
১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রস্তুতি চলছে কাশীতে সুবর্ণ জয়ন্তী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের। সাহিত্যপ্রেমী বাঙালির সম্বৎসরিক তিন দিনের সম্মেলন। লেখক ও পাঠকদের এ এক সর্বভারতীয় মিলনমেলা। পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের শাখা-সংগঠনের মাধ্যমে সাহিত্য-সচেতন বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের মানুষের মধ্যে সম্মেলনে উপস্থিত থাকার ব্যবস্থাদি চলছে পূর্ণদ্যোমে। বলে নেওয়া ভাল, আজকের সময়ে বসে সেদিনের সাহিত্যপিপাসু সাধারণ বাঙালির এই সম্মেলনটিকে ঘিরে যে আবেগের উচ্ছ্বলতা তার আন্দাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
এইরকম একটি সময়ে সেবারের সম্মেলন শুরুর সামান্য দিন কয়েক আগে একদিন রাত্রি দশটা নাগাদ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র মশায়ের একটি ফোন এল সম্মেলনের চব্বিশ পরগনা শাখার সভাপতি প্রভাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে: “ভাই প্রভাস, বড় সমস্যায় পড়ে তোমার সাহায্য চাইছি। বেনারসে সাহিত্য সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের আমাদের তিন আমন্ত্রিত অতিথি, অর্থাৎ আমি, দক্ষিণারঞ্জন বসু (যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক) এবং দেবনারায়ণ গুপ্ত (নাট্যকার ও পরিচালক), এই তিনজনকে কলকাতা থেকে নিয়ে যাবার কথা ছিল। আমরা তো প্রস্তুত হয়ে রয়েছি। এখন শেষ মুহূর্তে ওঁরা জানাচ্ছেন যে অনিবার্য কারণে ওঁদের কেউ আসতে পারছেন না। আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ করছেন যে একটু ব্যবস্থা করে আমরা যেন ট্রেনে চেপে বসি। কাশীতে পৌঁছে গেলে আমাদের দায়িত্ব তাঁরা নিয়ে নেবেন। তা, তুমি কি কিছু ব্যবস্থা করতে পার আমাদের জন্যে?”

ফোনের এ’প্রান্ত থেকে প্রশ্নকর্তাকে জানানো হল,”বীরেনদা’, এত অল্প সময়ের মধ্যে টিকিট কেটে আপনাদের যাওয়ার ব্যবস্থা তো করা মুশকিল। তবে আপনাদের যদি দ্বিতীয় শ্রেণীতে যেতে আপত্তি না থাকে, আপনারা স্বচ্ছন্দে আমাদের সদস্যদের জন্য ভাড়া করা বগিটিতে সহযাত্রী হতে পারেন। যথাযোগ্য সমাদরে আমাদের সদস্যরা আপনাদের নিয়ে যাবে।”
বীরেন বাবু খুশি হয়ে বললেন, “মনে করব কেন? এ’তো আনন্দের কথা! খুব ভাল প্রস্তাব। তোমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে বাবা বিশ্বনাথের শহরে পৌঁছে যাব।”
দূরভাষবাহিত এই আলাপচারিতার প্রেক্ষাপটটি এইরকম…
যেমন বললাম, বাঙালির ঐতিহাসিক প্রবাসভূমি কাশীতে সেবার বসছে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের তিন দিন ব্যাপী অধিবেশন। অনুষ্ঠানের মূল সভাপতি বিশিষ্ট সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়। বিভিন্ন পর্বে বক্তা হিসেবে অতিথি তালিকায় রয়েছেন মৈত্রেয়ী দেবী, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, দক্ষিণারঞ্জন বসু, দেবনারায়ণ গুপ্ত, হরিপদ ভারতী, গণেশ ঘোষ (বিপ্লবী), আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, তুষারকান্তি ঘোষ, নন্দগোপাল সেনগুপ্ত, ইন্দিরা দেবী প্রমুখ।
কিঞ্চিদধিক সত্তর জনের একটি সদস্য দল নিয়ে রওনা হবার পরিকল্পনা হয়েছে সম্মেলনের চব্বিশ পরগণা শাখা থেকে। আমাদের শাখাটি সম্মেলন উদ্যোক্তাদের তরফ থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় একটি একাঙ্ক নাটক মঞ্চস্থ করার। প্রবল উৎসাহে আমরা মহড়া চালাচ্ছি সর্বভারতীয় মঞ্চে জমজমাট একটি নাটক পরিবেশনের জন্যে। নাটক নির্দিষ্ট হয়েছে সামাজিক রূপকথা বা ফ্যান্টাসির আদলে লেখা বনফুলের দমফাটা হাসির ছন্দোময় নাটক ‘কবয়ঃ’। স্থানীয় কুশলী অভিনেতা সুনীল কোলে, ভাস্করজ্যোতি সেনগুপ্ত, বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য, তপন চট্টোপাধ্যায় রয়েছেন শিল্পী হিসেবে, রয়েছে আমার মত তরুণ ও কিছু শখের অভিনেতারাও। তৈরি নাটক, ইতিমধ্যেই সুনামের সঙ্গে পরিবেশন করেছি আমরা। সুতরাং একটু ঘষামাজা করে নিয়ে যে স্বচ্ছন্দে মঞ্চস্থ করা যাবে, এ’ব্যাপারে রীতিমত আত্মবিশ্বাসী আমরা।





সকলে একসঙ্গে যাওয়ার জন্যে ভারতীয় রেলের একটি গোটা বগিই ভাড়া করে নেওয়া হয়েছে আমাদের শাখার তরফ থেকে। উদ্দীপনায় রীতিমত মাতোয়ারা সদস্যরা।
এই উদ্দীপনায় নতুন মাত্রা যোগ করল আমাদের সহযাত্রী হিসেবে তিন বিশিষ্ট অতিথির আবির্ভাব ও অন্তর্ভূক্তি।
খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই সদস্যরাও খুশি হলেন। এমন তিন গুণী অতিথির সাহচর্যে এক বগিতে কাশীধাম যাত্রার মত আনন্দ সংবাদ আর কীই বা হতে পারে!
ট্রেনে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট বগিটির একটি ক্যুপে অতিথিদের আসন করে দেওয়া হল। ব্যবস্থাপনা ও আতিথ্যে ওঁরা খুবই সন্তুষ্ট। ট্রেন ছাড়ার অল্প সময়ের মধ্যেই এই ত্রয়ীকে কেন্দ্র করে জমে উঠল আড্ডা, যার মধ্যমণি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র মশাই। আমরা যে যখন সুযোগ পাচ্ছি আসন দখল করে বসে পড়ে বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আড্ডার রসগ্রহণ করে আসছি। সবচেয়ে জমজমাট আসর বসেছিল সেদিন সন্ধ্যায় চলন্ত ট্রেনের কামরায়। মনে পড়ে, চলন্ত ট্রেনের ঐ ছোট্ট কামরায় ও তার আশেপাশে উপচে পড়েছিল সহযাত্রী সদস্যদের ভিড়। কামরার বাঙ্কগুলো সেদিন ছোটোখাটো গ্যালারির চেহারা নিয়েছিল। অতিথিরাও খোসমেজাজেই আড্ডায় মেতেছিলেন। বীরেন বাবু তাঁর বেতারের কর্মজীবনের বর্ণময় ভাঁড়ার থেকে কত যে গল্প বার করে শুনিয়েছিলেন! আর ‘যুগান্তর’ সম্পাদক দক্ষিণারঞ্জন বাবু শোনাচ্ছিলেন সংবাদপত্র জগতের কাহিনি।
২৬শে ফেব্রুয়ারি অন্নদাশঙ্কর রায়ের সভাপতিত্বে শুরু হল প্রথম দিনের প্রভাতী অধিবেশন। এরপর কদিনের অধিবেশনের বিভিন্ন পর্বে যে আলোচনাগুলি মনোগ্রাহী হয়ে উঠল সেগুলি মোটামুটি এইরকম…
বন্দেমাতরম্ সঙ্গীতের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে তথ্যসমৃদ্ধ ভাষণ শোনা গেল বিপ্লবী গণেশ ঘোষের কণ্ঠে। প্রখ্যাত বাগ্মী হরিপদ ভারতীর অসামান্য কথকতায় আমরা শুনলাম জনমানসে এই গানের সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে আলোচনা। সভাপতির ভাষণে অন্নদাশঙ্কর বাংলা ভাষাকে প্রাণের ভাষায় পরিণত করার আহ্বান জানালেন।
কথা সাহিত্য বিভাগে মৈত্রেয়ী দেবীর বৈদগ্ধ্যপূর্ণ আলোচনা শুনলাম আমাদের জীবনে ভাষা ও সাহিত্যের ভূমিকা বিষয়ে। সাহিত্যিক কেন লেখেন, এই বিষয়ে বললেন ঔপন্যাসিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। নাটক ও চলচ্চিত্র শাখায় হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য শোনা গেল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও দেবনারায়ণ গুপ্তের কণ্ঠে। দর্শন ও সাহিত্য নিয়ে বললেন ডক্টর রমা চৌধুরী, কবিতার জগতে নতুন চিন্তা ও পরিবর্তন নিয়ে বললেন বাণী রায়, বাংলা কাব্যের গতি প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করলেন সাহিত্যিক জগদীশ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত ও সাহিত্য শাখায় সঙ্গীতের ভাষা ও আবেদন নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা শোনা গেল রাধিকামোহন মৈত্রের কাছে। প্রখ্যাত অভিনেতা পাহাড়ী সান্যালের লক্ষ্ণৌপ্রবাসী স্বনামধন্য দাদা অতুলপ্রসাদ-শিষ্য দ্বিজেন্দ্রনাথ সান্যালের কণ্ঠে শোনা গেল সঙ্গীত সহযোগে অতুলপ্রসাদ সেনের গানের মনোজ্ঞ আলোচনা। বেহালা-বাদনের অপূর্ব একটি অনুষ্ঠান শোনা গেল প্রখ্যাত বেহালা শিল্পী ভি, জি, যোগের পরিবেশনে।

এবার আমাদের নাটক মঞ্চায়নের প্রসঙ্গে আসি। ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা। নাট্যামোদী পরিপূর্ণ দর্শকাসন। সামনের সারিতে পরপর বসে আছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র প্রমুখ বিশিষ্ট সব অতিথি ও অভ্যাগতরা। এত গুণী ও কৃতি মানুষের উপস্থিতিতে নাটকের মঞ্চায়ন। টানটান উত্তেজনার আবহ আমাদের গ্রীনরুমে।
শুরু হল নাটক। সংক্ষেপে কাহিনিটি এইরকম…
জম্বুদ্বীপ নামক রাজ্যের প্রতাপশালী জমিদার মশাই তাঁর কাব্যপ্রেমী সুন্দরী কন্যার বিবাহের জন্য ঘোষণা করেছেন যে তাঁর কন্যার রূপ বর্ণনা করে জম্বুদ্বীপের অধিবাসীদের মধ্যে যিনিই একটি মনোমোহনী কবিতা লিখতে পারবেন, তাঁর সঙ্গেই তিনি তাঁর কন্যার বিবাহ দেবেন। এই রাজ্যের অধিবাসীবৃন্দ স্বভাবকবি। যাঁরা জমিদারকন্যার পানিপ্রার্থী হলেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন পেশার বর্ণময় চরিত্রের ক’জন মানুষ। একজন ময়রা, একজন নাপিত, একজন মালী, একজন অতি আধুনিক কবি এবং এক সুশিক্ষিত ও সুদর্শন সাহিত্যিক। নানান রসসিক্ত রঙ্গময় ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে সাহিত্যিকটি বাকি সবাইকে নাস্তানাবুদ ও পর্যুদস্ত করে জমিদার কন্যার হৃদয় জিতে নিলেন, তাই নিয়েই আদ্যন্ত উপভোগ্য এই কাহিনি, যার সমস্ত কথোপকথনই ছন্দোময় কবিতার আঙ্গিকে।




বলা বাহুল্য, অল্প সময়ের মধ্যেই নাটক জমে উঠল। নাটক চলাকালীন একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল, সেটা বলি। আমরা মঞ্চে অভিনয়রত অবস্থাতেই অনুভব করছি যে শ্রোতারা তো বটেই, বিশিষ্ট অতিথিরাও নাটকের কথোপকথনে হাসি সংবরণ করতে বেগ পাচ্ছেন। আমাদের দলের যিনি চিত্রগ্রাহক তিনি মঞ্চের নিচে অতিথিদের আসনের সামনে কখনো দাঁড়িয়ে কখনো হাঁটু মুড়ে বসে বিভিন্ন কৌনিক অবস্থান থেকে ক্যামেরা হাতে ছবি তুলে চলেছেন। হঠাৎ দেখলাম, একটি প্রবল হাসির নাট্যমুহুর্তে আমাদের ক্যামেরাম্যান বন্ধুটি ক্যামেরা হাতে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে ছিটকে ও গড়িয়ে পড়লেন। কিছুটা হতচকিত হলেও অভিনয় চালিয়ে গেলাম আমরা। পরক্ষণেই বুঝলাম, হাসির দমকে বেসামাল সামনের সারিতে পায়ের ওপর পা তুলে বসা দক্ষিণারঞ্জন বসুর পদাঘাতেই এই অঘটনটি ঘটেছে। সে এক বিচিত্র পরিস্থিতি! মঞ্চের ঠিক সামনেই ঘটে যাওয়া দৃশ্যটির অভিঘাতে মঞ্চের ওপর অভিনয়রত আমাদের তখন হাসি সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত সফল হয়েছিল নাট্য পরিবেশনাটি। প্রবল করতালি মধ্যে অভিনয় শেষ হতেই মঞ্চে উঠে এলেন সেই সন্ধ্যার অন্যতম বিশিষ্ট অতিথি দর্শক ডক্টর রমা চৌধুরী। দুহাত তুলে আশীর্বাদ করে অভিনেতাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন তিনি। তাঁর কলকাতার বাড়িতে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বললেন “তোমরা অবশ্যই এসো। তোমাদের আমি খুব ভাল করে ল্যাংচা খাওয়াবো।”… সেদিনের অভিনেতাদের ল্যাংচাপ্রেমের তথ্য তাঁকে কে দিয়েছিল, সেটা জানা হয়নি। সম্ভবত এই মিষ্টান্নটি প্রবীণা বিদূষীর নিজেরই খুব প্রিয় ছিল!
সেই অসাধারণ সন্ধ্যাটির রেশ আজও মনে অমলিন থেকে গেছে। অনুষ্ঠানের পরের দিন সকালেও কাশীর বাঙালি মহলে আমাদের খ্যাতির যে রেশ অনুভূত হয়েছিল, তা নিঃসন্দেহে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছিলাম আমরা।
(পরিচিতিঃ এই নাটকের কুশীলবেরা ছিলেন, ভাস্করজ্যোতি সেনগুপ্ত (পরিচালক), বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য, সুনীল কোলে, তপন চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়, সমর দত্ত, বিষ্ণুচরণ ঘোষ, সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে জমিদার কন্যার ভূমিকায় যিনি অভিনয় করেছিলেন, তাঁর নামটি বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে।)
খুব, খুব ভাল লাগল পড়ে।
ধন্যবাদ দাদা। আপনার ভাল লাগার উষ্ণতা অনুভব করলাম।