
“CHANDRA BOSE TO BERLIN, RECEIVED BY HITLER – ONCE MORE, HE HAS MADE THE PLUNGE. AT ONE TIME TO THE RIGHT, AT ANOTHER TO THE LEFT. MOSCOW, BERLIN, TOKYO…THESE BENGALIS, VIOLENT, IMPULSIVE, NEVER A POLITICS OF REASON, THEY OBEY THE SOMERSAULTS OF THEIR PASSIONS, VICTIMS OF THEIR OWN VULNERABILITY TO JEALOUSY, VANITY, STUNG TO THE QUICK BY FLESHWOUNDS,”
- ROMAIN ROLLAND (Journal, 1915-1943)

১৯৩৪ সালে ভিয়েনায় অবস্থানকালে ইংরেজ পুস্তক-প্রকাশক Lawrence and Wishart প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের যোগাযোগ হয়। সেই সূত্রে ১৯৩৫ সালের জানুয়ারি মাসে The Indian Struggle বইটি প্রকাশিত হয়। এ বইটি ছাড়াও রয়েছে দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী An Indian Pilgrim যা ইউরোপে নির্বাসিত অবস্থায় লেখা। এখানে স্থান পেয়েছে আত্মীয়-পরিজনকে লেখা তাঁর চিঠিপত্র এবং মোটামুটি ২০২০ পর্যন্ত তাঁর ছাত্রাবস্থার বিবরণ। কিন্তু The Indian Struggle বইটির চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে রয়েছে তিনটি দশক ঘিরে স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতের রাজনীতি ও সংগ্রামজনিত জটিল ইতিহাস। এই ইতিহাসের ধারায় যুক্ত হয়েছে তৎকালীন বিশ্ব-রাজনীতি ও বিশ্ব-যুদ্ধের প্রেক্ষিতে আবর্তিত ও জাগ্রত সুভাষচন্দ্রের রাষ্ট্রনৈতিক দর্শন।

গান্ধীজিকে এড়িয়ে গিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সম্পর্কিত কোনো আলোচনা তো আদৌ সম্ভব নয়। The Indian Struggle বইটিতেও গান্ধীজির প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। মনে রাখতে হবে, গান্ধীজির প্রতি সুভাষচন্দ্রের শ্রদ্ধার কোনো ঘাটতি ছিল না কখনও। এমনকি পরবর্তীকালে জাতির জনক হিসাবেও তিনি সুভাষচন্দ্র কর্তৃক বন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু এই পর্বে সুভাষচন্দ্রকে দেখি গান্ধীজির প্রতি কঠোর সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। গান্ধীজি সম্পর্কে গুরু চিত্তরঞ্জন দাশের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করে সুভাষচন্দ্র লিখছেন, “…I am reminded of what the Deshabandhu used frequently to say about the virtues and failings of Mahatma Gandhi’s leadership. According to him, the Mahatma opens a campaign in a brilliant fashion; he works it up with unerring skill; he moves from success to success till he reaches the zenith of his campaign – but after that he loses his nerve and begins falter.” সাংঘাতিক মন্তব্য!
The Indian Struggle পড়তে পড়তে একটা বড় প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়াই। সমস্যাটা হয় যখন বইটিতে সুভাষচন্দ্র কমিউনিজম্ ও ফ্যাসিজিম্-এর সমন্বয়-ভাবনার একটা তত্ত্ব হাজির করেন। তাঁর এমন ভবিষ্যদ্-বাণী আমাদের বেশ চমৎকৃত করে – “Considering everything one is inclined to hold that the next phase in world-history will produce a SYNTHESIS BETWEEN COMMUNISM AND FASCISM.”(বড় হরফ আমার)।
সুভাষচন্দ্রের মতে, এই দুই মতবাদের পারস্পরিক বিরোধ সত্ত্বেও কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য উভয়ের মধ্যে বিদ্যমান। তিনি বলছেন, “in spite of antithesis between Communism and Fascism there are certain traits common to both. Both Communism and Fascism believe in the supremacy of the State over the individual. Both denounce parliamentary democracy. Both believe in party rule. Both believe in the dictatorship of the party and the ruthless suppression of all dissenting minorities. Both believe in a industrial reorganization of the country. These common traits will form the basis of the NEW SYNTHESIS”(বড় হরফ আমার)।

সন্দেহ নেই, ফ্যাসিজম্ তৎকালীন কতিপয় বাঙালি বিদ্বজ্জনকেও আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের এহেন দুর্বলতা ও সিন্থেসিস সংক্রান্ত ব্যাখ্যা বামপন্থীদের, বিশেষ করে জওহরলাল নেহরুর, অসন্তোষের কারণ হয়েছিল। স্বীয় মস্তিষ্ক প্রসূত এমন তত্ত্ব সম্পর্কে পরবর্তীকালে নানা প্রশ্ন সুভাষচন্দ্রের কিছুটা অস্বস্তির কারণ হয়েছিল বলে মনে হয়। এই প্রসঙ্গে রজনী পাম দত্তের প্রসঙ্গটি এসে যায়। আন্তর্জাতিক মহলে সুপরিচিত এই বঙ্গ সন্তান R. Palm Dutt ছিলেন একজন সাংবাদিক, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক এবং ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। বলা হয়, ইংলন্ডে ছাত্রাবস্থায় তাঁর কাছেই জ্যোতি বসুর প্রথম মার্কসবাদের হাতেখড়ি।

সে যাই হোক, এই রজনী পাম দত্তের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের একটি সাক্ষাৎকার লন্ডনের ডেইলি ওয়ার্কার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল (২৪।১।১৯৩৮)। উক্ত সাক্ষাৎকারে কমিউনিজম্ এবং ফ্যাসিজম্ সংক্রান্ত প্রশ্ন আর উত্তর এই রকম –
Dutt: Many questions have been asked about the references to Fascism in the closing part of your book The Indian Struggle. Would you care to make any comment on your view of Fascism?
Bose: My political ideas have developed further since I wrote my book three years ago. What I really meant was that we in India wanted our national freedom, and having won it, we wanted to move in the direction of Socialism. This is what I meant when I referred to a ‘a synthesis between Communism and Fascism’. PERHAPS THE EXPRESSION I USED WAS NOT A HAPPY ONE. But I should like to point out that when I was writing the book, FASCISM HAD NOT STARTED ON ITS IMPERIALIST EXPEDITION, and it appeared to me on aggressive form of nationalism. (বড় হরফ আমার)
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর এই বক্তব্য থেকে আরও অগ্রসর হয়ে, হয়তো ফ্যাসিজিম থেকে কিছুটা দূরত্ব রচনা করতেই, দত্তের কাছে সুভাষচন্দ্রের এমন আত্মপক্ষ সমর্থন – “I should add that I have always understood and am quite satisfied that Communism, as it has been expressed in the writings of Marx and Lenin and in the official statements of policy of the Communist International, gives full support to the struggle for national independence and recognizes this as an integral part of its world outlook.”

এই বিষয়টির প্রেক্ষিতে আরও একটি প্রসঙ্গর অবতারণা করতেই হয়। ১৯৩৪-এর ৩ অগাস্ট ভিয়েনা থেকে সুভাষচন্দ্র তাঁর সদ্য প্রকাশিতব্য বইটিতে বার্নার্ড শ কর্তৃক একটি Forward লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করে রবীন্দ্রনাথের সুপারিশ প্রার্থনা করেন। আশ্চর্যের কথা, একই সঙ্গে সুভাষচন্দ্র কবিকে এটাও জানান, “আপনার কথাও আমার মনে হইয়াছিল কিন্তু আমি জানি না আপনি রাজনীতি-বিষয়ক পুস্তকের জন্য কিছু লিখিতে ইচ্ছুক হইবেন কি না। তদ্ব্যতীত, আপনি নিজে সম্প্রতি মহাত্মাজীর অন্ধভক্ত হইয়া পড়িয়াছেন…”। অতএব… । রবীন্দ্রনাথের কাছে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কেই সুভাষচন্দ্রের এইরকম স্পষ্ট উক্তি তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিচারে আমাদের কাছে অস্বস্তির কারণ তো বটেই। ওই একই বিষয়ে, অর্থাৎ তাঁর বইয়ের Forward লেখাবার প্রশ্নে, ‘প্রচন্ড রকমের গান্ধীভক্ত’ রোম্যাঁ রোলাঁর সঙ্গেও বাধ্য হয়ে দূরত্ব রাখার প্রয়োজন হয়েছে বলে সুভাষচন্দ্র জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে।

রোম্যাঁ রোলাঁ সম্পর্কে এখানে কিছু বলা আবশ্যক। মানবতার অতন্দ্র প্রহরী রোলাঁ ছিলেন ভারতের অকৃত্রিম বন্ধু। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর আমৃত্যু সংগ্রাম। রোলাঁ জীবনে বহু অপমান ও নিগ্রহ স্বীকার করেও তাঁর স্বাজাতিক গণ্ডী ও স্বার্থের ঊর্দ্ধে বিশ্ব-মৈত্রীর আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। রোলাঁর প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছিল অগাধ বিশ্বাস, অনুরাগ ও শ্রদ্ধা। তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ রোলাঁর প্রতি কৃতজ্ঞও ছিলেন। কারণ ইতালি ভ্রমণকালে ফ্যাসিস্ট প্রেসের অপপ্রচার ও দুরভিসন্ধিটা সেদিন রবীন্দ্রনাথ ঠিক অনুধাবন করতে পারেননি। রোলাঁই রবীন্দ্রনাথের সামনে ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বরূপ উন্মোচন করেন। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি মুসোলিনির প্রতি দুর্বলতা গান্ধীজির মতো রবীন্দ্রনাথেরও মনে কিঞ্চিৎ অবশিষ্ট ছিল বলেই মনে হয়। মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা স্বয়ং সেই রোলাঁকেই শোনাতে বসে গান্ধীজি তো মুসোলিনির দেশ-শাসনের পদ্ধতি এবং তার প্রতি ইতালির আপামর জনগণের অপরিসীম আস্থার সপ্রশংস উল্লেখ করতে ভোলেননি।
Indian Struggle বইটি রোলাঁ মন দিয়ে পড়লেন। তৃপ্ত রোলাঁ সুভাষচন্দ্রকে মতামত জানালেন। কী বললেন রোলাঁ? ২২।২।১৯৩৫ তারিখে লিখছেন – “…So interesting seemed the book to us that I ordered another copy so that my wife and sisters should have one each. It is an indispensable history of the Indian movement. In it you show the best qualities of the historian; lucidity and high equity of mind. Rarely it happens that a man of action as you are is apt to judge without party spirit. Without sharing all your appreciations I find most of them well-founded and they all make us reconsider things with profit.” তা হলে এখানেই তো উঠে এল রোলাঁ সম্পর্কে একটা প্রশ্ন।
সে অর্থে রোলাঁ মার্কসবাদী নন। কিন্তু রোলাঁ অবশ্যই ভীষণভাবে একজন anti-fascist এবং বলা যেতে পারে বাম-মনস্ক মানুষ। অবশ্যই লেনিন তাঁর পছন্দের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। অপরদিকে মার্কসবাদ নিয়ে সুভাষচন্দ্রের মনে অনেক প্রশ্ন ছিল, বিশেষ করে ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটা তাই নিয়ে। কিন্তু মার্ক্স-লেনিনের প্রতি দুর্বলতা সুভাষচন্দ্রের ভাবনায় ঠাঁই পেয়েছেই। নচেৎ তাঁর সমন্বয়িত তত্ত্বে Communism-এর স্থান হয় কী করে? লক্ষ করার বিষয়, এখানেই সুভাষচন্দ্র আর নেহরুর রাজনৈতিক ভাবনায় সাযুজ্য এবং বৈপরীত্ব। এক বিবৃতিতে (১৮।১২।১৯৩৩) নেহরু বলছেন,“I dislike Fascism intensely and…there is no middle road between Fascism and communism. One has to choose between the two and I choose the Communist ideal…I may not agree with everything that the orthodox Communists have done….But I do think that the basic ideology of Communism and its scientific interpretation of history is sound.” তা হলে রোলাঁর মতোই নেহরুও Fascism-এর প্রতি একজন uncompromising opponent। এই কারণেই শেষ পর্যন্ত নেহরু-সুভাষের ভাবনা পরস্পর মিলতে গিয়েও মিলল না।

ফ্যাসিজিমের প্রতি দুর্বলতা নিয়ে The Indian Struggle লিখতে বসে সুভাষচন্দ্র যে synthesis-এর প্রসঙ্গটা আনলেন তাকে একেবারে পাশ কাটিয়ে বইটি সম্পর্কে এতটা উচ্ছ্বসিত হওয়া রোলাঁর পক্ষে কীভাবে সম্ভব হল সেটাই আশ্চর্যের। তা ছাড়াও আর একটি কথা বলার আছে। এ-লেখার শুরুতে সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে তাঁর জার্নাল থেকে রোলাঁর একটি মারাত্মক উদ্ধৃতি দেওয়া আছে। সেখানে রোলাঁ বলছেন, “These Bengalis, violent, impulsive, never a politics of reason…”। সুভাষচন্দ্রের মতো বাঙালিদের চরিত্র-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এমন গড়পড়তা বিচার কি গ্রহণযোগ্য? কারণ The Indian Struggle-এ সুভাষচন্দ্রের মধ্যে যে ‘Best qualities of historian, lucidity and high quality of mind’কে রোলাঁ খুঁজে পেয়েছেন, জার্নালে দেখছি তাঁর উলটো সুর! সেখানে সুভাষচন্দ্রের মধ্যে রোলাঁ পেলেন বাঙালির ‘Somersaults of their passions’। সুভাষচন্দ্রের বিচার করতে গিয়ে নিজের প্রতি বিচারটাই ঠিক করে উঠতে পারলেন না রোলাঁ!

সুভাষচন্দ্রের কাছে ভারতের স্বাধীনতাই ছিল একমাত্র প্রার্থিত এবং সেটা যে কোনো মূল্যে। সেখানে Politics আর Ethics-এর সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা compromise করেনি। দেশই ছিল তাঁর প্রথম প্রেম। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রামের যে পথ তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেখানে তাঁর চালিকা শক্তি ছিল ভারতবর্ষ সম্পর্কে এক অপরিসীম ভালবাসার আবেগ। এই দুর্বার আবেগ নিয়েই অনেক ধেয়ে আসা প্রশ্নকে তুচ্ছ করে ১৬ই জানুয়ারি ১৯৪১-এর মধ্যরাতের এলগিন থেকে শুরু হল আমৃত্যু সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষু্ব্ধ ‘মারের সাগর পাড়ি’ দেওয়ার ইতিহাস! আজকে অভাগা বাঙালি-জীবনের বিপুল অন্ধকারের মধ্যে তাঁকে নিয়ে আমাদের অনেক ভাবনা, বাকী পড়ে থাকা অনেক কথা; কিন্তু সব ছাড়িয়ে রয়ে গেছে তাঁরই কাছ থেকে পাওয়া তাঁর প্রতি আমাদের ভালবাসার সেই,সেই অফুরান আবেগ। ১৯২৯ সালে ‘তপতী’ নাটকের জন্য রবীন্দ্রনাথ লেখেন’, ‘তোমার আসন শূন্য আজি, হে বীর পূর্ণ করো’ গানটি। তখন তো আর সুভাষচন্দ্রের প্রসঙ্গ আসার কথা ছিল না। কালক্রমে এই গানটিকে আমরা ২৩শে জানুয়ারির Signature Song করে ফেলেছি। এই একটা পুণ্য কাজ করেছি বটে। Leonard A. Gordon সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে ইতিহাস লিখতে বসে যথার্থই মন্তব্য করেছেন, ‘A dead hero is often a more convenient prop than a live one.’ সত্যি, জ্যান্ত সুভাষচন্দ্র নয়, মৃত নেতাজিকেই আমারা মান্যতা দিয়েছি, জেনে অথবা না জেনে! কথাটা মেনে নিতে আমাদের সমস্যায় পড়তে হয় অবশ্য। তবু তা সত্যিই। আজকের চারিদিকের অসীম শূন্যতার মধ্যে ইতিহাস আর কল্পনা ছাড়া আমাদের পাশে কিছু নেই, কেউ নেই। আজ সুভাষচন্দ্রের কথা মনে এলেই রবীন্দ্রনাথের সান্ত্বনাটুকু শুধু অবশিষ্ট থাকে, যেখানে শূন্যতা আশ্রয় খোঁজে পূর্ণতার –
“তবু শূন্য শূন্য নয়,
ব্যথাময়
অগ্নিবাষ্পে পূর্ণ সে গগন।
একা-একা সে অগ্নিতে
দীপ্তগীতে
সৃষ্টি করি স্বপ্নের ভুবন।”
সুভাষচন্দ্রের ‘ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে একটি সংগ্রামের অন্যতম সেনানী সেই সংগ্রামের ইতিহাস রচনা করেছেন। বইটি সম্পর্কে লেখক এখানে যে নানা তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন তা পড়ে ভালো লাগল। প্রসঙ্গত এই গ্রন্থে কম্যুনিজম ও ফ্যাসিজমের যে-সমন্বয়ের কথা বলে সুভাষচন্দ্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন, পরবর্তীকালে অনেজে বিশেষ করে কমিউনিস্টরা তার প্রচুর সমালোচনা করেছে বলে আমরা জানি। কিন্তু এখানে যে লেখক বলেছেন নেহেরুও সুভাষচন্দ্রের এই মতের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেছিলেন, সে কথা কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। বরঞ্চ সুভাষচন্দ্রই এখানে তাঁর এই সমন্বয় তত্ত্ব উপস্থিত করার আগে নেহেরুর কমিউনিজম সম্পর্কিত মতামত উল্লেখ করে তারপরে নিজের ভিন্নমতের কথা জানিয়েছেন। ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল গ্রন্থটি সম্পর্কে নেহেরুর কোন মতামত যদি থেকে থাকে, তাহলে সেটা এখানে উল্খিলিত হলে ভালো হত।
এ ছাড়া আরেকটি কথাও লিখি। সুভাষচন্দ্রের এই গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ এখন সহজলভ্য। কাজেই মূল ইংরেজির উদ্ধৃতি না দিয়ে সুভাষচন্দ্রের অভিমতগুলির বাংলায় অনূদিত অংশ দেওয়া হলে আর একটু সুখপাঠ্য হত মনে হয়। এই সূত্রে ব্রিটিশ ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতা রজনী পাম দত্তের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের ওই বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে আলোচনাপ্রসঙ্গে মনে হল, লন্ডনে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তোলা তাঁর একটি ছবি এখানে থাকলে লেখাটির আকর্ষণ বৃদ্ধি হত এ কথা ভেবে ছবিটি এখানে যুক্ত করলাম।
এত তথ্যবহুল নিবন্ধ। উপন্যাস পাঠের আগ্রহসঞ্চারী। আবেগবিহ্বল চিত্তে রবীন্দ্রনাথে এসে পাঠ শেষ করে আপনাকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা।
ধন্যবাদ
আমি কিন্তু এমন কথা বলিনি যে, কমিউনিজম্ এবং ফ্যাসিজম্ সংক্রান্ত নেহরুর ভাবনা ‘The Indian Struggle’ পড়ারই ফলশ্রুতি। হ্যাঁ, সুভাষচন্দ্র তাঁর বইতে এবিষয়ে নেহরুকে উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু এমন বিপ্রতীপ ভাবনা তো বইটি পড়ার প্রতিক্রিয়া নয়, নেহরুর নিজস্ব, যা সুভাষচন্দ্রের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে। আর একটা কথা, ১৯৩৪ সালে উভয়ের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতায় অবশ্যই বলা যায়, সুভাষচন্দ্রের এমন political synthesis-এর আঁচ পেতে নেহরুর কাছে ‘The Indian Struggle’ প্রকাশের অপেক্ষাটা জরুরী ছিল না; এবং তাঁর কোনো লেখায় বইটির অনুল্লেখ তাঁদের ভাবনার এমন সমীকরণের পথে অন্তরায়। তবু, তথাপি, আমার লেখার কোনো দৌর্বল্যে অলকবাবু বিভ্রান্ত হলে আমি দুঃখিত।
অপূর্ব। আপনার লেখা পড়ে শুধুমাত্র নতুন কিছু জানা হয় না, সেইসঙ্গে নতুন চর্চার উপকরণ রেখে যায় এবং নিজের জানাকে উপলব্ধির স্তরে নিয়ে যায়।
ইতিহাস গতিশীল, যে যত বড়ই মনীষী হোন না কেন, তিনি তো একটা বিশেষ সময়ে দাঁড়িয়ে কয়েক দশক পরে ইতিহাসের চাকা কোন দিকে ঘুরবে সেটার সম্পূর্ণ আন্দাজ করতে পারেন না। অতীত ইতিহাস এবং ঘটমান বর্তমানের ধারা বিশ্লেষণ করে কোন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হন, যেটার থেকে অনেক সময় তাঁর নিজেরই জীবিতকালে সরে আসতে বাধ্য হন। সুভাষচন্দ্র যখন The Indian Strugge বইটি লিখেছিলেন, তখন Fascism তার নখদন্ত পুরোপুরি বার করে নি। তাই Fascism সম্পর্কে তাঁর একটা দুর্বলতা ছিল। কিন্ত তাঁর তৎকালীন মূল্যায়ন যে ভুল ছিল পরবর্তীকালে তা স্বীকার করতে দ্বিধা করেন নি। কিন্ত ভবিষ্যতে ভারতের স্বাধীনতালাভের উগ্র তাড়নায় তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য Fascist দের সাথে tactically হাত মিলিয়েছিলেন, সেটা ঠিক না ভুল ছিল, তার সঠিক মূল্যায়ন কোনদিনই করা যাবেনা।
হ্যাঁ ঠিক, প্রশ্নটা তো থেকেই যায়।