তদানীন্তন বোম্বাইয়ের এক হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণাময় স্পন্ডিলাইটিসে আক্রান্ত হয়ে পায়ে, কোমরে ভারি ট্র্যাকশন বেঁধে টানটান চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন দীর্ঘদেহী গায়ক ও সুরকার মানুষটা। ঘরে প্রবেশ করলেন এক চিত্রপরিচালক ও এক নবীন গীতিকার, যাঁর হাতে নতুন লেখা একটি গানের কাগজ। গানটি শুয়ে শুয়েই দেখতে চাইলেন রোগী। কাগজখানা হাতে নিয়ে শূন্যে তুলে দেখে নিয়ে মিনিট খানেক চোখ বুজেই গুনগুন করতে শুরু করে গাইতে থাকেন তিনি। অন্তরা, সঞ্চারী, দ্বিতীয় অন্তরা…। অদূর ভবিষ্যতে অবিকল সেই সুরেই হল গানটির রেকর্ডিং, যা আজও আমরা শুনে চলেছি। ‘পলাতক’ ছায়াছবির কালজয়ী সেই গানঃ “আহা, কৃষ্ণ কালো আঁধার কালো / আমিও তো কালো সখি / তবে কেন আমায় ভালোবাসলে না”। ছবির পরিচালক তরুণ মজুমদার, গীতিকার মুকুল দত্ত। বলা বাহুল্য, সেদিনের যন্ত্রণাকাতর রোগীটির নাম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ছবিটির সঙ্গীত পরিচালক।
আরও একটি কাহিনি। হেমন্ত বাবুকে সামনে বসিয়ে গান লিখছেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। হেমন্ত বাবুর সামনে খোলা হারমোনিয়াম। কিছুক্ষণ পরে হাতের কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বললেন গৌরীবাবু, “দেখুন তো কেমন দাঁড়াল!” নির্লিপ্ত ভাবে কাগজটা টেনে নিয়ে চোখ বোলাতে থাকেন হেমন্ত বাবু। একবার, দুবার, তিনবার। হারমোনিয়ামের ওপর কাগজটা রেখে ঝুঁকে দেখতে থাকেন। চোখ বোজেন, খোলেন, আবার বোজেন । তারপর হারমোনিয়ামের বেলোটা খোলেন। ছাড়া ছাড়া রিড টিপতে থাকেন। তারপরেই শুরু করে দেন তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠে মন আকুল করা গানটিঃ “তোমার ভুবনে মা গো এত পাপ / এ কী অভিশাপ / নাই প্রতিকার / মিথ্যার জয় তাই, সত্যের নাই আজ অধিকার।‘… মরুতীর্থ হিংলাজের কালজয়ী সেই গান, আজও যা আমাদের মনকে উদাস করে, আবেগে আপ্লুত করে।
এতটাই স্বচ্ছন্দ, সাবলীল ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতে সুরারোপের ধরন। এসব ঘটনা আমরা পেয়েছি প্রত্যক্ষদর্শী চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদারের ভাষ্যে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবন-জোড়া সুরেলা সফরে তাঁর গানে তো বটেই, সুরারোপেও এমন সব রূপকথার গল্প কম নয়।
সত্যি কথা বলতে কি, ভাবতে বড় ধন্দে পড়তে হয় যে, কোন্ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অবয়বটি বেশি উজ্জ্বল? সুরকার হেমন্ত না গায়ক হেমন্ত? এ’ প্রশ্নও বোধহয় এড়ানো মুশকিল যে, তাঁর মোহিনী গায়ক সত্তার ছায়ায় কি কিছুটা ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর অবিস্মরণীয় সুরকারের মূর্তিটি?
কী অসামান্য তাঁর সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি! সলিল চৌধুরীর গণসঙ্গীত থেকে উত্তম-সুচিত্রার মেলোড্রামা প্রভাবিত চলচ্চিত্র, স্বদেশীয়ানার গান থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত, কান্তকবির গান, বেসিক ডিস্ক থেকে হিন্দি ছবির দুনিয়া, একটা দীর্ঘ সময়কাল ধরে সর্বত্রই তাঁর জয়যাত্রার নিশান উড়েছে অপ্রতিহত গতিতে। শুধু কণ্ঠলাবণ্যকে মূলধন করে একজন মূলত আধুনিক গানের শিল্পীর এমন উজ্জ্বল আধিপত্যের আর উদাহরণ কোথায়?
আপাদমস্তক এমন নিখুঁত বাঙালি শিল্পীই বা ক’জনকে পেয়েছি আমরা? প্রথিতযশা কৃতি বাঙালি শিল্পীর তো অভাব ছিল না সেকালের বাংলায়। কিন্তু নিখাদ বাঙালিয়ানার প্রতীক সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে চোখ বুজলেই আজও তো তাঁর ছবিটিই ভেসে আসে আমাদের মনে। বাংলা গানের সাদামাটা অথচ চিরসবুজ মহীরুহটি শতবর্ষের সীমানা ডিঙিয়েছেন বছর চারেক আগে। বলতে দ্বিধা নেই, তাঁর গান আধুনিকতার সীমানা পেরিয়ে বাঙালি জীবনে চিরকালীনতার আসরে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে আধুনিক, এই দ্রুতগামিতার যুগেও তাঁর ভরাট গলার সুরেলা মাদকতার টান অস্বীকার করা গান ভালোলাগা বাঙালির পক্ষে অসম্ভব।
সদ্য আমরা পেরিয়ে এসেছি তাঁর ১০৫ তম জন্মদিনটি। আমাদের প্রণাম এই চিরজীবী শিল্পীর উদ্দেশে। বর্তমান সংখ্যার একটি রচনায় এবং পরবর্তী সংখ্যার দুটি রচনায় ধরা থাকবে তাঁর প্রতি রবিচক্রের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
পাশাপাশি এই সংখ্যায় দুটি রচনায় আমরা অবনত শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বসন্তের আরও এক অগ্রদূত, কবি নজরুল ইসলামকে। আমাদের অনুরোধে সুদূর প্রবাস থেকে চিরতারুণ্যের কবিকে স্মরণ করেছেন শ্রী শৌভিক দে। কবিতায় শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়েছেন শ্রী অলোকরঞ্জন বসুচৌধুরী।
বিজ্ঞপ্তি


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
এক চির বরেণ্য সুরসাধক তথা অনন্য এক সঙ্গীতশিল্পীর সুরলোকে আসা যাওয়ার পথটি কত সুগম ছিল তাই তন্ময়বাবু মধুর বেদনাভরা ভাষায় এঁকে দিয়েছেন।কলমের দুচারটি আঁচড়ে ফুটে উঠেছে
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ে অনাড়ম্বর
শিল্পী সত্তার প্রতি প্রতিবেদকের
অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।
Khub bhalo laglo
অনেক অজানা তথ্য জেনে খুব ভাল লাগল।