ওদের সবাই আমাদের চারপাশেই ঘোরাঘুরি করে, বসবাস করে আমাদের নিকটে বা দূরে। চোখ আর বোধের জানলা একটু খোলা রাখলেই আমাদের নজরে ধরা দেয় ওরা। আপাতদৃষ্টিতে বিদঘুটে চরিত্রগুলো দিব্যি জ্যান্ত হয়ে ওঠে। আমরা চিনে নিতে পারি ওদের অনেককেই।

একটিবার মনে করুন তো হ-য-ব-র-ল-এর হৃষ্টপুষ্ট বেড়ালটাকে, যে এক চোখ টিপে ফিচেল হাসি হেসে তাকিয়ে আছে আপনার দিকে! ভাবখানা যেন ‘কেমন দিলাম?’ গোছের। আপনাকে ধোঁকা দেওয়ার প্রবল বাসনা হাসিল করার মজাটা বেশ উপভোগ করছে ও!

কিম্বা ‘হযবরল’এর সেই নেড়া, যে মুখে একটা তেলতেলে বোকাটে হাসি নিয়ে ঘাড়টা টেরচে দাঁড়িয়ে দেখছে আপনাকে। লোকটা হাবেভাবে নেহাতই একটা ভালমানুষ ভালমানুষ ভাব, কিন্তু অসম্ভব রকমের ন্যাকা। হাত দুটো সামনের দিকে ঠেলে দিয়ে কাল্পনিক অনুরোধ ঠেকানোর ছলে ‘না না ভাই, আমাকে কিন্তু গাইতে বোলনা’ বলতে বলতে আসলে সে গান গাওয়ার জন্যেই উমেদারী করছে।

নামের সঙ্গে এক্কেবারে মানানসই চেহারা ? তার নমুনা নিয়ে হাজির হিজিবিজবিজ, অকারণ হাসির দমকে যে অবিরত লুটোপুটি খাচ্ছে, কিন্তু হাসির কারণ বলার সে ফুরসৎ পাচ্ছে না। নাম জিগেস করলেই ঊর্ধতন কয়েক পুরুষের নামের নামতা পড়তে পড়তে আপনাকে গুলিয়ে দিচ্ছে ও।

কিম্বা ধরুন, পান্ত ভূতের আহ্লাদী জ্যান্ত ছানাটি, যে মায়ের সঙ্গে খুনসুটি করছে আর যেটিকে তার মাতৃদেবী মুখে বিগলিত হাসি নিয়ে ঘেঁটি ধরে তুলে আদর করছে। জ্যান্ত ছানার দুষ্টুমির হাসিটির মজা ভূতের বাপ এবং আপনি-আমি সকলেরই উপভোগ্য। আপনার নিজের ও পাশের বাড়ির দুষ্টু-মিষ্টি ছানাটার সঙ্গে ওর যেন বড্ড মিল।

তারই বিপরীতে দেখুন, না-হাসার হুমকি আর নির্দেশিকা নিয়ে তার ডেরায় বসে থাকা তিরিক্ষে, রাগত মুখের রামগড়ুরের ছানাটিকে, যে হাজার প্ররোচনাতেও না হাসার পণ করেছে। ভেবে দেখবেন, হাসির সঙ্গে সম্পর্কবিহীন এমন অকারণ গোমড়া মুখ কম নেই আপনার পৃথিবীতে। হাজার আনন্দেও এমন ব্যাজার-বিরক্ত রামগড়ুরেরা হয় হাসির খোরাক, নাহয় মূর্তিমান উপদ্রব।

বিপরীতে রামগড়ুরের ছানাটির নিদান হেলায় উড়িয়ে দিয়ে নানা ঢঙের অকারণ হসির ফোয়ারা ছুটিয়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে তিন-তিনটি আহ্লাদী, সোডার মতো হরেক কিসিমের হাসি ভসভসিয়ে বেরোচ্ছে যাদের পেট থেকে। চোখ কান খোলা রাখলে আপনার আশেপাশে এরকম হাসির রকমফের তো হরবখত আপনাকে আমোদিত করতে বাধ্য।

তারপর আপনি চমকে যাবেন সেই ‘ছিঁচকাঁদুনে মিচকে যারা শস্তা কেঁদে নাম কেনে’ দলের সেই ক্ষুদেটাকে দেখে, যাকে কোলে চড়িয়ে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছেন তার মা, আর যে-কোনো অজুহাতে পরিত্রাহি চিল-চিৎকারে হাঁ-মুখটি যেন ছোটখাট চাঁদের গহ্বরের চেহারা নিচ্ছে। কী অসামান্য এক কৌণিক অবস্থান থেকে সুকুমার ধরেছেন বেয়াড়া শিশুটির বেখাপ্পা কান্নার দৃশ্যটি!

এবার এক গাল হেসে আপনার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন সব-কিছু-লিখে-রাখা নোটবুক হাতে বিগলিত হাসির সবজান্তা বাবুটি, বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের যাবতীয় অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে জানা এবং নোটবুকে টুকে রাখার অসীম কৌতুহল ও অবিচল নিষ্ঠা যাঁর।

অভয় দেওয়ার ছল করে ‘থ্রেট কালচার’ বা হুমকি সংস্কৃতি? সে-ও আপনার মালুম হবে গিন্নী ও নয় ছেলের নামে ত্রাস তৈরি করে গোলা গোলা চোখে হাতে মুগুর নিয়ে জনৈক ভয়ানক-দর্শনের মোলায়েম সন্ত্রাস সৃষ্টির বহর দেখে।
এঁদের দুনিয়ায় একবার ঢুকে পড়লে এমন কত যে চরিত্রের ভিড় ! ইতিউতি দেখা পাবেন প্রজ্ঞাবান ও স্থিতধী মুখমন্ডলের ট্যাঁশ্ গরুর, নিজের পিঠে কল লাগিয়ে নিজেকে দৌড় করানো খুড়োমশায়ের, বিজ্ঞজনসুলভ চিন্তিত মুখের হুঁকোমুখো হ্যাংলার, নাদুস নুদুস দার্শনিক প্রকৃতির কুমড়োপটাশের, খেলার ছলে হাতি-নাচানো পালোয়ান ষষ্ঠীচরণের, নাকের ডগায় এক জোড়া গোঁফ নিয়ে গোঁফ চুরির অভিযোগে চেয়ারে বসে লম্ফঝম্ফ করা বড়বাবুস্থানীয় আমাদের আরও কত কত চেনা মানুষের, বন্ধুবান্ধবের, প্রতিবেশীর!

ভাবতে বসলে সত্যিই তল পাওয়া যায় না, রেখায় ও লেখায় বাঙালিকে উদ্ভট রসের খেলায় মজিয়ে দেওয়া এই বিচিত্রকর্মা মানুষটিকে। রসায়ন ও পদার্থ বিদ্যায় অনার্স নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক, বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত কুশলী আলোকচিত্রী ও মুদ্রণশিল্পী বা লিথোগ্রাফার, শিশু-পত্রিকার সম্পাদক, একই সঙ্গে তুখোড় ছড়াকার ও কুশলী ছবি-আঁকিয়ের মহাসম্মেলন – সে বড় যে-সে কথা নয়!

ঊনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথম আড়াই দশকে (১৮৮৭-১৯২৩) ব্যাপ্ত মাত্র পঁয়ত্রিশটি বছরের জীবনের এক উল্কাসদৃশ চরিত্র সুকুমার রায়। রায় পরিবারের তিন প্রজন্মের তিনটি অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্রের মধ্যবর্তী তিনি। পিতা উপেন্দ্রকিশোর, পুত্র সত্যজিৎ।
১৯১৫-সালে পিতার মৃত্যুর পর ‘সন্দেশ’ পত্রিকার দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে। এখানেই ছাপা হতে থাকে তাঁর সেইসব উদ্ভট, অদ্ভুত, সরস, কৌতুককর সব লেখা ও আঁকা, যা ১৯২৩ সালে তাঁর অকালমৃত্যুর পর একে একে সন্নিবিষ্ট হয় ‘আবোল তাবোল’, ‘পাগলা দাশু’, ‘খাই খাই’, ‘হ য ব র ল’ প্রভৃতি গ্রন্থে।
যেটা অবশ্যই উল্লেখের দাবি রাখে তা হল, ছবি আঁকার ক্ষেত্রে রায়বাড়ির অলংকরণের ধারায় উপেন্দ্রকিশোর বা সুকুমার ছিলেন স্বশিক্ষিত এবং সত্যজিতের মতো প্রশিক্ষিত শিল্পী তাঁরা কেউই ছিলেন না। কিন্তু পারিবারিক সৃষ্টিশীলতার আবহে অর্জিত শিল্প-নৈপুণ্য ছিল ছবি-আঁকিয়ে হিসেবে তাঁদের কুশলতার নেপথ্য কারিগর। হয়তো এই প্রেক্ষাপটেই কিছু শিল্প বিশেষজ্ঞের মতে, ‘ড্রয়িংয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময়েই সুকুমারের অপরিণত হাতের ছাপ রয়ে গেছে। রেখাগুলো মাঝে মাঝেই মনে হয় বেশ অগোছালো, অপরিচ্ছন্ন। আবার ঠিক এই কারণেই কবিতা বা গল্পের উদ্ভটত্ব বা উৎকট মজার সঙ্গে তা বেশ খাপও খেয়ে যায়।’

নিঃসন্দেহে সুকুমার রায়ের অবিস্মরণীয় চরিত্রগুলো বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। তবু রবিচক্রের সম্পাদকীয় নিবন্ধের অতীব স্বল্প পরিসরে তাঁর আঁকা অসংখ্য ছবির মধ্যে কিছু চরিত্র, উদ্ভট রসের আড়ালে যাদের অনেকেরই বসবাস আমাদের চেনা পরিসরে, তাদের কয়েকজনকে ফিরে দেখলাম আমরা। সাধারণ দর্শক ও পাঠকের দৃষ্টি নিয়ে ওদের প্রতি একটু নজর দিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করলাম তাদের অবয়ব, মুখভঙ্গী ও অভিব্যক্তি নিয়ে। বহুবার দেখা এই ছবিগুলোকে ফিরে দেখার আলো হয়তো নতুন করে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের বিপুল প্রতিভাধর চিরস্মরণীয় এই যুবককে, গত ৩০ অক্টোবর আমরা ফেলে এসেছি যাঁর ১৩৭-তম জন্মদিন। আমাদের নতজানু প্রণাম সেই চিরন্তন রসস্রষ্টার স্মৃতির উদ্দেশে।
[চিত্র ঋণ- আন্তর্জাল]


‘সুকুমার – ছবির চেনা ‘মানুষজন’… রীতিমত একটি প্রবন্ধ, একই সঙ্গে সরস এবং সিরিয়াস, যাতে সম্পাদকীয়র ছুতো করে সম্পাদক ছবি এবং কৌতুকের সাহায্যে ভুলিয়ে এনে হাল্কা জাপানি স্কেচের মতো সুকুমার জগতের আভাস দিয়ে যান , যেখানে ননসেন্সের মুখোস পড়ে আসলে বহুরূপী সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের পারিপার্শ্বিক বাস্তবের জগত।
যেহেতু সম্পাদকীয় তাই আমরাও আর বিশদ বিস্তার দাবি করতে পারলাম না, তবে আলাদা প্রবন্ধ হিসেবে এই দাবিটা সম্পাদকের কাছে আমার রইল। …চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য
রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
চমৎকার লেখা। সুকুমার রায়ের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য এর থেকে ভাল আর কী হতে পারে। আমারও প্রণাম।
ধন্যবাদ দাদা।
চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য সমীপেষু,
ছেলেবেলায় সুকুমারের ছবিগুলোর মধ্যে যে আনন্দ ও উপভোগ্যতার উপকরণ পেতাম, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছবিগুলোর একটু গভীরে গিয়ে বুঝতে পারলাম যে ওগুলো নিছকই কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র নয়। ব্যঙ্গচিত্রের আড়ালে আমাদের পরিচিত বহু চরিত্রকেই যেন চিনিয়ে দিতে চেয়েছেন সুকুমার। ফলে উপভোগ্যতা আরও বাড়ল বৈ কমল না। সম্পাদকীয়র গাম্ভীর্যকে দূরে সরিয়ে তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছি লেখাটিতে । বলা বাহুল্য়, সুকুমারের জন্মদিনটি অনুঘটকের কাজ করেছে। তবে বিষয়টি নিঃসন্দেহে আরও বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে, যেটা আমি উল্লেখও করেছি। ভবিষ্যতে ইচ্ছে রইল। তবে সেই আলোচনাটি কোনো শিল্পীর কলমে হলে সেটি বোধহয় আরও অর্থবহ ও গভীর হয়ে উঠবে।
সুকৃমার রায়ের রেখচিত্রগুলির রসঘন ব্যঞ্জনার জটাজালথেকে ভাষার
স্বচ্ছ ধারায় পাঠকচিত্তকে ভাসিয়ে দেবার জন্য সম্পাদক মহাশয়কে অনেক ধন্যবাদ।
আপনাদের বিদগ্ধ চিত্তের পাঠ ও মন্তব্য লেখকের পরিশ্রমকে সার্থক করে তোলে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।