
চোরাপথে হাওয়া ঢোকে। মনকে অশান্ত করে তোলে। রণজয়, বিশ্বাস করতে চায় না, যে ওরও মন আছে। অথচ বর্ষার পর আকাশটা মাছরাঙার গলার মতো নীল হয়ে যায়। পাখিটা রোজ পূবদিকের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের বিশাল জলাধারের পাশে এসে বসে। চারপাশে সার দিয়ে লাগানো নারকেল বীথির কোন একটার মগডালের সবুজ পাতার ওপরে মূর্তির মতো স্থির। হঠাৎ একটা তীব্র শীস দিয়ে জলে ঝাঁপ দেয়।
রণজয় দিনরাত এক করে মিশে থাকে। ওর আপিসের অন্যান্য কর্মচারীরা বিরক্ত হয়, ঘাড়ের ওপর যদি বড়কর্তা সবসময় নিঃশ্বাস ফেলে, বিরক্তি তো আসবেই। তবে ভালও বাসে, বাড়িঘর ফেলে লোকটা ভাগাড়ে পড়ে আছে। শঙ্কর জিজ্ঞেস করে, “ম্যাডামকে নিয়ে আসবেন না?”
রণজয় হাসে, কী বলবে বোঝে না। ছেলে ব্যাঙ্গালোরে থাকে, স্ত্রী নন্দিতা ওর বাবার কাছে কলকাতায়। এখানে, এই শীতলপুরে রণজয়ের ফ্ল্যাট তালা দেওয়াই থাকে। রণজয় তো সেখানে ফেরে সপ্তাহে এক কি দুইদিন।

পানকৌরিটা ডুবে ডুবে মাছ ধরে। তারপর ডানা মেলে শুকোনোর চেষ্টা করে। রণজয় ওর মনের ডানা মেলে রাখে, কিন্তু শুকোয় না।
ভাগাড় বলতে যা বোঝায়, শীতলপুর এক সময় সত্যিই তাই ছিল। বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে, কলকাতার ধাপার মাঠের মতো আবর্জনার স্তূপ। পূতিগন্ধময় সেই স্তূপে উড়তো চিল, শকুন, বক আর নিচে আবর্জনা কুড়ানিরা। হাতে হাতে তারা প্লাস্টিক, কাচ, ধাতু আলাদা করে। আবর্জনা ঘাঁটতে ঘাঁটতে ওরাও যেন বর্জ্যমানুষ হয়ে উঠেছে। সেখানে নন্দিতা থাকবে না। ছেলের সঙ্গে সঙ্গে সেও চলে গেছে।
পৌরসভার কর্মচারীরাও তেমনই। ময়লা নোংরা টিপার ট্রাক, ট্রাকটর গাড়ি ও তাদের চালক আর ময়লা পরিস্কার করার ছেলেরা। এখন অবশ্য তাদের নতুন নাম হয়েছে, নির্মল বন্ধু আর নির্মল সাথী। শঙ্কর, ছোবাই, গাঁতু, লিটন আরও অনেকে রণজয়ের সঙ্গী সাথী। এদের নিয়েই প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে থেকে কাজ শুরু করে।
বছর আটেক আগে পাল্টাতে শুরু করে। একটা জাপানি দল আসে, তাদের সঙ্গে মিলে রণজয় বিপ্লবে শামিল হয়। নাওয়া খাওয়া ভুলে ভাগাড়েই থাকতে শুরু করে। এখন অবশ্য ‘শীতলপুর ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ বলা যাবে না, নতুন নাম হয়েছে অরুণোদয় প্রসেসিং ইউনিট। তার লক্ষ্যে রণজয় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। জাপান থেকে বিশেষজ্ঞরা এসেছে। রণজয় নিজেও ট্রেনিং নিতে দুবার জাপান ঘুরে এসেছে।
সেবার ট্রেনিং-এর পর কিছুটা সময় ছিল। টোকিও শহরের ইম্পেরিয়াল প্যালেস ইস্ট গার্ডেন দেখতে গিয়েছিল। পুরো দেশটাই যেখানে ছবির মতো, সেখানে এই বিশেষ বাগানটির সৌন্দর্য্য অতুলনীয়। রণজয়ের সঙ্গে আরও কয়েকজন ভারতীয় অফিসার ছিলেন। তারা সবাই দেশে ফিরে জঞ্জাল সমস্যার নতুন সমাধান প্রবর্তন করবেন।

রণজয় অবাক বিস্ময়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, হঠাৎই একটি নিরাপত্তা রক্ষী সাইকেল করে এসে, ওকে দাঁড় করায়। তারপর ওর হাতে একটা ছোট কাগজ তুলে দেয়। রণজয় লক্ষ্য করে, কাগজটি ওর ট্রেন-এর পুরানো ইনভয়েস। কোন সময় এই বিরাট বাগানের কোথাও, রুমাল বা পার্স বার করতে গিয়ে পকেট থেকে পড়ে গেছে। নিরাপত্তার কাজে থাকা রক্ষীরা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় সেটি নজর করে, তারপর রণজয়কে খুঁজে ফেরত দিতে এসেছে। রণজয় প্রথমে বেশ অপ্রস্তুত! এই সুন্দর জায়গায়, ও কাগজ ফেলে নোংরা করেছে বলে অনুতপ্ত হয়। রক্ষীটি অভিবাদন জানিয়ে ফিরে যায়।
রণজয় দেশে ফিরে এসে, কর্মচারী থেকে কাগজ কুড়ানিদের ডেকে বোঝাতে শুরু করে। নিজের চোখে দেখে আসা, শিখে আসা পদ্ধতিকে বাস্তবায়িত করে তোলার স্বপ্ন দেখতো। সেই স্বপ্নের বীজ চারিয়ে দিত ওর সহযোদ্ধাদের মনে।
শঙ্কর, ময়লা ফেলার ছেলেগুলোর সর্দার। রণজয়কে ওর ভগবানের মতো মনে হয়। ধীরে ধীরে গোটা জায়গাটার চরিত্র পাল্টে যেতে থাকে। ময়লা সংগ্রহ করার সময়, ওরা জৈব, অজৈব, রাসায়নিক, ইলেকট্রনিক আলাদা করে নিতে শুরু করে। জৈব বর্জ্য থেকে তৈরী হল, সার তৈরীর কারখানা। সেই সার, শঙ্কররা আবার বিক্রি করতে শুরু করে।
রিসাইকেল কোম্পানি-রা অজৈব বর্জ্য কিনে নিতে আসে। এসব থেকে পৌরসভার ভাল রোজগার হতে থাকে।
এখন শীতলপুর ভাগাড় ধীরে ধীরে সুন্দর গাছ গাছালিতে ঘেরা একটা পার্ক-এ পরিণত হয়েছে। এভাবে যে চরিত্র বদল হবে, ওরা কেউই শুরুতে বুঝতে পারেনি।
রণজয়ের এই সময়টা ভাল লাগে, যখন রাত এসে দিনে মিশে যায়, তখন যেন প্রকৃতি স্থির হয়ে ডানা মেলে বসে, ওই পানকৌরিটার মতোই। আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনের রোস্টার অনুযায়ী একটা একটা করে গাড়ি বেরতে শুরু করে। প্রতিটা কাজ রণজয় নিজে তদারক করে।

পাড়ায় পাড়ায় জনচেতনা বৃদ্ধির জন্য, পৌরসভা থেকে প্রচার ছাড়াও, নাটক গান তৈরী করে সবাইকে বুঝিয়েছে যে, বাড়ি থেকেই আবর্জনা ভাগ করে দিতে হয়। আর কোথাও ভ্যাট বা আস্তাকুঁড় থাকবে না। সবাই বাঁশি গাড়িতে ময়লা ফেলবে, সেই গাড়ি সরাসরি এনে ফেলেবে টিপার ট্রাকে। আর টিপার ট্রাক চলে আসবে অরুণোদয় প্রসেসিং ইউনিট-এ।
একটা একটা করে গাড়ি বেরচ্ছে, তখনই একজন নিরপত্তা কর্মী কয়েকটি অল্পবয়সী ছেলেমেয়েকে ধরে নিয়ে আসে। রণজয় ওয়েব্রিজের পাশে একটা চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিল। ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে বেশ অবাক হয়। বেশ চকচকে পোশাক পরিচ্ছদ। একজনের হাতে একটা বড়সড় ক্যামেরা, কয়েকজনের কাছে রিফ্লেকটার গোছের কিছু। রক্ষীটি এসে বলে, “স্যার, এরা কোন অনুমতি ছাড়া এখানে ঢুকেছে।”
ছেলেমেয়েদের দলটির মধ্যে একজন বেশ সপ্রতিভ মেয়ে, এগিয়ে এসে বলে, “এটা কি প্রোটেকটেড এরিয়া? আমরা একটু শুটিং করতে এসেছিলাম।”
রণজয় বলে, “যেকোন সরকারি অফিসেই তো ঢুকতে গেলে, অনুমতি নিতে হয়।”
“আমরা ভেবেছি, এটা কোন পার্ক।”
রণজয় হাসে, “তোমরা এই এলাকায় নতুন মনে হচ্ছে। এটা একটা প্রসেসিং ইউনিট। এখানে সলিড ওয়েস্ট প্রসেস করা হয়। আগে শীতলপুর ভাগাড় বলে যেটা কুখ্যাত ছিল।”
“এটা ভাগাড়?” ছেলেমেয়েগুলো বিস্মিত। রণজয় মনে মনে শ্লাঘা অনুভব করে। তারপর রক্ষীর দিকে ফিরে বলে, “দেখুন, কেমিকেল প্রসেসিংএর দিকে যেন না যায়। এপাশের ফুল ফলের বাগানে শুটিং করতেই পারে।”
মেয়েটি বলে ওঠে, “ওই লেক দুটোতে বোটিং করা যায়?”
রণজয় বেশ মজা পায়, “ওটা অ্যামিউসমেন্ট লেক নয়। ওখানে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট হচ্ছে। এই এলাকার সমস্ত সুয়েজ লাইন এসে এখানে টার্মিনেট করে। দুটো ওয়াটার বডি, পিউরিফিকেশনের দুটো স্তর।”
ছেলেমেয়েগুলো সব অবাক হয়ে শোনে। এমন মুগ্ধ শ্রোতা পেয়ে রণজয়ের উৎসাহ বেড়ে যায়। ওর এই কাজটা যে, একটা বিপ্লব ঘটাতে চলেছে, এই ধারনাটা ওর কাছের মানুষদের মধ্যে নেই। ও বলে চলে, “ভারতবর্ষ প্রতিদিন পনেরো লক্ষ টন বর্জ্য তৈরী করে। সেগুলো যদি ঠিক মতো প্রসেস না করা হয়, অচিরেই আমরা জঞ্জালের নিচে চাপা পড়ে যাব। অথচ উন্নতদেশগুলোতে গিয়ে দেখো, ওরা প্রত্যেক বাড়ি থেকেই আবর্জনা ম্যানেজ করছে।”
ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যে একজন বলে ওঠে, “কার্বন ফুটপ্রিন্টও তো বড় সমস্যা। এই জন্য আমাদের ইলেক্ট্রিক কার ব্যবহার করতে হবে।”
রণজয় আরও উৎসাহ পায়, আপিসের একজনকে ডেকে ওদের চা দিতে বলে। “দেখো ব্যাটারির গাড়িরও অনেক সমস্যা আছে। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি, তৈরী থেকে ডিসপোজ করা সবটাই পরিবেশের জন্য খুব বিপজ্জনক। সেটাও আল্টিমেট সলিউশন নয়। তার ওপর ইলেক্ট্রোলাইট হিসেবে প্রচুর ইথানলের প্রয়োজন হয়। সেজন্য আমরা আখচাষের ওপর নির্ভর করি। আর আখচাষে মাটির জলস্তরে খারাপ প্রভাব পড়ে।”
ছেলেটি বলে, “তবে তো খুব মুশকিল।”
“হ্যাঁ, হুজুগের বশে, কোন একটা পদ্ধতি নিয়ে এগিয়ে গেলে হবে না। তার সামনে পিছনে ভারসাম্যের জন্য যথেষ্ট গবেষণার প্রয়োজন।”
ছেলেমেয়েগুলো ছবি তুলতে চলে গেলে, রণজয় আত্মতৃপ্তি অনুভব করে। কয়েকদিন আগে, সর্বভারতীয় জঞ্জাল পরিষেবার নিরিখে ওর এই উদ্যোগ দৃষ্টান্তরূপে প্রসংশিত হয়েছে। সে সময় খুবই ভালো লেগেছিল, আজ তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজের স্বপ্নকে তুলে ধরতে পেরে, যেন আরও তৃপ্ত লাগছে।
আজ রণজয় বাড়ি ফিরবে। ছেলে হস্টেল থেকে ফিরছে, নন্দিতাও কটাদিন শীতলপুরে থাকতে এসেছে। আগে থেকে বলে রেখেছে, রণজয় যেন বাড়ি থাকে।
বছরের অন্যদিনগুলোতে কোন অসুবিধে হয়না। গোল বাধে, বাতাস যখন আগমনী গান ধরে, কী যেন একটা বুকের ভেতর চারিয়ে যায়। তখন রণজয়েরও বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে।

শীতলপুর পৌরসভা এলাকার ভেতর দুটো উঁচু টাওয়ার নিয়ে নতুন আবাসন। সেখানেই রণজয়ের ফ্ল্যাট। শঙ্করের আজ এদিকেই ডিউটি। দশ বারো তলায় উঠে, প্রতি ফ্ল্যাট থেকে জঞ্জাল নেওয়া, ওর কাজ নয়। আবাসনের পক্ষ থেকে সব আবর্জনা সংগ্রহ করে রাখে, শঙ্কররা সেখান থেকে টিপার ট্রাকে লোড করে। কিন্তু ‘রণজয় স্যার’ আছে বলে, ও আজ আবাসনের ভেতর ঢোকে।
বর্ষার পর ভোরগুলো যেন অতিরিক্ত আন্তরিক হয়ে যায়। জঞ্জাল ঘাঁটতে ঘাঁটতে, শঙ্করের নিজেকে এখন আর আগের মতো বর্জ্যমানুষ মনে হয় না। রণজয় স্যারের সংস্পর্শে, ও বুঝতে পারে এই সমাজ পরিবর্তনে, ওর মতো একজন নগন্য মানুষেরও যথেষ্ট অবদান আছে। রণজয়ের টাওয়ারের কাছাকাছি আসতেই, হঠাৎ ওপর থেকে কিছু একটা এসে পড়ে। শঙ্কর সরে যাওয়ার সময় পায় না। বুঝতে পারে একটা প্ল্যাস্টিকের ক্যারিব্যাগে মোড়া গতরাতের উচ্ছিষ্ট। শঙ্করের কাঁধে লেগে প্যাকেটা ছিঁড়ে গেছে, সারা গায়ে সেই সব মাখামাখি হয়ে যায়। সুন্দর সকালটা খানখান করে শঙ্কর গালি দিয়ে ওঠে। বহুদিন পর ওর ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা সেই বর্জ্যমানুষ বেরিয়ে আসে।
ওপরে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, কোন জানালা? কিন্তু এই কুড়ি পঁচিশ তলার বাড়ির কোন জানালা দিয়ে, কে ছুঁড়ছে? খুঁজে বার করা কঠিন। কোনক্রমে লিফ্ট চেপে এগারো তলায় রণজয়ের ফ্ল্যাটে পৌঁছয়। দরজা ঘন্টিতে চাপ দেওয়ার আগে, ভেতর থেকে রণজয়ের গলা শুনতে পায়, “তুমি জানলা দিয়ে, জঞ্জাল ছুঁড়ে ফেললে?”
প্রত্যুত্তরে একটি মহিলা কন্ঠ বলে, “বেশ করেছি। তোমার ওই লেকচার তুমি যেখানে ঘর বেঁধেছো, সেখানেই দাও। বাড়িতে তো থাকোই না। এখানে তোমার জ্ঞান ফলাতে এসো না।”
ঘন্টা না বাজিয়ে, সুইচ থেকে হাত সরিয়ে নেয় শঙ্কর। সবকিছু ছাপিয়ে, ওর শরীর থেকে তখন বাসি তরকারির গন্ধ, সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে।