
সিগনাল লাল থেকে সবুজ হল। দুখিরাম বাইক চালু করে সবুজ পথে এগোল কয়েক গজ। লাল বাতির নিষেধ যে দিকে – সে দিক থেকে তীব্র হুটার বাজিয়ে এবং তীব্রতর গতিতে একটি ‘স্বর্গ রথ’ এসে ঘ্যাঁচ করে দাঁড়াল তার ঘাড় ঘেঁষে। আর একটু পরে ব্রেক দিলে দুখিরাম তাঁর সাড়ে তিন হাত জমি পেয়ে যেত। থতমত দুখিরামকে আরো ভ্যাবলা-কান্ত করে সেই স্বর্গ রথের সারথি গর্জন করে বলল –
‘হুটার শুনতে পান না? জানেন না আমাদের তাড়া থাকে’?
দুখিরাম উঁকি দিয়ে দেখল গাড়ির পিছনে নির্বাণ শয়ানে একমাত্র যাত্রীকে। বিনীত বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল –
‘এনার এখনো তাড়া আছে?’
‘ওনার নয় – আমার। সকাল থেকে বসে হাই তুলছি শুধু। এমনিতে ডিসেম্বর জানুয়ারি আমাদের লক্ষ্মী মাস। ঝুনো নারকেল টুপটাপ খসে পড়ে। এ বছর যেন শনি লেগেছে। দিনে দুটো বুকিংও আসছে না। ব্যবসা তো লাটে উঠল বলে। সবে বারোটায় একটা খেপ ধরেছি। নামিয়ে আর একটা ধরব। দেরি হলে রোঘো শালা ধরে নেবে। নিজে সরবেন না কোলে করে সরাব?’
ততক্ষণে দুখিরামের পেছনে অন্য দু চাকা, চার চাকার মালিকরা ঝ্যাঁ, ঝ্যাঁ, প্যাঁ, পো, ইত্যাদি শব্দের ঝড় তুলেছেন। তাদেরও তাড়া আছে। এত ভ্যানতাড়া বিল্কুল না পসন্দ। তাছাড়া সামনে রঘু ডাকাতের জামাইবাবু করাল কুম্ভীরের মত দাঁড়িয়ে। দুখিরাম কাঁপতে কাঁপতে বাইক ঠেলে ধারে সরল। মর্তের মানুষ আর স্বর্গের পথিক সবাই প্রাণপণে দৌড়ল যে যার দিকে।

বাড়িতে ঢুকতেই দুখিরামকে – মুখে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে – মেপে নিল মেয়ের মেয়ে। পরিবারের নবীন সংযোজন। মাপা হাসি দিল তিন ইঞ্চি টাক। তারপর সেকেন্ড দশেক বিলম্বিত গাওয়ার পরেই তার চিল চিৎকারে কাক চড়ূই পালাল পাড়া ছেড়ে। খিদে পেয়েছে অতএব এখুনি খাবার চাই। রে রে করে দৌড়ে এলো নতুন ও পুরোন মায়েরা। মিনিট খানেকের মধ্যেই ত্রাণ সামগ্রী পাওয়া গেল এবং পশ্চিম রণাঙ্গনে শান্তি। শুধু দুখিরাম বুঝে নিল সদ্যজাতর তাড়াও কম নয়।
দুখিরামের মেয়ে বলল
‘বাবা ব্ল্যাক কারেন্ট খাবে?’
‘কারেন্ট কি খাবার জিনিস?’
‘আরে ওটা আইসক্রিম। খাবে?’
‘সে তো আনতে হবে। বিকেলে আনা যাবে না হয়।’
‘দূর। এখনি খাব। এই তো টমেটো সাইটে টাকা দেবো – আট মিনিটে দুয়ারে খাবার।’
দুখিরাম ‘এখনি ‘ শব্দটির প্রয়োগ লক্ষ্য করল।
বসে থাকা গোরিলার মত একটি আরাম কেদারায় গা এলিয়ে, ঠ্যাং উঠিয়ে বসল দুখিরাম । এ তার বড় প্রিয় ‘দক্ষিণের বারান্দা।’ অবসরের আগেই কিনে রেখেছে একখানা। এক চিলতে বাসস্থানে অতিথির ঢাউস চেহারার জন্যে পরিবারে বিলক্ষণ বিবাদ হয়েছিল। কিন্তু দুখিরাম এবার আর লোকের কথা শুনে সাধের সীতাকে ছাড়েনি। নিস্তরঙ্গ চিত্তে বার দুয়েক অনুলোম বিলোম হয়েছে কি হয় নি – মুঠোফোন বাজল –
‘বলছি।’
‘আপনি নয় আমি বলছি স্যার। মিস্টার ইন্ডিয়া।’

এই মিস্টার ইন্ডিয়া একজন অদৃশ্য মানবক। ব্যাঙ্ক তাকে দুখিরামের ল্যাজে বেঁধে দিয়েছে মোলায়েম হাসি দিয়ে। তাকে চোখে দেখা যায়না কখনো। মুঠোফোনে ভেসে আসেন। দুখিরামকে ক্রোড়পতি বানানো টাই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে হয়। ‘কবে তোমার আসবে টেলিফোন’ বলে হা পিত্যেশ করতে হয় না – প্রতিদিন বেলা বারোটা নাগাদ তার ফোন আসে। আজ এলো বারোটা পঁচিশে।
‘ভারতীয় সিগারেটের দাম কমল এই মাত্র।’
‘আমি তো সিগারেট খাই না।’
‘স্যার সত্যি রসিক মানুষ। বলছি – শেয়ার নামলো এই মাত্র। গোটা দশেক এই বেলা কিনতেই হবে। আমি নজর রাখছি স্যার। বেলা চারটে নাগাদ যদি বাড়ে – ঝোপ বুঝে লোপ।’
‘লোপ?’
‘ঝেড়ে দেব স্যার। বলুন বলুন শিগ্রি বলুন। এই আবার দু পয়েন্ট বাড়ল বুঝি।’
‘আমি আপনাকে আগেও বলেছি এ সব আমার দূর পাল্লাতেও নেই।’
‘সে পাল্লা তো আমি বুঝব স্যার আপনি শুধু বাটখারা চাপাবেন। জলদি হ্যাঁ বলুন।’
‘অ্যাঁ। আচ্ছা হ্যাঁ।’
‘গুড। এবার বলি লাল্টু নির্মাণ কোম্পানির শেয়ার চড়চড় করে উঠেছে। বড় জোর আধ ঘণ্টা থাকবে। আপনার পঁচিশটা এই মওকাতে ঝেড়ে দিন।’
‘আমি একটু ভেবে দেখি?’
‘সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়। ভেবে কি করবেন আপনি? বাজারের প্যাঁচ পয়জার যতদূর জানি – আপনার কিছুই তেমন – হেঁ হেঁ। ভাবা যায় এই দুহাজার তেইশেও ষাঁড় চিনলেন না, ভালুক চিনলেন না। সুখী মানুষ। পরেই যখন ভেবে দিচ্ছে আপনার ভাবনা – আপনি পরেই ভাববেন স্যার। এখন অ্যাকশন। দিই ঝেড়ে?’
পেটো নয় শুধু শেয়ার । তেড়ে ধরা – ধরে ছাড়া। দুখিরাম সম্মতি দিয়ে বাঁচল। সত্যিই এ জগত তার চারণ ভূমি নয়। যৎসামান্য টাকা এর ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। তার আবাহন – বিসর্জন আছে – আবার নেই ও। তবে যা উল্লেখ্য তা হল – চিৎ বা পট – ঝটপট ঝটপট।
সন্ধ্যে বেলা বামন বিষাদ নিয়ে বসে আছে দুখিরাম। এ রকম সময়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সারা জীবন কাজে দিয়েছে। নিখিল নন্দিত দুই শিল্পীর সেতার সরোদ যুগলবন্দী খুঁজে বার করল আন্তর্জালে। সিন্ধু ভৈরবী। চোখ বুঝে শুনছে। ছেলে এলো।
‘কি শুনছো বাবা?’
‘সিন্ধু ভৈরবী। বসে একটু শোন। এমন শান্তি আর পাবি না।’
‘আরে প্রথম দিকটা লাফিয়ে যাও না। শেষের দিকে যে খুব তাড়াতাড়ি বাজায় না – দ্রুত না কি বলে – ওখান থেকে চালাও। কি দারুণ লাগে।’
‘এখন বিলম্বিত চলছে। লাফিয়ে কেন যাব? সমস্ত টা নিয়েই তো…।’
‘তাড়া আছে বাবা। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কলে বসতে হবে। আচ্ছা চট পট সেরে আসছি।’

সে হাসতে হাসতে চলে গেল। দুখিরাম আসতে আসতে ব্যাপারটা পরিপাক করতে লাগল। কোভিডের পরে এই ‘কল’ সংস্কৃতি কলেরার মতই ব্যাপক হয়েছে। নবীন চাকরিজীবী প্রায় সবাই – সদা সর্বদা কল কল করছে। তা হোক – কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ? সে যত টুকু চেনে – সেই সুধা যেন ঘন শীতের পাটালি।সারা রাত বাছাই গাছের থেকে টুপ টুপ ঝরে পড়ল খেজুর রস। হাড়ি নামল ভোরে। তারপর ধীরে ধীরে সেই রস জ্বাল দিয়ে কেলাসিত হল ।ধৈর্য চাই। তবে তার স্বাদ জমে , মন মজে। তারও কি দিন গেল? পাঁচ দিন থেকে কুড়ি ওভার ?
ল্যাপটপ খুলে বসল দুখিরাম। কিছু গল্প পড়া যাক। প্রচুর সম্ভার দিয়ে সাজানো প্রখ্যাত প্রকাশনার আন্তর্জালিক কল্প লোক। সেখানে প্রতিদিন নতুন গল্প উড়ে বেড়াচ্ছে। ধরো আর পড়ো। একটি আবেদনে চোখ আটকাল। গল্প চাইছেন সম্পাদক। অনধিক দুশো শব্দের রচনা।মাত্র দুশো শব্দ? এ যে ঘরের মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানো। ছাড়বে কি ? গোটাবেই বা কি? পাঠকেরও তবে এখন গতির গদ্য চাই।

দুখিরাম দুচোখ বুজে একটু চিন্তা লোকে যাবে – গৃহিণী হাঁক দিলেন –
‘তুমি কি এখন চা খাবে তো ? কি চা দেবো? লাল? সবুজ ? গেরুয়া’?
‘গেরুয়া চা মানে? দাদা হল, দিদি হল , এবার কি তবে…… ‘?
‘উঃ তুমি দয়া করে ‘ সন্ধেবেলা ষাট মিনিট ‘দেখা ছাড়বে ? সবেতেই …… হুঁহ। গেরুয়া মানে দুধ চা। সময় নেই তাড়াতাড়ি বল।’
‘খয়েরি। মানে দুধ একটু বেশী। বিস্কুট আমি নিয়ে নেব।’
ঠিক যেন ক্রোড় পতি হবার সারি সারি বিকল্প। বিস্কুটের প্রশ্নটা বাঁচানো গেছে। দুখিরামের মন জেনে গৃহিণী দৌড়লেন রান্না ঘরে। দুখিরামের চাকরির বৃত্ত সম্পুর্ন হয়েছে – তেনার নিবৃত্তি হয় নি। তিনি যেন সেই সেবা সংস্থানের ট্যাগ লাইন – তোমার ছুটি – আমার নয়। সুতরাং – তিনি গত সাড়ে তিন দশক – ঘোড়ায় জিন চড়িয়েই আছেন। দুখিরাম চা নিয়ে আবার একবার ভাবনার সাগরে ডুব দিল।

লাট্টুর মত পৃথিবীতে পড়েই মানুষ ‘তাড়া’ র ছলনায় ঘুরে চলেছে। মাছ-ওয়ালা দাঁড়ি পাল্লায় রুই চাপিয়ে পরের জনের চিংড়ির পরিমাণ জেনে নিচ্ছে। সবজী বিক্রেতারও রোখ আছে । অনেকটা ‘তুই না লিলে ডাঞ্চি বাবু আছে – সেই লিবে।’ রকমারি জিনিস নিয়ে প্রাণপণে দুচাকায় দৌড়চ্ছে ‘পলক ঝপক’ কোম্পানির লোক। সকালে যে সংস্থায় কর্মরত বাড়ির বালকটি – বিকেলে সে সম্পর্ক কেটে যাচ্ছে। পরের দিনের বুট বাঁধা অন্য কোথাও – অন্য কোন খানে। আজকে যে এসে জল পরিশোধক বেচে গেল – দিন তিনেক পরে সেই আর্য়ুবেদিক ওষধির গুনাগুন ব্যাখ্যা করে গেল। অগতির গতি শুধুই গতিময়তা। অনন্ত ম্যারাথন চলছে চৌদিকে। ব্যাবহারিক – মানসিক। পথের শেষ কোথায়? কে জানে।
তবে পথিকের একটা শেষ আছে অবশ্য। দিন দুয়েক আগে দুখিরামের প্রায় চল্লিশ বছরের বন্ধু অন লাইন থাকতে থাকতেই ছেড়ে গেল পৃথিবী। কি এমন তাড়া ছিল তার যে এত তাড়াহুড়োয় তারার সীমানা ছাড়াল ?মাটি পৃথিবীতে অবসরের স্বাদ পেল না। তারার দেশে হয়ত পাবে।কথা হল – এই দৈব পিকনিকের দেশ ছেড়ে সেই ছায়া পথেই যখন যেতে হবে তখন এত দ্রুতির কি দরকার।
(শিরোনামে রবি কবির একটি গানের বর্ণ বিপর্যয় করা হয়েছে।সেখানে তাড়া ছিল না, … ইদানীং চলে বলেই দুখিরাম ভাবল দেখি কেমন লাগে।)
[চিত্র ঋণ- আন্তর্জাল]