাল পরে শ্রীশচন্দ্রের সহায়তায় ১৮৪৭ খ্রীষ্টাব্দে আমিনবাজারেই একটি সমাজ মন্দির নির্মিত হয়। এই গৃহনির্মাণে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এক হাজার টাকা দান করেন। উদ্বোধনের দিন তিনি উপস্থিত ছিলেন কিনা তার কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলেও কৃষ্ণনগরে যে তিনি প্রায়শই আসতেন তার উল্লেখ আছে তাঁর আত্মজীবনীতে। দেবেন্দ্রনাথ লিখছেন, “কৃষ্ণনগরে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করিয়া আমি সর্বদাই সেখানে যাইতাম।” পরবর্তীতে এই সমাজ মন্দিরই হয়ে ওঠে প্রগতিশীল সমাজ আন্দোলনের মূল কেন্দ্রস্থল।
একটি বিষয় লক্ষণীয়, শ্রীশচন্দ্র ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি দূর্বলতা এবং ধর্মের প্রসারে সহযোগিতা করলেও তিনি নিজে কিন্তু কখনও ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন নি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন পৌত্তলিক সমাজেরই কর্তা। তথাপি ব্রাহ্মধর্মের প্রতি তাঁর নরম মনোভাবের কারণ কী? এ প্রসঙ্গে অনেকে মনে করেন, খ্রীষ্টান মিশনারীদের ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শিক্ষিত মেধাবী ব্রাহ্ম নেতৃবৃন্দকেই তিনি উপযুক্ত বলে মনে করতেন। তাঁর ধারণা যে অযৌক্তিক ছিল না, তা প্রমাণিত সত্য।

পরবর্তী কালে ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কেশবচন্দ্র সেন কৃষ্ণনগরে আসেন (তখনও দেবেন্দ্রনাথ-কেশব চন্দ্রের বিরোধ শুরু হয়নি)। ব্রাহ্মধর্মের প্রচারে গিয়ে তাঁদের লড়াইটা যে মিশনারীদের বিরুদ্ধেই ছিল তার প্রমাণ আমরা পাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক চিঠিতে। সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন – “We are trying our best to promote the cause of the Brahmoism . Brahmananadaji (Keshab Chandra) stirring lectures have set Krishnagar all in a flame. We had to fight hard with the missionaries here …”
কেশব চন্দ্রের বক্তৃতার ফলশ্রুতিতে পাদ্রী ডাইসন সাহেবের সঙ্গে তাঁর বিবাদ বেধে যায়। শুধু তাইই নয়, ১৮৬৩ সালে কেশব চন্দ্রের একটি বক্তৃতার কথা উল্লেখ করে শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন, “…সুপ্রসিদ্ধ পাদরী ডফ্ (আলেকজান্ডার ডাফ) সাহেব উক্ত বক্তৃতাতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পরে বলেন ব্রাহ্মসমাজ যে শক্তি লইয়া উঠিতেছে তাহা সামান্য শক্তি নহে”। এই শক্তিকেই শ্রীশচন্দ্র ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন মিশনারী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।
তবে শুধু যে এই স্বার্থবোধই তাঁর ব্রাহ্মসমাজের প্রতি দূর্বলতার একমাত্র প্রেরণা ছিল — একথা বললে সে বিশ্লেষণ সংকীর্ণতা দোষে দুষ্ট হবে। উন্মুক্তমনা, শাস্ত্রজ্ঞ শ্রীশচন্দ্র যে ব্রাহ্ম ধর্মের অন্তরাত্মার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তার সমর্থন পাই নবদ্বীপের পন্ডিত মন্ডলীর উদ্দ্যেশ্যে করা তাঁর এই প্রশ্নে – “কেন আপনারা বেদ-বিহিত বেদান্ত ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিবেন না?” কৃষ্ণনগরের সমাজ মন্দিরের পরবর্তী কর্মকান্ডের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সংযোগ কমে এলেও পরমব্রহ্মের আরাধনা সংক্রান্ত ঔৎসুক্য ও জিজ্ঞাসা যে স্তিমিত হয়নি তার উল্লেখ পাই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীতে। কলকাতার বাসায় থাকাকালীন একবার শ্রীশচন্দ্র দেবেন্দ্রনাথকে টাউনহলে দেখা করবার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠান। দেবেন্দ্রনাথ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে টাউন হলে নদীয়া-রাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দের এই ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন দেবেন্দ্রনাথ এইভাবে, “পরস্পরের সম্মিলনে বড়ই সুখী হইলাম। সেখানে তিনি আমার সহিত কেবলই ধর্ম্মালোচনা করিলেন। যাইবার সময় বলিয়া গেলেন যে, “এখানে এত অল্পক্ষণে আলাপ করিয়া মনের পরিতৃপ্তি হইল না। আমি কলিকাতায় এখনো তিন চারিদিন আছি, যদি ইহার মধ্যে কোন দিন সন্ধ্যার সময় আমার বাসায় যাইয়া আলাপ করেন, তবে বড় সুখী হই”। দেবেন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন তাঁর বাসায়। শুধু তাইই নয়, শ্রীশচন্দ্রের আমন্ত্রণে তিনি কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতেও অতিথি হিসাবে এসেছিলেন। ‘ষাট প্রকারের ব্যঞ্জন’ দিয়ে মহারাজ তাঁকে আপ্যায়ন করেছিলেন। এভাবেই কৃষ্ণনগরে ব্রাহ্মসমাজ গঠনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল শ্রীশচন্দ্রের উদ্যোগে। তৈরি হয়েছিল মুক্ত মনের সংস্কারার্থী একদল নব্য যুব সম্প্রদায়ের। এবং সর্বোপরি দেবেন্দ্রনাথ ও শ্রীশচন্দ্রের মতো দুই মহৎ প্রাণ কাছাকাছি এসেছিলেন এরই সূত্র ধরে — যা উনবিংশ শতাব্দীর কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক মনোভূমিকে আরও উর্বর করেছিল।

আজও আমিনবাজারে রাস্তার পাশে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের গল্প বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ব্রাহ্ম সমাজের সেই প্রার্থনা গৃহ। একশ’ সাতাত্তর বছরের জীর্ণ শরীরে তার সময়ের ক্ষত চিহ্ন।ধসে গেছে কড়িবরগার ছাদ। সৌধের সমস্ত শরীর জুড়ে গাছপালা আর তার শিকড় বাকরের মারণ আলিঙ্গন। তবু নবজাগরণের প্রথম পর্বের শেষ স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে সে, প্রতিদিনের সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের আলো গায়ে মেখে।
পাঠক সহায়ক প্রকরণ গুলোর প্রতি বাড়তি নজর দেওয়ার পাশাপাশি এত সুন্দর করে গুছিয়ে কাজ করছেন আপনারা, কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।
আমার রচনাটি মনোনয়নের জন্য ’রবিচক্র’র সম্পাদক এবং সম্পাদক মন্ডলীকে অনেক ধন্যবাদ ।